alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

মতিউর রহমান

: বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালের প্রথম প্রভাতের রক্তিম সূর্যকে অভিবাদন জানাচ্ছে, তখন জাতি হিসেবে আমরা আমাদের ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। নতুন বছর কেবল একটি বর্ষপঞ্জির পরিবর্তন বা কালানুক্রমিক সময়ের অগ্রগমন নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের এক নিবিড় পুনঃমূল্যায়নের মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তা যেমন বিস্ময়কর গৌরবের, তেমনি সামনের দিনগুলোর জন্য বিশাল দায়িত্ববোধের। ২০২৬ সাল আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি আমাদের স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে এসে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় আসীন হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নতুন বছরের আকাক্সক্ষা কেবল প্রবৃদ্ধির শুষ্ক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং একটি বৈষম্যহীন সমৃদ্ধির সুদৃঢ় সংকল্প।

একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রধান পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ২০২৬ সালের এই সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা গভীরভাবে অনুভব করি যে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনই পারে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করতে। নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং এটি জনমতের প্রতিফলন এবং শাসনের বৈধতা নিশ্চিত করার প্রধান স্তম্ভ। যখন একটি জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং তাতে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে, তখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়। এই আস্থা কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তিতেই ভূমিকা রাখে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া সুশাসন বা অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণÑকোনোটিই দীর্ঘস্থায়ী রূপ পেতে পারে না।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত। যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধারাবাহিকতা থাকে এবং অনিশ্চয়তা দূর হয়, তখন ব্যবসায়ী সমাজ ও উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে সাহসী হন। ২০২৬ সালে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেখানে সংলাপ ও পরমতসহিষ্ণুতা হবে মূল ভিত্তি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার কেবল শাসন পরিচালনা করে না, বরং দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলে। এই ঐক্যই চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার এবং উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার শক্তি জোগায়।

সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একে অপরের পরিপূরক। ২০২৬ সালে আমাদের অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হবে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো। দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি না পেলে উন্নয়নের সুফল কখনোই সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছানো সম্ভব নয়। দুর্নীতি কেবল একটি নৈতিক অপরাধ নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যখন কোনো জাতীয় প্রকল্পের অর্থ দুর্নীতির কারণে অপচয় হয়, তখন সেটি প্রকারান্তরে জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত হানে। তাই সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে তথ্যপ্রযুক্তির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই সরকারি সেবা পায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ২০২৬ সালে আমাদের প্রধান মনোযোগ হতে হবে ‘অর্থনৈতিক বৈচিত্র?্যকরণ’। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা আমাদের রফতানি আয়ের জন্য মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছি। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে আমাদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাই একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রফতানি, ওষুধ শিল্প, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং সমুদ্র সম্পদের সঠিক ব্যবহার আমাদের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আজ বিশ্বের বহু দেশে রফতানি হচ্ছে। ২০২৬ সালে এই খাতকে আরও আধুনিকায়ন করে বৈশ্বিক বাজারে আমাদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে। উচ্চমানের গবেষণার মাধ্যমে আমরা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ রফতানিতেও নেতৃত্ব দিতে পারি। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ আমাদের সমৃদ্ধির এক বড় হাতিয়ার হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর যুবসমাজ। জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ, যা পৃথিবীর খুব কম দেশেরই রয়েছে। এই জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগানোই হবে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ। তবে শিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধি আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। যুব বেকারত্ব দূর করতে হলে আমাদের সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল ডিগ্রি-নির্ভর না রেখে ‘দক্ষতা-নির্ভর’ করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মান বৃদ্ধি করে তরুণদের আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার জ্ঞান তাদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখবে। তরুণরা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে যেন নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সেজন্য সহজ শর্তে ঋণ ও মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা জরুরি।

নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। ঘরের কোণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ স্তর পর্যন্ত নারীর যে সরব উপস্থিতি আমরা দেখছি, তা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষণীয়। ২০২৬ সালে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আরও নিরাপদ ও বৈষম্যহীন করা। বিশেষ করে উদ্যোক্তা হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা জোরদার করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন কেবল লিঙ্গ সমতার বিষয় নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক সক্ষমতা দ্বিগুণ করার কৌশল। যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী সমান তালে উন্নয়নের চাকা ঘুরাবে, তখন ২০২৬-এর সমৃদ্ধি হবে অপ্রতিরোধ্য। সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীকে আরও সম্প্রসারিত করে প্রান্তিক নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় নৈতিক দায়িত্ব।

পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। ২০২৬ সালে আমাদের উন্নয়ন কৌশলে পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধি বা ‘গ্রিন ইকোনমি’কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নদী ভাঙন রোধ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায়। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে আমাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে হবে যাতে উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত তহবিল জোগানে এগিয়ে আসে। জলবায়ু সহনশীল কাঠামোই হবে ২০২৬ সালের টেকসই সমৃদ্ধির ভিত্তি।

সামাজিক সংহতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্য। ২০২৬ সালের নতুন বছরে আমাদের এই ঐতিহ্যকে আরও যতœ সহকারে লালন করতে হবে। উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতা যেন কোনোভাবেই আমাদের উন্নয়নের গতিকে রুদ্ধ করতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সংস্কৃতির চর্চা, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কর্মকা-ের মাধ্যমে যুবসমাজকে বিপথগামিতা থেকে দূরে রাখতে হবে। একটি বহুত্ববাদী সমাজ হিসেবে আমাদের বৈচিত্র?্যই হোক আমাদের শক্তি। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২৬ সালে আরও কৌশলগত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদের একটি শক্তিশালী কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’Ñএই নীতিই হবে আমাদের বিশ্বজয়ের মূলমন্ত্র।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সাল কেবল সময়ের চাকায় একটি নতুন সংখ্যা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা এবং স্বপ্নের এক অগ্নিপরীক্ষা। আমরা যে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করেছি, তার গন্তব্য হলো একটি সুখী, শান্তিময় এবং উন্নত দেশ। এই যাত্রায় নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী সমাজ, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষÑসবাইকেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে পারি। ২০২৬-এর নতুন সূর্য আমাদের মনে এই আশার সঞ্চার করুক যে, বাংলাদেশ হবে এমন এক দেশ যেখানে প্রতিটি মানুষ তার মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এই অঙ্গীকারে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এক মাথা উঁচু করা আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান স্থায়ী করুক।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

বিনা-ভাড়ার ট্রেনযাত্রা

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এশিয়া

ছবি

নামে ইসলামী, কাজে আবু জাহেল!

জলবায়ু পরিবর্তন: স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি

অস্থির পেঁয়াজের বাজার: আমদানি কি সত্যিই সমাধান?

মূল্যবৃদ্ধির ঘেরাটোপ: সংকটাক্রান্ত পরিবার ও সামাজিক রূপান্তর

বায়দূষণে অকালমৃত্যু

লাশের বদলে লাশই যদি চুড়ান্ত হয়, তবে রাষ্ট্রের দরকার কী?

ভিক্ষাবৃত্তি যেখানে অন্যতম পেশা

বুদ্ধিজীবী হত্যা ও এর স্বরূপ সন্ধানে

আদিবাসীদের ভূমি অধিকার ও নিরাপত্তা সংকট

“মুনীর চৌধুরীর কবর...”

বুদ্ধিজীবী হত্যা ও এর স্বরূপ সন্ধানে

জলবায়ু সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা

স্বাধীন তদন্ত কমিশন দাবির নেপথ্যে কি দায়মুক্তি?

বুদ্ধিজীবী হত্যা ও এর স্বরূপ সন্ধানে

প্রহর গুনি কোন আশাতে!

বিজয়ের রক্তাক্ত সূর্য ও আমাদের ঋণের হিসাব

বিজয় দিবস: নতুন প্রজন্মের রাষ্ট্রচিন্তার দিকদর্শন

ছবি

আমাদের বিজয়ের অন্তর্নিহিত বার্তা

প্রাণিসম্পদ: দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

মতিউর রহমান

বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালের প্রথম প্রভাতের রক্তিম সূর্যকে অভিবাদন জানাচ্ছে, তখন জাতি হিসেবে আমরা আমাদের ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। নতুন বছর কেবল একটি বর্ষপঞ্জির পরিবর্তন বা কালানুক্রমিক সময়ের অগ্রগমন নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের এক নিবিড় পুনঃমূল্যায়নের মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তা যেমন বিস্ময়কর গৌরবের, তেমনি সামনের দিনগুলোর জন্য বিশাল দায়িত্ববোধের। ২০২৬ সাল আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি আমাদের স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে চূড়ান্তভাবে বেরিয়ে এসে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় আসীন হওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নতুন বছরের আকাক্সক্ষা কেবল প্রবৃদ্ধির শুষ্ক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে শান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং একটি বৈষম্যহীন সমৃদ্ধির সুদৃঢ় সংকল্প।

একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রধান পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ২০২৬ সালের এই সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা গভীরভাবে অনুভব করি যে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনই পারে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করতে। নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং এটি জনমতের প্রতিফলন এবং শাসনের বৈধতা নিশ্চিত করার প্রধান স্তম্ভ। যখন একটি জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং তাতে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে, তখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়। এই আস্থা কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তিতেই ভূমিকা রাখে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া সুশাসন বা অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণÑকোনোটিই দীর্ঘস্থায়ী রূপ পেতে পারে না।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সরাসরি অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত। যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধারাবাহিকতা থাকে এবং অনিশ্চয়তা দূর হয়, তখন ব্যবসায়ী সমাজ ও উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণে সাহসী হন। ২০২৬ সালে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেখানে সংলাপ ও পরমতসহিষ্ণুতা হবে মূল ভিত্তি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার কেবল শাসন পরিচালনা করে না, বরং দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলে। এই ঐক্যই চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার এবং উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার শক্তি জোগায়।

সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একে অপরের পরিপূরক। ২০২৬ সালে আমাদের অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হবে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো। দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি না পেলে উন্নয়নের সুফল কখনোই সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছানো সম্ভব নয়। দুর্নীতি কেবল একটি নৈতিক অপরাধ নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যখন কোনো জাতীয় প্রকল্পের অর্থ দুর্নীতির কারণে অপচয় হয়, তখন সেটি প্রকারান্তরে জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত হানে। তাই সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে তথ্যপ্রযুক্তির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই সরকারি সেবা পায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ২০২৬ সালে আমাদের প্রধান মনোযোগ হতে হবে ‘অর্থনৈতিক বৈচিত্র?্যকরণ’। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা আমাদের রফতানি আয়ের জন্য মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছি। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্ববাজারে আমাদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাই একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির ভিত্তি সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রফতানি, ওষুধ শিল্প, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং সমুদ্র সম্পদের সঠিক ব্যবহার আমাদের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আজ বিশ্বের বহু দেশে রফতানি হচ্ছে। ২০২৬ সালে এই খাতকে আরও আধুনিকায়ন করে বৈশ্বিক বাজারে আমাদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে। উচ্চমানের গবেষণার মাধ্যমে আমরা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ রফতানিতেও নেতৃত্ব দিতে পারি। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ আমাদের সমৃদ্ধির এক বড় হাতিয়ার হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর যুবসমাজ। জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ, যা পৃথিবীর খুব কম দেশেরই রয়েছে। এই জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগানোই হবে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ। তবে শিক্ষিত বেকারত্বের হার বৃদ্ধি আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। যুব বেকারত্ব দূর করতে হলে আমাদের সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল ডিগ্রি-নির্ভর না রেখে ‘দক্ষতা-নির্ভর’ করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মান বৃদ্ধি করে তরুণদের আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার জ্ঞান তাদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখবে। তরুণরা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে যেন নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সেজন্য সহজ শর্তে ঋণ ও মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা জরুরি।

নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। ঘরের কোণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ স্তর পর্যন্ত নারীর যে সরব উপস্থিতি আমরা দেখছি, তা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই ঈর্ষণীয়। ২০২৬ সালে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আরও নিরাপদ ও বৈষম্যহীন করা। বিশেষ করে উদ্যোক্তা হিসেবে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা জোরদার করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন কেবল লিঙ্গ সমতার বিষয় নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক সক্ষমতা দ্বিগুণ করার কৌশল। যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী সমান তালে উন্নয়নের চাকা ঘুরাবে, তখন ২০২৬-এর সমৃদ্ধি হবে অপ্রতিরোধ্য। সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীকে আরও সম্প্রসারিত করে প্রান্তিক নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় নৈতিক দায়িত্ব।

পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। ২০২৬ সালে আমাদের উন্নয়ন কৌশলে পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধি বা ‘গ্রিন ইকোনমি’কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নদী ভাঙন রোধ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায়। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে আমাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করতে হবে যাতে উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত তহবিল জোগানে এগিয়ে আসে। জলবায়ু সহনশীল কাঠামোই হবে ২০২৬ সালের টেকসই সমৃদ্ধির ভিত্তি।

সামাজিক সংহতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্য। ২০২৬ সালের নতুন বছরে আমাদের এই ঐতিহ্যকে আরও যতœ সহকারে লালন করতে হবে। উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতা যেন কোনোভাবেই আমাদের উন্নয়নের গতিকে রুদ্ধ করতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সংস্কৃতির চর্চা, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কর্মকা-ের মাধ্যমে যুবসমাজকে বিপথগামিতা থেকে দূরে রাখতে হবে। একটি বহুত্ববাদী সমাজ হিসেবে আমাদের বৈচিত্র?্যই হোক আমাদের শক্তি। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান ২০২৬ সালে আরও কৌশলগত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আমরা নিজেদের একটি শক্তিশালী কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’Ñএই নীতিই হবে আমাদের বিশ্বজয়ের মূলমন্ত্র।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সাল কেবল সময়ের চাকায় একটি নতুন সংখ্যা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা এবং স্বপ্নের এক অগ্নিপরীক্ষা। আমরা যে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করেছি, তার গন্তব্য হলো একটি সুখী, শান্তিময় এবং উন্নত দেশ। এই যাত্রায় নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী সমাজ, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষÑসবাইকেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে পারি। ২০২৬-এর নতুন সূর্য আমাদের মনে এই আশার সঞ্চার করুক যে, বাংলাদেশ হবে এমন এক দেশ যেখানে প্রতিটি মানুষ তার মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এই অঙ্গীকারে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এক মাথা উঁচু করা আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান স্থায়ী করুক।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top