alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

শেখর ভট্টাচার্য

: বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
image

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যায় পুরোনো বছর। নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন বছরের। সোনালি স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে উদিত হয় নতুন বছরের সূর্য

সময়কে বিভাজিত করে বছর, মাস, দিন, ঘণ্টার প্রবর্তন করা হয়েছে পরিকল্পিত ভাবে। কল্পনা করুন সময়কে যদি এরকম বিভাজন করা না হতো তাহলে মানুষের প্রাত্যাহিক জীবন কেমন হতো? সময়ের এই পরিকল্পিত বিভাজন মানুষের জীবন, জীবিকা সহ সামগ্রিক কর্মকা-ে নিয়ে এসেছে শৃঙ্খলা। সময় মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, স্বল্প ও দীর্ঘ কালের পরিকল্পনা করার প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সময় অবিরত মানুষকে অতিক্রম করে যাচ্ছে নাকি মানুষ সময়কে। এ’নিয়ে দার্শনিক আলোচনা দীর্ঘ করা যায়। আমাদের এই বদ্বীপে আন্দোলন মুখর দু’হাজার চব্বিশের পর, অস্থির পঁচিশ সাল অতিক্রম করে আমরা দু’হাজার ছাব্বিশে উপনীত। চব্বিশের জুলাই আন্দোলন অনেক সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলো। দু’হাজার পঁচিশের শেষে এই আন্দোলন ধারণ করা দলের কর্মকা-ের গতি-প্রকৃতি মানুষকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ করে তুলেছে। যারা পরিবর্তন, বৈষম্য হ্রাসের স্বপ্ন দেখে আন্দোলনে আন্তরিকভাবে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের চোখ থেকে স্বপ্নের বিভা কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেছে এ’কথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তবে দু’হাজার পচিশ সালে সামজিক, রাজনৈতিক বিভাজন যে আরও ব্যাপক হয়েছে এ’বিষয়টি আমরা সহজেই অনুমান করতে পারছি। সামজিক এবং রাজনৈতিকভাবে পুরো বাংলাদেশে মবোক্রেসির বিস্তার ঘটায় স্বপ্নবাজ মানুষদের হতাশার কথা মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামজিক মাধ্যমে নিয়মিত উঠে এসেছে। চব্বিশে দেখা স্বপ্ন এতো দ্রুত বিবর্ণ হতে থাকবে, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত মানুষদের কিছুটা হলেও বিস্মিত করেছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা,আন্দোলনে যুক্ত কর্মী এবং নেতাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে নিবেদিত নাগরিকদের প্রত্যশার পালে হাওয়াতো লাগেইনি বরঞ্চ মনে হয়েছে স্বপ্ন ছোঁয়ার বন্দর মনে হয় আরও দূরে চলে গেছে। নাগরিক সমাজ যদি দুহাজার পঁচিশ সালের সালতামামী করতে উদ্যোগী হন তাহলে এই সালতামামী শেষে কী পাওয়া যাবে? বিদায়ী বছরটি ছিলো সামজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা,ভাংচুর, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে চাঁদাবাজি, অগ্নিসন্ত্রাস, গণমাধ্যমের উপর আঘাত সৃষ্টির বছর। এসব অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা প্রান্তিক মানুষের জীবিকাকে চরম ভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দেশের মানুষ মব-সন্ত্রাসের কারণে কখন, কোথায় কী ঘটবে এরকম দুশ্চিন্তা করে আতঙ্কগ্রস্থ দিন কাটিয়েছেন।

চব্বিশের আন্দোলনে যারা সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের কাছ থেকেও আমরা শুনেছি এরকম মবতন্ত্র তারাও প্রত্যাশা করেননি। মানুষ হতাশ হয়েছে যখন প্রত্যক্ষ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে রেখে মববাজরা নিজেরাই আইনকে হাতে তুলে নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে ক্রমাগত। সবচেয়ে হতাশার দৃশ্য ছিলো “প্রথম আলো” কার্যালয় ভাংচুরের সময়। ভিডিওতে পরিস্কার দেখা গেছে একদল সেনা সদস্য মবসন্ত্রাসীদের কাছে আকুলভাবে “প্রথম আলো” অফিসে প্রবেশের জন্য বিশ মনিট সময় চেয়ে নিচ্ছে ভেতরের মানুষকে উদ্বারের জন্য। সেনাসদস্যদের বড় অসহায় মনে হয়েছে তখন। এরকম দৃশ্য সারা দেশবাসি প্রত্যক্ষ করে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মানসিকভাবে প্রচ- বিধ্বস্ত হয়েছে।

হতাশার কালো রাতগুলো যতোই মানুষকে বিমর্ষ করুক মানুষ কিন্তু স্বপ্ন দেখে যায়। নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যশায় শুরু হয় নতুন বছর। নব চেতনায়, নব উন্মাদনায় মানুষ গড়তে চায় সমাজ, রাজনীতি এবং দেশের অর্থনীতিকে।

রবীন্দ্রনাথ মানুষ হিসেবে ছিলেন অসম্ভব আশাবাদী। মরণকে জয় করার আকাক্সক্ষা তিনি ধারণ করতেন। দুঃখ, বেদনা কখনো একটি জাতিকে দমিয়ে রাখতে পারে না। ভেতো, ভীতু, আবেগী বাঙালি দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে যখন সামনে এসে অলঙ্ঘনীয় পাহাড়কে দেখতে পায়। মৃত্যু, দুঃখ, বেদনা বাঙালিকে কখনো কাতর করতে পারেনি। অন্ধকারের ভেতর শান্তি, আনন্দে অবগাহন করে জেগে উঠতে জানে বাঙালি। রবীন্দ্রনাথের কথায় উচ্চারণ করে ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ ঠাকুরের গানের এ কথার মতোই দুঃখ ও কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা নেয় মানুষ।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যায় পুরোনো বছর। নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন বছরের। সোনালি স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে উদিত হয় নতুন বছরের সূর্য। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বজুড়ে এক অস্থির সময় অতিক্রম করেছ মানুষ। তারপরেও মানুষ নতুন বছরে মধ্যে খুঁজে বেড়ায় অনন্ত সম্ভাবনার স্বপ্ন। নতুন বছর হলো স্বপ্ন সম্ভাবনার। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সুযোগ করে দেয় নতুন বছর।

দুহাজার ছাব্বিশকে ঘিরে আমাদের অপার স্বপ্ন। দীর্ঘ সংগ্রাম, আন্দোলনের পর আমরা অর্জন করেছি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের অধিকার। এই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আমরা একসাথে অনেক কিছু অর্জন করতে চাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্ভুক্তিমুলক রাজনীতি এবং নির্বাচনের কথা বলে আসছি, জানিনা আমাদের আসন্ন নির্বাচন সে পথে এগোয় কী না। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনায় আমরা খুব আশাবাদী হতে পারিনা। তারপরও আমরা আশাবাদী হতে চাই। ছাব্বিশের নির্বাচন আমাদের রাজনীতি, সমাজ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। নির্বাচিত সরকার ছাব্বিশে আমাদেরকে সুশাসনের আলোক রেখা দেখাতে সমর্থ হবে। জবাবদিহিতা , স্বচ্ছ্বতা নিশ্চিত করে সমাজে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বাংলাদেশর মানুষ ছাব্বিশে আইনের শাসনের সূচনা দেখতে চায়। “মবোক্রেসি” বিদায় নেবে এই সুবর্ণ ভূমি থেকে। মানুষের ভেতরের আতঙ্ক কেটে গিয়ে প্রতিটি মানুষ তার সম্ভাবনাকে জাতির অগ্রগতি ও অর্জনে কাজে লাগাতে পারে। সংকুচিত স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচিত হোক। সমতার সমাজ, সমদৃষ্টির সমাজে দ্বার খুলে যাক। সকল মানুষের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে সমান সুযোগ তৈরি হোক।

চব্বিশের আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিলো তারুণ্যের হাত ধরে । বছরে শেষে এসে আন্দোলনের শক্তির বিভাজন আমাদেরকে হতাশ করেছে। আমরা চাই নিবেদিত তরুণেরা রাজনীতিতে জমে থাকা কলুষ, আবর্জনা সব দূর করে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে স্বচ্ছ্ব একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করুক। সমগ্র দেশের মানুষ আবেগ-প্রবণ, আশাবাদী হয়েছিলো বৈষম্য নিরসনের কথা শুনে। আমরা এ’পর্যন্ত বৈষম্য নিরসনের কোন সুস্পষ্ট রুপরেখা দেখতে পেলাম না। নতুন বছর নির্বাচিত সরকার আমাদেরকে আশাবাদী করে তুলুক সামাজিক, রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসনের পথরেখা উপহার দিয়ে।

শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকদের সকল চাওয়াকে একসাথে করে বলতে বললে আমার মনে হয় সকলেই বলবেন দুহাজার ছাব্বিশ সালে আমরা চাই উদার গণতন্ত্রান্ত্রিক এবং মানবিক একটি ব্যবস্থার সূচনা। মানুষের স্বাধীনতা যেনো সংকুচিত হয়ে না যায় । প্রান্তিক মানুষেরা যেনো ধীরে ধীরে নীতি নির্ধারনের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে। ওই যে বহুল উচ্চারিত স্লোগান,” আমরা একটি নতুন বন্দোবস্ত চাই”, সেই স্লোগানের বাস্তবায়নের জন্য সকল রাজনৈতিক দলের প্রত্যয় দেখতে চায় নাগরিক সমাজের মানুষেরা।ইংরেজি নববর্ষে যদি আবার ক্ষমতার রাজনীতি দেখতে পাওয়া যায় তাহলে নাগরিক সমাজের সচেতন মানুষদের দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।

নতুন বছর যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা একটি নতুন ক্যানভাস, যেখানে পুরনো ক্ষত, বেদনা আর অপূর্ণতার ছায়া মুছে ফেলে সম্ভাবনার রঙে ভরে ওঠে প্রতিটি কোণ। এটি একটি নতুন সূচনা, যেখানে প্রতিটি ভোরের আলো জীবনের গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ করে। নতুন বছর আসে প্রতিশ্রুতির মতো- বাতাসে নতুন স্বপ্নের ঘ্রাণ, গাছে গাছে নতুন পাতার সঞ্চার। জীবন যেন তার ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আরও একবার নিজেকে সজীব করে তোলে। এই বছর হয়তো তেমনটাই হবে, যেমনটা আমরা কল্পনা করি ভালোবাসা, সৌহার্দ্য আর সৃষ্টির এক নতুন অধ্যায়। পুরনো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা আশা থেকে আলো নিয়ে আমরা রচনা করব এমন এক সময়, যেখানে সব বাধা পেরিয়ে জীবনের গান আরও মধুর শোনাবে। নতুন বছরের প্রতি এই প্রত্যাশা যেন তার প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের পথ দেখায়, আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক

ধূমপান ছাড়ার জন্য উপযুক্ত সময়

বারুদের বাজারে শান্তির সেল

ডিগ্রির পাহাড় ও দক্ষতার মরুভূমি

নিরাপত্তার দৌড়ে খাদ্যের সুরক্ষা কোথায়?

নারীর অধিকার নিশ্চিত হলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব

কৃষিঋণ মওকুফ: কৃষকের স্বস্তি, বাস্তবায়নে দরকার সুশাসন

‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!’

ইরানে হামলা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও পরিণতি

ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব

নবযাত্রায় কেমন বাংলাদেশ চাই

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা

নতুন গভর্নর অপরিহার্য ছিল

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিবাহের রীতি ও প্রথা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

না হয় রহিতে কাছে!

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

শেখর ভট্টাচার্য

image

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যায় পুরোনো বছর। নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন বছরের। সোনালি স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে উদিত হয় নতুন বছরের সূর্য

বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬

সময়কে বিভাজিত করে বছর, মাস, দিন, ঘণ্টার প্রবর্তন করা হয়েছে পরিকল্পিত ভাবে। কল্পনা করুন সময়কে যদি এরকম বিভাজন করা না হতো তাহলে মানুষের প্রাত্যাহিক জীবন কেমন হতো? সময়ের এই পরিকল্পিত বিভাজন মানুষের জীবন, জীবিকা সহ সামগ্রিক কর্মকা-ে নিয়ে এসেছে শৃঙ্খলা। সময় মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, স্বল্প ও দীর্ঘ কালের পরিকল্পনা করার প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সময় অবিরত মানুষকে অতিক্রম করে যাচ্ছে নাকি মানুষ সময়কে। এ’নিয়ে দার্শনিক আলোচনা দীর্ঘ করা যায়। আমাদের এই বদ্বীপে আন্দোলন মুখর দু’হাজার চব্বিশের পর, অস্থির পঁচিশ সাল অতিক্রম করে আমরা দু’হাজার ছাব্বিশে উপনীত। চব্বিশের জুলাই আন্দোলন অনেক সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলো। দু’হাজার পঁচিশের শেষে এই আন্দোলন ধারণ করা দলের কর্মকা-ের গতি-প্রকৃতি মানুষকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ করে তুলেছে। যারা পরিবর্তন, বৈষম্য হ্রাসের স্বপ্ন দেখে আন্দোলনে আন্তরিকভাবে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের চোখ থেকে স্বপ্নের বিভা কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেছে এ’কথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তবে দু’হাজার পচিশ সালে সামজিক, রাজনৈতিক বিভাজন যে আরও ব্যাপক হয়েছে এ’বিষয়টি আমরা সহজেই অনুমান করতে পারছি। সামজিক এবং রাজনৈতিকভাবে পুরো বাংলাদেশে মবোক্রেসির বিস্তার ঘটায় স্বপ্নবাজ মানুষদের হতাশার কথা মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামজিক মাধ্যমে নিয়মিত উঠে এসেছে। চব্বিশে দেখা স্বপ্ন এতো দ্রুত বিবর্ণ হতে থাকবে, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত মানুষদের কিছুটা হলেও বিস্মিত করেছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা,আন্দোলনে যুক্ত কর্মী এবং নেতাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে নিবেদিত নাগরিকদের প্রত্যশার পালে হাওয়াতো লাগেইনি বরঞ্চ মনে হয়েছে স্বপ্ন ছোঁয়ার বন্দর মনে হয় আরও দূরে চলে গেছে। নাগরিক সমাজ যদি দুহাজার পঁচিশ সালের সালতামামী করতে উদ্যোগী হন তাহলে এই সালতামামী শেষে কী পাওয়া যাবে? বিদায়ী বছরটি ছিলো সামজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা,ভাংচুর, ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে চাঁদাবাজি, অগ্নিসন্ত্রাস, গণমাধ্যমের উপর আঘাত সৃষ্টির বছর। এসব অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা প্রান্তিক মানুষের জীবিকাকে চরম ভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দেশের মানুষ মব-সন্ত্রাসের কারণে কখন, কোথায় কী ঘটবে এরকম দুশ্চিন্তা করে আতঙ্কগ্রস্থ দিন কাটিয়েছেন।

চব্বিশের আন্দোলনে যারা সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের কাছ থেকেও আমরা শুনেছি এরকম মবতন্ত্র তারাও প্রত্যাশা করেননি। মানুষ হতাশ হয়েছে যখন প্রত্যক্ষ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে রেখে মববাজরা নিজেরাই আইনকে হাতে তুলে নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে ক্রমাগত। সবচেয়ে হতাশার দৃশ্য ছিলো “প্রথম আলো” কার্যালয় ভাংচুরের সময়। ভিডিওতে পরিস্কার দেখা গেছে একদল সেনা সদস্য মবসন্ত্রাসীদের কাছে আকুলভাবে “প্রথম আলো” অফিসে প্রবেশের জন্য বিশ মনিট সময় চেয়ে নিচ্ছে ভেতরের মানুষকে উদ্বারের জন্য। সেনাসদস্যদের বড় অসহায় মনে হয়েছে তখন। এরকম দৃশ্য সারা দেশবাসি প্রত্যক্ষ করে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মানসিকভাবে প্রচ- বিধ্বস্ত হয়েছে।

হতাশার কালো রাতগুলো যতোই মানুষকে বিমর্ষ করুক মানুষ কিন্তু স্বপ্ন দেখে যায়। নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যশায় শুরু হয় নতুন বছর। নব চেতনায়, নব উন্মাদনায় মানুষ গড়তে চায় সমাজ, রাজনীতি এবং দেশের অর্থনীতিকে।

রবীন্দ্রনাথ মানুষ হিসেবে ছিলেন অসম্ভব আশাবাদী। মরণকে জয় করার আকাক্সক্ষা তিনি ধারণ করতেন। দুঃখ, বেদনা কখনো একটি জাতিকে দমিয়ে রাখতে পারে না। ভেতো, ভীতু, আবেগী বাঙালি দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে যখন সামনে এসে অলঙ্ঘনীয় পাহাড়কে দেখতে পায়। মৃত্যু, দুঃখ, বেদনা বাঙালিকে কখনো কাতর করতে পারেনি। অন্ধকারের ভেতর শান্তি, আনন্দে অবগাহন করে জেগে উঠতে জানে বাঙালি। রবীন্দ্রনাথের কথায় উচ্চারণ করে ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ ঠাকুরের গানের এ কথার মতোই দুঃখ ও কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা নেয় মানুষ।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যায় পুরোনো বছর। নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন বছরের। সোনালি স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে উদিত হয় নতুন বছরের সূর্য। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বজুড়ে এক অস্থির সময় অতিক্রম করেছ মানুষ। তারপরেও মানুষ নতুন বছরে মধ্যে খুঁজে বেড়ায় অনন্ত সম্ভাবনার স্বপ্ন। নতুন বছর হলো স্বপ্ন সম্ভাবনার। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সুযোগ করে দেয় নতুন বছর।

