alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আদিবাসী হত্যার বিচার কোন পথে

মিথুশিলাক মুরমু

: শনিবার, ১১ মে ২০২৪

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুন পৈতৃকভিটা থেকে অপহৃত হন হিল উইমেন ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমা। কল্পনার আপনজনদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মানুষেরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল, টেনেহিঁচড়ে পাহাড়ি পথে মিলিয়ে গেল। সেই ঘটনাটি এখন কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল কল্পনা চাকমার অপহৃত হওয়া মামলার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সেদিন রাঙামাটির জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা বেগম মুক্তা ‘আদালতে পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাদীর নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করে অবসানের আদেশ দেন।’ অর্থাৎ কল্পনা চাকমার দীর্ঘ ২৮ বছরের বিচারিক কাজ শেষ হলো। প্রশ্ন হচ্ছেÑ কল্পনা চাকমার মামলার রেজাল্ট কী হলো! রেজাল্ট শূন্য। কল্পনা চাকমার বড়ভাই কালিন্দী কুমার চাকমাকে শুনতে হচ্ছেÑ ‘কে বা কারা করেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি’।

এই বক্তব্যই দেশের পুলিশ বাহিনী আদালতের সম্মুখে উপস্থাপন করেছে। আদালত বলেছে, ‘প্রতিবেদনে কারও দায় পাওয়া না যাওয়ায় ২৮ বছর আগের মামলাটির অবসান হচ্ছে।’

কালিন্দী কুমার চাকমা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেন, ‘পুলিশ সুপারের তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত আসামিদের নাম উল্লেখ না করে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দায়মুক্ত করা হয়েছে।’ উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে কালিন্দী কুমার চাকমা জানিয়েছেন।

কল্পনা চাকমার অন্তর্ধানের ঘটনায় প্রথমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। অধিকতর তদন্তের জন্য রাঙামাটি পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব প্রদান করে আদালত। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মামলার ৩৯তম তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার। পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কল্পনা চাকমা অপহৃত হলেও কে বা কারা অপহরণ করেছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনের ওপর নারাজি আবেদন জানিয়ে মামলার অধিকতর তদন্তের দাবি জানান বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা। নারাজি আবেদনের ওপর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে শুনানি চলে আদালতে। অবশেষে ২৩ এপ্রিল পূর্বনির্ধারিত শুনানির দিনে আদালত পুলিশ সুপারের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের নাগরিক। সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরে সাম্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখে চলেছিলেন। হিল উইমেন ফেডারেশনের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন, কেননা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। মূলত কল্পনার অসাধারণ কল্পনা শক্তিকে স্তিমিত করতে কিংবা পাহাড়ের চেয়েও শক্তিশালী ও দুভের্দ্য প্রাচীরকে গুঁড়িয়ে দিতেই একদল চিহ্নিত দুর্বৃত্ত অপহরণ করে পাহাড়ের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে। কল্পনা চাকমা পাহাড়ের রাজনীতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ¦ল জ¦ল করছে। এমন ব্যক্তিত্বের অপহরণের তদন্ত হলো দায়সারাভাব, যেটি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য অশনিসংকেত। পুলিশ বাহিনীর ৩৯তম চৌকস কর্মকর্তাও পূর্বের পথ ধরে সোজাসাপটা প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন, কল্পনাকে যে অপহরণ করা হয়েছে, এটির কোনো প্রমাণ মেলেনি। বারবার তদন্তভার কর্মকর্তাদের হাত বদল হয়েছে কিন্তু অন্ধকারকে ঠেলে আলোর ঝলকানি দেখানোর মনমানসিকতা অভাব চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। অপহরণের দিন কল্পনার মা ও দুই ভাই বাড়িতেই ছিলেন। তিন-তিনজন স্বচক্ষে দেখার পরও অপহরণের সত্যতা প্রমাণে ব্যর্থ পুলিশ বাহিনীর প্রতি আস্থার ব্যারোমিটার তলানির দিকেই ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু কেন পুলিশের ব্যর্থতা, কী আছে এটির আড়ালে, উপেক্ষা, বঞ্চনা, অবহেলা, অবিচার, নাকি অন্যকিছু; এটিই আদিবাসীদের প্রশ্ন। এ দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে আমাদের ভাবিত করে তুলেছে তাহলে কী ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট নওগাঁর ভীমপুরে আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলার কী পরণতি হবে! প্রকাশ্য দিবালোকে বলিহার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হাতেম আলী ও শীতেষ ভট্টাচার্য গদাইয়ের লাঠিয়াল বাহিনী আলফ্রেড সরেনকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত আদিবাসী আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলাটি আদিবাসী জনসাধারণের হৃদয়ে দাগ কেটেছে কিন্তু দাগটি শুকোয়নি। উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সংগঠনগুলো বিচারের দাবিতে ভীমপুর থেকে নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটার গণপদযাত্রা করেছে, ভিন্ন ভিন্ন সময় জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।

