alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

হোসেন আবদুল মান্নান

: রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সহজে কাটবে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষের ধারণা ভবিষ্যতে এর মাত্রা আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বহুবিধ হবে জনজীবনের উৎকণ্ঠা ও নৈরাজ্য। দেশের রাজনীতির আকাশে যে মেঘ ওড়াউড়ি করছে তা কেবল স্বস্তির বৃষ্টি পতনের মধ্য দিয়েই অবসান হবে না; বরঞ্চ অভাবনীয় মারাত্মক বজ্রপাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সবাই। বলাবলি হচ্ছে, শুধু একটা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ভেতরেই কি সবকিছু নিহিত আছে? না, গণমানুষের প্রত্যাশার জায়গা কিন্তু ভিন্নতর।

এরা যা চায় তা-ই করতে পারে বিনা বাধায়, বিনা প্রতিরোধে। এরা ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, একদিন গ্রামগঞ্জ, লোকালয়- সব জয় করতে করতে পুনরায় এরা শহরে ফিরে আসবে। শহরই এদের মূল টার্গেট ও চালিকাশক্তি

নিকট অতীতের নজিরবিহীন বিতর্কিত নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি কী দেশে কোনো শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে? জবাব হতে পারে, ‘অবশ্যই হবে না’। এ কথা সত্য যে, দেশের লক্ষ-কোটি মানুষ এবং লক্ষ-লক্ষ নতুন ভোটার (জেন-জি শ্রেণির) আগ্রহভরে যেন মুখিয়ে আছে এদের প্রথম ভোটটি নিজের পছন্দমতো প্রার্থীর অনুকূলে প্রদান করতে। উৎসব মুখরতার আমেজ নিয়ে তারা আগামীর ভোট উদযাপন করতে চায়। একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে তারা কখনো চাইবে না, কেন্দ্রে গিয়ে বিগত দিনের মতো এমন এক উদ্ভট জবাবের মুখোমুখি হতে, ‘চলে যান, আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে’ ! এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার হিসাবনিকাশ হয়তো আপাতত কারও সঠিক বিবেচনায় নেই।

২.

এদিকে মব জাস্টিস থামছেই না বা থামানো যাচ্ছে না অথবা থামানো হচ্ছে না। মানুষ বলে উল্টো কথা, মবরা এখন দেশের ভেতরে আরেকটি বিকল্প বাহিনীর ছায়া। তারা যা করছে এতে পেছনে রয়েছে বড় শক্তি এবং সামগ্রিক অর্থে সমর্থনও আছেই।

আর আছে বলেই এরা প্রকাশ্যে ও দিবালোকের সংঘবদ্ধ বাহিনীর আরেক নাম। এরা যা চায় তা-ই করতে পারে বিনা বাধায়, বিনা প্রতিরোধে। এরা ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, একদিন গ্রামগঞ্জ, লোকালয়- সব জয় করতে করতে পুনরায় এরা শহরে ফিরে আসবে। শহরই এদের মূল টার্গেট ও চালিকাশক্তি। মামলা, হামলা, ফ্যাসিস্ট-দোসর ট্যাগ দিয়ে চাঁদাবাজির নৈরাজ্যের পর্ব শেষে বর্তমানে তারা গ্রামের লম্বা চুলের আউল-বাউল, ফকির শ্রেণির পথের মানুষ, সংসারবিরাগী, চির-বোহেমিয়ান মানুষগুলোকে টার্গেট করেছে। এদের বাড়িঘর, আস্তানা, আঁকড়া গুড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এ শ্রেণির উৎপত্তি ও আগমন এক দিনে নয় শতাব্দীর পর শতাব্দীতে বাংলা এবং বাঙালির ইতিহাসে এদের সরব উপস্থিতি আছে। এদের হাতের একতারায় আবহমান বাংলার মেঠো সুর আছে, তাল-লয়ের ঝংকার আছে, মা-মাটির কথা আছে। বাঙালির অতীত আছে। এরা কারও বোঝা নয় বরং বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতির পরিপূরক হয়ে, প্রকৃতির সন্তান হয়েই টিকে আছে যুগে যুগে। এদের ওপর আঘাত হানার হেতু নিয়ে জনমনে অসন্তোষ ও ধূম্রজাল রয়েছে। বাউলরা সমাজে অজাতশত্রু শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত। এরা দেশ-কাল, ভোগ, পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের তোয়াক্কা করে না। ভোগবিলাসী সম্পদ এদের টার্গেট নয়, কাজেই রাষ্ট্রকেই এদের রক্ষক বা সেফগার্ড হতে হবে। অন্য কিছু নয়। অন্যথায় আপামর সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনকে এদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। যদিও এর ফলাফল সবসময় রাষ্ট্রের জন্য শুভ বা মঙ্গলবার্তা বয়ে নিয়ে আসে না।

