মতিউর রহমান
২০২৬ সালের জানুয়ারির এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। ঢাকার আকাশ আজ যেন কোনো এক ধূসর বিষাদে আচ্ছন্ন। গত এক সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা নেই। উত্তরের হিমেল হাওয়া বুড়িগঙ্গার তীরের এই জনপদকে এমনভাবে চেপে ধরেছে, যা গত কয়েক দশকে এ শহরের মানুষ কল্পনাও করেনি। একসময় ঢাকার শীত ছিল এক মনোরম আমেজ- পিঠাপুলি, মেলা আর মিঠে রোদের উৎসব। কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এই হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ সেই নস্টালজিয়াকে এক নির্মম বাস্তবতায় আছড়ে ফেলেছে। আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের যে বয়ান এতকাল উপকূলীয় ঝড় কিংবা বন্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা এখন ঢাকার শীতের কামড়ে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। শীত আজ আর কেবল আবহাওয়া নয়, শীত আজ আমাদের গভীর সামাজিক বৈষম্যের এক জ্বলন্ত দর্পণ।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জলবায়ু আলোচনায় শৈত্যপ্রবাহ ছিল কেবল উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ললাট লিখন। পঞ্চগড় বা কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে শীত মানেই ছিল লড়াই। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা আমাদের বলছে, জলবায়ুর কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমন্ডলের অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঋতুচক্রের ভারসাম্য আজ সম্পূর্ণ বিপন্ন। গড় তাপমাত্রা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চরমভাবাপন্নতা অর্থাৎ, যখন গরম পড়ে তখন তা দাবদাহে রূপ নেয়, আর যখন ঠান্ডা আসে, তা হিমবাহের মতো শহরকে গ্রাস করে।
আর্কটিক অসিলেশন বা উত্তর মেরুর শীতল বায়ুর বিশৃঙ্খল প্রবাহ আজ হিমালয় পেরিয়ে সমতলে নেমে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকার কুখ্যাত বায়ুদূষণ। শীতকালে ধূলিকণা ও ধোঁয়ার আস্তরণ সূর্যের আলোকে মাটিতে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে, ফলে দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে না। এই ‘সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার’ বা এসপিএম ঢাকার কুয়াশাকে আরও ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী করছে। ফলস্বরূপ, আমরা এমন এক অদ্ভুত শীতের মুখোমুখি হচ্ছি, যেখানে দুপুর আর মাঝরাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসছে এবং মানুষের শরীর খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
২০২৬ সালের শীত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা আসলে একই শহরে বাস করি না। একই মেঘের নিচে আমাদের দুই ভিন্ন পৃথিবী। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য শীত কেবল কিছুটা অস্বস্তি, যা গরম কাপড়, ইলেকট্রিক হিটার কিংবা আধুনিক স্থাপত্যের ঘেরাটোপে সামাল দেয়া যায়। কিন্তু আমাদের শহরের বিশাল এক জনগোষ্ঠী, যারা বস্তিতে বা ফুটপাতে জীবন কাটায়, তাদের কাছে এই শীত এক অস্তিত্বের লড়াই।
