মিহির কুমার রায়
২০১০ সালে দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। ২০১১ সালে এ কার্যক্রমে টাকা জমার সুযোগ আসে। বর্তমানে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং চালু রেখেছে। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা মাত্র ১০০ টাকা জমা রেখে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। এতে ফি, চার্জ, ডেবিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় ও সুবিধা প্রদান করা হয়। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিশুরা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পারদর্শিতা অর্জন করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
স্কুল ব্যাংকিংয়ের কম আমানতের পেছনে মূলত দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেড়ে যাওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় দায়ী
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমানত কমে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা, যা সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্দীপ্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীই ৪ কোটির বেশি। তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাইরে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের মধ্যে শৈশবকাল থেকেই সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তুললে তাদেরও যেমন লাভ, তেমনি গতি সঞ্চার হয় দেশের অর্থনীতিতেও। প্রধানত এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাংকগুলোকে স্কুল ব্যাংকিং চালু করার অনুমোদন দেয় সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংক।
টার্গেট গ্রুপ ও কার্যক্রম: স্কুল ব্যাংকিংয়ে টার্গেট গ্রুপ হলো ১১-১৭ বছরের তরুণ-তরুণী ও ছাত্রছাত্রী, যাদের কোনো আয়ের উৎস নেই। তারা তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে উপহার বা নগদ অর্থ পায়, অথবা নিয়মিতভাবে দুপুরের টিফিন বাবদ যে অর্থ পায়, তা থেকে কিছু অর্থ বাঁচিয়ে জমা রাখার নিমিত্তে স্কুলের নিকটস্থ ব্যাংক শাখায় একটি সেভিংস হিসাব খোলার উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করাই স্কুল ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য।
ব্যাংকগুলো ইয়ং স্টার, ফিউচার স্টার, প্রজন্ম স্টার ইত্যাদি নানা আকর্ষণীয় নামে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সঞ্চয় স্কিম চালু করেছে। স্বভাবতই ছোট ছেলেমেয়েরা তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কিছু করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
দেশে সঞ্চয়ের বিপরীতে সুদের হার অনেক কম। অথচ আমানত আকৃষ্ট করতে হলে সুদের হার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের এহেন আর্থিক নীতি বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হচ্ছে। সে অবস্থায় সঞ্চয়ের বিপরীতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু প্রণোদনা দেয়া যায় কিনা, তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারে।
কিছু ব্যাংক প্রতি বছর দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সুবিধা ও বিভিন্ন বৃত্তি দিয়ে থাকে। এর আওতা আরও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। মোটকথা, সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহী ও আকৃষ্ট করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। আর তাহলেই স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের সাফল্য সুনিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতা: দেশের সাড়ে ২৬ হাজার প্রতিষ্ঠান স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট ৪৮ লাখের বেশি। জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪ লাখের বেশি। আর্থিক শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে চলতি বছর থেকে প্রতিটি ব্যাংক শাখাকে অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনার নির্দেশনা রয়েছে।
স্কুল ব্যাংকিংকে আরও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মার্চ মাসের এক নির্দেশনায় সব ব্যাংকের প্রতিটি শাখার নিকটবর্তী অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্কুল ব্যাংকিং সেবা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, নিয়মিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচি পালন, শিক্ষার্থীদের হিসাব খোলা ও লেনদেন সেবা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে দ্বৈততা এড়াতে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে শাখা নির্বাচন করতে হবে।
প্রতি তিন মাস পরপর ব্যাংকগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে হচ্ছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে ২৬ হাজার ৪৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। মোট হিসাব খোলা হয়েছে ৪৮ লাখ ৫ হাজার।
হিসাবের হিসাবনিকাশ: হিসাবের মধ্যে ৫২.৭৪% গ্রামে এবং ৪৭.২৬% শহর অঞ্চলে। ছাত্রছাত্রীদের অনুপাত প্রায় সমান: ছাত্র ৫০.৮১%, ছাত্রী ৪৯.১৯%। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে দুটি ব্যতীত সব ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম রয়েছে।
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব হিসাবের মোট জমার পরিমাণ ২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। শিক্ষার্থীদের ১৮ বছর পূর্ণ হলে হিসাব সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবে রূপান্তরিত করা হয়। এইভাবে ১১ লাখ ৮৭ হাজার অ্যাকাউন্ট সাধারণ হিসাব হিসেবে রূপান্তর হয়েছে। প্রতিটি শাখার উদ্যোগে চলতি বছরে অন্তত ৩০০টি নতুন হিসাব খোলার নির্দেশনা রয়েছে।
স্কুল ব্যাংকিংয়ের আমানতের নিম্নমুখিতা: চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আমানত কমেছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। গত ৯ মাসে জমাকৃত টাকার পরিমাণ কমেছে ৩৩২ কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের নামে মোট ৪৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮২টি অ্যাকাউন্ট খোলা রয়েছে। ডিসেম্বরের তুলনায় অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বেড়েছে ৫১ হাজারের বেশি, কিন্তু আমানতের পরিমাণ কমেছে ৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা। স্কুল ব্যাংকিংয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
ছেলেদের নামে মোট হিসাবের ৫১% এবং আমানতের পরিমাণে ৪৯%। স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে এগিয়ে পাঁচটি ব্যাংক হলো: ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, অগ্রণী ব্যাংক, এশিয়া ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক।
শেষ কথা : স্কুল ব্যাংকিংয়ের কম আমানতের পেছনে মূলত দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেড়ে যাওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় দায়ী। স্কুলের খরচ ও অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেন বিভিন্ন প্রয়োজনে।
তবে স্কুল ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি দিনদিন বাড়ছে এবং এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রণী ভূমিকা জরুরি।
[লেখক: সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মিহির কুমার রায়
রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
২০১০ সালে দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। ২০১১ সালে এ কার্যক্রমে টাকা জমার সুযোগ আসে। বর্তমানে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং চালু রেখেছে। ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা মাত্র ১০০ টাকা জমা রেখে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। এতে ফি, চার্জ, ডেবিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় ও সুবিধা প্রদান করা হয়। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিশুরা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পারদর্শিতা অর্জন করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
স্কুল ব্যাংকিংয়ের কম আমানতের পেছনে মূলত দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেড়ে যাওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় দায়ী
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমানত কমে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা, যা সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্দীপ্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীই ৪ কোটির বেশি। তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাইরে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের মধ্যে শৈশবকাল থেকেই সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তুললে তাদেরও যেমন লাভ, তেমনি গতি সঞ্চার হয় দেশের অর্থনীতিতেও। প্রধানত এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাংকগুলোকে স্কুল ব্যাংকিং চালু করার অনুমোদন দেয় সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংক।
টার্গেট গ্রুপ ও কার্যক্রম: স্কুল ব্যাংকিংয়ে টার্গেট গ্রুপ হলো ১১-১৭ বছরের তরুণ-তরুণী ও ছাত্রছাত্রী, যাদের কোনো আয়ের উৎস নেই। তারা তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে উপহার বা নগদ অর্থ পায়, অথবা নিয়মিতভাবে দুপুরের টিফিন বাবদ যে অর্থ পায়, তা থেকে কিছু অর্থ বাঁচিয়ে জমা রাখার নিমিত্তে স্কুলের নিকটস্থ ব্যাংক শাখায় একটি সেভিংস হিসাব খোলার উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করাই স্কুল ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য।
ব্যাংকগুলো ইয়ং স্টার, ফিউচার স্টার, প্রজন্ম স্টার ইত্যাদি নানা আকর্ষণীয় নামে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সঞ্চয় স্কিম চালু করেছে। স্বভাবতই ছোট ছেলেমেয়েরা তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কিছু করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
দেশে সঞ্চয়ের বিপরীতে সুদের হার অনেক কম। অথচ আমানত আকৃষ্ট করতে হলে সুদের হার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের এহেন আর্থিক নীতি বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হচ্ছে। সে অবস্থায় সঞ্চয়ের বিপরীতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু প্রণোদনা দেয়া যায় কিনা, তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারে।
কিছু ব্যাংক প্রতি বছর দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সুবিধা ও বিভিন্ন বৃত্তি দিয়ে থাকে। এর আওতা আরও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। মোটকথা, সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহী ও আকৃষ্ট করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। আর তাহলেই স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের সাফল্য সুনিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতা: দেশের সাড়ে ২৬ হাজার প্রতিষ্ঠান স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট ৪৮ লাখের বেশি। জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪ লাখের বেশি। আর্থিক শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে চলতি বছর থেকে প্রতিটি ব্যাংক শাখাকে অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনার নির্দেশনা রয়েছে।
স্কুল ব্যাংকিংকে আরও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মার্চ মাসের এক নির্দেশনায় সব ব্যাংকের প্রতিটি শাখার নিকটবর্তী অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্কুল ব্যাংকিং সেবা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, নিয়মিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শিক্ষা কর্মসূচি পালন, শিক্ষার্থীদের হিসাব খোলা ও লেনদেন সেবা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে দ্বৈততা এড়াতে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে শাখা নির্বাচন করতে হবে।
প্রতি তিন মাস পরপর ব্যাংকগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে হচ্ছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে ২৬ হাজার ৪৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। মোট হিসাব খোলা হয়েছে ৪৮ লাখ ৫ হাজার।
হিসাবের হিসাবনিকাশ: হিসাবের মধ্যে ৫২.৭৪% গ্রামে এবং ৪৭.২৬% শহর অঞ্চলে। ছাত্রছাত্রীদের অনুপাত প্রায় সমান: ছাত্র ৫০.৮১%, ছাত্রী ৪৯.১৯%। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে দুটি ব্যতীত সব ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম রয়েছে।
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব হিসাবের মোট জমার পরিমাণ ২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। শিক্ষার্থীদের ১৮ বছর পূর্ণ হলে হিসাব সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবে রূপান্তরিত করা হয়। এইভাবে ১১ লাখ ৮৭ হাজার অ্যাকাউন্ট সাধারণ হিসাব হিসেবে রূপান্তর হয়েছে। প্রতিটি শাখার উদ্যোগে চলতি বছরে অন্তত ৩০০টি নতুন হিসাব খোলার নির্দেশনা রয়েছে।
স্কুল ব্যাংকিংয়ের আমানতের নিম্নমুখিতা: চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আমানত কমেছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। গত ৯ মাসে জমাকৃত টাকার পরিমাণ কমেছে ৩৩২ কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের নামে মোট ৪৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮২টি অ্যাকাউন্ট খোলা রয়েছে। ডিসেম্বরের তুলনায় অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বেড়েছে ৫১ হাজারের বেশি, কিন্তু আমানতের পরিমাণ কমেছে ৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা। স্কুল ব্যাংকিংয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
ছেলেদের নামে মোট হিসাবের ৫১% এবং আমানতের পরিমাণে ৪৯%। স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে এগিয়ে পাঁচটি ব্যাংক হলো: ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, অগ্রণী ব্যাংক, এশিয়া ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক।
শেষ কথা : স্কুল ব্যাংকিংয়ের কম আমানতের পেছনে মূলত দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেড়ে যাওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় দায়ী। স্কুলের খরচ ও অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেন বিভিন্ন প্রয়োজনে।
তবে স্কুল ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি দিনদিন বাড়ছে এবং এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রণী ভূমিকা জরুরি।
[লেখক: সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা]