মাহফুজ আলম
বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল যা মসলা ও সবজি ,উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৭ লাখ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন। কৃষিপ্রধান এ দেশে পেঁয়াজ একটি অতি প্রয়োজনীয় মসলা জাতীয় ফসল হিসেবে বিবেচিত। পেঁয়াজ শুধু খাদ্যের স্বাদ এবং ঘ্রাণ বৃদ্ধি করতেই নয়, এটি পুষ্টিগুণ এবং আর্থিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় পেঁয়াজ একটি অপরিহার্য উপাদান। পেঁয়াজ চাষ করে কৃষকেরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয় এবং প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া পেঁয়াজ উৎপাদন সঠিকভাবে বৃদ্ধি করা গেলে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের উচ্চ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এর চাষাবাদ বাড়ানো কৃষি খাতের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত জাত, সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। তবে পেঁয়াজ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব ও সময়মতো ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে অনেক চাষি হতাশ হন। এ সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পেঁয়াজের পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণাবলি
পেঁয়াজ একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ভেষজ গুণসম্পন্ন খাদ্য উপাদান, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। পেঁয়াজে ক্যালোরি কম এবং পুষ্টিগুণ বেশি, যা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, বি৬ এবং ফোলেট রয়েছে, যা শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পেঁয়াজে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও সালফার যৌগ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। এটি শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে। পেঁয়াজের ভেষজ গুণাবলিও উল্লেখযোগ্য। এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান হিসেবে কাজ করে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। পেঁয়াজে থাকা অ্যালিসিন নামক একটি যৌগ জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদেও জন্য উপকারী। এছাড়া পেঁয়াজ সর্দি-কাশি, গলাব্যথা এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা সমস্যায় প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পেঁয়াজের রস চুল পড়া রোধে এবং ত্বকের সংক্রমণ প্রতিরোধেও ব্যবহৃত হয়। নিয়মিত পেঁয়াজ খেলে পাকস্থলী ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমতে পাওে বলে গবেষণায় প্রমাণিত। এই সব পুষ্টি ও ভেষজ গুণাবলির জন্য পেঁয়াজ খাদ্য তালিকায় শুধু একটি সাধারণ উপাদান নয় বরং একটি স্বাস্থ্যরক্ষাকারী ওষুধ হিসেবেও বিবেচিত।
উপযুক্ত মাটি ও জমি তৈরি
পেঁয়াজ চাষের জন্য উপযুক্ত জমি ও মাটির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজ চাষের জন্য মাঝারি উঁচু, পানি জমে না এমন এবং সুনিষ্কাশিত জমি সবচেয়ে উপযোগী। পানি জমে থাকলে পেঁয়াজের কন্দ পচে যেতে পারে, ফলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এ কারণে সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। মাটির ধরন হিসেবে বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য আদর্শ। এই ধরনের মাটি সহজে পানি ও বাতাস চলাচল করতে দেয়, যা পেঁয়াজের মূল এবং কন্দের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। মাটির পিএইচ মান ৬.০ থেকে ৬.৫ হল পেঁয়াজ চাষের জন্য আদর্শ। এ পিএইচ স্তরে মাটির পুষ্টি উপাদানগুলো গাছ সহজেই গ্রহণ করতে পারে। জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য জৈব সার যেমন গোবর সার, কম্পোস্ট এবং পচা খড় ব্যবহার করা। পেঁয়াজের ভালো বৃদ্ধির জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত
পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ এবং সালফারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এছাড়া জমি চাষের আগে একাধিকবার চাষ ও মই দিয়ে জমি সমান এবং জৈব সার ব্যবহার করা। এতে বীজ বপন বা চারা রোপণের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। একইসঙ্গে জমি আগাছামুক্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আগাছা পেঁয়াজের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। পেঁয়াজের জন্য সঠিক জমি ও মাটি নির্বাচন এবং তার যথাযথ পরিচর্যা করলে ফসলের গুণগত মান এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
উন্নত জাত নির্বাচন
পেঁয়াজ চাষে উন্নত জাত নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের বিভিন্ন উন্নত জাতের মধ্যে স্থানীয় এবং হাইব্রিড জাতগুলো বেশি জনপ্রিয়। স্থানীয় জাতের মধ্যে তহুরা, বগুড়া লাল এবং ফরিদপুরী উল্লেখযোগ্য, যেগুলো সুস্বাদু ও সংরক্ষণ উপযোগী। অন্যদিকে, উচ্চফলিশীল জাতের মধ্যে বারি পেঁয়াজ১, বারি পেঁয়াজ২ এবং বারি পেঁয়াজ৩ অধিক ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এছাড়া বারি পেঁয়াজ৪; উচ্চ ফলনশীল শীতকালীন জাত এবং বারি পেঁয়াজ৫, সারা বছর চাষযোগ্য উন্নত জাত, বিনা পিঁয়াজ-১ (গ্রীষ্মকালীন) ও বিনা পিঁয়াজ-২ (রবি), লাল তীর হাইব্রিড পেঁয়াজ, লাল তীর কিং পেঁয়াজ, লাল তীর ২০ এবং অঈও-এর হাইব্রিড জাত বিপ্লব।
উন্নত জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে জলবায়ু, মাটির ধরন এবং কৃষি অঞ্চলের উপযোগিতা বিবেচনায় নেয়া হয়। হাইব্রিড জাতগুলো স্বল্প সময়ে অধিক ফলন দেয় এবং সেচ, সার ও পরিচর্যার প্রতি অধিক সংবেদনশীল। তবে, স্থানীয় জাতগুলো দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশের সঙ্গে বেশি মানানসই। উন্নত জাত নির্বাচন করলে কৃষকরা একই জমি থেকে অধিক ফলন এবং ভালো মানের পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারেন। এর ফলে কৃষি খাতের লাভজনকতা বাড়ে এবং বাজারের চাহিদা মেটানো সহজ হয়। সঠিক জাত নির্বাচন পেঁয়াজ চাষের সফলতার মূল চাবিকাঠি। ভালো বীজ পানিতে দিলে ডুবে যাবে এবং চাপ দিলে ভাঙবে, চ্যাপ্টা হবে না।
চারা তৈরি
পেঁয়াজের চারা তৈরির পদ্ধতি সঠিকভাবে অনুসরণ করলে ভালো মানের এবং রোগমুক্ত চারা পাওয়া যায়, যা পরবর্তী চাষের ফলন নিশ্চিত করে। প্রথমে উঁচু ও সুনিষ্কাশিত জমি নির্বাচন করা হয়। জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করা হয় এবং আগাছা পরিষ্কার করা হয়। বীজতলায় জৈব সার যেমন- গোবর সার ও কম্পোস্ট ভালোভাবে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা হয়। বীজতলায় পেঁয়াজের বীজ বপনের জন্য ১ মিটার প্রস্থ এবং প্রয়োজনমতো দৈর্ঘ্যরে বেড তৈরি করা হয়। বেডের উচ্চতা ১৫-২০ সেন্টিমিটার রাখা হয়, যাতে পানি জমে না থাকে। প্রতি বর্গমিটারে ১০-১২ গ্রাম বীজ বপন করা হয় এবং বীজের ওপর হালকা মাটি বা খড় বিছিয়ে দেয়া হয়। বীজ বপনের পর নিয়মিত সেচ এবং পরিচর্যা করতে হয়। চারার বয়স ৩০-৩৫ দিন হলে বা চারা ১০-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে জমিতে রোপণের
উপযোগী হয়। চারা তৈরির সময় রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হয়, যেমন রোভরাল ব্যবহার এবং চারা পরিচ্ছন্ন রাখা। সঠিকভাবে প্রস্তুত পেঁয়াজ চারা ভালো ফলন এবং রোগমুক্ত ফসলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
চারা রোপণ
পেঁয়াজ চারা রোপণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা সঠিকভাবে সম্পন্ন করলে ফসলের উৎপাদনশীলতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়। চারা রোপণের আগে জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করতে হয়। জমি চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে আগাছা পরিষ্কার করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় সার, যেমন গোবর সার, ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সমানভাবে প্রয়োগ করতে হয়। চারা রোপণের জন্য ১৫-২০ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ১ মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করা হয়, যার মধ্যে সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। চারা রোপণের দূরত্ব সারি থেকে সারি ১৫-২০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারা ১০ সেন্টিমিটার রাখা হয়।