৩.

‘মব’ সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ও বহুল চর্চিত একটি শব্দ। সাধারণ মানুষও এই শব্দের সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় নতুন একটা যুৎসই শব্দের সংযোজন হলো। ইংরেজি ‘MOB’ শব্দের আভিধানিক বাংলা ‘উশৃঙ্খল জনতা’। তবে অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলেছে, a large crowd of people, they may become violent or cause trouble, angry/ unruly mob..etc ।

কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে সংঘবদ্ধ উশৃঙ্খল জনতা যখন আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয় তখনই তা মবে পরিণত হয়। গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসির বিপরীত হলো মবোক্রেসি। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে Mobocracy বা মবতন্ত্র বললে অত্যুক্তি হবে না। মব জাস্টিস বলেও মানুষ হাটে-ঘাটে আলোচনা করছে। ইংরেজি ঔঁংঃরপব মানে ন্যায়বিচার। আর মব জাস্টিস বলতে বুঝাচ্ছে নির্লজ্জ অন্যায় অবিচারকে। আর একটা অন্যায় আরও দশটা অন্যাকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ‘Injustice anywhere is a threat to Justice everywhere’.

দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এমন মব জাস্টিসের অভয়ারণ্যের অবসান একান্ত জরুরি। রাষ্ট্রকেই অবিলম্বে এদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। অন্যথায়, এরা রাষ্ট্রের ঘাড়ের ওপর চেপে বসবে। ইতোমধ্যেই তারা রাষ্ট্রে একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এবং এরা অনতিবিলম্বে ফ্রাংকেনস্টাইনের দানবে রূপান্তরিত হওয়ার পথে হেঁটে চলেছে।

৪.

আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটা ঐতিহাসিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়তো রাজনীতিতে আশার আলো ফেলতে পারত। কিন্তু এর সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং সুদূর পরাহত বলেই মনে হচ্ছে । অপেক্ষাকৃত অপরিচিত, কর্মী সমর্থকহীন গুটিকয়েক নেতাসর্বস্ব দলের ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার আকাশচুম্বি হাতছানির কারণে তা বাস্তবে হয়ে উঠবে না। এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ও তার সহযোগীরা আগামী নির্বাচনকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে একাধিকবার জাতিকে আশ্বস্ত করলেও ইদানীং হতাশার সুর কানে লাগছে। অথচ মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফের বহাল করা হয়েছে। এতে সরকার বিপুল প্রশংসায় ভাসছে। সর্বস্তরের জনগণ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, দলনিরপেক্ষ শিক্ষিত শ্রেণি- সকলেই একে যুগান্তকারী রায় বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এতে করে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, এবার ভোটের অধিকার ফিরে আসবে, ২০১১ সালের বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে দেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ধস নেমেছিল এর অবসান হল ইত্যাদি। বিতর্কিত রায়ের হোতা তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এটাও এদেশে নজিরবিহীন ঘটনার অন্যতম।

কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো, এ রায়ও অচলাবস্থার পথকে মসৃণ করে দিতে পারবে না, বরং রাজনীতি আরও সহিংসতার চোরাগলিতে পথ হারাতে পারে। এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ রায়ে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন হতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে’।