ঢাকার তেজগাঁও বা হাজারীবাগের বস্তিগুলোতে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায়, টিন আর বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বরফ-শীতল বাতাস বিঁধে যাচ্ছে মানুষের হাড়ের ভেতর। সেখানে গরম জল এক বিলাসিতা, ভালো একটি কম্বল এক স্বপ্ন। রাস্তার পাশের খোলা ড্রেনের পাশেই পলিথিন মুড়িয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলো আমাদের উন্নয়নের মহাসড়কের এক করুণ উপহাস। যখন সরকার ও নীতিনির্ধারকরা ২০২৬ সালের ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনছেন, তখন এক টুকরো শুকনো খড় জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতা খোঁজা মানুষের সংখ্যা এই শহরে কম নয়। এই বৈষম্য কেবল আর্থিক নয়, এটি জীবনের অধিকারের বৈষম্য।
শৈত্যপ্রবাহ কেবল আমাদের শরীরে কাঁপুনি দেয় না, এটি আমাদের অর্থনীতির চাকাও জমিয়ে দেয়। ঢাকার অর্থনীতি মূলত সচল থাকে রিকশাচালক, দিনমজুর, ভ্যানচালক এবং ক্ষুদ্র হকারদের পেশিশক্তিতে। ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এই অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একজন রিকশাচালক, যিনি আগে দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করতেন, তীব্র শীতে তিনি ৪ ঘণ্টার বেশি রাস্তায় থাকতে পারছেন না। যাত্রীসংখ্যাও কমেছে, কারণ প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে চাচ্ছেন না।
নির্মাণশিল্পের শ্রমিকরা ভোরে কাজে যেতে পারছেন না ঠান্ডার কারণে। ফলে তাদের দৈনিক মজুরি কমছে, আর জাতীয় উৎপাদনশীলতায় পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। ২০২৬ সালের শীতকালীন এই অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ শত শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র?্যাজেডি হলো, এই শ্রমজীবীদের কোনো বীমা নেই, কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। কয়েক দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহ মানেই তাদের সংসারে খাবারের টান পড়া। উন্নয়ন যদি এই মানুষদেরকে সুরক্ষার ছাতা দিতে না পারে, তবে সেই উন্নয়নের সার্থকতা কোথায়?
তীব্র শীত আর ঢাকার বায়ুদূষণের মেলবন্ধন জনস্বাস্থ্যে এক মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে। ২০২৬ সালের শীতকালীন হাসপাতালগুলোর চিত্র দেখলে শিউরে উঠতে হয়। নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস এবং অ্যাজমার প্রকোপে শিশু ও বয়স্কদের শয্যা সংকট চরমে। বিশেষ করে যারা ধুলোবালির কাজ করেন এবং খোলা জায়গায় থাকেন, তাদের ফুসফুস আজ অকেজো হয়ে পড়ছে। অপুষ্টিতে ভোগা দরিদ্র শিশুরা ঠান্ডার কামড়ে প্রাণ হারাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমে যথাযথভাবে উঠে আসে না।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর শীতের প্রভাবও আজ আর উপেক্ষণীয় নয়। দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো না পাওয়া এবং কর্মহীনতা মানুষের মধ্যে বিষন্নতা ও একাকিত্ব বাড়াচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। আমরা অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে ছুটি, কিন্তু শীতজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধে যে পুষ্টি এবং নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজন, সেদিকে নজর নেই বললেই চলে।
শৈত্যপ্রবাহ এলে আমাদের চিরাচরিত ‘কম্বল বিতরণ’ উৎসব শুরু হয়। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান সবাই ফটোসেশনের মাধ্যমে কম্বল বিলিয়ে দায় সারে। কিন্তু এটি কি কোনো স্থায়ী সমাধান? ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে টেকসই অভিযোজন নিয়ে। আমরা কেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলতে কেবল বন্যা আর ঘূর্ণিঝড় বুঝি? শৈত্যপ্রবাহকে কেন এখনও ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে না?
আমাদের প্রয়োজন এমন নগর পরিকল্পনা, যেখানে বস্তিবাসীদের জন্য তাপ-সহনশীল সাশ্রয়ী আবাসন থাকবে। শীতকালীন ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য ক্যাম্প এবং শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে গরম জলের ব্যবস্থা ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু তহবিল বা ‘ক্লাইমেট ফান্ড’-এর অর্থ কেবল বাঁধ নির্মাণে নয়, শীতকালীন দুর্যোগ মোকাবিলাতেও বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। আমাদের কৃষি পরিকল্পনায় শীতকালীন ফসল রক্ষা এবং গবাদি পশুর সুরক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে এক উদীয়মান শক্তি। কিন্তু উন্নয়নের উজ্জ্বল আলোর নিচে শৈত্যপ্রবাহে থরথর করে কাঁপা মানুষের দীর্ঘশ্বাস আমাদের সাফল্যের ওপর কালো ছায়া ফেলে। ২০২৬ সালের শীত আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের গল্প নয়, এটি বর্তমানের কঠিন সত্য এবং এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেইসব মানুষ, যারা কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেছে।
প্রকৃতি এখন আর শহরকে ছাড় দিচ্ছে না। ইট-পাথরের জঙ্গলও আর নিরাপদ নয়। যদি আমরা আমাদের নীতি-নির্ধারণে শীতকে গুরুত্ব না দিই, যদি আমরা বৈষম্যের এই দেয়াল ভাঙতে না পারি, তবে প্রতি বছর শীত আসবে আরও করাল রূপ নিয়ে। প্রতিটি হিমশীতল মৃত্যু আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার সাক্ষ্য দেবে। আমরা কি কেবল ফটোসেশনের জন্য কম্বল হাতে দাঁড়িয়ে থাকব, নাকি একটি মানবিক ও সুরক্ষিত আগামীর ভিত গড়ব? সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। কারণ, প্রকৃতির এই নতুন বিষদাঁত আগামীতে আরও তীক্ষè হবে।
শীত কাটলে আমরা যেন ভুলে না যাই যে, পরের বছর আবার একটি হাড়কাঁপানো অন্ধকার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। উন্নয়ন হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক, সুরক্ষা হোক সবার জন্য। তবেই বাংলাদেশ ২০২৬ সালের এই রূপান্তরের সন্ধিক্ষণকে সফলভাবে পার করতে পারবে।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতিউর রহমান
সোমবার, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬
২০২৬ সালের জানুয়ারির এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। ঢাকার আকাশ আজ যেন কোনো এক ধূসর বিষাদে আচ্ছন্ন। গত এক সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা নেই। উত্তরের হিমেল হাওয়া বুড়িগঙ্গার তীরের এই জনপদকে এমনভাবে চেপে ধরেছে, যা গত কয়েক দশকে এ শহরের মানুষ কল্পনাও করেনি। একসময় ঢাকার শীত ছিল এক মনোরম আমেজ- পিঠাপুলি, মেলা আর মিঠে রোদের উৎসব। কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এই হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ সেই নস্টালজিয়াকে এক নির্মম বাস্তবতায় আছড়ে ফেলেছে। আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের যে বয়ান এতকাল উপকূলীয় ঝড় কিংবা বন্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তা এখন ঢাকার শীতের কামড়ে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। শীত আজ আর কেবল আবহাওয়া নয়, শীত আজ আমাদের গভীর সামাজিক বৈষম্যের এক জ্বলন্ত দর্পণ।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জলবায়ু আলোচনায় শৈত্যপ্রবাহ ছিল কেবল উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ললাট লিখন। পঞ্চগড় বা কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে শীত মানেই ছিল লড়াই। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা আমাদের বলছে, জলবায়ুর কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমন্ডলের অস্থিরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঋতুচক্রের ভারসাম্য আজ সম্পূর্ণ বিপন্ন। গড় তাপমাত্রা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চরমভাবাপন্নতা অর্থাৎ, যখন গরম পড়ে তখন তা দাবদাহে রূপ নেয়, আর যখন ঠান্ডা আসে, তা হিমবাহের মতো শহরকে গ্রাস করে।
