গনি মিয়া বাবুল
সড়ক দুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না।
শুধু অবকাঠামো দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়-ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি, মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট না পরা, ওভারটেক করার প্রবল মানসিকতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির অভাব, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং ট্রাফিক আইন না মানা।
অন্যান্য কারণ হলো-পরিকল্পনাহীন সড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন না মেনে সড়কের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক বাঁক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, মাদকসেবন করে গাড়ি চালানো, ভুল পথে গাড়ি চালানো, পথচারীদের ট্রাফিক আইন অমান্য, ফুটপাত ব্যবহার না করা, ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করা, সড়ক বা ফুটপাতে দোকান স্থাপন, যত্রতত্র পার্কিং, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি নিয়ম-কানুন প্রতিপালনে সবার অনীহা।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এতটাই বেড়েছে যে সড়ক–মহাসড়কগুলো ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। এখন সড়কে চলাচল মানেই জীবনবাজি রেখে চলা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী-গত দুই দশকে সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫৬ হাজার ৯৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
স্বাস্থ্য খাতের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতেও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। সড়ক নিরাপদ হলে রোগীর চাপ কমবে, সেবার মানও বাড়বে।
এআরআই বলছে-দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে চালকেরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনা ও এর প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে জিডিপির দুই থেকে তিন শতাংশ ক্ষতি হয়। জানমালের ক্ষতি ও যানজট দেশের অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকার পদক্ষেপ নিলেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাবে আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না।
বুয়েটের এআরআই-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে-সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অবকাঠামো দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়-ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। আধুনিক স্পিড ক্যামেরা, নজরদারির জন্য স্থায়ী জনবল এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার–সেবার জন্য ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে।
দুর্ঘটনা কমাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্যপ্রযুক্তি-দক্ষ করে তুলতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানি ঘটায় না-মানুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতিও তৈরি করে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সমস্যা। এর সমাধানে প্রয়োজন সার্বিক উদ্যোগ।
দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি মানবসম্পদের অপূরণীয় বিনাশ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে পরিবহন খাতের অবদান অনস্বীকার্য-যোগাযোগব্যবস্থাকে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরিবহন খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।
সড়কব্যবস্থাপনার নাজুকতা, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত ভাড়া, ট্রাফিক আইন অমান্য, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল-সব মিলিয়ে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব নয়-প্রয়োজন সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা, সমন্বিত পদক্ষেপ এবং যথাযথ বাস্তবায়ন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের দক্ষতা বাড়াতে পর্যাপ্ত ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন জরুরি। ট্রাফিক আইন মানতে চালক ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। মাদকসেবন রোধে নিয়মিত ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মানাতে হবে। নিয়ন্ত্রিত গতিতে চালানো এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণে গতি পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করতে হবে। ওভারটেকিং প্রবণতা কমাতে হবে। সড়কব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন জরুরি। অনিয়মমুক্তভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা দ্রুত দূর করতে হবে।
দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে বেগবান করতে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরাপদ সড়ক অপরিহার্য। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সবার সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
[লেখক: যুগ্ম মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
গনি মিয়া বাবুল
শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
সড়ক দুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না।
শুধু অবকাঠামো দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়-ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি, মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট না পরা, ওভারটেক করার প্রবল মানসিকতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির অভাব, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং ট্রাফিক আইন না মানা।
অন্যান্য কারণ হলো-পরিকল্পনাহীন সড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন না মেনে সড়কের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক বাঁক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, মাদকসেবন করে গাড়ি চালানো, ভুল পথে গাড়ি চালানো, পথচারীদের ট্রাফিক আইন অমান্য, ফুটপাত ব্যবহার না করা, ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করা, সড়ক বা ফুটপাতে দোকান স্থাপন, যত্রতত্র পার্কিং, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি নিয়ম-কানুন প্রতিপালনে সবার অনীহা।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এতটাই বেড়েছে যে সড়ক–মহাসড়কগুলো ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। এখন সড়কে চলাচল মানেই জীবনবাজি রেখে চলা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী-গত দুই দশকে সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫৬ হাজার ৯৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
স্বাস্থ্য খাতের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতেও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। সড়ক নিরাপদ হলে রোগীর চাপ কমবে, সেবার মানও বাড়বে।
এআরআই বলছে-দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে চালকেরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনা ও এর প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে জিডিপির দুই থেকে তিন শতাংশ ক্ষতি হয়। জানমালের ক্ষতি ও যানজট দেশের অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকার পদক্ষেপ নিলেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাবে আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না।
বুয়েটের এআরআই-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে-সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অবকাঠামো দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়-ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। আধুনিক স্পিড ক্যামেরা, নজরদারির জন্য স্থায়ী জনবল এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার–সেবার জন্য ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে।
দুর্ঘটনা কমাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্যপ্রযুক্তি-দক্ষ করে তুলতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানি ঘটায় না-মানুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতিও তৈরি করে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা এখন জাতীয় সমস্যা। এর সমাধানে প্রয়োজন সার্বিক উদ্যোগ।
দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি মানবসম্পদের অপূরণীয় বিনাশ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে পরিবহন খাতের অবদান অনস্বীকার্য-যোগাযোগব্যবস্থাকে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরিবহন খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।
সড়কব্যবস্থাপনার নাজুকতা, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত ভাড়া, ট্রাফিক আইন অমান্য, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল-সব মিলিয়ে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব নয়-প্রয়োজন সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা, সমন্বিত পদক্ষেপ এবং যথাযথ বাস্তবায়ন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের দক্ষতা বাড়াতে পর্যাপ্ত ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন জরুরি। ট্রাফিক আইন মানতে চালক ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। মাদকসেবন রোধে নিয়মিত ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মানাতে হবে। নিয়ন্ত্রিত গতিতে চালানো এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণে গতি পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করতে হবে। ওভারটেকিং প্রবণতা কমাতে হবে। সড়কব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন জরুরি। অনিয়মমুক্তভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা দ্রুত দূর করতে হবে।
দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে বেগবান করতে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরাপদ সড়ক অপরিহার্য। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সবার সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
[লেখক: যুগ্ম মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি]