এম এ হোসাইন

ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে যাকে “মাদক-বিরোধী” অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, সেটাই ছিল আসলে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নতুন কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সূচনা-যার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলা
আমেরিকা এমন এক সংঘাতে পা দিয়ে ফেলেছে, যা প্রকাশ্যে আনতে কিছুটা দ্বিধায় ছিল। কিন্তু লক্ষণগুলো সামান্য নয়, বরং প্রকট - সংবাদ শিরোনাম, পেন্টাগনের বিবৃতি, স্যাটেলাইট ছবি আর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অবস্থান বদলের গর্জন সব একই সূত্রে গাঁথা। যদি এটাকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলা না হয়, তবে “যুদ্ধ” শব্দটির আর কোনো অর্থই থাকে না।
এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় নীরবে। ক্যারিবিয়ান সাগরের কোথাও ঢেউয়ে ভাসমান কাঠের ছোট নৌকাকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোনের আঘাতের মধ্য দিয়ে। এ ধরনের নৌকা এই অঞ্চলে খুবই স্বাভাবিক যা মূলত মৎস্যজীবী, চোরাকারবারি কিংবা যে কেউ ব্যবহার করে যাদের কাছে ঐ উপকূলের জ্ঞান সরকারি মানচিত্রের চেয়েও বেশি আছে। সাধারণত মার্কিন বাহিনী এগুলো আটক করে তল্লাশি চালায়। কিন্তু এবার ড্রোন হামলায় এগুলোকে সোজা পানিতে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একটির পর আরেকটির ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। কয়েক সপ্তাহে মধ্যে প্রায় ১৪টি হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন বিবৃতিতে বলেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল মাদককারবারিদের নৌকা। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। কারণ কোকেন চোরাচালানের প্রধান রুট এসব জলসীমা নয়। বরং কলম্বিয়া, পেরু, বলিভিয়া, মেক্সিকো হয়ে স্থলপথ বা প্রশান্ত মহাসাগরের পথে মাদক চোরাচালান হয়ে থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে যাকে “মাদক-বিরোধী” অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, সেটাই ছিল আসলে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নতুন কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সূচনা-যার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলা।
অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটনের এই মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে যায়। আমেরিকা তাদের অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরীকে এই অঞ্চলে অবস্থান নিতে দেখা যায় এবং নীরবে সিআইএ-কে ভেনেজুয়েলার ভেতরে গুপ্ত কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেয়া হয়। কূটনীতির ভাষায় এটি ছিল ঝড়ের আগে সব দরজা-জানালা বন্ধ করে চাবি লাগানোর মতো পদক্ষেপ। বার্তাটি ছিল সুস্পষ্ট-পরবর্তী ড্রোন হামলা হয়তো আর কাঠের নৌকায় হবে না; কোনো পতাকাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
কিন্তু কেন ভেনেজুয়েলা? উত্তরটি দীর্ঘও, আবার সরলও। দীর্ঘ উত্তরে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল-ভা-ারের মালিকানা, এবং সেই সম্পদকে নিরাপত্তার বিনিময়ে মস্কোর কাছে তুলে দেওয়া। আছে চীনের দেওয়া বিপুল অবকাঠামো ঋণ, যা কারাকাসের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। আছে রাশিয়ার বোমারু বিমান ভেনেজুয়েলার ঘাঁটিতে অবতরণ, আর মার্কিন প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও মাদুরোর আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।
