জটিল ধোঁয়াশার গণভোট

স্বাধীনতার পর দেশে চতুর্থবারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিনই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়া হবে। সরকার বলছে, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নিতেই এই গণভোট। এসব প্রস্তাবের অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট বা দ্বিমত রয়েছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদকে সবগুলো প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংশোধন না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংশোধনী বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস বলে গণ্য হবে। আর ‘না’ জয়ী হলে ‘জুলাই সনদ’ কার্যকর হবে না।

সংস্কার প্রস্তাব বা গণভোট নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসা উচিত ছিল নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে। এটাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সংসদকে পাশ কাটিয়ে কারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিল? তাদের ম্যান্ডেট কী?

সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪টি আর গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপন করা হয়েছে চারটি প্রশ্ন। এটা এক ধরনের প্রতারণা। গোটা প্রক্রিয়াটাই হয়েছে অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে। সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করার সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে রাখা হয়েছে ধোঁয়াশার মধ্যে। আবার গণভোট আয়োজনেও জনগণকে রাখা হয়েছে অন্ধকারে।

সমস্যা হলো গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় যুক্ত করে যে প্রশ্নগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলো সাধারণ ভোটারের পক্ষে সহজে বোঝা কঠিন। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিলে কী পরিবর্তন আসবে, আর কী আসবে নাÑসে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।

অন্তর্বর্তী সরকার গণভোট বিষয়ে প্রচার চালালেও সেই প্রচার মূলত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে। গুটিকয়েক বিষয় উল্লেখ করে নাগরিকদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এতে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, গণভোটে সরকার কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের পক্ষে প্রচার চালাতে পারে না। নির্বাচন কমিশনও একই কথা বলেছিলো।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণভোটের মূল শর্ত হলো জনগণকে নিরপেক্ষ ও পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া। ‘হ্যাঁ’ বললে কী হবে, ‘না’ বললে কী হবে সেটা ভোটারদের সুস্পষ্টভাবে জানার অধিকার আছে। সেই ব্যাখ্যা না দিয়ে যদি একতরফা প্রচার চলে, তাহলে জনগণের রায় সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। এটা নাগরিকদের সঙ্গে স্পষ্টতই প্রতারণা। আমরা জানতে চাইব, রাষ্ট্রের মালিক জনগণের সঙ্গে এই প্রতারণা কিসের জন্য, কার স্বার্থে?

এমন অনেকে আছেন যারা ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের সবগুলোকেই সমানভাবে সমর্থন করেন না। কিছু প্রস্তাবকে তারা সমর্থন করেন, কিছু প্রস্তাবকে সমর্থন করেন না। প্রশ্ন হচ্ছে, হ্যাঁ-না’র গণভোটে তারা তাদের মত প্রকাশ করবেন কীভাবে।

যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে তাতে সংস্কার প্রক্রিয়া ভ-ুল হবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। গণভোটের কারণে কি সংস্কার যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে যাবে?

সম্প্রতি