alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। চৌদ্দ বছর আগে ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করে।

পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে একদল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের। এটা যে তাদের জন্য লজ্জার তা বুঝেও না বোঝার ভান করে রাজনৈতিক দলগুলো

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের করা পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল করে দেয় এবং এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়ে যায়। পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে কয়েকজন ব্যক্তি লিভ টু আপিল দায়ের করেন। এই আপিল আবেদনের শুনানি শেষে ২০ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১১ সনে ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং এই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত ও ‘সক্রিয়’ হয়েছে বিধায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন করতে আর কোন বাধা রইল না।

আদালতের রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলেও তাতে ফেরকা আছে, আসন্ন নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে না, হবে এর পরবর্তী নির্বাচন বা চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে, আসন্ন নির্বাচন হবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে। কারণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরুজ্জীবিত হলেও তা কার্যকর হবে ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৫৮খ(১) ও ৫৮গ(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্ত মোতাবেক। উক্ত দুইটি অনুচ্ছেদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৯০ দিনের মেয়াদ এবং কখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যভার গ্রহণ করবে তার উল্লেখ রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৫৮গ(২) মোতাবেক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার বা ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্য উপদেষ্টারা নিযুক্ত হওয়ার কথা, তাই ৫ আগস্ট থেকে ইতোমধ্যে দেড় বছর পার হয়ে যাওয়ায় এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নাকি নেই। এই সকল ব্যাখ্যা আইনজীবীদের।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আরেক রায় ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলেছে, কিন্তু এভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলতে পারে কিনা তা সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হুম, বলতে পারেন। তবে রায় প্রকাশিত হলে এ বিষয়ে আদালতের ব্যাখ্যা জানা যাবে’। তবে ২০১১ সনে আদালতের পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট একটি ত্রুটি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ উল্লেখ করেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করলেও পরবর্তী দুইটি নির্বাচন তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে সুপ্রিম কোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছিল। ’পর্যবেক্ষণ’ রায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ না হলেও মওদুদ আহমেদ উল্লেখ করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যদি অবৈধ হয়, তাহলে তা আবার দুই টার্মের নির্বাচনের জন্য বৈধ হয় কী করে! সম্ভবত এই কারণে পূর্ণাঙ্গ রায়ে ‘পরবর্তী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে’- কথাটি ছিল না।

উল্লেখ্য যে, জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১১ সনে অবৈধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর হাইকোর্ট এতদসংশ্লিষ্ট একটি রিটের রায় প্রদানকালে পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় তা সংবিধানের মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং তা হয়ে গেছে সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু ২০১১ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল প্রশ্নে বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন করলেও অসংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানিক হয়ে যায় না। সময়ের ব্যবধানে প্রদত্ত বিপরীতধর্মী কথাগুলো আদালতের, আমাদের মতো সাধারণ লোকের নয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করার দাবি জানিয়ে আসছিল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কান দেয়নি, কারণ আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করার পক্ষে ছিল না, অবশ্য পক্ষে থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিলকৃত এই ব্যবস্থা পুনর্বহালের এক্তিয়ার আওয়ামী লীগ সরকার বা জাতীয় সংসদের ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের আগ্রহ না থাকায় বিরোধী পক্ষের কেউ তখন রায় পুনর্বিবচনার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়নি, ২০২৪ সনের জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রথমে হাইকোর্টে রিট হয় এবং পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল পিটিশন দায়ের হয়। তৎপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো।