আর সরল উত্তরে আছে ক্ষমতার প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রশাসন বহুমেরুবিশ্ব মেনে নিলেও পশ্চিম গোলার্ধে বহুমেরুতা মেনে নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। মোনরো ডকট্রিন, যা অনেকের চোখে মৃত কূটনৈতিক নীতি, তা আবার নতুন প্রাণ পেয়েছে ওয়াশিংটনের কৌশলগত ভাবনায়। আর ভেনেজুয়েলা যা অর্থহীন, বিচ্ছিন্নতা ও রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ততার পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। আমেরিকার প্রভাবম-লে থাকা কোনো রাষ্ট্র যখন মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তখন কী হয়-এই প্রশ্নের জবাব দিতে ট্রাম্প আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে।
কূটনৈতিক ব্যাকচ্যানেল যদি কখনো সত্যিই চলমান থেকেও থাকে, অক্টোবরের মধ্যভাগে তা ভেঙে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান দুই বছর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। মূলত এটা আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়ার জন্য অন্য কাউকে সামনে আনার সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটেছিল। এরপর এলো পেশিশক্তি - ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ১০ হাজারেরও বেশি মেরিন ও নৌসেনা, সঙ্গে এমন নৌ ও বিমানবহর যা কোনো “মাদক-বিরোধী” অভিযানের সঙ্গে মোটেও খাপ খায় না। মাদক কারবারি দমন অভিযানে এফ-৩৫, বি-৫২ কিংবা জেরাল্ড আর. ফোর্ড ক্যারিয়ার গ্রুপের দরকার হয় না।
গোপন অভিযানের কথাও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। কারাকাস অভিযোগ করছে, তারা সিআইএ-সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের আটক করেছে যারা নাকি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ভুয়া হামলা সাজিয়ে যুদ্ধের অজুহাত তৈরি করতে চাইছিল। আরেক ঘটনায়, এফবিআই নাকি মাদুরোর ব্যক্তিগত পাইলটকে ঘুষ দিয়ে বিমানের রুট বদলে দিতে চেয়েছিল, যেন আকাশ থেকে মাদুরোকে ধরে ফেলা যায় এবং তার মাথার উপর ঘোষিত ৫ কোটি ডলারের পুরস্কার দাবি করা যায়। শুনলে সিনেমার কাহিনির মতো লাগে, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় ঠান্ডা যুদ্ধকালে মার্কিন অপারেশনের ইতিহাস জানলে ঘটনাগুলোকে অস্বাভাবিক কিছু মনে হবে না।
এখন প্রশ্ন-এরপর কী? গোপন অভিযান জটলায় পড়লে সাধারণত সামনে আসে প্রকাশ্য অভিযান। হয়তোবা কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আক্রমনের অনুমোদন দিয়ে দিবেন। আমেরিকা ক্যারিবিয়ান সাগরে ১৯৬২ সালের কিউবা মিসাইল সংকটের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। পুয়ের্তো রিকো ও ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের পুরনো সামরিক অবকাঠামো নতুনভাবে সক্রিয় করা হচ্ছে। রিপার ড্রোনগুলো টারমাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন শেল্টার ও রানওয়ে যেন দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের জন্য প্রস্তুত। এগুলো সেই আয়োজন, যা কোনো সুপার পাওয়ার যুদ্ধ শুরুর আগে করে থাকে।
আর লক্ষ্য? ভেনেজুয়েলা সামরিক দৃষ্টিকোণে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র। কাগজে-কলমে বাহিনী বিশাল, কিন্তু বাস্তবে ভেঙে পড়ার উপক্রম প্রায়। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তাদের রুশ এসইউ–৩০ বিমানগুলোকে অকেজো করে রেখেছে। পুরনো এফ-১৬ দীর্ঘদিন উড়তে পারে না। সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল। টিভির কুচকাওয়াজের বাহিনী আর বাস্তবে যুদ্ধে বাহিনীর কোনো সাদৃশ্য রাখে না।
মস্কো কিছু প্রতীকী সমর্থন দিয়েছে। কিছু পরিবহন বিমান, উপদেষ্টা, কয়েকজন ওয়াগনার ভাড়াটে সৈন্য। কিন্তু এগুলো আমেরিকার নৌক্ষমতার সামনে তুচ্ছ। আর ইউক্রেনে জড়িত রাশিয়া ভেনেজুয়েলায় বড়সড় সম্পদ পাঠাবে, এমন আশা করাও অবাস্তব। চাইলে আমেরিকা ভেনেজুয়েলার সামরিক অবকাঠামো কয়েক দিনের মধ্যেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই প্রকৃত বাস্তবতা এসে উন্মোচিত হয়। মাদুরোকে সরানো শেষ অধ্যায় নয়, বরং পরবর্তী অরাজকতার সূচনা মাত্র। শেভেজ দীর্ঘসময় ধরে বেসামরিক মিলিশিয়াদের হাতে লাখ লাখ একে–৪৭ বিতরণ করেছেন। অনুমান করা হয়, অর্ধমিলিয়নের মতো রাইফেল ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন গ্যাং, লয়্যালিস্ট গ্রুপ, পাড়ার মিলিশিয়া আর সশস্ত্র বাহিনীর ভগ্নাংশের কাছে। শাসন বদল হলে এসব অস্ত্র অদৃশ্য হবে না-বরং নতুন আনুগত্যে, নতুন নেতার অধীনে নতুন বিভাজনে সংগঠিত হবে। দেশের ভেতর দ্রুত তৈরি হবে লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো আরও বড় মানবিক বিপর্যয়।
আর এখানেই এই সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি উঠে আসে-সম্ভবত আমেরিকা ইতিমধ্যে এমন একটি যুদ্ধেই জড়িয়ে গেছে, যার অস্তিত্ব স্বয়ং ওয়াশিংটন স্বীকার করতে চাইছে না। এটি ড্রোন, নৌ-বহর, গোপন অপারেশন ও কৌশলগত চাপ দিয়ে গঠিত এক আধুনিক যুদ্ধ। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে চালানো হলেও প্রকৃত চালিকা শক্তি হচ্ছে ভূ-রাজনীতি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-মহাশক্তিগুলো দুর্বল রাষ্ট্রের সঙ্গে হঠাৎ করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে না। তাদের পদক্ষেপ থাকে লক্ষ্যভেদী, যদিও সেই লক্ষ্য প্রায়ই আড়াল করা হয়। আর ইতিহাস এটাও বলে একজন স্বৈরশাসককে সরানো সহজ, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের উপর নতুন রাষ্ট্র গড়া কঠিন। মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা হয়তো প্রথম কাজটা শিগগিরই করে ফেলবে, কিন্তু দ্বিতীয় কাজটির জন্য প্রস্তুত আছে এমন কোনো ইঙ্গিত এখনও দেখা যাচ্ছে না।
[লেখক : প্রাবন্ধিক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
এম এ হোসাইন

ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে যাকে “মাদক-বিরোধী” অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, সেটাই ছিল আসলে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নতুন কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সূচনা-যার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলা
রোববার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
আমেরিকা এমন এক সংঘাতে পা দিয়ে ফেলেছে, যা প্রকাশ্যে আনতে কিছুটা দ্বিধায় ছিল। কিন্তু লক্ষণগুলো সামান্য নয়, বরং প্রকট - সংবাদ শিরোনাম, পেন্টাগনের বিবৃতি, স্যাটেলাইট ছবি আর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অবস্থান বদলের গর্জন সব একই সূত্রে গাঁথা। যদি এটাকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলা না হয়, তবে “যুদ্ধ” শব্দটির আর কোনো অর্থই থাকে না।
এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় নীরবে। ক্যারিবিয়ান সাগরের কোথাও ঢেউয়ে ভাসমান কাঠের ছোট নৌকাকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোনের আঘাতের মধ্য দিয়ে। এ ধরনের নৌকা এই অঞ্চলে খুবই স্বাভাবিক যা মূলত মৎস্যজীবী, চোরাকারবারি কিংবা যে কেউ ব্যবহার করে যাদের কাছে ঐ উপকূলের জ্ঞান সরকারি মানচিত্রের চেয়েও বেশি আছে। সাধারণত মার্কিন বাহিনী এগুলো আটক করে তল্লাশি চালায়। কিন্তু এবার ড্রোন হামলায় এগুলোকে সোজা পানিতে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একটির পর আরেকটির ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। কয়েক সপ্তাহে মধ্যে প্রায় ১৪টি হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন বিবৃতিতে বলেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল মাদককারবারিদের নৌকা। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। কারণ কোকেন চোরাচালানের প্রধান রুট এসব জলসীমা নয়। বরং কলম্বিয়া, পেরু, বলিভিয়া, মেক্সিকো হয়ে স্থলপথ বা প্রশান্ত মহাসাগরের পথে মাদক চোরাচালান হয়ে থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে যাকে “মাদক-বিরোধী” অভিযান হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, সেটাই ছিল আসলে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে নতুন কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সূচনা-যার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলা।
অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটনের এই মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে যায়। আমেরিকা তাদের অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরীকে এই অঞ্চলে অবস্থান নিতে দেখা যায় এবং নীরবে সিআইএ-কে ভেনেজুয়েলার ভেতরে গুপ্ত কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেয়া হয়। কূটনীতির ভাষায় এটি ছিল ঝড়ের আগে সব দরজা-জানালা বন্ধ করে চাবি লাগানোর মতো পদক্ষেপ। বার্তাটি ছিল সুস্পষ্ট-পরবর্তী ড্রোন হামলা হয়তো আর কাঠের নৌকায় হবে না; কোনো পতাকাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
কিন্তু কেন ভেনেজুয়েলা? উত্তরটি দীর্ঘও, আবার সরলও। দীর্ঘ উত্তরে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল-ভা-ারের মালিকানা, এবং সেই সম্পদকে নিরাপত্তার বিনিময়ে মস্কোর কাছে তুলে দেওয়া। আছে চীনের দেওয়া বিপুল অবকাঠামো ঋণ, যা কারাকাসের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। আছে রাশিয়ার বোমারু বিমান ভেনেজুয়েলার ঘাঁটিতে অবতরণ, আর মার্কিন প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও মাদুরোর আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।
আর সরল উত্তরে আছে ক্ষমতার প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রশাসন বহুমেরুবিশ্ব মেনে নিলেও পশ্চিম গোলার্ধে বহুমেরুতা মেনে নেওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। মোনরো ডকট্রিন, যা অনেকের চোখে মৃত কূটনৈতিক নীতি, তা আবার নতুন প্রাণ পেয়েছে ওয়াশিংটনের কৌশলগত ভাবনায়। আর ভেনেজুয়েলা যা অর্থহীন, বিচ্ছিন্নতা ও রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ততার পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে। আমেরিকার প্রভাবম-লে থাকা কোনো রাষ্ট্র যখন মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তখন কী হয়-এই প্রশ্নের জবাব দিতে ট্রাম্প আগ্রহী বলেই মনে হচ্ছে।
কূটনৈতিক ব্যাকচ্যানেল যদি কখনো সত্যিই চলমান থেকেও থাকে, অক্টোবরের মধ্যভাগে তা ভেঙে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান দুই বছর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। মূলত এটা আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়ার জন্য অন্য কাউকে সামনে আনার সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটেছিল। এরপর এলো পেশিশক্তি - ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ১০ হাজারেরও বেশি মেরিন ও নৌসেনা, সঙ্গে এমন নৌ ও বিমানবহর যা কোনো “মাদক-বিরোধী” অভিযানের সঙ্গে মোটেও খাপ খায় না। মাদক কারবারি দমন অভিযানে এফ-৩৫, বি-৫২ কিংবা জেরাল্ড আর. ফোর্ড ক্যারিয়ার গ্রুপের দরকার হয় না।
গোপন অভিযানের কথাও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। কারাকাস অভিযোগ করছে, তারা সিআইএ-সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের আটক করেছে যারা নাকি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ভুয়া হামলা সাজিয়ে যুদ্ধের অজুহাত তৈরি করতে চাইছিল। আরেক ঘটনায়, এফবিআই নাকি মাদুরোর ব্যক্তিগত পাইলটকে ঘুষ দিয়ে বিমানের রুট বদলে দিতে চেয়েছিল, যেন আকাশ থেকে মাদুরোকে ধরে ফেলা যায় এবং তার মাথার উপর ঘোষিত ৫ কোটি ডলারের পুরস্কার দাবি করা যায়। শুনলে সিনেমার কাহিনির মতো লাগে, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় ঠান্ডা যুদ্ধকালে মার্কিন অপারেশনের ইতিহাস জানলে ঘটনাগুলোকে অস্বাভাবিক কিছু মনে হবে না।
এখন প্রশ্ন-এরপর কী? গোপন অভিযান জটলায় পড়লে সাধারণত সামনে আসে প্রকাশ্য অভিযান। হয়তোবা কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় আক্রমনের অনুমোদন দিয়ে দিবেন। আমেরিকা ক্যারিবিয়ান সাগরে ১৯৬২ সালের কিউবা মিসাইল সংকটের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। পুয়ের্তো রিকো ও ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের পুরনো সামরিক অবকাঠামো নতুনভাবে সক্রিয় করা হচ্ছে। রিপার ড্রোনগুলো টারমাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন শেল্টার ও রানওয়ে যেন দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের জন্য প্রস্তুত। এগুলো সেই আয়োজন, যা কোনো সুপার পাওয়ার যুদ্ধ শুরুর আগে করে থাকে।
আর লক্ষ্য? ভেনেজুয়েলা সামরিক দৃষ্টিকোণে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র। কাগজে-কলমে বাহিনী বিশাল, কিন্তু বাস্তবে ভেঙে পড়ার উপক্রম প্রায়। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তাদের রুশ এসইউ–৩০ বিমানগুলোকে অকেজো করে রেখেছে। পুরনো এফ-১৬ দীর্ঘদিন উড়তে পারে না। সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল। টিভির কুচকাওয়াজের বাহিনী আর বাস্তবে যুদ্ধে বাহিনীর কোনো সাদৃশ্য রাখে না।
মস্কো কিছু প্রতীকী সমর্থন দিয়েছে। কিছু পরিবহন বিমান, উপদেষ্টা, কয়েকজন ওয়াগনার ভাড়াটে সৈন্য। কিন্তু এগুলো আমেরিকার নৌক্ষমতার সামনে তুচ্ছ। আর ইউক্রেনে জড়িত রাশিয়া ভেনেজুয়েলায় বড়সড় সম্পদ পাঠাবে, এমন আশা করাও অবাস্তব। চাইলে আমেরিকা ভেনেজুয়েলার সামরিক অবকাঠামো কয়েক দিনের মধ্যেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
কিন্তু এখানেই প্রকৃত বাস্তবতা এসে উন্মোচিত হয়। মাদুরোকে সরানো শেষ অধ্যায় নয়, বরং পরবর্তী অরাজকতার সূচনা মাত্র। শেভেজ দীর্ঘসময় ধরে বেসামরিক মিলিশিয়াদের হাতে লাখ লাখ একে–৪৭ বিতরণ করেছেন। অনুমান করা হয়, অর্ধমিলিয়নের মতো রাইফেল ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন গ্যাং, লয়্যালিস্ট গ্রুপ, পাড়ার মিলিশিয়া আর সশস্ত্র বাহিনীর ভগ্নাংশের কাছে। শাসন বদল হলে এসব অস্ত্র অদৃশ্য হবে না-বরং নতুন আনুগত্যে, নতুন নেতার অধীনে নতুন বিভাজনে সংগঠিত হবে। দেশের ভেতর দ্রুত তৈরি হবে লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো আরও বড় মানবিক বিপর্যয়।
আর এখানেই এই সংকটের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি উঠে আসে-সম্ভবত আমেরিকা ইতিমধ্যে এমন একটি যুদ্ধেই জড়িয়ে গেছে, যার অস্তিত্ব স্বয়ং ওয়াশিংটন স্বীকার করতে চাইছে না। এটি ড্রোন, নৌ-বহর, গোপন অপারেশন ও কৌশলগত চাপ দিয়ে গঠিত এক আধুনিক যুদ্ধ। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে চালানো হলেও প্রকৃত চালিকা শক্তি হচ্ছে ভূ-রাজনীতি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-মহাশক্তিগুলো দুর্বল রাষ্ট্রের সঙ্গে হঠাৎ করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে না। তাদের পদক্ষেপ থাকে লক্ষ্যভেদী, যদিও সেই লক্ষ্য প্রায়ই আড়াল করা হয়। আর ইতিহাস এটাও বলে একজন স্বৈরশাসককে সরানো সহজ, কিন্তু ধ্বংসস্তূপের উপর নতুন রাষ্ট্র গড়া কঠিন। মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা হয়তো প্রথম কাজটা শিগগিরই করে ফেলবে, কিন্তু দ্বিতীয় কাজটির জন্য প্রস্তুত আছে এমন কোনো ইঙ্গিত এখনও দেখা যাচ্ছে না।
[লেখক : প্রাবন্ধিক]