এতকিছুর পরও আজ পর্যন্ত আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলাটি স্থবির হয়ে পড়ে আছে। আলফ্রেড সরেনের বোন রেবেকা সরেন ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছেনÑ ‘...আওয়ামী লীগ, বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক, আবার আওয়ামী লীগ সরকার দেখলাম, কারও কাছে বিচার পেলাম না।’ একই পরিস্থিতির স্বীকার টাঙ্গাইলের মধুপুর বনরক্ষীদের গুলিতে পীরেন স্নাল হত্যার মামলাটিও। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ৩ জানুয়ারি মধুপুরে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনে বনরক্ষীদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পীরেন স্নাল। সেদিন মধুপুরের জালাবাদা এলাকায় বন বিভাগের সীমানা প্রাচীন নির্মাণের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে স্থানীয়দের মিছিলে বনরক্ষী ও পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে গারো আদিবাসী যুবক পীরেন স্নাল নিহত হন এবং আহন হন আরও প্রায় ৩০ জন। ৪ জানুয়ারি রাতেই নিহত পীরেন স্নাল এবং গুলিতে আহত উৎপল নকরেক, জর্জ নকরেক, শ্যামল সাংমা, মৃদুলা সাংমা, হ্যারিসন সাংমা, বিনিয়ান নকরেকসহ অজ্ঞাত ছয়শ জনকে আসামি করে মধুপুর থানার হাবিলদার বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। এভাবেই বন বিভাগ বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলন শুরুর পর থেকে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে। শুধুমাত্র জুন ২০০৩ থেকে জুলাই ২০০৪ পর্যন্তই আদিবাসী নেতাসহ নিরীহ আদিবাসীদের নামে ২১টি মামলা দায়ের করেছিলেন। আদিবাসীরা নিজস্ব রীতিনীতিতে বনকে, বনের বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে আসছে যুগ যুগ কাল থেকে। বনের সামান্যতম ক্ষতি করাকেও তারা মারাং বা দূষণীয় জ্ঞান করে। বন রক্ষার্থে নিহত পীরেন স্নালের বিচারের ভার এখন স্রষ্টার কাছেই, একে একে ২০ বছর অতিক্রান্ত করেছে কিন্তু প্রশাসনের নীবর ও নিথর ভূমিকা আদিবাসীদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে চলেছে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গে আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় আন্দোলন বাগদা ফার্ম নিয়ে। এই বিরোধপূর্ণ জমিতে ফসল উত্তোলনে নিয়ে প্রশাসনের মুখোমুখি হলে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামে তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। সাঁওতালদের পক্ষে ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। পরে আদালত মামলা তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই গাইবান্ধা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাঁওতাল হত্যা মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে জমা দেন। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ ১১ আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনের নামে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাদী থোমাস হেমব্রম অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি পিটিশন দেন। আদালত শুনানি শেষে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে অধিকতর তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন। সিআইডি ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর আদালতে একই ধরনের অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি বাদী থোমাস পুনরায় নারাজি দেন। এই নারাজির ওপর বেশ কয়েক দফা শুনানি শেষে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ ধার্য করেছিলো আদালত, সেদিনও বাদী নারাজি দেন। পিবিআই ও সিআইডি উভয় কর্তৃপক্ষ মূল আসামিসহ ১১ জনকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করাতে আদিবাসী সাঁওতালরা হতাশ ও নিরাশ হয়ে পড়েছেন। পাহাড় থেকে সমতল কোথাও আদিবাসীরা স্বস্তিতে নেই। দিনের পর দিন মহাসড়ক থেকে রাজপথে আন্দোলন, মিছিল-মিটিং করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে কিন্তু নীতিনির্ধারকরা উদাসীন। আলফ্রেড সরেন, পীরেন স্নাল কিংবা গোবিন্দগঞ্জের তিন সাঁওতাল হত্যা বিচারের পরিণতি কি কল্পনা চাকমার পথই অনুসরণ করছেÑ সেটা এখন প্রশ্ন।

[লেখক : কলামিস্ট]

