ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

বাবুল রবিদাস

আধুনিক বিশ্ব বহুদূর এগিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প ও সাহিত্যের বিকাশের ফলে প্রতিনিয়ত নতুনত্বের উদ্ভব ঘটছে। পূর্বে মানুষ যে সব রীতি ও অভ্যাস লালন-পালন করত, বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে তার অনেক কিছুই এখন পরিত্যক্ত হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর বাস্তবতা।

যেমন, একসময় বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে সরকারিভাবে ঘোষিত গড় আয়ু ৭৩ বছর। বিজ্ঞানীরা আরও দাবি করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যেই মানুষের গড় আয়ু এক হাজার বছর পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়-চিকিৎসা বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অভাবনীয় অগ্রগতি মানুষের জীবনধারা আমূল বদলে দিতে পারে। এর পেছনে কাজ করছে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, উদ্ভাবন ও কৌশলগত বিনিয়োগ। মানুষ এখন কৃষিনির্ভর সমাজ থেকে শিল্প, জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সমাজে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ এখনও পিছিয়ে। এ সমাজের অনেক সন্তান আজও খাদ্যের সন্ধানে বনবাদাড়, মাঠ-ঘাট, পাহাড়-পর্বতে ঘোরাফেরা করে। পৃথিবীর মানুষ সভ্যতা ও জ্ঞানে এগিয়ে গেলেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ শিক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে রয়েছে। শিক্ষা, দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে ধারণার অভাবে তারা যেন অন্ধকারেই বাস করছে।

তথাকথিত কিছু নেতৃবৃন্দ বলছেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দিতে হবে; কেউ কেউ আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষার কথা বলছেন। অথচ যারা এসব কথা বলেন, তারাই আন্তর্জাতিক ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্বজুড়ে বিচরণ করছেন, খ্যাতি ও সাফল্য অর্জন করছেন। যে ভাষা শিখে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষরা ঘরে আবদ্ধ থাকবে, আয়-উপার্জন করতে পারবে না, বড় চাকরিতে যোগ দিতে পারবে না, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারবে না, কম্পিউটার বা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না-সে ভাষা চাপিয়ে দেয়া কতটা যুক্তিসংগত?

এদিকে জাতিসংঘ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিচিত করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের বাণীতে বলা হয়েছে- “আদিবাসী জনগণ প্রাচীন জ্ঞানের অভিভাবক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রক্ষক, জীববৈচিত্রে তত্ত্বাবধায়ক এবং আমাদের যৌথ ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই): আদিবাসী জনগণের জন্য ঝুঁকি ও সুফল। এআই বিপন্ন ভাষা ও মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণে, পূর্বপুরুষের ভূমির মানচিত্র তৈরিতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদিবাসী জ্ঞানকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু আদিবাসী জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ ছাড়া এই প্রযুক্তি পুরনো বঞ্চনার ধারা বজায় রাখতে, সংস্কৃতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিশ্চিত করতে হবে-এআই যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক, নৈতিক ও ন্যায়সংগতভাবে বিকশিত ও পরিচালিত হয়।” ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের শিখতে হবে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ইঞ্জিন, যন্ত্রচালিত উৎপাদন ব্যবস্থা ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অর্জনের মাধ্যমেই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। “জঙ্গলই মঙ্গল” ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে “জ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিই মঙ্গল”-এই চিন্তাধারায় বিশ্বাসী করে তুলতে হবে।

গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে উপকৃত হবে দেশ, জাতি এবং বাংলাদেশের আপামর জনগণ। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো কম্পিউটার সিস্টেমের সেই সক্ষমতা, যা মানুষের মতো চিন্তা করতে, শিখতে, সিদ্ধান্ত নিতে ও সমস্যার সমাধান করতে পারে।

যেসব দেশ এআই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, তারাই ভবিষ্যতের অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও সামাজিক কাঠামোর দিকনির্দেশনা দেবে। শিল্প খাত সমৃদ্ধ হবে, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং জটিল বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে মৌলিক গবেষণায় সাহসী ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ ছাড়া কোনো দেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হলে দলিত, অনগ্রসর, শ্রমজীবী ও বঞ্চিত সন্তানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি অর্জন করলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তিখাতে এই জনগোষ্ঠী এখনও পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক ভাষার দক্ষতা, বিশ্বমানের শিক্ষা ও পেশাদার নেটওয়ার্ক যাদের আছে, তারাই আজ বিশ্বজুড়ে সফল।

এই প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য কার্যকর শিক্ষানীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা চাওয়া কি দোষের? ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান-ড. বি. আর. আম্বেদকরের মতো শিক্ষিত, সংগঠিত ও সচেতন হয়ে উঠুন। তার বাণী আজও প্রাসঙ্গিক-“শিক্ষিত হও, একত্রিত হও এবং অধিকারের জন্য লড়াই করো।”

বিশ্ব অর্থনীতি আজ জ্ঞান ও উদ্ভাবনের দিকে এগোচ্ছে। তাই বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানদের বিজ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সহায়তা অপরিহার্য। আসুন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করি। তাহলেই তারা হবে আত্মনির্ভরশীল, মর্যাদাসম্পন্ন ও সক্ষম নাগরিক।

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

‘মুক্ত আলোচনা’ : আরও খবর

» উচ্চশিক্ষা নেতৃত্বে এক নতুন পথের দিশা: মালয়েশিয়ায় গ্যালেপ ২.০- এর অভিজ্ঞতা

» ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে মাতবোল কতটা

» কেবল চেতনা নয়, চাই ঐক্য ও কাজ: কোন পথে বাংলাদেশ?

» নভেম্বর বিপ্লবের ১০৮ বছর: শ্রেণিসংগ্রামের উজ্জ্বলতম আলোকবর্তিকা

» নতুন বাংলাদেশে নারীর পথচলা : অগ্রগতি নাকি পশ্চাদপদতা?

» কপ-৩০ কেন গুরুত্বপূর্ণ: বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

» সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং : বুদ্ধিমানরাও প্রতারিত হন!

সম্প্রতি