সৈয়দ আমিরুজ্জামান
(গতকালের পর)
আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার কিছুদিন আগ থেকেই ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের কাছে হুশিয়ারিমূলক বিভিন্ন চিঠি পাঠাতে শুরু করে। চিঠিটা ছিল এরকম-
‘শয়তান নির্মূল অভিযান
ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের যে সব পা চাটা কুকুর আর ভারতীয় ইন্দিরাবাদের দালাল নানা ছুতানাতায় মুসলমানদের বৃহত্তর আবাসভূমি পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে তুমি তাদের অন্যতম। তোমার মনোভাব, চালচলন ও কাজকর্ম কোনটাই আমাদের অজানা নেই। অবিলম্বে হুঁশিয়ার হও এবং ভারতের পদলেহন থেকে বিরত হও, না হয় তোমার নিস্তার নেই। এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে নির্মূল হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। শনি’
জামায়াত ইসলামের মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় নভেম্বরের ১২ তারিখে প্রকাশিত ‘রোকেয়া হলের ঘটনা’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তর থেকে যারা এ দুষ্কর্মকে সহায়তা করছে তাদেরকে যদি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তবে সেটাই সঠিক পদক্ষেপ হবে বলে আমরা মনে করি’।
সেই সাথে বুদ্ধিজীবীদের ‘ছদ্মবেশী দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে উচ্ছেদের আহ্বান জানানো হয় এবং আশা করা হয় যে, এর মাধ্যমেই ‘হিন্দুস্তানি চরদের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে’ দেয়া সম্ভব হবে।
মিজানুর রহমান খান ‘মার্কিন দলিলপত্রে সাক্ষ্য: কেন বুদ্ধিজীবী হত্যা? কিভাবে জামায়াত জড়িত’ শিরোনামের অনুসন্ধানী লেখায় দেখিয়েছেন কিভাবে মওদুদীর মতবাদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আদর্শিক প্রেক্ষাপট গড়ে তুলেছিল। তার মতে, পঞ্চাশের দশক থেকেই মওদুদীর রাজনৈতিক দর্শনে বাঙালি, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি একধরণের ঘৃণা ও বিদ্বেষ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। তাদের আদর্শিক অবস্থানটা নাৎসিবাদের সাথে তুলনীয়। তিনি বলেন, ‘মওদুদী ও জামায়াতের ওই ঐতিহাসিক হিন্দু বিদ্বেষ থেকেই একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি গঠন করতে পেরেছিল জামায়াত।’
ধর্মান্ধ আলবদররা হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পাদন করেছিল ঠিকই, তবে পাকিস্তানিদের পাশাপাশি এর আড়ালে কলকাঠি নাড়ছিল সাম্রাজ্যবাদী আরেক শক্তি। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের কথা বলতে হয়। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে তার বড় ভাই আরেক প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারকেও আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।
বিজয়ের পর কলকাতা থেকে দেশে ফিরেই জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান ও ঘাতকদের ধরার জন্যে এশতেহাম হায়দার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মওদুদ, ডঃ সিরাজুল ইসলাম সহ আরও অনেককে নিয়ে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’ নামে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। এই কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে তিনি আলবদর ও রাজাকারদের অনেক গোপন তথ্যও উদ্ধার করেছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পিছনে কারা জড়িত ছিলেন এবং হত্যাকারীদের অনেকেরই গোপন আড্ডাখানা সম্পর্কেও তথ্য উদঘাটন করেছিলেন জহির রায়হান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘আলবদরদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করতে যেয়ে আমরা এই সাথে অপরাধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝবার জন্য নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যখন নিহত বাবা ও ভাইয়ের দেহের অবশেষ ঢাকায় বধ্যভূমিতে খুঁজে ফিরছিলেন তখন আমাদের ধারণা ছিল যে দখলদার পাকিস্তানি শাসকদের নিশ্চিত পরাজয় উপলব্ধি করে সন্ত্রস্ত গোঁড়া ধর্মধ্বজী পশু ক্রোধান্ধ হয়ে কাপুরোষোচিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতি হিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করেছে। কিন্তু পরে বুঝেছি ঘটনা তা ছিল না। কেননা এই হত্যাকাণ্ডের শিকার যারা হয়েছে তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের স্থানীয় প্রতিনিধি এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবের জন্যে সুপরিচিত ছিলেন’।
এখানে দুটো নাম সামনে আসে- হেইট ও ডুসপিক। হেইট মার্কিন সেনাবাহিনীতে চাকরি করত এবং পরবর্তীতে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করে। অন্যদিকে ডুসপিক ছিল সিআইএ’র এজেন্ট এবং এই দুজন রাও ফরমান আলীর সাথে মিলে প্রায় তিন হাজার বুদ্ধিজীবীর একটা তালিকা তৈরি করে। এছাড়াও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কাজে বিদেশী মুখোশ, ছদ্ম পোশাক ও ছোরা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এটাই প্রমাণ করে যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার জন্যে আলবদরের সাথে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকাও জড়িত ছিল ওতপ্রোতভাবে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে বুদ্ধিজীবী যাদেরকে মারা হয়েছিল তাদের অধিকাংশই বাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তাদেরকে নির্মূল করার সাম্রাজ্যবাদীদের এই আক্রমণ মোটেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ১৯৫০ সালে কমিউনিস্ট প্রভাব রুখতে গৃহীত কর্মসূচিরই আরেক রূপ। আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কামনা ছিল, যেহেতু বাংলাদেশের জন্ম আটকানো সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু নতুন এই রাষ্ট্র যেন সমাজতন্ত্রের দিকে হাঁটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা।
বিষয়টা সরলীকরণ করলে দাঁড়ায়, পাকিস্তানিরাও তাদের ক্রোধের কারণে বুদ্ধিজীবীদের সহ্য করতে পারত না, আবার অন্যদিকে আমেরিকাও সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে বুদ্ধিজীবীদের দেখতে পারত না; ফলস্বরুপ দুই দলই চেয়েছে এই হত্যাকাণ্ড এবং এতে সহকারী এবং কার্যসম্পাদনকারী হিসেবে পেয়েছিল স্থানীয় দালালদেরকে।
তবে কি বুদ্ধিজীবীরা ‘নির্বোধ’ ছিলেন?
পঁচিশ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা যখন ঢাকা সহ সারা দেশে আক্রমণ করলো, তখন অনেকে বুদ্ধিজীবীই মারা যান; পরবর্তীতে অনেকেই দেশ ছেড়ে কলকাতায় আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন উপায়ে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন এবং কেউ কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই কর্মস্থলে থেকে যান। এখন অনেকেই প্রশ্ন করেন এই বুদ্ধিজীবীরা কেন এমতাবস্থায় পড়ে রইলেন কর্মস্থলে? কিভাবে সহকর্মীর বুকের রক্তের উপর দিয়ে কর্মস্থলে যোগদান করতে পারলেন? কেন তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলেন না? দেশ ছেড়ে চলে গেলে তো আর মরতে হতো না; তাহলে কি তারা ‘নির্বোধ’ ছিল? এই প্রশ্নগুলো কিছুদিন যাবত অহরহ শোনা যাচ্ছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর, মানে এই বুদ্ধিজীবীদের অবদান খোঁজার পূর্বে আরও কিছু বিষয়ে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করতে হবে।
এটা পরিষ্কার যে, ১৯৬৬ এর পর থেকেই ধীরে ধীরে তুমুল জাগরণের সৃষ্টি হচ্ছিল এবং আন্দোলনে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছিল। এমনকি, ২৫শে মার্চের রাতের ক্র?্যাকডাউনের পর জনসাধারণের মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়াটাও ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
তবে, এটাও মনে রাখা উচিত সবাই একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজন’ ছোটগল্পে দেখা যায় সেক্টর কমান্ডার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্ন করছেন, ‘কেন যুদ্ধ করছ?’, একেকজনের উত্তর ছিল একেকরকম। কেউ বলছেন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য, কেউ বলছেন মা-বোনদের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য, কেউ বলছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, কেউ বলছেন ওদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, কেউ বলছেন গুণ্ডা, বদমাশ, মহাজন, ধর্ম-ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। আবার কেউ বলছেন, সময়ের প্রয়োজনে লড়ছি। ‘আমাদের মাটি থেকে ওদের তাড়াতে হবে। এটাই এখনকার প্রয়োজন’।
জহির রায়হানের ছোটগল্পটার কথা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করলাম কেননা সেটা সে সময়েই রচিত হয়েছিল এবং যেহেতু যুদ্ধের সাথে নানাভাবেই তিনি জড়িত ছিলেন, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা সেখানে স্থান পাবে সেটাই স্বাভাবিক। জনগণের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য যেমন বহুমাত্রিক ছিল তেমনি তাদের ‘অবদান’ ছিল বহুমাত্রিক;।
উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান নিয়ে কথা বলতে গেলে বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করতে হবে। নারীকে আমরা যেমন পাচ্ছি সম্মুখ যুদ্ধে, তেমনি তাদেরকে পাচ্ছি সেবিকা হিসেবে যিনি আহতদেরকে সেবা-শুশ্রুষা করছেন, যিনি শরণার্থী শিবিরে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন শিক্ষিকা ও নার্স হিসেবে, তেমনি তাদেরকে পাচ্ছি রাঁধুনি হিসেবে যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে রান্না করে দিচ্ছেন।
সে সাথে নারীকে পাচ্ছি নির্যাতিতা হিসেবে যিনি পাকিস্তানিদের লালসার স্বীকার হচ্ছেন এবং পরবর্তীতে আমাদের কাছেই সামাজিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। আবার, নারীদের বিশাল অংশ পাচ্ছি যারা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছেন একজন সাহায্যকারী মা, স্ত্রী এবং বোন হিসেবে। একদিকে তারা স্বামী-সন্তান-পিতাকে হারিয়েছেন, অন্যদিকে তারাই গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আশ্রয় দিচ্ছেন, খাবার দিচ্ছেন এবং যুদ্ধকালীন সময়ে বাচ্চা ও বৃদ্ধদের দেখভাল করছেন। এই নারীদের কেউ কেউ পরিবার হারিয়েছেন, সম্পদ হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন।
পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজে পুরুষ যেখানে পরিবারের প্রধান সেখানে স্বামী-সন্তান-পিতাকে হারিয়ে অভিভাবকহীন কিংবা নিঃস্ব হয়ে পড়া নারীদের যন্ত্রণাটুকুকেও নারীর অবদানের মধ্যেই রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, একারণেই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ‘নারী প্রধান’ পরিবারের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল নাটকীয়ভাবে।
এখানে নারীর অবদানের বহুমাত্রিকতা পাওয়া যাচ্ছে।
মূল আলোচনা অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অবদান প্রসঙ্গে কথা বলার পূর্বে আমাদেরকে ‘অবদান’ বিষয়ে সংকীর্ণ মানসিকতা ঝেড়ে এর বিস্তৃত পরিসরের বিষয়টা পরিষ্কার করে চিন্তা করতে হবে। সবাই যে একভাবে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু উপায়ে যুদ্ধে সামিল হবে- এটা ভ্রান্ত ধারণা। যে যার জায়গা থেকে লড়বে এবং লড়েও গিয়েছে, অনেকটা শেখ মুজিবের আহ্বানের মতো, যার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়।
আবার জনগণের সবাই যে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে সেটাও হয় না। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ভূমিকা পালন না করেও যুদ্ধকালীন সময়ে অনেককেই ব্যস্ত থাকতে হয় জীবন ধারণের জন্যে, বেঁচে থাকার জন্যে। তারা কখনো আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে, কখনোবা দেশের ভেতরেই গোপনে যুদ্ধকালীন সময় অতিবাহিত করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাঙালিরা শুধুমাত্র সামরিক দিক থেকেই সংগ্রাম করেনি, বরং সেটা ছিল সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরের পূর্ব থেকেই সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে যে আন্দোলন চলছিল একাত্তরের পাকি বর্বরতার নয়মাস জুড়েও সেটা বহাল ছিল। একেকটা গান কবিতা ছিল বারুদের মতো; উদ্বুদ্ধ করেছে, প্রেরণা দিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। ‘চরমপত্র’র কথা সর্বজনবিদিত।
