বাবুল রবিদাস
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক অধিকার। আজ আলোচনা করব “বস্ত্র” নিয়ে। অন্ন ছাড়া যেমন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনি বস্ত্র ছাড়াও মানবসমাজে চলাফেরা ও বসবাস করা যায় না।
মূলত লজ্জা নিবারণ ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষার জন্যই মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বস্ত্রের প্রয়োজন। আদিকালে মানুষ গাছের লতাপাতা, ছাল বা পশুর চামড়া ব্যবহার করে বস্ত্রের চাহিদা মেটাতো। পরবর্তীকালে গাছের আঁশ থেকে সুতা ও সেই সুতায় কাপড় তৈরির কৌশল শিখে নেয়। তবে কোথায়, কখন প্রথম কাপড় ব্যবহারের সূচনা হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য আজও অজানা। একসময় মানুষ হাতে সুতা কেটে কাপড় তৈরি করত এবং সেলাই করে পোশাক বানাত।
সেলাই মেশিনের সাহায্যে পোশাক তৈরি করার ইতিহাস মাত্র ২৬০ বছরের পুরোনো। ১৭৫৫ সালে ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রেডেরিক প্রথম যান্ত্রিক সেলাই মেশিন আবিষ্কার ও পেটেন্ট করেন, যা দ্বারা হাতে সেলাইয়ের মতো স্টিচ তৈরি করা যেত। বাণিজ্যিকভাবে সফল সেলাই মেশিন আবিষ্কৃত হয় ১৮৫১ সালে, যার আবিষ্কারক ছিলেন ইসাক মেরিট সিঙ্গার। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প সেলাই মেশিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হলো জাপানের জুকি কোম্পানি, যা ১৯৪৫ সালে টোকিওতে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৭ সালে তাদের প্রথম সেলাই মেশিন তৈরি করে।
রেডিমেড পোশাক তৈরির ইতিহাস প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো। ১৮২৯ সালে প্যারিসে ৮০টি সেলাই মেশিন নিয়ে বিশ্বের প্রথম গার্মেন্টস কারখানা স্থাপিত হয়, যেখানে সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্ম তৈরি করা হতো। ১৮৫৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের লিডস শহরে জন বেরেন তিনটি সেলাই মেশিন নিয়ে প্রথম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালু করেন।
বাংলাদেশে প্রথম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয় ১৯৬০ সালে ঢাকার উর্দু রোডে, যার নাম ছিল “রিয়াজ গার্মেন্টস”। প্রথম দিকে এখানে তৈরি পোশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হতো। ১৯৬৭ সালে “রিয়াজ গার্মেন্টস” দশ হাজার পিস শার্ট প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে রপ্তানি করে।
১৯৮১-৮২ অর্থবছরে বাংলাদেশ মাত্র ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেড পোশাক রপ্তানি করে। তখনও পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় কোনো ভূমিকা রাখেনি। কিন্তু মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে, ১৯৯২-৯৩ সালে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫টি টেক্সটাইল কলেজ, ৫৬টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, ২৭টি টেক্সটাইল বিদ্যালয়, প্রায় ৪,৬০০টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং ৬০০টি বাইয়িং হাউজ রয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে। এই বিশাল আয় সম্ভব হয়েছে প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে মূলত ওভেন শার্ট, টি-শার্ট, ট্রাউজার, জ্যাকেট, জগিং স্যুট, শর্টস, ব্রিফ ইত্যাদি তৈরি হয়। এসব পণ্য প্রধানত আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে আমেরিকা ট্যারিফ আরোপ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, যা এই খাতের সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও পোশাক রপ্তানি করা হয়। তবে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আবার পোশাক তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়। সরকার স্থানীয়ভাবে কাপড়, লাইনিং, সুতা, বোতাম, জিপার, লেবেল ইত্যাদি উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে নিট গার্মেন্টস (যেমন টি-শার্ট) উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়। ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশ বর্তমানে টি-শার্ট রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ১৯৯৪-৯৫ সালে টি-শার্ট রপ্তানি ছিল ৩৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০০৮-০৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬,৪২৯ মিলিয়ন ডলারে। যদিও বাংলাদেশের তৈরি টি-শার্টগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামের।
তবে পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় দুঃখের জায়গা হলোÑশ্রমিকদের মজুরি। ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবরের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, পোশাক খাতের প্রায় ৩২ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরিরও কম আয় করেন। ৭৮ শতাংশ শ্রমিক তাদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাতে পারেন না, এবং প্রতি আটজনের একজন শ্রমিক ঋণের জালে বন্দী।
যারা শ্রমিক, তারাই দেশের প্রাণ। তাদের ঘামেই গার্মেন্টস শিল্প টিকে আছে, তাদের হাতের তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। তাহলে তারা পিছিয়ে থাকবে কেন? বলা হয়Ñ“কাউকে পিছিয়ে রেখে উন্নয়ন নয়।” অথচ যারা কাজ করছে, তারাই যদি ঋণ করে চলতে বাধ্য হয়, তবে তা দুঃখজনক।
আমরা চাই, সংবিধান অনুযায়ী শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন হোক। যেন কোনো শ্রমিক ঋণ করে নয়, নিজের পরিশ্রমের উপার্জনে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে পারেন।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
বাবুল রবিদাস
বৃহস্পতিবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৫
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক অধিকার। আজ আলোচনা করব “বস্ত্র” নিয়ে। অন্ন ছাড়া যেমন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনি বস্ত্র ছাড়াও মানবসমাজে চলাফেরা ও বসবাস করা যায় না।
মূলত লজ্জা নিবারণ ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষার জন্যই মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বস্ত্রের প্রয়োজন। আদিকালে মানুষ গাছের লতাপাতা, ছাল বা পশুর চামড়া ব্যবহার করে বস্ত্রের চাহিদা মেটাতো। পরবর্তীকালে গাছের আঁশ থেকে সুতা ও সেই সুতায় কাপড় তৈরির কৌশল শিখে নেয়। তবে কোথায়, কখন প্রথম কাপড় ব্যবহারের সূচনা হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য আজও অজানা। একসময় মানুষ হাতে সুতা কেটে কাপড় তৈরি করত এবং সেলাই করে পোশাক বানাত।
সেলাই মেশিনের সাহায্যে পোশাক তৈরি করার ইতিহাস মাত্র ২৬০ বছরের পুরোনো। ১৭৫৫ সালে ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রেডেরিক প্রথম যান্ত্রিক সেলাই মেশিন আবিষ্কার ও পেটেন্ট করেন, যা দ্বারা হাতে সেলাইয়ের মতো স্টিচ তৈরি করা যেত। বাণিজ্যিকভাবে সফল সেলাই মেশিন আবিষ্কৃত হয় ১৮৫১ সালে, যার আবিষ্কারক ছিলেন ইসাক মেরিট সিঙ্গার। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প সেলাই মেশিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হলো জাপানের জুকি কোম্পানি, যা ১৯৪৫ সালে টোকিওতে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৭ সালে তাদের প্রথম সেলাই মেশিন তৈরি করে।
রেডিমেড পোশাক তৈরির ইতিহাস প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো। ১৮২৯ সালে প্যারিসে ৮০টি সেলাই মেশিন নিয়ে বিশ্বের প্রথম গার্মেন্টস কারখানা স্থাপিত হয়, যেখানে সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্ম তৈরি করা হতো। ১৮৫৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের লিডস শহরে জন বেরেন তিনটি সেলাই মেশিন নিয়ে প্রথম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালু করেন।
বাংলাদেশে প্রথম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয় ১৯৬০ সালে ঢাকার উর্দু রোডে, যার নাম ছিল “রিয়াজ গার্মেন্টস”। প্রথম দিকে এখানে তৈরি পোশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হতো। ১৯৬৭ সালে “রিয়াজ গার্মেন্টস” দশ হাজার পিস শার্ট প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে রপ্তানি করে।
১৯৮১-৮২ অর্থবছরে বাংলাদেশ মাত্র ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেড পোশাক রপ্তানি করে। তখনও পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় কোনো ভূমিকা রাখেনি। কিন্তু মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে, ১৯৯২-৯৩ সালে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫টি টেক্সটাইল কলেজ, ৫৬টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, ২৭টি টেক্সটাইল বিদ্যালয়, প্রায় ৪,৬০০টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং ৬০০টি বাইয়িং হাউজ রয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে। এই বিশাল আয় সম্ভব হয়েছে প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে মূলত ওভেন শার্ট, টি-শার্ট, ট্রাউজার, জ্যাকেট, জগিং স্যুট, শর্টস, ব্রিফ ইত্যাদি তৈরি হয়। এসব পণ্য প্রধানত আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে আমেরিকা ট্যারিফ আরোপ করায় আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, যা এই খাতের সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও পোশাক রপ্তানি করা হয়। তবে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আবার পোশাক তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়। সরকার স্থানীয়ভাবে কাপড়, লাইনিং, সুতা, বোতাম, জিপার, লেবেল ইত্যাদি উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নিট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে নিট গার্মেন্টস (যেমন টি-শার্ট) উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যণীয়। ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশ বর্তমানে টি-শার্ট রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ১৯৯৪-৯৫ সালে টি-শার্ট রপ্তানি ছিল ৩৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০০৮-০৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬,৪২৯ মিলিয়ন ডলারে। যদিও বাংলাদেশের তৈরি টি-শার্টগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামের।
তবে পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় দুঃখের জায়গা হলোÑশ্রমিকদের মজুরি। ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবরের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, পোশাক খাতের প্রায় ৩২ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরিরও কম আয় করেন। ৭৮ শতাংশ শ্রমিক তাদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাতে পারেন না, এবং প্রতি আটজনের একজন শ্রমিক ঋণের জালে বন্দী।
যারা শ্রমিক, তারাই দেশের প্রাণ। তাদের ঘামেই গার্মেন্টস শিল্প টিকে আছে, তাদের হাতের তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। তাহলে তারা পিছিয়ে থাকবে কেন? বলা হয়Ñ“কাউকে পিছিয়ে রেখে উন্নয়ন নয়।” অথচ যারা কাজ করছে, তারাই যদি ঋণ করে চলতে বাধ্য হয়, তবে তা দুঃখজনক।
আমরা চাই, সংবিধান অনুযায়ী শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন হোক। যেন কোনো শ্রমিক ঋণ করে নয়, নিজের পরিশ্রমের উপার্জনে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে পারেন।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]