দুহাজার ছাব্বিশকে ঘিরে আমাদের অপার স্বপ্ন। দীর্ঘ সংগ্রাম, আন্দোলনের পর আমরা অর্জন করেছি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের অধিকার। এই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আমরা একসাথে অনেক কিছু অর্জন করতে চাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্ভুক্তিমুলক রাজনীতি এবং নির্বাচনের কথা বলে আসছি, জানিনা আমাদের আসন্ন নির্বাচন সে পথে এগোয় কী না। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনায় আমরা খুব আশাবাদী হতে পারিনা। তারপরও আমরা আশাবাদী হতে চাই। ছাব্বিশের নির্বাচন আমাদের রাজনীতি, সমাজ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। নির্বাচিত সরকার ছাব্বিশে আমাদেরকে সুশাসনের আলোক রেখা দেখাতে সমর্থ হবে। জবাবদিহিতা , স্বচ্ছ্বতা নিশ্চিত করে সমাজে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বাংলাদেশর মানুষ ছাব্বিশে আইনের শাসনের সূচনা দেখতে চায়। “মবোক্রেসি” বিদায় নেবে এই সুবর্ণ ভূমি থেকে। মানুষের ভেতরের আতঙ্ক কেটে গিয়ে প্রতিটি মানুষ তার সম্ভাবনাকে জাতির অগ্রগতি ও অর্জনে কাজে লাগাতে পারে। সংকুচিত স্বাধীনতার দ্বার উন্মোচিত হোক। সমতার সমাজ, সমদৃষ্টির সমাজে দ্বার খুলে যাক। সকল মানুষের সকল রাষ্ট্রীয় কাজে সমান সুযোগ তৈরি হোক।

চব্বিশের আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিলো তারুণ্যের হাত ধরে । বছরে শেষে এসে আন্দোলনের শক্তির বিভাজন আমাদেরকে হতাশ করেছে। আমরা চাই নিবেদিত তরুণেরা রাজনীতিতে জমে থাকা কলুষ, আবর্জনা সব দূর করে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে স্বচ্ছ্ব একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করুক। সমগ্র দেশের মানুষ আবেগ-প্রবণ, আশাবাদী হয়েছিলো বৈষম্য নিরসনের কথা শুনে। আমরা এ’পর্যন্ত বৈষম্য নিরসনের কোন সুস্পষ্ট রুপরেখা দেখতে পেলাম না। নতুন বছর নির্বাচিত সরকার আমাদেরকে আশাবাদী করে তুলুক সামাজিক, রাজনৈতিক বৈষম্য নিরসনের পথরেখা উপহার দিয়ে।

শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকদের সকল চাওয়াকে একসাথে করে বলতে বললে আমার মনে হয় সকলেই বলবেন দুহাজার ছাব্বিশ সালে আমরা চাই উদার গণতন্ত্রান্ত্রিক এবং মানবিক একটি ব্যবস্থার সূচনা। মানুষের স্বাধীনতা যেনো সংকুচিত হয়ে না যায় । প্রান্তিক মানুষেরা যেনো ধীরে ধীরে নীতি নির্ধারনের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসে। ওই যে বহুল উচ্চারিত স্লোগান,” আমরা একটি নতুন বন্দোবস্ত চাই”, সেই স্লোগানের বাস্তবায়নের জন্য সকল রাজনৈতিক দলের প্রত্যয় দেখতে চায় নাগরিক সমাজের মানুষেরা।ইংরেজি নববর্ষে যদি আবার ক্ষমতার রাজনীতি দেখতে পাওয়া যায় তাহলে নাগরিক সমাজের সচেতন মানুষদের দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।

নতুন বছর যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা একটি নতুন ক্যানভাস, যেখানে পুরনো ক্ষত, বেদনা আর অপূর্ণতার ছায়া মুছে ফেলে সম্ভাবনার রঙে ভরে ওঠে প্রতিটি কোণ। এটি একটি নতুন সূচনা, যেখানে প্রতিটি ভোরের আলো জীবনের গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ করে। নতুন বছর আসে প্রতিশ্রুতির মতো- বাতাসে নতুন স্বপ্নের ঘ্রাণ, গাছে গাছে নতুন পাতার সঞ্চার। জীবন যেন তার ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আরও একবার নিজেকে সজীব করে তোলে। এই বছর হয়তো তেমনটাই হবে, যেমনটা আমরা কল্পনা করি ভালোবাসা, সৌহার্দ্য আর সৃষ্টির এক নতুন অধ্যায়। পুরনো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা আশা থেকে আলো নিয়ে আমরা রচনা করব এমন এক সময়, যেখানে সব বাধা পেরিয়ে জীবনের গান আরও মধুর শোনাবে। নতুন বছরের প্রতি এই প্রত্যাশা যেন তার প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের পথ দেখায়, আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করায়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক

back to top