রোপণের সময় চারা মাটিতে সোজা স্থাপন করে গোড়া হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। রোপণের পর হালকা সেচ দিতে হয়, যাতে চারা মাটির সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে সঠিক সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং সার প্রয়োগ করা। চারা রোপণের সময় যতœশীলতা বজায় রাখা হলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমে এবং পেঁয়াজের ভালো ফলন নিশ্চিত হয়।
সার ব্যবস্থাপনা
পেঁয়াজ চাষে সঠিক সার ব্যবস্থাপনা ভালো ফলন নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজের জন্য জমি প্রস্তুতের সময় জৈব সার, যেমন পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৮-১০ টন/হেক্টর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়। এছাড়া রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এবং পটাশ সার নির্দিষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ২৪০ কেজি, টিএসপি ২৬০ কেজি, এমওপি ১৫০ কেজি, জিপসাম ১৫০ কেজি, জিপসাম ১০ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়। টিএসপি এবং পটাশ সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করা হয়, আর ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ
করতে হয়। প্রথম কিস্তি চারা রোপণের ১৫ দিন পর, দ্বিতীয় কিস্তি রোপণের ৩০ দিন পর, এবং তৃতীয় কিস্তি রোপণের ৫০ দিন পর দেওয়া হয়। সার প্রয়োগের সময় জমিতে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে। পেঁয়াজের ফলন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত সালফার প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কন্দের গঠন এবং স্বাদ উন্নত করতে সহায়তা করে। সারের সঠিক প্রয়োগ পেঁয়াজের বৃদ্ধি, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং গুণগত মান উন্নত করতে সহায়ক।
(বাকি অংশ আগামীকাল)
[লেখক: পরিচালক (জনশক্তি ও প্রশিক্ষণ), বিএআরসি]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মাহফুজ আলম
বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল যা মসলা ও সবজি ,উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৭ লাখ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন। কৃষিপ্রধান এ দেশে পেঁয়াজ একটি অতি প্রয়োজনীয় মসলা জাতীয় ফসল হিসেবে বিবেচিত। পেঁয়াজ শুধু খাদ্যের স্বাদ এবং ঘ্রাণ বৃদ্ধি করতেই নয়, এটি পুষ্টিগুণ এবং আর্থিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় পেঁয়াজ একটি অপরিহার্য উপাদান। পেঁয়াজ চাষ করে কৃষকেরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয় এবং প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া পেঁয়াজ উৎপাদন সঠিকভাবে বৃদ্ধি করা গেলে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের উচ্চ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এর চাষাবাদ বাড়ানো কৃষি খাতের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত জাত, সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। তবে পেঁয়াজ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব ও সময়মতো ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে অনেক চাষি হতাশ হন। এ সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পেঁয়াজের পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণাবলি
পেঁয়াজ একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ভেষজ গুণসম্পন্ন খাদ্য উপাদান, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। পেঁয়াজে ক্যালোরি কম এবং পুষ্টিগুণ বেশি, যা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, বি৬ এবং ফোলেট রয়েছে, যা শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পেঁয়াজে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও সালফার যৌগ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। এটি শরীর থেকে টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে। পেঁয়াজের ভেষজ গুণাবলিও উল্লেখযোগ্য। এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান হিসেবে কাজ করে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। পেঁয়াজে থাকা অ্যালিসিন নামক একটি যৌগ জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদেও জন্য উপকারী। এছাড়া পেঁয়াজ সর্দি-কাশি, গলাব্যথা এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা সমস্যায় প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পেঁয়াজের রস চুল পড়া রোধে এবং ত্বকের সংক্রমণ প্রতিরোধেও ব্যবহৃত হয়। নিয়মিত পেঁয়াজ খেলে পাকস্থলী ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমতে পাওে বলে গবেষণায় প্রমাণিত। এই সব পুষ্টি ও ভেষজ গুণাবলির জন্য পেঁয়াজ খাদ্য তালিকায় শুধু একটি সাধারণ উপাদান নয় বরং একটি স্বাস্থ্যরক্ষাকারী ওষুধ হিসেবেও বিবেচিত।
উপযুক্ত মাটি ও জমি তৈরি
পেঁয়াজ চাষের জন্য উপযুক্ত জমি ও মাটির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজ চাষের জন্য মাঝারি উঁচু, পানি জমে না এমন এবং সুনিষ্কাশিত জমি সবচেয়ে উপযোগী। পানি জমে থাকলে পেঁয়াজের কন্দ পচে যেতে পারে, ফলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এ কারণে সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। মাটির ধরন হিসেবে বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য আদর্শ। এই ধরনের মাটি সহজে পানি ও বাতাস চলাচল করতে দেয়, যা পেঁয়াজের মূল এবং কন্দের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। মাটির পিএইচ মান ৬.০ থেকে ৬.৫ হল পেঁয়াজ চাষের জন্য আদর্শ। এ পিএইচ স্তরে মাটির পুষ্টি উপাদানগুলো গাছ সহজেই গ্রহণ করতে পারে। জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য জৈব সার যেমন গোবর সার, কম্পোস্ট এবং পচা খড় ব্যবহার করা। পেঁয়াজের ভালো বৃদ্ধির জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত
পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ এবং সালফারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এছাড়া জমি চাষের আগে একাধিকবার চাষ ও মই দিয়ে জমি সমান এবং জৈব সার ব্যবহার করা। এতে বীজ বপন বা চারা রোপণের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। একইসঙ্গে জমি আগাছামুক্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আগাছা পেঁয়াজের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। পেঁয়াজের জন্য সঠিক জমি ও মাটি নির্বাচন এবং তার যথাযথ পরিচর্যা করলে ফসলের গুণগত মান এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
উন্নত জাত নির্বাচন
পেঁয়াজ চাষে উন্নত জাত নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের বিভিন্ন উন্নত জাতের মধ্যে স্থানীয় এবং হাইব্রিড জাতগুলো বেশি জনপ্রিয়। স্থানীয় জাতের মধ্যে তহুরা, বগুড়া লাল এবং ফরিদপুরী উল্লেখযোগ্য, যেগুলো সুস্বাদু ও সংরক্ষণ উপযোগী। অন্যদিকে, উচ্চফলিশীল জাতের মধ্যে বারি পেঁয়াজ১, বারি পেঁয়াজ২ এবং বারি পেঁয়াজ৩ অধিক ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এছাড়া বারি পেঁয়াজ৪; উচ্চ ফলনশীল শীতকালীন জাত এবং বারি পেঁয়াজ৫, সারা বছর চাষযোগ্য উন্নত জাত, বিনা পিঁয়াজ-১ (গ্রীষ্মকালীন) ও বিনা পিঁয়াজ-২ (রবি), লাল তীর হাইব্রিড পেঁয়াজ, লাল তীর কিং পেঁয়াজ, লাল তীর ২০ এবং অঈও-এর হাইব্রিড জাত বিপ্লব।
উন্নত জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে জলবায়ু, মাটির ধরন এবং কৃষি অঞ্চলের উপযোগিতা বিবেচনায় নেয়া হয়। হাইব্রিড জাতগুলো স্বল্প সময়ে অধিক ফলন দেয় এবং সেচ, সার ও পরিচর্যার প্রতি অধিক সংবেদনশীল। তবে, স্থানীয় জাতগুলো দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশের সঙ্গে বেশি মানানসই। উন্নত জাত নির্বাচন করলে কৃষকরা একই জমি থেকে অধিক ফলন এবং ভালো মানের পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারেন। এর ফলে কৃষি খাতের লাভজনকতা বাড়ে এবং বাজারের চাহিদা মেটানো সহজ হয়। সঠিক জাত নির্বাচন পেঁয়াজ চাষের সফলতার মূল চাবিকাঠি। ভালো বীজ পানিতে দিলে ডুবে যাবে এবং চাপ দিলে ভাঙবে, চ্যাপ্টা হবে না।
চারা তৈরি