এটা কেন, কার স্বার্থে? বলা যাচ্ছে না। বলা সহজ নয়। কিন্তু ফলাফল কী হবে তা-ও বোঝা মুশকিল। তবে বিষয়টি দিবালোকের মতো সত্য যে, দেশে একটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে না, যা হবে তাতে মিলেমিশে ক্ষমতার সামান্য পালাবদল হবে। সাধারণ আমজনতা যে তিমিরে ছিল সেখানেই নিমজ্জিত থেকে যাবে বলে অনেকেই মনে করেন।

৫.

দেশের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষিত, বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববাসীকে দারিদ্র্য মুক্তির পরামর্শ দেন তিনি। তার কাছ থেকে মাইক্রো-ক্রেডিট ফর্মুলা নেন। পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধীর হয়ে থাকে তার মূল্যবান কথা শোনার জন্য। এদিকে দেশের মানুষের কত আকাক্সক্ষা, কত স্বপ্ন, কত সুদূরের পিয়াসী হয়ে তারা অপেক্ষমাণ। যদি ভালো কিছু হয়, অভিনব কিছু হয়, অভূতপূর্ব কিছু হয় তবে সেটি মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরেই হবে। অথচ দিন যত যাচ্ছে, সময় গড়িয়ে পড়ছে কালের অতলে, আশার আলো ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, স্বপ্নের সবকিছু যেন অদৃশ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। আজকে হাটে ঘাটে, ক্ষেতে-খামারে কারখানার চাকায় হাত রাখা কেউই আস্থা রাখতে পারছে না, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? কার জন্য হবে? কার পক্ষে হবে? আর এ শঙ্কাকে চোখের সামনে সত্যি করে তুলছে তারা, দেশে যাদের সমর্থনে ৫% ভোট নেই অথচ তারা যখন গণমাধ্যমে বুক চাপড়িয়ে, উচ্চকিত স্বরে বলে, ‘আগামী নির্বাচন ও সরকারের নিয়ামক হব আমরা, সরকার আমরাই গঠন করব’।

এটা সবাই জানত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একটা নির্দলীয় সরকার। তারা জনস্বার্থ-সম্পর্কিত কতিপয় অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে এমন একটি জাতীয় নির্বাচন উপহার দিয়ে ফিরে যাবেন। তথাকথিত দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে সমাজের সৎ, অবিতর্কিত, দেশপ্রেমিক, ভালো মানুষগুলোকে জনপ্রতিনিধিত্ব করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেবেন, যা আগামীতে অন্তত অর্ধশতাব্দীকাল অনন্য দৃষ্টান্তের মাইলফলক ছুঁয়ে বেঁচে থাকত। না, এটা হওয়ার সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে গেছে, আশাবাদী মানুষগুলোও প্রতিদিন স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনায় বিদীর্ণ হচ্ছে। তারা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এখন দেশকেই অভিসম্পাত দিতে কার্পণ্য করছে না। যেন সব হারানোর বেদনায় আমজনতা ম্রীয়মান ও কাতর হয়ে আছে। এর থেকে উত্তরণ বা মুক্তির পথ কী একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেল? নাকি টানেলের শেষ প্রান্তে এখনো আলোর ঝলকানির আভাস পাওয়া যায়?

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: গল্পকার]

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

বিনা-ভাড়ার ট্রেনযাত্রা

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এশিয়া

ছবি

নামে ইসলামী, কাজে আবু জাহেল!

জলবায়ু পরিবর্তন: স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি

অস্থির পেঁয়াজের বাজার: আমদানি কি সত্যিই সমাধান?

মূল্যবৃদ্ধির ঘেরাটোপ: সংকটাক্রান্ত পরিবার ও সামাজিক রূপান্তর

বায়দূষণে অকালমৃত্যু

লাশের বদলে লাশই যদি চুড়ান্ত হয়, তবে রাষ্ট্রের দরকার কী?

ভিক্ষাবৃত্তি যেখানে অন্যতম পেশা

বুদ্ধিজীবী হত্যা ও এর স্বরূপ সন্ধানে

আদিবাসীদের ভূমি অধিকার ও নিরাপত্তা সংকট

“মুনীর চৌধুরীর কবর...”

বুদ্ধিজীবী হত্যা ও এর স্বরূপ সন্ধানে

জলবায়ু সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা

স্বাধীন তদন্ত কমিশন দাবির নেপথ্যে কি দায়মুক্তি?

বুদ্ধিজীবী হত্যা ও এর স্বরূপ সন্ধানে

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

হোসেন আবদুল মান্নান

রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সহজে কাটবে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষের ধারণা ভবিষ্যতে এর মাত্রা আরও অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বহুবিধ হবে জনজীবনের উৎকণ্ঠা ও নৈরাজ্য। দেশের রাজনীতির আকাশে যে মেঘ ওড়াউড়ি করছে তা কেবল স্বস্তির বৃষ্টি পতনের মধ্য দিয়েই অবসান হবে না; বরঞ্চ অভাবনীয় মারাত্মক বজ্রপাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সবাই। বলাবলি হচ্ছে, শুধু একটা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ভেতরেই কি সবকিছু নিহিত আছে? না, গণমানুষের প্রত্যাশার জায়গা কিন্তু ভিন্নতর।

এরা যা চায় তা-ই করতে পারে বিনা বাধায়, বিনা প্রতিরোধে। এরা ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, একদিন গ্রামগঞ্জ, লোকালয়- সব জয় করতে করতে পুনরায় এরা শহরে ফিরে আসবে। শহরই এদের মূল টার্গেট ও চালিকাশক্তি

নিকট অতীতের নজিরবিহীন বিতর্কিত নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি কী দেশে কোনো শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে? জবাব হতে পারে, ‘অবশ্যই হবে না’। এ কথা সত্য যে, দেশের লক্ষ-কোটি মানুষ এবং লক্ষ-লক্ষ নতুন ভোটার (জেন-জি শ্রেণির) আগ্রহভরে যেন মুখিয়ে আছে এদের প্রথম ভোটটি নিজের পছন্দমতো প্রার্থীর অনুকূলে প্রদান করতে। উৎসব মুখরতার আমেজ নিয়ে তারা আগামীর ভোট উদযাপন করতে চায়। একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে তারা কখনো চাইবে না, কেন্দ্রে গিয়ে বিগত দিনের মতো এমন এক উদ্ভট জবাবের মুখোমুখি হতে, ‘চলে যান, আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে’ ! এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার হিসাবনিকাশ হয়তো আপাতত কারও সঠিক বিবেচনায় নেই।

২.

এদিকে মব জাস্টিস থামছেই না বা থামানো যাচ্ছে না অথবা থামানো হচ্ছে না। মানুষ বলে উল্টো কথা, মবরা এখন দেশের ভেতরে আরেকটি বিকল্প বাহিনীর ছায়া। তারা যা করছে এতে পেছনে রয়েছে বড় শক্তি এবং সামগ্রিক অর্থে সমর্থনও আছেই।

আর আছে বলেই এরা প্রকাশ্যে ও দিবালোকের সংঘবদ্ধ বাহিনীর আরেক নাম। এরা যা চায় তা-ই করতে পারে বিনা বাধায়, বিনা প্রতিরোধে। এরা ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, একদিন গ্রামগঞ্জ, লোকালয়- সব জয় করতে করতে পুনরায় এরা শহরে ফিরে আসবে। শহরই এদের মূল টার্গেট ও চালিকাশক্তি। মামলা, হামলা, ফ্যাসিস্ট-দোসর ট্যাগ দিয়ে চাঁদাবাজির নৈরাজ্যের পর্ব শেষে বর্তমানে তারা গ্রামের লম্বা চুলের আউল-বাউল, ফকির শ্রেণির পথের মানুষ, সংসারবিরাগী, চির-বোহেমিয়ান মানুষগুলোকে টার্গেট করেছে। এদের বাড়িঘর, আস্তানা, আঁকড়া গুড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এ শ্রেণির উৎপত্তি ও আগমন এক দিনে নয় শতাব্দীর পর শতাব্দীতে বাংলা এবং বাঙালির ইতিহাসে এদের সরব উপস্থিতি আছে। এদের হাতের একতারায় আবহমান বাংলার মেঠো সুর আছে, তাল-লয়ের ঝংকার আছে, মা-মাটির কথা আছে। বাঙালির অতীত আছে। এরা কারও বোঝা নয় বরং বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতির পরিপূরক হয়ে, প্রকৃতির সন্তান হয়েই টিকে আছে যুগে যুগে। এদের ওপর আঘাত হানার হেতু নিয়ে জনমনে অসন্তোষ ও ধূম্রজাল রয়েছে। বাউলরা সমাজে অজাতশত্রু শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত। এরা দেশ-কাল, ভোগ, পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের তোয়াক্কা করে না। ভোগবিলাসী সম্পদ এদের টার্গেট নয়, কাজেই রাষ্ট্রকেই এদের রক্ষক বা সেফগার্ড হতে হবে। অন্য কিছু নয়। অন্যথায় আপামর সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনকে এদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। যদিও এর ফলাফল সবসময় রাষ্ট্রের জন্য শুভ বা মঙ্গলবার্তা বয়ে নিয়ে আসে না।

৩.

‘মব’ সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ও বহুল চর্চিত একটি শব্দ। সাধারণ মানুষও এই শব্দের সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় নতুন একটা যুৎসই শব্দের সংযোজন হলো। ইংরেজি ‘MOB’ শব্দের আভিধানিক বাংলা ‘উশৃঙ্খল জনতা’। তবে অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলেছে, a large crowd of people, they may become violent or cause trouble, angry/ unruly mob..etc ।

কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে সংঘবদ্ধ উশৃঙ্খল জনতা যখন আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয় তখনই তা মবে পরিণত হয়। গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসির বিপরীত হলো মবোক্রেসি। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে Mobocracy বা মবতন্ত্র বললে অত্যুক্তি হবে না। মব জাস্টিস বলেও মানুষ হাটে-ঘাটে আলোচনা করছে। ইংরেজি ঔঁংঃরপব মানে ন্যায়বিচার। আর মব জাস্টিস বলতে বুঝাচ্ছে নির্লজ্জ অন্যায় অবিচারকে। আর একটা অন্যায় আরও দশটা অন্যাকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ‘Injustice anywhere is a threat to Justice everywhere’.

দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এমন মব জাস্টিসের অভয়ারণ্যের অবসান একান্ত জরুরি। রাষ্ট্রকেই অবিলম্বে এদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। অন্যথায়, এরা রাষ্ট্রের ঘাড়ের ওপর চেপে বসবে। ইতোমধ্যেই তারা রাষ্ট্রে একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এবং এরা অনতিবিলম্বে ফ্রাংকেনস্টাইনের দানবে রূপান্তরিত হওয়ার পথে হেঁটে চলেছে।

৪.

আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটা ঐতিহাসিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়তো রাজনীতিতে আশার আলো ফেলতে পারত। কিন্তু এর সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং সুদূর পরাহত বলেই মনে হচ্ছে । অপেক্ষাকৃত অপরিচিত, কর্মী সমর্থকহীন গুটিকয়েক নেতাসর্বস্ব দলের ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার আকাশচুম্বি হাতছানির কারণে তা বাস্তবে হয়ে উঠবে না। এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ও তার সহযোগীরা আগামী নির্বাচনকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে একাধিকবার জাতিকে আশ্বস্ত করলেও ইদানীং হতাশার সুর কানে লাগছে। অথচ মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফের বহাল করা হয়েছে। এতে সরকার বিপুল প্রশংসায় ভাসছে। সর্বস্তরের জনগণ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, দলনিরপেক্ষ শিক্ষিত শ্রেণি- সকলেই একে যুগান্তকারী রায় বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এতে করে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, এবার ভোটের অধিকার ফিরে আসবে, ২০১১ সালের বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে দেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় ধস নেমেছিল এর অবসান হল ইত্যাদি। বিতর্কিত রায়ের হোতা তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এটাও এদেশে নজিরবিহীন ঘটনার অন্যতম।

কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো, এ রায়ও অচলাবস্থার পথকে মসৃণ করে দিতে পারবে না, বরং রাজনীতি আরও সহিংসতার চোরাগলিতে পথ হারাতে পারে। এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ রায়ে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন হতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে’।

এটা কেন, কার স্বার্থে? বলা যাচ্ছে না। বলা সহজ নয়। কিন্তু ফলাফল কী হবে তা-ও বোঝা মুশকিল। তবে বিষয়টি দিবালোকের মতো সত্য যে, দেশে একটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে না, যা হবে তাতে মিলেমিশে ক্ষমতার সামান্য পালাবদল হবে। সাধারণ আমজনতা যে তিমিরে ছিল সেখানেই নিমজ্জিত থেকে যাবে বলে অনেকেই মনে করেন।

৫.

দেশের প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষিত, বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববাসীকে দারিদ্র্য মুক্তির পরামর্শ দেন তিনি। তার কাছ থেকে মাইক্রো-ক্রেডিট ফর্মুলা নেন। পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধীর হয়ে থাকে তার মূল্যবান কথা শোনার জন্য। এদিকে দেশের মানুষের কত আকাক্সক্ষা, কত স্বপ্ন, কত সুদূরের পিয়াসী হয়ে তারা অপেক্ষমাণ। যদি ভালো কিছু হয়, অভিনব কিছু হয়, অভূতপূর্ব কিছু হয় তবে সেটি মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরেই হবে। অথচ দিন যত যাচ্ছে, সময় গড়িয়ে পড়ছে কালের অতলে, আশার আলো ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, স্বপ্নের সবকিছু যেন অদৃশ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। আজকে হাটে ঘাটে, ক্ষেতে-খামারে কারখানার চাকায় হাত রাখা কেউই আস্থা রাখতে পারছে না, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে? কার জন্য হবে? কার পক্ষে হবে? আর এ শঙ্কাকে চোখের সামনে সত্যি করে তুলছে তারা, দেশে যাদের সমর্থনে ৫% ভোট নেই অথচ তারা যখন গণমাধ্যমে বুক চাপড়িয়ে, উচ্চকিত স্বরে বলে, ‘আগামী নির্বাচন ও সরকারের নিয়ামক হব আমরা, সরকার আমরাই গঠন করব’।

এটা সবাই জানত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একটা নির্দলীয় সরকার। তারা জনস্বার্থ-সম্পর্কিত কতিপয় অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার করে এমন একটি জাতীয় নির্বাচন উপহার দিয়ে ফিরে যাবেন। তথাকথিত দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে সমাজের সৎ, অবিতর্কিত, দেশপ্রেমিক, ভালো মানুষগুলোকে জনপ্রতিনিধিত্ব করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেবেন, যা আগামীতে অন্তত অর্ধশতাব্দীকাল অনন্য দৃষ্টান্তের মাইলফলক ছুঁয়ে বেঁচে থাকত। না, এটা হওয়ার সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে গেছে, আশাবাদী মানুষগুলোও প্রতিদিন স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনায় বিদীর্ণ হচ্ছে। তারা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এখন দেশকেই অভিসম্পাত দিতে কার্পণ্য করছে না। যেন সব হারানোর বেদনায় আমজনতা ম্রীয়মান ও কাতর হয়ে আছে। এর থেকে উত্তরণ বা মুক্তির পথ কী একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেল? নাকি টানেলের শেষ প্রান্তে এখনো আলোর ঝলকানির আভাস পাওয়া যায়?

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: গল্পকার]

back to top