এ ধরনের অবদানের পাশাপাশি জনসাধারণের একটা বিশাল অংশ পরোক্ষভাবে অবদান রেখে যাচ্ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে গোপনে আশ্রয় দিয়েছেন, বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছেন, শত্রু সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করছেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে দিয়েছেন ইত্যাদি। সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’ উপন্যাসে একজন মা’কে পাওয়া যায় যিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বাঁচাতে নিজের প্রতিবন্ধী ছেলেকে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। উপন্যাসটা তিনি রচনা করেছিলেন একটা সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
সিলেটের চা বাগানে এরকম নিদর্শন পাওয়া যায়, যেখানে শ্রমিকরা মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের জন্যে বাগানের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন।
মূল কথা হচ্ছে, যদিও পরোক্ষ অবদানের জন্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি মিলে না, তবু মুক্তিযুদ্ধে অবদান প্রসঙ্গে কথা বলতে হলে এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান দুটোকেই আলোচনার মধ্যে না রাখলে আলোচনাটা সম্পূর্ণ হবে না।
একাত্তরের নয়মাসের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আমরা মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করতে পারি; এক, পাকিস্তানপন্থী অর্থাৎ পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং দুই, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। প্রথম পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে এবং অন্য পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই পঁচিশে মার্চ রাতের আক্রমণেই শহিদ হন। এবং পরবর্তীতে তাদের কিছু অংশ ভারতে চলে যান এবং সেখানে মুজিবনগর সরকারকে বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করেন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়েন। কেউ কেউ থেকে যান দেশের ভেতরে। অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাকে আবারো মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়, এক, দেশের বাইরে এবং দুই, দেশের ভেতর।
দেশের ভেতরের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং আরেকটা অংশ থেকে যান তাদের কর্মস্থলে। কর্মস্থলে থেকে যাওয়া অংশের ভূমিকা নিয়েই আমাদের মূল আলোচনা।
পাকিস্তানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরুতেই কিছতা আলোচনা করা উচিৎ, কেননা তারাও যেমন নয়মাস কর্মস্থলে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধিজীবীরাও তেমনি কর্মস্থলে ছিলেন। দুই গ্রুপের কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা উচিৎ, নাহলে দুটো ভিন্ন ধারার কর্মকাণ্ডকে গুলিয়ে ফেলা হয়ে যেতে পারে, যা বর্তমানে হচ্ছে।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার বিরাট ফারাক দেখে বাঙালি মুসলমানদের প্রতিবাদী অংশ যখন পাকিস্তান তত্ত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছিল তখন অপর দিকে পাকিস্তান কায়েমের ফলে যারা ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন তারা নিজেদের স্বার্থেই পাকিস্তান তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে রইলেন। এবং তাদের মন মানসিকতার সাথে পাকিস্তানি জেনারেলদের চিন্তাধারা ও মন মানসিকতার ভয়ংকর মিল পরিলক্ষিত হয়।
পাকিস্তানপন্থী এমন বুদ্ধিজীবীরা একাত্তরে সক্রিয়ভাবেই পাকিস্তানিদের সাহায্য করেছেন; যুদ্ধকালীন সময়ে রচিত আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসে এর কিছতা পরিচয় পাওয়া যায়। তারা পাকিস্তানিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, পাকিস্তানিদের গণহত্যার কথা অস্বীকার করে বিশ্ব মিডিয়াতে বিবৃতি দিয়েছেন, গণহত্যাকে ও ধর্ষণকে জায়েজীকরণের চেষ্টা করেছেন এবং, বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধকালীন নয়মাস জুড়ে বুদ্ধিজীবীদের ওপর যে গ্রেফতার-দমন-পীড়ন চলে সেখানেও তাদের ছিল সরব ভূমিকা।
(চলবে)
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