পেঁয়াজের চারা তৈরির পদ্ধতি সঠিকভাবে অনুসরণ করলে ভালো মানের এবং রোগমুক্ত চারা পাওয়া যায়, যা পরবর্তী চাষের ফলন নিশ্চিত করে। প্রথমে উঁচু ও সুনিষ্কাশিত জমি নির্বাচন করা হয়। জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করা হয় এবং আগাছা পরিষ্কার করা হয়। বীজতলায় জৈব সার যেমন- গোবর সার ও কম্পোস্ট ভালোভাবে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা হয়। বীজতলায় পেঁয়াজের বীজ বপনের জন্য ১ মিটার প্রস্থ এবং প্রয়োজনমতো দৈর্ঘ্যরে বেড তৈরি করা হয়। বেডের উচ্চতা ১৫-২০ সেন্টিমিটার রাখা হয়, যাতে পানি জমে না থাকে। প্রতি বর্গমিটারে ১০-১২ গ্রাম বীজ বপন করা হয় এবং বীজের ওপর হালকা মাটি বা খড় বিছিয়ে দেয়া হয়। বীজ বপনের পর নিয়মিত সেচ এবং পরিচর্যা করতে হয়। চারার বয়স ৩০-৩৫ দিন হলে বা চারা ১০-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে জমিতে রোপণের
উপযোগী হয়। চারা তৈরির সময় রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হয়, যেমন রোভরাল ব্যবহার এবং চারা পরিচ্ছন্ন রাখা। সঠিকভাবে প্রস্তুত পেঁয়াজ চারা ভালো ফলন এবং রোগমুক্ত ফসলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
চারা রোপণ
পেঁয়াজ চারা রোপণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা সঠিকভাবে সম্পন্ন করলে ফসলের উৎপাদনশীলতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা যায়। চারা রোপণের আগে জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করতে হয়। জমি চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে আগাছা পরিষ্কার করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় সার, যেমন গোবর সার, ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সমানভাবে প্রয়োগ করতে হয়। চারা রোপণের জন্য ১৫-২০ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ১ মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করা হয়, যার মধ্যে সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। চারা রোপণের দূরত্ব সারি থেকে সারি ১৫-২০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারা ১০ সেন্টিমিটার রাখা হয়।
রোপণের সময় চারা মাটিতে সোজা স্থাপন করে গোড়া হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। রোপণের পর হালকা সেচ দিতে হয়, যাতে চারা মাটির সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে সঠিক সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং সার প্রয়োগ করা। চারা রোপণের সময় যতœশীলতা বজায় রাখা হলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমে এবং পেঁয়াজের ভালো ফলন নিশ্চিত হয়।
সার ব্যবস্থাপনা
পেঁয়াজ চাষে সঠিক সার ব্যবস্থাপনা ভালো ফলন নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজের জন্য জমি প্রস্তুতের সময় জৈব সার, যেমন পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৮-১০ টন/হেক্টর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়। এছাড়া রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এবং পটাশ সার নির্দিষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ২৪০ কেজি, টিএসপি ২৬০ কেজি, এমওপি ১৫০ কেজি, জিপসাম ১৫০ কেজি, জিপসাম ১০ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়। টিএসপি এবং পটাশ সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করা হয়, আর ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ
করতে হয়। প্রথম কিস্তি চারা রোপণের ১৫ দিন পর, দ্বিতীয় কিস্তি রোপণের ৩০ দিন পর, এবং তৃতীয় কিস্তি রোপণের ৫০ দিন পর দেওয়া হয়। সার প্রয়োগের সময় জমিতে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে। পেঁয়াজের ফলন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত সালফার প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কন্দের গঠন এবং স্বাদ উন্নত করতে সহায়তা করে। সারের সঠিক প্রয়োগ পেঁয়াজের বৃদ্ধি, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং গুণগত মান উন্নত করতে সহায়ক।
(বাকি অংশ আগামীকাল)
[লেখক: পরিচালক (জনশক্তি ও প্রশিক্ষণ), বিএআরসি]