২০১১ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আর উঠত না। বিশেষ করে ২০১৮ সনের নির্বাচনে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অবশ্য একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এরশাদের আমলে প্রতিটি নির্বাচনে সকাল ১১ টার মধ্যে ভোট কাস্টিং শেষ হয়ে যেত। ১৯৯০ সনে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন হলে দলনিরপেক্ষ লোক দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন শুরু হয়। তবে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ১৯৯১ সনের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি জামায়াতে ইসলামের সহযোগিতায় সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ পরাজয় মেনে নেয়। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠত না, যদি ১৯৯৪ সনে অনুষ্ঠিত মাগুরা-উপনির্বাচন সুষ্ঠু হতো। বিএনপি সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে কারচুপির ভয়াবহতা এত দৃষ্টিকটু ছিল যে তা লক্ষ্য করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার লজ্জায় মাগুরা থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এই অবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো উপলব্ধি করে যে, বিএনপির তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু হলেও খালেদা জিয়া ছিলেন আপোষহীন, বিরোধী দলের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করেই ১৯৯৬ সনের ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচন করে ফেলেন, বড় কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ৪৮ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন, এবং সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল আবদুর রশীদ। কিন্তু আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ায় বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন গণতান্ত্রিক দেশে নেই। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে একদল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের। এটা যে তাদের জন্য লজ্জার তা বুঝেও না বোঝার ভান করে রাজনৈতিক দলগুলো। যে দলীয় সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ, সেই দলীয় সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা অনুচিত।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিএনপির হাতে প্রবর্তিত হলেও এই ব্যবস্থাকে আবার কলুষিত করেছেও বিএনপি। নিজেদের পছন্দের প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে পাওয়ার লক্ষ্যে বিএনপি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দেয়। তীব্র আন্দোলনের মুখে পছন্দের বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করতে না পেরে বিএনপি তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করে দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার নিজেদের মতো করে গঠনের চেষ্টা করেছে, যাতে নির্বাচনের পরিবেশ তাদের অনুকূলে থাকে। এই অনুকূল পরিবেশ মুখ্য হওয়ায় বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলেও অংশগ্রহণ করবে; কারণ মুহাম্মদ ইউনূস তাদের বিশ্বস্ত লোক। একই কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও মনে করে ইউনূস থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার নেই। শুধু বিএনপি নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার পেছনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও দায় আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনই পরাজিত দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং গ্রহণযোগ্য হয়নি বলেই প্রতিবারই সংসদ ছিল বিরোধী দল শূন্য। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সর্বজনস্বীকৃত ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দলের আন্তরিকতা ছিল না।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে নিরপেক্ষ নয় তা লণ্ডন বৈঠকের পর বলেছে জামায়াতে ইসলাম। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে নিরপেক্ষ নয় তা তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের কথা থেকেও প্রতিপন্ন হয়। তার কথা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী কাড়াকাড়ি করে প্রশাসনিক জায়গাগুলোতে তাদের লোক বসিয়েছে। এনসিপির জন্য দুঃখজনক হচ্ছে, প্রশাসনে তাদের লোক না থাকায় বিএনপি-জামায়াতের এই ভাগবাটোয়ারায় তারা নিজেদের কোন আমলা পায়নি। বিএনপি এবং জামায়াত তাই মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আপত্তি করছে না, এনসিপিরও আপত্তি করার কথা নয়, কারণ ইউনূস তাদেরই মনোনীত প্রতিনিধি।

ইউনূস পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ। কারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দুই পয়সারও পাত্তা দিচ্ছে না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘাত শুরু হলে নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে তা আগাম নিশ্চিত করা কঠিন। তবে নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগের উত্থানের একটি কল্পকাহিনী বিশ্বাসযোগ্য করে বিএনপি এবং জামায়েতের কানে ঢুকাতে পারলে নির্বাচনের হারজিত বিসর্জন দিয়ে কল্পিত ‘আওয়ামী ফ্যাসিজম’কে ঠেকানোর জন্য এক লহমায় তারা সংঘাত বন্ধ করে জোটবদ্ধ হয়ে যমুনায় চলে আসবে, নির্বাচনী সংঘাত থেমে যাবে। বিএনপি এবং জামায়েতের মধ্যে কারা ক্ষমতায় আসবে তা বলা কঠিন। জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে শরিয়া আইন বলবৎ করলে কোন গণতান্ত্রিক দল আর থাকবে না, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারও আর লাগবে না; অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কী করে তা আন্দাজ করাও কঠিন, কারণ ‘শিশু আর পাগল ছাড়া নিরপেক্ষ ব্যক্তি নেই,- খালেদা জিয়ার এই কথাটি আবার প্রচার হতে পারে। তবে কথাটি কিন্তু অসত্য নয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সংকট

কেন বাড়ছে দারিদ্র্য?

লবণাক্ততায় ডুবছে উপকূল

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ও বাস্তবতা

সড়ক দুর্ঘটনার সমাজতত্ত্ব: আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা ও কাঠামোর চক্রাকার পুনরুৎপাদন

ছবি

অস্থির সময় ও অস্থির সমাজের পাঁচালি

ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণ: ব্যাধি ও প্রতিকার

চিপনির্ভরতা কাটিয়ে চীনের উত্থান

একতার বাতাসে উড়ুক দক্ষিণ এশিয়ার পতাকা

ছবি

স্মরণ: শহীদ ডা. মিলন ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থার সংগ্রাম

মনে পুরানো দিনের কথা আসে, মনে আসে, ফিরে আসে...

রাসায়নিক দূষণ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি

আছদগঞ্জের শুটকি : অতীতের গৌরব, বর্তমানের দুঃসময়

নবান্নের আনন্দ ও আমনের ফলন

‘প্রশ্ন কোরো না, প্রশ্ন সর্বনাশী’

ভূমিকম্প, অর্থনৈতিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা: মানসিকতার নতুন অর্থনীতি

নবম পে স্কেল ও এর আর্থসামাজিক প্রভাব

মৃত্যুদণ্ড, তারপর...

জমির ভুয়া দলিল কীভাবে বাতিল করবেন?

