জাহাঙ্গীর আলম সরকার
ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের সামাজিক, প্রশাসনিক ও বিচারিক বাস্তবতায় একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কাঠামোগত সংকটের নাম। জমির দলিল জালিয়াতি, খতিয়ান ও নকশার পারস্পরিক অসামঞ্জস্য, রেকর্ড সংশোধনের অনিয়ম এবং দখলভিত্তিক মালিকানার সংস্কৃতি— এই সবকিছু মিলিয়ে ভূমি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষত দরিদ্র, ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি প্রশ্নটি শুধু একটি সম্পত্তিগত ইস্যু নয়; এটি তাদের বসবাস, জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র যখন ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন তা অনেকের কাছে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ন্যায়বিচারের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়। কাগজভিত্তিক, জটিল ও দুর্নীতিপ্রবণ ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্বচ্ছ রেকর্ড ব্যবস্থা— এমন ধারণা স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে যে, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ কমবে, জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং খাস জমি ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক ভূমি প্রশাসনে জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু প্রযুক্তি নিজে কোনো নিরপেক্ষ নৈতিক স্বত্তা নয়; এটি যে কাঠামোর ভেতরে প্রয়োগ হয়, তার শক্তি ও সীমাবদ্ধতাও সেই কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বহন করে। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা যদি ত্রুটিপূর্ণ তথ্য, অসম ক্ষমতা ও দুর্বল জবাবদিহির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে, তবে তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে খাস জমি ও ভূমিহীনদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গভীর। ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট ডিজিটাল রেকর্ড একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে বেআইনি দখলের সুযোগ করে দিতে পারে, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃত ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে চিরস্থায়ীভাবে বঞ্চিত করে রাখার পথও সুগম করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে খাস জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি সংবিধানের সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা— সেই প্রশ্নে বিচার হওয়া প্রয়োজন। অতএব প্রশ্নটি শুধু এটুকু নয় যে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা চালু হয়েছে কিনা; প্রশ্নটি হলো— এই প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর কাদের জন্য সুবিধা সৃষ্টি করছে এবং কাদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এটি কি খাস জমির স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমিহীনদের অধিকার বাস্তবায়নে সহায়ক হচ্ছে, নাকি বিদ্যমান বৈষম্যকে প্রযুক্তির মোড়কে আরও দৃঢ় করছে? এই প্রবন্ধে খাস জমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার প্রসঙ্গটি তাই ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থার আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে— যেখানে প্রযুক্তি, প্রশাসন ও ন্যায়বিচারের আন্তঃসম্পর্ক উন্মোচিত হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত ভূমি-ন্যায়বিচার কোনো সফটওয়্যার বা ডেটাবেসের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, নৈতিক অবস্থান এবং সংবিধানের প্রতি বাস্তব আনুগত্যের প্রশ্ন।
ভূমি মানুষের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। বাংলাদেশে ভূমি প্রশ্ন শুধু একটি সম্পত্তিগত ইস্যু নয়; এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, ক্ষমতার অসমতা এবং ন্যায়বিচারের গভীর কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই বাস্তবতায় খাস জমি ও ভূমিহীনদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি সাংবিধানিক ও নৈতিক উভয় অর্থেই রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড বলতে মূলত ভূমির খতিয়ান, পর্চা, নকশা, জরিপ তথ্য, রেকর্ড সংশোধনের ইতিহাস এবং ভূমি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক উপাত্তসমূহকে একটি সমন্বিত ইলেকট্রনিক ডাটাবেজে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এর লক্ষ্য শুধু কাগজভিত্তিক নথির পরিমাণ কমানো নয়; বরং ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারকে বাস্তব রূপ দেয়া। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ‘ডিজিটাল গভর্ন্যান্স’-এর একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। এর মাধ্যমে ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি এবং রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় একক মানদ- প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এই লক্ষ্য ভূমি ও সম্পত্তির ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—বিশেষত যখন তা খাস জমির সঠিক সনাক্তকরণ ও ভূমিহীনদের মধ্যে ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার দেয়। সংবিধানের ১৯ ও ২০ অনুচ্ছেদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের নির্দেশনা রয়েছে। সেই আলোকে খাস জমি ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহৃত হওয়া শুধু প্রশাসনিক সদিচ্ছার বিষয় নয়, বরং সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা যদি এই সাংবিধানিক দর্শনকে ধারণ করে পরিচালিত হয়, তবে তা ভূমিহীনদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে এখানে একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে— প্রযুক্তি কি নিজেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে? বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এটি যেভাবে নকশা করা হয় এবং যাদের হাতে প্রয়োগের ক্ষমতা থাকে, তার ওপরই এর সামাজিক প্রভাব নির্ভর করে। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যদি শুধু প্রশাসনিক সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা খাস জমি ও ভূমিহীনদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। এই কারণে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সংস্কার হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মূলত একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রকল্প, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ভূমিহীন মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো— প্রযুক্তির পাশাপাশি আইনগত স্বীকৃতি, সহজ প্রতিকার ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং মানবিক সহায়তার কাঠামো সমান্তরালভাবে গড়ে তোলা। অন্যথায়, ডিজিটাল রেকর্ড নিজেই নতুন ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যেখানে দুর্বল জনগোষ্ঠী আবারও বঞ্চিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে ‘খাস জমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার’ আলোচনায় ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড একটি সম্ভাবনাময় কিন্তু সতর্কতার দাবি করা উপাদান—যার সফলতা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড নিঃসন্দেহে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি ভূমি-সংক্রান্ত তথ্যকে নাগরিকের নাগালে আনতে পারে, দীর্ঘদিনের নথিগত অস্পষ্টতা কমাতে পারে এবং ভূমি প্রশাসনের ওপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির কাঠামো আরোপ করতে পারে। বিশেষত খাস জমি শনাক্তকরণ, সংরক্ষণ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে পারে। তবে প্রযুক্তি নিজেই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়— এই ধারণা একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ। বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যদি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তামূলক কাঠামো ছাড়া চালু করা হয়, তবে তা বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি ও বিরোধের জন্ম দিতে পারে। রেকর্ডে একটি ত্রুটি, অননুমোদিত হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার একদিকে যেমন ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের ওপর নাগরিক আস্থাকেও দুর্বল করে দেয়।
খাস জমি ও ভূমিহীনদের অধিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রযুক্তি চালু করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংবিধান যে সামাজিক ন্যায় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের নির্দেশনা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডকে একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে স্থাপন করতে হবে। ডিজিটাল রেকর্ডের আইনি মর্যাদা স্পষ্ট করা, ভুল সংশোধনের কার্যকর ও সময়বদ্ধ পদ্ধতি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের জন্য সহজ প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা— এসবই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত। কাজেই, ন্যায়বিচারের সন্ধানে এগোতে হলে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখলে চলবে না। একে দেখতে হবে ভূমি ও সম্পত্তির ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও মানবকেন্দ্রিক হাতিয়ার হিসেবে। যখন প্রযুক্তি আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সমন্বিত হবে, তখনই তা সত্যিকার অর্থে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে।
[লেখক: আইনজীবী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জাহাঙ্গীর আলম সরকার
শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬
ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের সামাজিক, প্রশাসনিক ও বিচারিক বাস্তবতায় একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কাঠামোগত সংকটের নাম। জমির দলিল জালিয়াতি, খতিয়ান ও নকশার পারস্পরিক অসামঞ্জস্য, রেকর্ড সংশোধনের অনিয়ম এবং দখলভিত্তিক মালিকানার সংস্কৃতি— এই সবকিছু মিলিয়ে ভূমি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের জন্য ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষত দরিদ্র, ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি প্রশ্নটি শুধু একটি সম্পত্তিগত ইস্যু নয়; এটি তাদের বসবাস, জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র যখন ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন তা অনেকের কাছে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ন্যায়বিচারের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়। কাগজভিত্তিক, জটিল ও দুর্নীতিপ্রবণ ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্বচ্ছ রেকর্ড ব্যবস্থা— এমন ধারণা স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে যে, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ কমবে, জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং খাস জমি ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক ভূমি প্রশাসনে জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু প্রযুক্তি নিজে কোনো নিরপেক্ষ নৈতিক স্বত্তা নয়; এটি যে কাঠামোর ভেতরে প্রয়োগ হয়, তার শক্তি ও সীমাবদ্ধতাও সেই কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বহন করে। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা যদি ত্রুটিপূর্ণ তথ্য, অসম ক্ষমতা ও দুর্বল জবাবদিহির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে, তবে তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে খাস জমি ও ভূমিহীনদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গভীর। ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট ডিজিটাল রেকর্ড একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে বেআইনি দখলের সুযোগ করে দিতে পারে, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃত ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে চিরস্থায়ীভাবে বঞ্চিত করে রাখার পথও সুগম করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে খাস জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি সংবিধানের সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা— সেই প্রশ্নে বিচার হওয়া প্রয়োজন। অতএব প্রশ্নটি শুধু এটুকু নয় যে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা চালু হয়েছে কিনা; প্রশ্নটি হলো— এই প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর কাদের জন্য সুবিধা সৃষ্টি করছে এবং কাদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এটি কি খাস জমির স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমিহীনদের অধিকার বাস্তবায়নে সহায়ক হচ্ছে, নাকি বিদ্যমান বৈষম্যকে প্রযুক্তির মোড়কে আরও দৃঢ় করছে? এই প্রবন্ধে খাস জমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার প্রসঙ্গটি তাই ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থার আলোকে বিশ্লেষণ করা হবে— যেখানে প্রযুক্তি, প্রশাসন ও ন্যায়বিচারের আন্তঃসম্পর্ক উন্মোচিত হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত ভূমি-ন্যায়বিচার কোনো সফটওয়্যার বা ডেটাবেসের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, নৈতিক অবস্থান এবং সংবিধানের প্রতি বাস্তব আনুগত্যের প্রশ্ন।
ভূমি মানুষের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। বাংলাদেশে ভূমি প্রশ্ন শুধু একটি সম্পত্তিগত ইস্যু নয়; এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, ক্ষমতার অসমতা এবং ন্যায়বিচারের গভীর কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই বাস্তবতায় খাস জমি ও ভূমিহীনদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি সাংবিধানিক ও নৈতিক উভয় অর্থেই রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড বলতে মূলত ভূমির খতিয়ান, পর্চা, নকশা, জরিপ তথ্য, রেকর্ড সংশোধনের ইতিহাস এবং ভূমি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক উপাত্তসমূহকে একটি সমন্বিত ইলেকট্রনিক ডাটাবেজে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এর লক্ষ্য শুধু কাগজভিত্তিক নথির পরিমাণ কমানো নয়; বরং ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারকে বাস্তব রূপ দেয়া। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ‘ডিজিটাল গভর্ন্যান্স’-এর একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। এর মাধ্যমে ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি এবং রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় একক মানদ- প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এই লক্ষ্য ভূমি ও সম্পত্তির ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—বিশেষত যখন তা খাস জমির সঠিক সনাক্তকরণ ও ভূমিহীনদের মধ্যে ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার দেয়। সংবিধানের ১৯ ও ২০ অনুচ্ছেদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের নির্দেশনা রয়েছে। সেই আলোকে খাস জমি ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহৃত হওয়া শুধু প্রশাসনিক সদিচ্ছার বিষয় নয়, বরং সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা যদি এই সাংবিধানিক দর্শনকে ধারণ করে পরিচালিত হয়, তবে তা ভূমিহীনদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে এখানে একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে— প্রযুক্তি কি নিজেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে? বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এটি যেভাবে নকশা করা হয় এবং যাদের হাতে প্রয়োগের ক্ষমতা থাকে, তার ওপরই এর সামাজিক প্রভাব নির্ভর করে। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যদি শুধু প্রশাসনিক সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা খাস জমি ও ভূমিহীনদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। এই কারণে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সংস্কার হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মূলত একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রকল্প, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ভূমিহীন মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো— প্রযুক্তির পাশাপাশি আইনগত স্বীকৃতি, সহজ প্রতিকার ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং মানবিক সহায়তার কাঠামো সমান্তরালভাবে গড়ে তোলা। অন্যথায়, ডিজিটাল রেকর্ড নিজেই নতুন ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যেখানে দুর্বল জনগোষ্ঠী আবারও বঞ্চিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে ‘খাস জমি ও ভূমিহীনদের সাংবিধানিক অধিকার’ আলোচনায় ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড একটি সম্ভাবনাময় কিন্তু সতর্কতার দাবি করা উপাদান—যার সফলতা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড নিঃসন্দেহে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি ভূমি-সংক্রান্ত তথ্যকে নাগরিকের নাগালে আনতে পারে, দীর্ঘদিনের নথিগত অস্পষ্টতা কমাতে পারে এবং ভূমি প্রশাসনের ওপর একটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির কাঠামো আরোপ করতে পারে। বিশেষত খাস জমি শনাক্তকরণ, সংরক্ষণ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে পারে। তবে প্রযুক্তি নিজেই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়— এই ধারণা একটি বিপজ্জনক সরলীকরণ। বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যদি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তামূলক কাঠামো ছাড়া চালু করা হয়, তবে তা বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি ও বিরোধের জন্ম দিতে পারে। রেকর্ডে একটি ত্রুটি, অননুমোদিত হস্তক্ষেপ কিংবা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার একদিকে যেমন ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের ওপর নাগরিক আস্থাকেও দুর্বল করে দেয়।
খাস জমি ও ভূমিহীনদের অধিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রযুক্তি চালু করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংবিধান যে সামাজিক ন্যায় ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের নির্দেশনা দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডকে একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে স্থাপন করতে হবে। ডিজিটাল রেকর্ডের আইনি মর্যাদা স্পষ্ট করা, ভুল সংশোধনের কার্যকর ও সময়বদ্ধ পদ্ধতি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের জন্য সহজ প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা— এসবই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত। কাজেই, ন্যায়বিচারের সন্ধানে এগোতে হলে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখলে চলবে না। একে দেখতে হবে ভূমি ও সম্পত্তির ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও মানবকেন্দ্রিক হাতিয়ার হিসেবে। যখন প্রযুক্তি আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সমন্বিত হবে, তখনই তা সত্যিকার অর্থে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে।
[লেখক: আইনজীবী]