(গতকালের পর)
আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার কিছুদিন আগ থেকেই ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের কাছে হুশিয়ারিমূলক বিভিন্ন চিঠি পাঠাতে শুরু করে। চিঠিটা ছিল এরকম-
‘শয়তান নির্মূল অভিযান
ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের যে সব পা চাটা কুকুর আর ভারতীয় ইন্দিরাবাদের দালাল নানা ছুতানাতায় মুসলমানদের বৃহত্তর আবাসভূমি পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে তুমি তাদের অন্যতম। তোমার মনোভাব, চালচলন ও কাজকর্ম কোনটাই আমাদের অজানা নেই। অবিলম্বে হুঁশিয়ার হও এবং ভারতের পদলেহন থেকে বিরত হও, না হয় তোমার নিস্তার নেই। এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে নির্মূল হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। শনি’
জামায়াত ইসলামের মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় নভেম্বরের ১২ তারিখে প্রকাশিত ‘রোকেয়া হলের ঘটনা’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তর থেকে যারা এ দুষ্কর্মকে সহায়তা করছে তাদেরকে যদি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তবে সেটাই সঠিক পদক্ষেপ হবে বলে আমরা মনে করি’।
সেই সাথে বুদ্ধিজীবীদের ‘ছদ্মবেশী দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে উচ্ছেদের আহ্বান জানানো হয় এবং আশা করা হয় যে, এর মাধ্যমেই ‘হিন্দুস্তানি চরদের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে’ দেয়া সম্ভব হবে।
মিজানুর রহমান খান ‘মার্কিন দলিলপত্রে সাক্ষ্য: কেন বুদ্ধিজীবী হত্যা? কিভাবে জামায়াত জড়িত’ শিরোনামের অনুসন্ধানী লেখায় দেখিয়েছেন কিভাবে মওদুদীর মতবাদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আদর্শিক প্রেক্ষাপট গড়ে তুলেছিল। তার মতে, পঞ্চাশের দশক থেকেই মওদুদীর রাজনৈতিক দর্শনে বাঙালি, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি একধরণের ঘৃণা ও বিদ্বেষ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। তাদের আদর্শিক অবস্থানটা নাৎসিবাদের সাথে তুলনীয়। তিনি বলেন, ‘মওদুদী ও জামায়াতের ওই ঐতিহাসিক হিন্দু বিদ্বেষ থেকেই একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি গঠন করতে পেরেছিল জামায়াত।’
ধর্মান্ধ আলবদররা হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পাদন করেছিল ঠিকই, তবে পাকিস্তানিদের পাশাপাশি এর আড়ালে কলকাঠি নাড়ছিল সাম্রাজ্যবাদী আরেক শক্তি। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের কথা বলতে হয়। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে তার বড় ভাই আরেক প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারকেও আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।
বিজয়ের পর কলকাতা থেকে দেশে ফিরেই জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান ও ঘাতকদের ধরার জন্যে এশতেহাম হায়দার চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মওদুদ, ডঃ সিরাজুল ইসলাম সহ আরও অনেককে নিয়ে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’ নামে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। এই কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে তিনি আলবদর ও রাজাকারদের অনেক গোপন তথ্যও উদ্ধার করেছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পিছনে কারা জড়িত ছিলেন এবং হত্যাকারীদের অনেকেরই গোপন আড্ডাখানা সম্পর্কেও তথ্য উদঘাটন করেছিলেন জহির রায়হান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘আলবদরদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করতে যেয়ে আমরা এই সাথে অপরাধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝবার জন্য নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যখন নিহত বাবা ও ভাইয়ের দেহের অবশেষ ঢাকায় বধ্যভূমিতে খুঁজে ফিরছিলেন তখন আমাদের ধারণা ছিল যে দখলদার পাকিস্তানি শাসকদের নিশ্চিত পরাজয় উপলব্ধি করে সন্ত্রস্ত গোঁড়া ধর্মধ্বজী পশু ক্রোধান্ধ হয়ে কাপুরোষোচিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতি হিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করেছে। কিন্তু পরে বুঝেছি ঘটনা তা ছিল না। কেননা এই হত্যাকাণ্ডের শিকার যারা হয়েছে তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের স্থানীয় প্রতিনিধি এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবের জন্যে সুপরিচিত ছিলেন’।
এখানে দুটো নাম সামনে আসে- হেইট ও ডুসপিক। হেইট মার্কিন সেনাবাহিনীতে চাকরি করত এবং পরবর্তীতে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করে। অন্যদিকে ডুসপিক ছিল সিআইএ’র এজেন্ট এবং এই দুজন রাও ফরমান আলীর সাথে মিলে প্রায় তিন হাজার বুদ্ধিজীবীর একটা তালিকা তৈরি করে। এছাড়াও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কাজে বিদেশী মুখোশ, ছদ্ম পোশাক ও ছোরা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এটাই প্রমাণ করে যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার জন্যে আলবদরের সাথে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকাও জড়িত ছিল ওতপ্রোতভাবে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে বুদ্ধিজীবী যাদেরকে মারা হয়েছিল তাদের অধিকাংশই বাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তাদেরকে নির্মূল করার সাম্রাজ্যবাদীদের এই আক্রমণ মোটেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ১৯৫০ সালে কমিউনিস্ট প্রভাব রুখতে গৃহীত কর্মসূচিরই আরেক রূপ। আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কামনা ছিল, যেহেতু বাংলাদেশের জন্ম আটকানো সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু নতুন এই রাষ্ট্র যেন সমাজতন্ত্রের দিকে হাঁটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা।
বিষয়টা সরলীকরণ করলে দাঁড়ায়, পাকিস্তানিরাও তাদের ক্রোধের কারণে বুদ্ধিজীবীদের সহ্য করতে পারত না, আবার অন্যদিকে আমেরিকাও সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে বুদ্ধিজীবীদের দেখতে পারত না; ফলস্বরুপ দুই দলই চেয়েছে এই হত্যাকাণ্ড এবং এতে সহকারী এবং কার্যসম্পাদনকারী হিসেবে পেয়েছিল স্থানীয় দালালদেরকে।
তবে কি বুদ্ধিজীবীরা ‘নির্বোধ’ ছিলেন?
পঁচিশ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা যখন ঢাকা সহ সারা দেশে আক্রমণ করলো, তখন অনেকে বুদ্ধিজীবীই মারা যান; পরবর্তীতে অনেকেই দেশ ছেড়ে কলকাতায় আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন উপায়ে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন এবং কেউ কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই কর্মস্থলে থেকে যান। এখন অনেকেই প্রশ্ন করেন এই বুদ্ধিজীবীরা কেন এমতাবস্থায় পড়ে রইলেন কর্মস্থলে? কিভাবে সহকর্মীর বুকের রক্তের উপর দিয়ে কর্মস্থলে যোগদান করতে পারলেন? কেন তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলেন না? দেশ ছেড়ে চলে গেলে তো আর মরতে হতো না; তাহলে কি তারা ‘নির্বোধ’ ছিল? এই প্রশ্নগুলো কিছুদিন যাবত অহরহ শোনা যাচ্ছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর, মানে এই বুদ্ধিজীবীদের অবদান খোঁজার পূর্বে আরও কিছু বিষয়ে আমাদের ধারণা স্পষ্ট করতে হবে।
এটা পরিষ্কার যে, ১৯৬৬ এর পর থেকেই ধীরে ধীরে তুমুল জাগরণের সৃষ্টি হচ্ছিল এবং আন্দোলনে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছিল। এমনকি, ২৫শে মার্চের রাতের ক্র?্যাকডাউনের পর জনসাধারণের মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়াটাও ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
তবে, এটাও মনে রাখা উচিত সবাই একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজন’ ছোটগল্পে দেখা যায় সেক্টর কমান্ডার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্ন করছেন, ‘কেন যুদ্ধ করছ?’, একেকজনের উত্তর ছিল একেকরকম। কেউ বলছেন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য, কেউ বলছেন মা-বোনদের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য, কেউ বলছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, কেউ বলছেন ওদের শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, কেউ বলছেন গুণ্ডা, বদমাশ, মহাজন, ধর্ম-ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। আবার কেউ বলছেন, সময়ের প্রয়োজনে লড়ছি। ‘আমাদের মাটি থেকে ওদের তাড়াতে হবে। এটাই এখনকার প্রয়োজন’।
জহির রায়হানের ছোটগল্পটার কথা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করলাম কেননা সেটা সে সময়েই রচিত হয়েছিল এবং যেহেতু যুদ্ধের সাথে নানাভাবেই তিনি জড়িত ছিলেন, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা সেখানে স্থান পাবে সেটাই স্বাভাবিক। জনগণের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য যেমন বহুমাত্রিক ছিল তেমনি তাদের ‘অবদান’ ছিল বহুমাত্রিক;।
উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান নিয়ে কথা বলতে গেলে বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করতে হবে। নারীকে আমরা যেমন পাচ্ছি সম্মুখ যুদ্ধে, তেমনি তাদেরকে পাচ্ছি সেবিকা হিসেবে যিনি আহতদেরকে সেবা-শুশ্রুষা করছেন, যিনি শরণার্থী শিবিরে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন শিক্ষিকা ও নার্স হিসেবে, তেমনি তাদেরকে পাচ্ছি রাঁধুনি হিসেবে যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে রান্না করে দিচ্ছেন।
সে সাথে নারীকে পাচ্ছি নির্যাতিতা হিসেবে যিনি পাকিস্তানিদের লালসার স্বীকার হচ্ছেন এবং পরবর্তীতে আমাদের কাছেই সামাজিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। আবার, নারীদের বিশাল অংশ পাচ্ছি যারা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছেন একজন সাহায্যকারী মা, স্ত্রী এবং বোন হিসেবে। একদিকে তারা স্বামী-সন্তান-পিতাকে হারিয়েছেন, অন্যদিকে তারাই গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আশ্রয় দিচ্ছেন, খাবার দিচ্ছেন এবং যুদ্ধকালীন সময়ে বাচ্চা ও বৃদ্ধদের দেখভাল করছেন। এই নারীদের কেউ কেউ পরিবার হারিয়েছেন, সম্পদ হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন।
পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজে পুরুষ যেখানে পরিবারের প্রধান সেখানে স্বামী-সন্তান-পিতাকে হারিয়ে অভিভাবকহীন কিংবা নিঃস্ব হয়ে পড়া নারীদের যন্ত্রণাটুকুকেও নারীর অবদানের মধ্যেই রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, একারণেই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ‘নারী প্রধান’ পরিবারের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল নাটকীয়ভাবে।
এখানে নারীর অবদানের বহুমাত্রিকতা পাওয়া যাচ্ছে।
মূল আলোচনা অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অবদান প্রসঙ্গে কথা বলার পূর্বে আমাদেরকে ‘অবদান’ বিষয়ে সংকীর্ণ মানসিকতা ঝেড়ে এর বিস্তৃত পরিসরের বিষয়টা পরিষ্কার করে চিন্তা করতে হবে। সবাই যে একভাবে কিংবা নির্দিষ্ট কিছু উপায়ে যুদ্ধে সামিল হবে- এটা ভ্রান্ত ধারণা। যে যার জায়গা থেকে লড়বে এবং লড়েও গিয়েছে, অনেকটা শেখ মুজিবের আহ্বানের মতো, যার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়।
আবার জনগণের সবাই যে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে সেটাও হয় না। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক ভূমিকা পালন না করেও যুদ্ধকালীন সময়ে অনেককেই ব্যস্ত থাকতে হয় জীবন ধারণের জন্যে, বেঁচে থাকার জন্যে। তারা কখনো আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে, কখনোবা দেশের ভেতরেই গোপনে যুদ্ধকালীন সময় অতিবাহিত করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাঙালিরা শুধুমাত্র সামরিক দিক থেকেই সংগ্রাম করেনি, বরং সেটা ছিল সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরের পূর্ব থেকেই সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে যে আন্দোলন চলছিল একাত্তরের পাকি বর্বরতার নয়মাস জুড়েও সেটা বহাল ছিল। একেকটা গান কবিতা ছিল বারুদের মতো; উদ্বুদ্ধ করেছে, প্রেরণা দিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। ‘চরমপত্র’র কথা সর্বজনবিদিত।
