alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : দক্ষিণ এশীয়ার অর্থনীতি

রেজাউল করিম খোকন

: শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৪

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম। এসব দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাব আছে। এই দেশগুলোর রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় উপার্জনকারীদের অধিকাংশই আবার অদক্ষ।

দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক বাধার পাশাপাশি অ-শুল্ক বাধাও আছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের মাত্র ৮ শতাংশ হয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। শুধু ঔপনিবেশিক আমল নয়, দেশগুলোর সঙ্গে হাজার বছরের সম্পর্ক বাংলাদেশের। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে নৌ, সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশে নিয়ে আসতে পেরেছে। আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন করছি। আমরা ভারত, নেপাল ও ভতানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবাধে চলাচল করতে আগ্রহী।

দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ বাণিজ্যই হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় এবং অঞ্চল হিসেবে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ এখনো শক্তিশালী কোনো জায়গা নয়। তবে একে শক্তিশালী করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশ-ভারতের অবকাঠামো উন্নয়ন যতটুকু হয়েছে, তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ কম। এজন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতি দরকার। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধার দিক থেকে আঞ্চলিক অখ-তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে মোটামুটি মিল আছে। এগুলো হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা; কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খুবই কম। গভীর গবেষণার মাধ্যমে সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ঐকমত্য দরকার। আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব নিয়ে অতীতে বহুবার আলোচনা হয়েছে। এখন নতুন বাস্তবতা। ফলে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ হয় নিজেদের মধ্যে। তাই বাণিজ্য বাড়াতে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হওয়া দরকার। আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদারে দরকার শক্তিশালী গণতন্ত্র। আঞ্চলিক সংঘাত আছে। আছে জলবায়ু পরিবর্তন। এসব সমস্যা দূর হওয়া উচিত। আর এ জন্য দরকার আঞ্চলিক সহযোগিতা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একই ভৌগোলিক রেখায় অবস্থান করলেও তাদের মধ্যে একক মুদ্রা (কমন কারেন্সি) প্রচলনের মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এখনও তৈরি হয়নি। এই অবস্থায় দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে হবে। কমাতে হবে ব্যবসার খরচ। পাশাপাশি নিয়মিত পারস্পরিক পরামর্শ চালু করতে হবে। একটি অঞ্চলের জন্য একক মুদ্রা প্রচলন করতে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এর মধ্যে অর্থের অবাধ চলাচল, সীমান্ত অতিক্রম করার স্বাধীনতা, ঝুঁকি সহনশীলতা, পারস্পরিক আস্থা, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন ইত্যাদি। একই ভৌগোলিক সীমায় অবস্থানের পরও প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা ভিন্ন।

কেউ কেউ বলেন, ভারত কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে না? তাদের সঙ্গে ভিসা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণসহ নানা ইস্যু আছে। রূপি-টাকা লেনদেন চালু হয়েছে, কিন্তু লেনদেন হচ্ছে না। এই লেনদেন চালু করতে হলে ভারতকে বড় অঙ্কের লাইন অব ক্রেডিট দিতে হবে। বড় ধরনের ঝুঁকি সামলাতে ভারতীয় ও বাংলাদেশি মুদ্রার অদলবদল (সোয়াপ) করতে হবে। এসব উদ্যোগে ভারতকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি উভয় দেশকে করনীতি পরিবর্তন করতে হবে। দুই দেশ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতি নিয়ে প্রতি তিন মাস অন্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে সভা করতে পারে। বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়েও এমন সভার প্রয়োজন আছে। আসামের চেয়ে আমাদের বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কয়েক গুণ বেশি। ফলে এখন আর কেউ আসামে চলে যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি বাড়াতে আঞ্চলিক বাণিজ্য বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে প্রায় সময়েই। অনেক বাধা বিপত্তির কারণে মাঝে মধ্যে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য হোঁচট খাচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে উপকৃত হবে বাংলাদেশ। বাণিজ্যের হাত ধরে এই অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে প্রাধান্য দেয়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে অনেক বড় আকারের ভোক্তা শ্রেণী রয়েছে এবং বিশেষত ভোগ্যপণ্য উৎপাদন খাতে নেপালের উদ্যোক্তারা এ দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। দু’দেশের ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চুক্তির ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে। ওদিকে প্রতিবেশি দেশ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ লেনদেন আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। নেপালে বাংলাদেশের পণ্য সামগ্রী রপ্তানি আয় বেড়েই চলেছে। আর হ্রাস পাচ্ছে আমদানি উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি বিশেষ করে বাংলাদেশের কুটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি সহ দূরদর্শী কিন্তু পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখন বাংলাদেশের অনুকূলে চলে এসেছে।

নেপালে বাংলাদেশের উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য, খাদ্য দ্রব্য, শৌখিন, গৃহস্থালি পণ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর বিরাট চাহিদা রয়েছে, নেপাল অনেকদিন ধরেই আমদানিতে একচেটিয়া ভারত নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এ প্রেক্ষিতে নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বিস্তৃতির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। এখানে সুযোগ রয়েছে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের। বিপুল চাহিদার তুলনায় নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এখনও অনেকটা সীমিত রয়ে গেছে। প্রাকৃতিক ভাবে বন্দর সুবিধা বঞ্চিত ভূমি ভূমি পরিবেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারিত করতে পারে। বাংলাদেশ তার নিজের বন্দর ব্যবহার করে নেপালে অনেক পণ্য পুনঃরপ্তানি করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে মোটামুটি মিল আছে। এগুলো হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা; কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খুবই কম

বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য সিরামিকস সামগ্রী, ঔষধ, আসবাবপত্র, পোশাক সামগ্রী প্রভৃতি নেপালে রপ্তানি হচ্ছে। নেপাল থেকে আমদানি করা হচ্ছে ডাল, মশলাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য। পর্যটন খাতের ব্যাপক প্রসার ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে নেপালের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ইদানীং বেশ বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দিয়েছে দেশটির পরিবর্তিত বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি। এখন নেপাল ভারত থেকে পণ্য আমদানি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রতিবেশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। নেপালের আমদানিকৃত পণ্যের ৬৩ শতাংশই ভারত থেকে আসে। আর ১৭ শতাংশ আসে চীন থেকে। অন্যান্য দেশ থেকে আমাদনি করা হয় অবশিষ্ট ২০ ভাগ। এখন বাংলাদেশের পক্ষে যদি নেপালে অন্যান্য দেশের বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এবং আমাদানিতে সে দেশের ভারত নির্ভরতা হ্রাসকরণ নীতির সুফল পেতে হয় তাহলে রপ্তানি পণ্যের সংখ্যাগত ও পরিমাণগত আওতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ও নেপালের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে সময়োচিত, দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এ মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সন্দেহ নেই। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে শক্তিশালী আঞ্চলিক সংযোগ, সহযোগিতা এবং বাণিজ্যপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব গ্রহণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক জাতি আছে। প্রায় ২০০ কোটি জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। কিন্তু ‘দক্ষিণ এশিয়া’ পরিচয়টা এখনো ব্যাপকভাবে পরিচিত নয়। আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ প্রবাহ, আর্থিক সংযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সার্কটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। এমন বাস্তবতায় এ অঞ্চলের দেশগুলোকে ওপরের দিকে নিতে হলে দরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য। পাশাপাশি সব সময় তদারকির জন্য দরকার আলাদা একটা শক্তিশালী দপ্তর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে একটা দপ্তর থাকা দরকার।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকট

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

লবণাক্ততায় ডুবছে উপকূল

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও বাস্তবতা

সড়ক দুর্ঘটনার সমাজতত্ত্ব: আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা ও কাঠামোর চক্রাকার পুনরুৎপাদন

ছবি

অস্থির সময় ও অস্থির সমাজের পাঁচালি

ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণ: ব্যাধি ও প্রতিকার

চিপনির্ভরতা কাটিয়ে চীনের উত্থান

একতার বাতাসে উড়ুক দক্ষিণ এশিয়ার পতাকা

ছবি

স্মরণ: শহীদ ডা. মিলন ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থার সংগ্রাম

মনে পুরানো দিনের কথা আসে, মনে আসে, ফিরে আসে...

রাসায়নিক দূষণ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি

আছদগঞ্জের শুটকি : অতীতের গৌরব, বর্তমানের দুঃসময়

নবান্নের আনন্দ ও আমনের ফলন

‘প্রশ্ন কোরো না, প্রশ্ন সর্বনাশী’

ভূমিকম্প, অর্থনৈতিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা: মানসিকতার নতুন অর্থনীতি

নবম পে স্কেল ও এর আর্থসামাজিক প্রভাব

মৃত্যুদণ্ড, তারপর...

জমির ভুয়া দলিল কীভাবে বাতিল করবেন?

জুলাই সনদ আদিবাসীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি

ব্যাংকের দুরবস্থা থামানো যাচ্ছে না কেন

আমন ধানে ব্রাউন প্ল্যান্টহপারের প্রাদুর্ভাব

বৈষম্য, অপচয় ও খাদ্যনিরাপত্তার সংকট

“বাঙালি আমরা, নহিতো...”

নারী নির্যাতন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সমাজের দায়

কাঁপছে ডলারের সিংহাসন

ত্রিশতম জলবায়ু সম্মেলন : প্রতীকী প্রদর্শনী, নাকি বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির বাঁক নেওয়ার মুহূর্ত?

অপরিণত নবজাতক : ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও যত্নের জরুরি বাস্তবতা

বাংলাদেশী উত্তরাধিকার: প্রবাস-জীবন ও আমাদের সংস্কৃতি

রাজনীতিতে ভাষার সহনীয় প্রয়োগ

ভারত : এসআইআর এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজন

মনে কী দ্বিধা নিয়ে...

নিরাপদ সড়ক ভাবনা

অপরিকল্পিত বাঁধ-শিল্পায়নে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র কৃষি

ছবি

মামদানি দেখালেন নেতৃত্বের মূল পরিচয় কী

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : দক্ষিণ এশীয়ার অর্থনীতি

রেজাউল করিম খোকন

শুক্রবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৪

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম। এসব দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাব আছে। এই দেশগুলোর রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় উপার্জনকারীদের অধিকাংশই আবার অদক্ষ।

দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক বাধার পাশাপাশি অ-শুল্ক বাধাও আছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের মাত্র ৮ শতাংশ হয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। শুধু ঔপনিবেশিক আমল নয়, দেশগুলোর সঙ্গে হাজার বছরের সম্পর্ক বাংলাদেশের। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে নৌ, সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশে নিয়ে আসতে পেরেছে। আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন করছি। আমরা ভারত, নেপাল ও ভতানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবাধে চলাচল করতে আগ্রহী।

দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ বাণিজ্যই হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় এবং অঞ্চল হিসেবে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ এখনো শক্তিশালী কোনো জায়গা নয়। তবে একে শক্তিশালী করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশ-ভারতের অবকাঠামো উন্নয়ন যতটুকু হয়েছে, তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগ কম। এজন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতি দরকার। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধার দিক থেকে আঞ্চলিক অখ-তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে মোটামুটি মিল আছে। এগুলো হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা; কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খুবই কম। গভীর গবেষণার মাধ্যমে সমস্যাগুলো মোকাবিলায় ঐকমত্য দরকার। আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব নিয়ে অতীতে বহুবার আলোচনা হয়েছে। এখন নতুন বাস্তবতা। ফলে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ হয় নিজেদের মধ্যে। তাই বাণিজ্য বাড়াতে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বের হওয়া দরকার। আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদারে দরকার শক্তিশালী গণতন্ত্র। আঞ্চলিক সংঘাত আছে। আছে জলবায়ু পরিবর্তন। এসব সমস্যা দূর হওয়া উচিত। আর এ জন্য দরকার আঞ্চলিক সহযোগিতা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একই ভৌগোলিক রেখায় অবস্থান করলেও তাদের মধ্যে একক মুদ্রা (কমন কারেন্সি) প্রচলনের মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এখনও তৈরি হয়নি। এই অবস্থায় দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে হবে। কমাতে হবে ব্যবসার খরচ। পাশাপাশি নিয়মিত পারস্পরিক পরামর্শ চালু করতে হবে। একটি অঞ্চলের জন্য একক মুদ্রা প্রচলন করতে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। এর মধ্যে অর্থের অবাধ চলাচল, সীমান্ত অতিক্রম করার স্বাধীনতা, ঝুঁকি সহনশীলতা, পারস্পরিক আস্থা, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন ইত্যাদি। একই ভৌগোলিক সীমায় অবস্থানের পরও প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা ভিন্ন।

কেউ কেউ বলেন, ভারত কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে না? তাদের সঙ্গে ভিসা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণসহ নানা ইস্যু আছে। রূপি-টাকা লেনদেন চালু হয়েছে, কিন্তু লেনদেন হচ্ছে না। এই লেনদেন চালু করতে হলে ভারতকে বড় অঙ্কের লাইন অব ক্রেডিট দিতে হবে। বড় ধরনের ঝুঁকি সামলাতে ভারতীয় ও বাংলাদেশি মুদ্রার অদলবদল (সোয়াপ) করতে হবে। এসব উদ্যোগে ভারতকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি উভয় দেশকে করনীতি পরিবর্তন করতে হবে। দুই দেশ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতি নিয়ে প্রতি তিন মাস অন্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে সভা করতে পারে। বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়েও এমন সভার প্রয়োজন আছে। আসামের চেয়ে আমাদের বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কয়েক গুণ বেশি। ফলে এখন আর কেউ আসামে চলে যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গতি বাড়াতে আঞ্চলিক বাণিজ্য বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে প্রায় সময়েই। অনেক বাধা বিপত্তির কারণে মাঝে মধ্যে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য হোঁচট খাচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে উপকৃত হবে বাংলাদেশ। বাণিজ্যের হাত ধরে এই অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে প্রাধান্য দেয়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে অনেক বড় আকারের ভোক্তা শ্রেণী রয়েছে এবং বিশেষত ভোগ্যপণ্য উৎপাদন খাতে নেপালের উদ্যোক্তারা এ দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। দু’দেশের ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চুক্তির ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হবে। ওদিকে প্রতিবেশি দেশ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ লেনদেন আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। নেপালে বাংলাদেশের পণ্য সামগ্রী রপ্তানি আয় বেড়েই চলেছে। আর হ্রাস পাচ্ছে আমদানি উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি বিশেষ করে বাংলাদেশের কুটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি সহ দূরদর্শী কিন্তু পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখন বাংলাদেশের অনুকূলে চলে এসেছে।

নেপালে বাংলাদেশের উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য, খাদ্য দ্রব্য, শৌখিন, গৃহস্থালি পণ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর বিরাট চাহিদা রয়েছে, নেপাল অনেকদিন ধরেই আমদানিতে একচেটিয়া ভারত নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এ প্রেক্ষিতে নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বিস্তৃতির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। এখানে সুযোগ রয়েছে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের। বিপুল চাহিদার তুলনায় নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এখনও অনেকটা সীমিত রয়ে গেছে। প্রাকৃতিক ভাবে বন্দর সুবিধা বঞ্চিত ভূমি ভূমি পরিবেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারিত করতে পারে। বাংলাদেশ তার নিজের বন্দর ব্যবহার করে নেপালে অনেক পণ্য পুনঃরপ্তানি করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে মোটামুটি মিল আছে। এগুলো হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা; কিন্তু দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ খুবই কম

বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য সিরামিকস সামগ্রী, ঔষধ, আসবাবপত্র, পোশাক সামগ্রী প্রভৃতি নেপালে রপ্তানি হচ্ছে। নেপাল থেকে আমদানি করা হচ্ছে ডাল, মশলাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য। পর্যটন খাতের ব্যাপক প্রসার ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে নেপালের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ইদানীং বেশ বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দিয়েছে দেশটির পরিবর্তিত বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি। এখন নেপাল ভারত থেকে পণ্য আমদানি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে প্রতিবেশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। নেপালের আমদানিকৃত পণ্যের ৬৩ শতাংশই ভারত থেকে আসে। আর ১৭ শতাংশ আসে চীন থেকে। অন্যান্য দেশ থেকে আমাদনি করা হয় অবশিষ্ট ২০ ভাগ। এখন বাংলাদেশের পক্ষে যদি নেপালে অন্যান্য দেশের বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এবং আমাদানিতে সে দেশের ভারত নির্ভরতা হ্রাসকরণ নীতির সুফল পেতে হয় তাহলে রপ্তানি পণ্যের সংখ্যাগত ও পরিমাণগত আওতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ও নেপালের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে সময়োচিত, দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এ মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সন্দেহ নেই। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে শক্তিশালী আঞ্চলিক সংযোগ, সহযোগিতা এবং বাণিজ্যপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব গ্রহণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক জাতি আছে। প্রায় ২০০ কোটি জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। কিন্তু ‘দক্ষিণ এশিয়া’ পরিচয়টা এখনো ব্যাপকভাবে পরিচিত নয়। আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ প্রবাহ, আর্থিক সংযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য সার্কটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। এমন বাস্তবতায় এ অঞ্চলের দেশগুলোকে ওপরের দিকে নিতে হলে দরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য। পাশাপাশি সব সময় তদারকির জন্য দরকার আলাদা একটা শক্তিশালী দপ্তর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে একটা দপ্তর থাকা দরকার।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

back to top