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

আদিবাসী হত্যার বিচার কোন পথে

মিথুশিলাক মুরমু

শনিবার, ১১ মে ২০২৪

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ জুন পৈতৃকভিটা থেকে অপহৃত হন হিল উইমেন ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমা। কল্পনার আপনজনদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মানুষেরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল, টেনেহিঁচড়ে পাহাড়ি পথে মিলিয়ে গেল। সেই ঘটনাটি এখন কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল কল্পনা চাকমার অপহৃত হওয়া মামলার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সেদিন রাঙামাটির জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা বেগম মুক্তা ‘আদালতে পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাদীর নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করে অবসানের আদেশ দেন।’ অর্থাৎ কল্পনা চাকমার দীর্ঘ ২৮ বছরের বিচারিক কাজ শেষ হলো। প্রশ্ন হচ্ছেÑ কল্পনা চাকমার মামলার রেজাল্ট কী হলো! রেজাল্ট শূন্য। কল্পনা চাকমার বড়ভাই কালিন্দী কুমার চাকমাকে শুনতে হচ্ছেÑ ‘কে বা কারা করেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি’।

এই বক্তব্যই দেশের পুলিশ বাহিনী আদালতের সম্মুখে উপস্থাপন করেছে। আদালত বলেছে, ‘প্রতিবেদনে কারও দায় পাওয়া না যাওয়ায় ২৮ বছর আগের মামলাটির অবসান হচ্ছে।’

কালিন্দী কুমার চাকমা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেন, ‘পুলিশ সুপারের তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত আসামিদের নাম উল্লেখ না করে সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দায়মুক্ত করা হয়েছে।’ উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে কালিন্দী কুমার চাকমা জানিয়েছেন।

কল্পনা চাকমার অন্তর্ধানের ঘটনায় প্রথমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। অধিকতর তদন্তের জন্য রাঙামাটি পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব প্রদান করে আদালত। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মামলার ৩৯তম তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার। পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কল্পনা চাকমা অপহৃত হলেও কে বা কারা অপহরণ করেছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনের ওপর নারাজি আবেদন জানিয়ে মামলার অধিকতর তদন্তের দাবি জানান বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা। নারাজি আবেদনের ওপর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে শুনানি চলে আদালতে। অবশেষে ২৩ এপ্রিল পূর্বনির্ধারিত শুনানির দিনে আদালত পুলিশ সুপারের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের নাগরিক। সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরে সাম্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখে চলেছিলেন। হিল উইমেন ফেডারেশনের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন, কেননা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। মূলত কল্পনার অসাধারণ কল্পনা শক্তিকে স্তিমিত করতে কিংবা পাহাড়ের চেয়েও শক্তিশালী ও দুভের্দ্য প্রাচীরকে গুঁড়িয়ে দিতেই একদল চিহ্নিত দুর্বৃত্ত অপহরণ করে পাহাড়ের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে। কল্পনা চাকমা পাহাড়ের রাজনীতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ¦ল জ¦ল করছে। এমন ব্যক্তিত্বের অপহরণের তদন্ত হলো দায়সারাভাব, যেটি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য অশনিসংকেত। পুলিশ বাহিনীর ৩৯তম চৌকস কর্মকর্তাও পূর্বের পথ ধরে সোজাসাপটা প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন, কল্পনাকে যে অপহরণ করা হয়েছে, এটির কোনো প্রমাণ মেলেনি। বারবার তদন্তভার কর্মকর্তাদের হাত বদল হয়েছে কিন্তু অন্ধকারকে ঠেলে আলোর ঝলকানি দেখানোর মনমানসিকতা অভাব চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। অপহরণের দিন কল্পনার মা ও দুই ভাই বাড়িতেই ছিলেন। তিন-তিনজন স্বচক্ষে দেখার পরও অপহরণের সত্যতা প্রমাণে ব্যর্থ পুলিশ বাহিনীর প্রতি আস্থার ব্যারোমিটার তলানির দিকেই ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু কেন পুলিশের ব্যর্থতা, কী আছে এটির আড়ালে, উপেক্ষা, বঞ্চনা, অবহেলা, অবিচার, নাকি অন্যকিছু; এটিই আদিবাসীদের প্রশ্ন। এ দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে আমাদের ভাবিত করে তুলেছে তাহলে কী ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট নওগাঁর ভীমপুরে আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলার কী পরণতি হবে! প্রকাশ্য দিবালোকে বলিহার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হাতেম আলী ও শীতেষ ভট্টাচার্য গদাইয়ের লাঠিয়াল বাহিনী আলফ্রেড সরেনকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত আদিবাসী আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলাটি আদিবাসী জনসাধারণের হৃদয়ে দাগ কেটেছে কিন্তু দাগটি শুকোয়নি। উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সংগঠনগুলো বিচারের দাবিতে ভীমপুর থেকে নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটার গণপদযাত্রা করেছে, ভিন্ন ভিন্ন সময় জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।