এ ধরনের অবদানের পাশাপাশি জনসাধারণের একটা বিশাল অংশ পরোক্ষভাবে অবদান রেখে যাচ্ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে গোপনে আশ্রয় দিয়েছেন, বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছেন, শত্রু সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করছেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে দিয়েছেন ইত্যাদি। সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’ উপন্যাসে একজন মা’কে পাওয়া যায় যিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বাঁচাতে নিজের প্রতিবন্ধী ছেলেকে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছেন। উপন্যাসটা তিনি রচনা করেছিলেন একটা সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
সিলেটের চা বাগানে এরকম নিদর্শন পাওয়া যায়, যেখানে শ্রমিকরা মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের জন্যে বাগানের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন।
মূল কথা হচ্ছে, যদিও পরোক্ষ অবদানের জন্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি মিলে না, তবু মুক্তিযুদ্ধে অবদান প্রসঙ্গে কথা বলতে হলে এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান দুটোকেই আলোচনার মধ্যে না রাখলে আলোচনাটা সম্পূর্ণ হবে না।
একাত্তরের নয়মাসের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আমরা মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করতে পারি; এক, পাকিস্তানপন্থী অর্থাৎ পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এবং দুই, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। প্রথম পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে এবং অন্য পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই পঁচিশে মার্চ রাতের আক্রমণেই শহিদ হন। এবং পরবর্তীতে তাদের কিছু অংশ ভারতে চলে যান এবং সেখানে মুজিবনগর সরকারকে বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করেন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়েন। কেউ কেউ থেকে যান দেশের ভেতরে। অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাকে আবারো মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়, এক, দেশের বাইরে এবং দুই, দেশের ভেতর।
দেশের ভেতরের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং আরেকটা অংশ থেকে যান তাদের কর্মস্থলে। কর্মস্থলে থেকে যাওয়া অংশের ভূমিকা নিয়েই আমাদের মূল আলোচনা।
পাকিস্তানপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরুতেই কিছতা আলোচনা করা উচিৎ, কেননা তারাও যেমন নয়মাস কর্মস্থলে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বুদ্ধিজীবীরাও তেমনি কর্মস্থলে ছিলেন। দুই গ্রুপের কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা উচিৎ, নাহলে দুটো ভিন্ন ধারার কর্মকাণ্ডকে গুলিয়ে ফেলা হয়ে যেতে পারে, যা বর্তমানে হচ্ছে।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার বিরাট ফারাক দেখে বাঙালি মুসলমানদের প্রতিবাদী অংশ যখন পাকিস্তান তত্ত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছিল তখন অপর দিকে পাকিস্তান কায়েমের ফলে যারা ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন তারা নিজেদের স্বার্থেই পাকিস্তান তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরে রইলেন। এবং তাদের মন মানসিকতার সাথে পাকিস্তানি জেনারেলদের চিন্তাধারা ও মন মানসিকতার ভয়ংকর মিল পরিলক্ষিত হয়।
পাকিস্তানপন্থী এমন বুদ্ধিজীবীরা একাত্তরে সক্রিয়ভাবেই পাকিস্তানিদের সাহায্য করেছেন; যুদ্ধকালীন সময়ে রচিত আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসে এর কিছতা পরিচয় পাওয়া যায়। তারা পাকিস্তানিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, পাকিস্তানিদের গণহত্যার কথা অস্বীকার করে বিশ্ব মিডিয়াতে বিবৃতি দিয়েছেন, গণহত্যাকে ও ধর্ষণকে জায়েজীকরণের চেষ্টা করেছেন এবং, বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধকালীন নয়মাস জুড়ে বুদ্ধিজীবীদের ওপর যে গ্রেফতার-দমন-পীড়ন চলে সেখানেও তাদের ছিল সরব ভূমিকা।
(চলবে)
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি; সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন]