রোজা এলেই দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা নতুন নয়। এ সময় সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায় খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর রোজার আগেই বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে। নতুন সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমদানিকারক ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন। নিত্যপণ্যের ব্যবসা করেন এরকম বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে তিনি ‘মাফিয়া সিন্ডিকেট’ বলেছেন। এবং তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তার নির্বাচিত সংসদীয় আসন থেকে এদের ‘সোজা করা’ শুরু হবে। লিখেছেন, ‘এরপর যতদূর যেতে পারি।’
খুব ভালো কথা- রাজনীতিবিদ এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝছেন। আমরা ধরে নিতে পারি তার উদ্দেশ্য ‘মহৎ’। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তিনি যে ভাষায় সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন সেটা একজন আইনপ্রণেতা বা সংসদ সদস্য, যিনি আবার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন, তার মুখে শোভা পায় কিনা। তার এরকম বক্তব্য দেয়ার এখতিয়ার আছে কিনা? এটাও একরকম মববাজির উসকানি কিনা?
প্রশ্ন হচ্ছে তিনি যে ভাষায় কথা বলেছেন, সেটা ব্যবসায়ীদের প্রতি একধরনের হুমকি কিনা। বাজারকে বাজারের নিয়মে, আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করাই সঙ্গত। এখানে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করা কতটা জরুরি? তিনি কি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন? সেটা করা হলে কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে? নাকি সেটা একধরনের ‘মব’-এর শাসন হবে? অন্তর্বর্তী সরকার আমলের পুরোটা সময়জুড়ে দেশ মববাজি চলেছে। নির্বাচিত সরকারের একজন মন্ত্রীও কি সেই পথে হাঁটছেন?
গত ১৮ মাসের মববাজিতে এদেশের মানুষ অতিষ্ঠ। এদেশের আইনশৃঙ্খলা, আইনের শাসনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এই মবতন্ত্র। এদেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটা মানুষ এই ‘মবের মুল্লুকের’ বিরুদ্ধে কথা বলেছে। ইশরাকের দল বিএনপি সবসময় প্রতিবাদ জানিয়েছে, এর অবসান চেয়েছে। কিন্তু এখন এ কি শুনছি ইশরাকের মুখে!
ইশরাক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সেই মন্ত্রণালয় বা তার প্রতিমন্ত্রীর কিনা সেটা আমরা জানতে চাইব। এ বিষয় নিয়ে তার কথা বলা জরুরি কি? তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী রয়েছেন কি কারণে?
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কি সত্যিই মনে করেন, হুমকি-ধামকি দিয়ে বা ‘যুদ্ধ’ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়, নাকি তিনি নাগরিকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এমন কথা বলেছেনÑসেটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। আমরা শুধু এটুকু বুঝতে পারি যে, বাগাড়াম্বর করে নাগরিকদের সমস্যার সমাধান করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গভীর হয়। সরকারও এতে বিপদে পড়ে।
নিত্যপণ্যের বাজারের লাগাম টানা যেমন দরকার, সরকারের দায়িত্বশীলদের মুখেও তেমন লাগাম টানা জরুরি। যার যেটা দায়িত্ব তিনি সেটা নিয়মমাফিক পালন করবেন সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। যার যা করবার কথা নয়, যার যেটা বলবার কথা নয়, সেটা না করা বা সে কথা না বলাই শ্রেয়।
বাজারে অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হলে তা অবশ্যই কঠোরভাবে দমন করা উচিত। কিন্তু সেই পদক্ষেপ হতে হবে আইনি কাঠামোর ভেতরে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে।
বাজার ব্যবস্থাপনা একটি বিশেষায়িত দায়িত্ব, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতায় পড়ে। সেক্ষেত্রে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তির হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক সীমারেখা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বাজার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সঠিক হলেও সেটার পদ্ধতি যদি সঠিক না হয়, ভাষা যদি আক্রমণাত্মক হয়, তবে তা ব্যবসায়ী সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। এতে করে বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তিনির্ভর বা আবেগপ্রসূত পদক্ষেপের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। সিন্ডিকেট বা কারসাজির অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করাই কার্যকর পথ। ‘যুদ্ধ’ বা ‘হুঁশিয়ারি’র ভাষা তাৎক্ষণিক জনসমর্থন হয়তো পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বাজার গড়ে তুলতে এটা সহায়ক নয়।
অর্থ-বাণিজ্য: বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি এফআইসিসিআই’র