এতকিছুর পরও আজ পর্যন্ত আলফ্রেড সরেন হত্যা মামলাটি স্থবির হয়ে পড়ে আছে। আলফ্রেড সরেনের বোন রেবেকা সরেন ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছেনÑ ‘...আওয়ামী লীগ, বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক, আবার আওয়ামী লীগ সরকার দেখলাম, কারও কাছে বিচার পেলাম না।’ একই পরিস্থিতির স্বীকার টাঙ্গাইলের মধুপুর বনরক্ষীদের গুলিতে পীরেন স্নাল হত্যার মামলাটিও। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ৩ জানুয়ারি মধুপুরে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলনে বনরক্ষীদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পীরেন স্নাল। সেদিন মধুপুরের জালাবাদা এলাকায় বন বিভাগের সীমানা প্রাচীন নির্মাণের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে স্থানীয়দের মিছিলে বনরক্ষী ও পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে গারো আদিবাসী যুবক পীরেন স্নাল নিহত হন এবং আহন হন আরও প্রায় ৩০ জন। ৪ জানুয়ারি রাতেই নিহত পীরেন স্নাল এবং গুলিতে আহত উৎপল নকরেক, জর্জ নকরেক, শ্যামল সাংমা, মৃদুলা সাংমা, হ্যারিসন সাংমা, বিনিয়ান নকরেকসহ অজ্ঞাত ছয়শ জনকে আসামি করে মধুপুর থানার হাবিলদার বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। এভাবেই বন বিভাগ বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলন শুরুর পর থেকে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করে। শুধুমাত্র জুন ২০০৩ থেকে জুলাই ২০০৪ পর্যন্তই আদিবাসী নেতাসহ নিরীহ আদিবাসীদের নামে ২১টি মামলা দায়ের করেছিলেন। আদিবাসীরা নিজস্ব রীতিনীতিতে বনকে, বনের বৈচিত্র্যকে রক্ষা করে আসছে যুগ যুগ কাল থেকে। বনের সামান্যতম ক্ষতি করাকেও তারা মারাং বা দূষণীয় জ্ঞান করে। বন রক্ষার্থে নিহত পীরেন স্নালের বিচারের ভার এখন স্রষ্টার কাছেই, একে একে ২০ বছর অতিক্রান্ত করেছে কিন্তু প্রশাসনের নীবর ও নিথর ভূমিকা আদিবাসীদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে চলেছে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গে আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় আন্দোলন বাগদা ফার্ম নিয়ে। এই বিরোধপূর্ণ জমিতে ফসল উত্তোলনে নিয়ে প্রশাসনের মুখোমুখি হলে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামে তিনজন সাঁওতাল নিহত হন। সাঁওতালদের পক্ষে ২৬ নভেম্বর থোমাস হেমব্রম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। পরে আদালত মামলা তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই গাইবান্ধা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাঁওতাল হত্যা মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে জমা দেন। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ ১১ আসামির নাম বাদ দিয়ে ৯০ জনের নামে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাদী থোমাস হেমব্রম অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি পিটিশন দেন। আদালত শুনানি শেষে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে অধিকতর তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন। সিআইডি ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর আদালতে একই ধরনের অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি বাদী থোমাস পুনরায় নারাজি দেন। এই নারাজির ওপর বেশ কয়েক দফা শুনানি শেষে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ ধার্য করেছিলো আদালত, সেদিনও বাদী নারাজি দেন। পিবিআই ও সিআইডি উভয় কর্তৃপক্ষ মূল আসামিসহ ১১ জনকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করাতে আদিবাসী সাঁওতালরা হতাশ ও নিরাশ হয়ে পড়েছেন। পাহাড় থেকে সমতল কোথাও আদিবাসীরা স্বস্তিতে নেই। দিনের পর দিন মহাসড়ক থেকে রাজপথে আন্দোলন, মিছিল-মিটিং করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে কিন্তু নীতিনির্ধারকরা উদাসীন। আলফ্রেড সরেন, পীরেন স্নাল কিংবা গোবিন্দগঞ্জের তিন সাঁওতাল হত্যা বিচারের পরিণতি কি কল্পনা চাকমার পথই অনুসরণ করছেÑ সেটা এখন প্রশ্ন।

[লেখক : কলামিস্ট]

back to top