alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

সড়ক হোক নিরাপদ

তরিকুল ইসলাম

: রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

বিআরটিএ পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সড়কে ৫ হাজার ২১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ১৬ জন নিহত ও ৬ হাজার ৫৫ জন আহত হয়েছে। এটা যেন শুধু পরিসংখ্যান নয়, একটা নীরব শোকগাথা; যা কেউ জানার চেষ্টা করেনা বা জেনেও ব্যবস্থা নেন না বা কী ব্যবস্থা নিতে হবে তা নিয়ে চিন্তা করেন না।

সড়কে অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্তরায়। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব

এই দুর্যোগ হঠাৎ করে উদয় হয়নি, অনেক বছর ধরেই আমাদের জীবনে নিয়মিত হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা সবকিছু আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। মানুষ মরছে, আমরা শিরোনাম দেখছি, আবার মানুষ মরছে, আবার শিরোনাম হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, পরিবার- সবাই মৃত্যুগুলো দেখে ‘অভ্যস্ত’ হয়ে গেছে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়। আমাদের মন এমনই অনুভূতিহীন হয়ে গেছে যে আমরা বুঝতেই পারি না চেষ্টা করলেই এই ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতি বছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন মাত্রায় আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছর দেশে ৫ হাজার ৮৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ জন সড়কে নিহত হচ্ছেন। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

ওয়ার্ল্ড হেলথ র‌্যাঙ্কিং অনুসারে, সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ ব্যতীত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো বা রোধ করা সম্ভব নয়।

আমাদের বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ মূলত সড়কে পরিবহনের জন্য আইন এবং সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিধিমালা। তাই পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি এ আইনে সাম্প্রতিক সংশোধনীর সময়ে গতি নিয়ন্ত্রণ, হেলমেট ও সিটবেল্টের মতো কিছু বিষয় সংযোজন করা হলেও তা সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু ও বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষার করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকটা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এ জন্য সড়কে প্রাণহানি কমাতে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন জরুরি।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনাহীনভাবে দেশে অনেক সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝখান দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানোর প্রবণতা, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা, সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানোসহ ভুলপথে গাড়ি চালানো, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে পথচারীদের চলাচল, রাস্তা পারাপারে ওভার ব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করা, রাস্তার ওপর বা ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলে বিদ্যমান নিয়ম-কানুন প্রতিপালনে যাত্রীদের অনীহা।

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন যে হারে বাড়ছে, তা যদি দ্রুত রোধ করার ব্যাপারে বাস্তবমুখী ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয় বা যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা না হয়, তাহলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ ও হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। সড়কে অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্তরায়। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

গ্লোবাল প্ল্যান ফর সেকেন্ড ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি ২০২১-২০৩০ এর আওতায় ৫টি স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- বহুমুখী যানবাহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার এবং রোডক্র্যাশ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য ৫টি আচরণগত ঝুঁকি যেমন- গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ না করা, সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, মানসম্মত হেলমেট পরিধান না করা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং শিশুবান্ধব বিশেষায়িত আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু এবং ৩০ বছরের কম বয়সী যুবক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ১৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। অথচ এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। জাতিসংঘ নির্ধারিত নিরাপত্তা কৌশল অনুসরণ করে এই প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানো সম্ভব। তাই আমার কাম্য নতুন বছর সড়ক হোক সবার জন্য নিরাপদ।

সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মরে গেলেন তারা তো একপ্রকার বেঁচে গেলেন। যারা বেঁচে থাকছেন, তারা আর আগের মতো বাঁচতে পারছেন না। আমরা কেবল নিহতের সংখ্যা গুনে চলেছি; আহত হয়ে বেঁচে থাকার যাতনা বোঝার চেষ্টা করছি না। ২০২১ সালের রিপোর্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মৃত্যু হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৬ সালে প্রতি লাখে মৃত্যুহার ছিল ১৫.৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ১৯ জনের মতো।

আমরা এই মৃত্যুগুলো মেনে নিয়েছি, কারণ যারা মারা যাচ্ছেন তারা বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম থেকে শহরে কাজ খুঁজতে আসা মানুষ, মোটরসাইকেলে অফিস করা মানুষ বা বাসে বাড়ি ফেরা মানুষ। এই মৃত্যুগুলো খবর হয়, কিন্তু আমরা শোকার্ত হই না; নীতিনির্ধারক ও আইন প্রয়োগকারীদের মনে দাগ কাটে না। মৃত্যুগুলো একটা অদ্ভুত অবহেলায় পড়ে থাকে। প্রতি মাসে প্রায় একই সংখ্যায় মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু আমরা নিশ্চুপ।

সড়কে অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্তরায়। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই আমার প্রত্যাশা নতুন বছর সড়ক হোক সবার জন্য নিরাপদ।

[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

মানবদেহে রোজার সুফল

নিরাপদ সড়কের দাবি

ভাষা, স্বাধীনতা ও সাহিত্য : ইতিহাস থেকে সমকাল

অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী ও শান্তিচুক্তি

ছবি

মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন!

চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিস

শান্তির স্বপ্ন বনাম বাস্তবের দোলাচল

ছবি

ভাষা আন্দোলন বাঙালির বিপ্লব ও আন্দোলনের ভ্যানগার্ড

বিয়ে রেজিস্ট্রি কেন জরুরি

ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা

বিএনপি পাস, জামায়াতও পাস

ব্যালট থেকে বাস্তবতায় বিএনপি

ছবি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: একুশের ইতিহাস, বিশ্বস্বীকৃতি ও আমাদের দায়িত্ব

ফুলের নিচে চাপা পড়া ভাষার আর্তনাদ

নতুন সরকারের কাছে পার্বত্যবাসীর প্রত্যাশা

ছবি

আন্দ্রে বেতেই : মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

‘নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

সড়ক হোক নিরাপদ

তরিকুল ইসলাম

রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬

বিআরটিএ পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সড়কে ৫ হাজার ২১৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ১৬ জন নিহত ও ৬ হাজার ৫৫ জন আহত হয়েছে। এটা যেন শুধু পরিসংখ্যান নয়, একটা নীরব শোকগাথা; যা কেউ জানার চেষ্টা করেনা বা জেনেও ব্যবস্থা নেন না বা কী ব্যবস্থা নিতে হবে তা নিয়ে চিন্তা করেন না।

সড়কে অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্তরায়। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব

এই দুর্যোগ হঠাৎ করে উদয় হয়নি, অনেক বছর ধরেই আমাদের জীবনে নিয়মিত হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা সবকিছু আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। মানুষ মরছে, আমরা শিরোনাম দেখছি, আবার মানুষ মরছে, আবার শিরোনাম হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, পরিবার- সবাই মৃত্যুগুলো দেখে ‘অভ্যস্ত’ হয়ে গেছে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়। আমাদের মন এমনই অনুভূতিহীন হয়ে গেছে যে আমরা বুঝতেই পারি না চেষ্টা করলেই এই ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতি বছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন মাত্রায় আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছর দেশে ৫ হাজার ৮৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ জন সড়কে নিহত হচ্ছেন। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

ওয়ার্ল্ড হেলথ র‌্যাঙ্কিং অনুসারে, সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ ব্যতীত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো বা রোধ করা সম্ভব নয়।

আমাদের বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ মূলত সড়কে পরিবহনের জন্য আইন এবং সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিধিমালা। তাই পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি এ আইনে সাম্প্রতিক সংশোধনীর সময়ে গতি নিয়ন্ত্রণ, হেলমেট ও সিটবেল্টের মতো কিছু বিষয় সংযোজন করা হলেও তা সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু ও বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষার করার জন্য পর্যাপ্ত নয়। সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকটা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এ জন্য সড়কে প্রাণহানি কমাতে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন জরুরি।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিকল্পনাহীনভাবে দেশে অনেক সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝখান দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানোর প্রবণতা, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা, সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানোসহ ভুলপথে গাড়ি চালানো, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে পথচারীদের চলাচল, রাস্তা পারাপারে ওভার ব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করা, রাস্তার ওপর বা ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলে বিদ্যমান নিয়ম-কানুন প্রতিপালনে যাত্রীদের অনীহা।

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন যে হারে বাড়ছে, তা যদি দ্রুত রোধ করার ব্যাপারে বাস্তবমুখী ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয় বা যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা না হয়, তাহলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ ও হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে। সড়কে অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্তরায়। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

গ্লোবাল প্ল্যান ফর সেকেন্ড ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি ২০২১-২০৩০ এর আওতায় ৫টি স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- বহুমুখী যানবাহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার এবং রোডক্র্যাশ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য ৫টি আচরণগত ঝুঁকি যেমন- গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ না করা, সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, মানসম্মত হেলমেট পরিধান না করা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং শিশুবান্ধব বিশেষায়িত আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশু এবং ৩০ বছরের কম বয়সী যুবক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ১৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। অথচ এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। জাতিসংঘ নির্ধারিত নিরাপত্তা কৌশল অনুসরণ করে এই প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানো সম্ভব। তাই আমার কাম্য নতুন বছর সড়ক হোক সবার জন্য নিরাপদ।

সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মরে গেলেন তারা তো একপ্রকার বেঁচে গেলেন। যারা বেঁচে থাকছেন, তারা আর আগের মতো বাঁচতে পারছেন না। আমরা কেবল নিহতের সংখ্যা গুনে চলেছি; আহত হয়ে বেঁচে থাকার যাতনা বোঝার চেষ্টা করছি না। ২০২১ সালের রিপোর্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মৃত্যু হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৬ সালে প্রতি লাখে মৃত্যুহার ছিল ১৫.৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ১৯ জনের মতো।

আমরা এই মৃত্যুগুলো মেনে নিয়েছি, কারণ যারা মারা যাচ্ছেন তারা বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম থেকে শহরে কাজ খুঁজতে আসা মানুষ, মোটরসাইকেলে অফিস করা মানুষ বা বাসে বাড়ি ফেরা মানুষ। এই মৃত্যুগুলো খবর হয়, কিন্তু আমরা শোকার্ত হই না; নীতিনির্ধারক ও আইন প্রয়োগকারীদের মনে দাগ কাটে না। মৃত্যুগুলো একটা অদ্ভুত অবহেলায় পড়ে থাকে। প্রতি মাসে প্রায় একই সংখ্যায় মানুষ মারা যাচ্ছে কিন্তু আমরা নিশ্চুপ।

সড়কে অকালমৃত্যু শুধু ব্যক্তি নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্তরায়। তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই আমার প্রত্যাশা নতুন বছর সড়ক হোক সবার জন্য নিরাপদ।

[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

back to top