জুলাই সনদ আদিবাসীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি

ব্যাংকের দুরবস্থা থামানো যাচ্ছে না কেন

আমন ধানে ব্রাউন প্ল্যান্টহপারের প্রাদুর্ভাব

বৈষম্য, অপচয় ও খাদ্যনিরাপত্তার সংকট

“বাঙালি আমরা, নহিতো...”

নারী নির্যাতন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সমাজের দায়

কাঁপছে ডলারের সিংহাসন

ত্রিশতম জলবায়ু সম্মেলন : প্রতীকী প্রদর্শনী, নাকি বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির বাঁক নেওয়ার মুহূর্ত?

অপরিণত নবজাতক : ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও যত্নের জরুরি বাস্তবতা

বাংলাদেশী উত্তরাধিকার: প্রবাস-জীবন ও আমাদের সংস্কৃতি

রাজনীতিতে ভাষার সহনীয় প্রয়োগ

ভারত : এসআইআর এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজন

মনে কী দ্বিধা নিয়ে...

নিরাপদ সড়ক ভাবনা

অপরিকল্পিত বাঁধ-শিল্পায়নে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র কৃষি

ছবি

মামদানি দেখালেন নেতৃত্বের মূল পরিচয় কী

চেকের মামলায় বৈধ বিনিময়, লেনদেন, দেনা-পাওনা প্রমাণ ছাড়া আর জেল নয়

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্জন্ম

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। চৌদ্দ বছর আগে ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করে।

পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে একদল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের। এটা যে তাদের জন্য লজ্জার তা বুঝেও না বোঝার ভান করে রাজনৈতিক দলগুলো

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের করা পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল করে দেয় এবং এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়ে যায়। পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে কয়েকজন ব্যক্তি লিভ টু আপিল দায়ের করেন। এই আপিল আবেদনের শুনানি শেষে ২০ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১১ সনে ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং এই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত ও ‘সক্রিয়’ হয়েছে বিধায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নির্বাচন করতে আর কোন বাধা রইল না।

আদালতের রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলেও তাতে ফেরকা আছে, আসন্ন নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে না, হবে এর পরবর্তী নির্বাচন বা চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে, আসন্ন নির্বাচন হবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে। কারণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরুজ্জীবিত হলেও তা কার্যকর হবে ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৫৮খ(১) ও ৫৮গ(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্ত মোতাবেক। উক্ত দুইটি অনুচ্ছেদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৯০ দিনের মেয়াদ এবং কখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার্যভার গ্রহণ করবে তার উল্লেখ রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৫৮গ(২) মোতাবেক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার বা ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্য উপদেষ্টারা নিযুক্ত হওয়ার কথা, তাই ৫ আগস্ট থেকে ইতোমধ্যে দেড় বছর পার হয়ে যাওয়ায় এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নাকি নেই। এই সকল ব্যাখ্যা আইনজীবীদের।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আরেক রায় ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলেছে, কিন্তু এভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলতে পারে কিনা তা সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হুম, বলতে পারেন। তবে রায় প্রকাশিত হলে এ বিষয়ে আদালতের ব্যাখ্যা জানা যাবে’। তবে ২০১১ সনে আদালতের পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট একটি ত্রুটি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ উল্লেখ করেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করলেও পরবর্তী দুইটি নির্বাচন তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে সুপ্রিম কোর্ট তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছিল। ’পর্যবেক্ষণ’ রায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ না হলেও মওদুদ আহমেদ উল্লেখ করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যদি অবৈধ হয়, তাহলে তা আবার দুই টার্মের নির্বাচনের জন্য বৈধ হয় কী করে! সম্ভবত এই কারণে পূর্ণাঙ্গ রায়ে ‘পরবর্তী দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে’- কথাটি ছিল না।

উল্লেখ্য যে, জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১১ সনে অবৈধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর হাইকোর্ট এতদসংশ্লিষ্ট একটি রিটের রায় প্রদানকালে পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় তা সংবিধানের মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, বরং তা হয়ে গেছে সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু ২০১১ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল প্রশ্নে বিচারপতি এসকে সিনহা বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন করলেও অসংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানিক হয়ে যায় না। সময়ের ব্যবধানে প্রদত্ত বিপরীতধর্মী কথাগুলো আদালতের, আমাদের মতো সাধারণ লোকের নয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করার দাবি জানিয়ে আসছিল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তাতে কান দেয়নি, কারণ আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করার পক্ষে ছিল না, অবশ্য পক্ষে থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিলকৃত এই ব্যবস্থা পুনর্বহালের এক্তিয়ার আওয়ামী লীগ সরকার বা জাতীয় সংসদের ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের আগ্রহ না থাকায় বিরোধী পক্ষের কেউ তখন রায় পুনর্বিবচনার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়নি, ২০২৪ সনের জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রথমে হাইকোর্টে রিট হয় এবং পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল পিটিশন দায়ের হয়। তৎপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো।

২০১১ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আর উঠত না। বিশেষ করে ২০১৮ সনের নির্বাচনে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অবশ্য একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এরশাদের আমলে প্রতিটি নির্বাচনে সকাল ১১ টার মধ্যে ভোট কাস্টিং শেষ হয়ে যেত। ১৯৯০ সনে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন হলে দলনিরপেক্ষ লোক দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন শুরু হয়। তবে বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ১৯৯১ সনের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি জামায়াতে ইসলামের সহযোগিতায় সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ পরাজয় মেনে নেয়। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠত না, যদি ১৯৯৪ সনে অনুষ্ঠিত মাগুরা-উপনির্বাচন সুষ্ঠু হতো। বিএনপি সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে কারচুপির ভয়াবহতা এত দৃষ্টিকটু ছিল যে তা লক্ষ্য করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার লজ্জায় মাগুরা থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। এই অবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো উপলব্ধি করে যে, বিএনপির তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু হলেও খালেদা জিয়া ছিলেন আপোষহীন, বিরোধী দলের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করেই ১৯৯৬ সনের ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচন করে ফেলেন, বড় কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ৪৮ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন, এবং সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল আবদুর রশীদ। কিন্তু আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ায় বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন গণতান্ত্রিক দেশে নেই। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে একদল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের। এটা যে তাদের জন্য লজ্জার তা বুঝেও না বোঝার ভান করে রাজনৈতিক দলগুলো। যে দলীয় সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ, সেই দলীয় সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা অনুচিত।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিএনপির হাতে প্রবর্তিত হলেও এই ব্যবস্থাকে আবার কলুষিত করেছেও বিএনপি। নিজেদের পছন্দের প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে পাওয়ার লক্ষ্যে বিএনপি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে দেয়। তীব্র আন্দোলনের মুখে পছন্দের বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করতে না পেরে বিএনপি তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করে দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার নিজেদের মতো করে গঠনের চেষ্টা করেছে, যাতে নির্বাচনের পরিবেশ তাদের অনুকূলে থাকে। এই অনুকূল পরিবেশ মুখ্য হওয়ায় বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলেও অংশগ্রহণ করবে; কারণ মুহাম্মদ ইউনূস তাদের বিশ্বস্ত লোক। একই কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও মনে করে ইউনূস থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার নেই। শুধু বিএনপি নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার পেছনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও দায় আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনই পরাজিত দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি এবং গ্রহণযোগ্য হয়নি বলেই প্রতিবারই সংসদ ছিল বিরোধী দল শূন্য। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সর্বজনস্বীকৃত ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দলের আন্তরিকতা ছিল না।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে নিরপেক্ষ নয় তা লণ্ডন বৈঠকের পর বলেছে জামায়াতে ইসলাম। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে নিরপেক্ষ নয় তা তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের কথা থেকেও প্রতিপন্ন হয়। তার কথা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী কাড়াকাড়ি করে প্রশাসনিক জায়গাগুলোতে তাদের লোক বসিয়েছে। এনসিপির জন্য দুঃখজনক হচ্ছে, প্রশাসনে তাদের লোক না থাকায় বিএনপি-জামায়াতের এই ভাগবাটোয়ারায় তারা নিজেদের কোন আমলা পায়নি। বিএনপি এবং জামায়াত তাই মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আপত্তি করছে না, এনসিপিরও আপত্তি করার কথা নয়, কারণ ইউনূস তাদেরই মনোনীত প্রতিনিধি।

ইউনূস পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ। কারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দুই পয়সারও পাত্তা দিচ্ছে না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘাত শুরু হলে নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে তা আগাম নিশ্চিত করা কঠিন। তবে নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগের উত্থানের একটি কল্পকাহিনী বিশ্বাসযোগ্য করে বিএনপি এবং জামায়েতের কানে ঢুকাতে পারলে নির্বাচনের হারজিত বিসর্জন দিয়ে কল্পিত ‘আওয়ামী ফ্যাসিজম’কে ঠেকানোর জন্য এক লহমায় তারা সংঘাত বন্ধ করে জোটবদ্ধ হয়ে যমুনায় চলে আসবে, নির্বাচনী সংঘাত থেমে যাবে। বিএনপি এবং জামায়েতের মধ্যে কারা ক্ষমতায় আসবে তা বলা কঠিন। জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে শরিয়া আইন বলবৎ করলে কোন গণতান্ত্রিক দল আর থাকবে না, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারও আর লাগবে না; অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কী করে তা আন্দাজ করাও কঠিন, কারণ ‘শিশু আর পাগল ছাড়া নিরপেক্ষ ব্যক্তি নেই,- খালেদা জিয়ার এই কথাটি আবার প্রচার হতে পারে। তবে কথাটি কিন্তু অসত্য নয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top