আর্কটিক অসিলেশন বা উত্তর মেরুর শীতল বায়ুর বিশৃঙ্খল প্রবাহ আজ হিমালয় পেরিয়ে সমতলে নেমে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকার কুখ্যাত বায়ুদূষণ। শীতকালে ধূলিকণা ও ধোঁয়ার আস্তরণ সূর্যের আলোকে মাটিতে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে, ফলে দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে না। এই ‘সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার’ বা এসপিএম ঢাকার কুয়াশাকে আরও ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী করছে। ফলস্বরূপ, আমরা এমন এক অদ্ভুত শীতের মুখোমুখি হচ্ছি, যেখানে দুপুর আর মাঝরাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসছে এবং মানুষের শরীর খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
২০২৬ সালের শীত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা আসলে একই শহরে বাস করি না। একই মেঘের নিচে আমাদের দুই ভিন্ন পৃথিবী। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য শীত কেবল কিছুটা অস্বস্তি, যা গরম কাপড়, ইলেকট্রিক হিটার কিংবা আধুনিক স্থাপত্যের ঘেরাটোপে সামাল দেয়া যায়। কিন্তু আমাদের শহরের বিশাল এক জনগোষ্ঠী, যারা বস্তিতে বা ফুটপাতে জীবন কাটায়, তাদের কাছে এই শীত এক অস্তিত্বের লড়াই।
ঢাকার তেজগাঁও বা হাজারীবাগের বস্তিগুলোতে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায়, টিন আর বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বরফ-শীতল বাতাস বিঁধে যাচ্ছে মানুষের হাড়ের ভেতর। সেখানে গরম জল এক বিলাসিতা, ভালো একটি কম্বল এক স্বপ্ন। রাস্তার পাশের খোলা ড্রেনের পাশেই পলিথিন মুড়িয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলো আমাদের উন্নয়নের মহাসড়কের এক করুণ উপহাস। যখন সরকার ও নীতিনির্ধারকরা ২০২৬ সালের ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনছেন, তখন এক টুকরো শুকনো খড় জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতা খোঁজা মানুষের সংখ্যা এই শহরে কম নয়। এই বৈষম্য কেবল আর্থিক নয়, এটি জীবনের অধিকারের বৈষম্য।
শৈত্যপ্রবাহ কেবল আমাদের শরীরে কাঁপুনি দেয় না, এটি আমাদের অর্থনীতির চাকাও জমিয়ে দেয়। ঢাকার অর্থনীতি মূলত সচল থাকে রিকশাচালক, দিনমজুর, ভ্যানচালক এবং ক্ষুদ্র হকারদের পেশিশক্তিতে। ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এই অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একজন রিকশাচালক, যিনি আগে দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করতেন, তীব্র শীতে তিনি ৪ ঘণ্টার বেশি রাস্তায় থাকতে পারছেন না। যাত্রীসংখ্যাও কমেছে, কারণ প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে চাচ্ছেন না।
নির্মাণশিল্পের শ্রমিকরা ভোরে কাজে যেতে পারছেন না ঠান্ডার কারণে। ফলে তাদের দৈনিক মজুরি কমছে, আর জাতীয় উৎপাদনশীলতায় পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। ২০২৬ সালের শীতকালীন এই অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ শত শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র?্যাজেডি হলো, এই শ্রমজীবীদের কোনো বীমা নেই, কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। কয়েক দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহ মানেই তাদের সংসারে খাবারের টান পড়া। উন্নয়ন যদি এই মানুষদেরকে সুরক্ষার ছাতা দিতে না পারে, তবে সেই উন্নয়নের সার্থকতা কোথায়?
তীব্র শীত আর ঢাকার বায়ুদূষণের মেলবন্ধন জনস্বাস্থ্যে এক মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে। ২০২৬ সালের শীতকালীন হাসপাতালগুলোর চিত্র দেখলে শিউরে উঠতে হয়। নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস এবং অ্যাজমার প্রকোপে শিশু ও বয়স্কদের শয্যা সংকট চরমে। বিশেষ করে যারা ধুলোবালির কাজ করেন এবং খোলা জায়গায় থাকেন, তাদের ফুসফুস আজ অকেজো হয়ে পড়ছে। অপুষ্টিতে ভোগা দরিদ্র শিশুরা ঠান্ডার কামড়ে প্রাণ হারাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমে যথাযথভাবে উঠে আসে না।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর শীতের প্রভাবও আজ আর উপেক্ষণীয় নয়। দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো না পাওয়া এবং কর্মহীনতা মানুষের মধ্যে বিষন্নতা ও একাকিত্ব বাড়াচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। আমরা অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে ছুটি, কিন্তু শীতজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধে যে পুষ্টি এবং নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজন, সেদিকে নজর নেই বললেই চলে।
শৈত্যপ্রবাহ এলে আমাদের চিরাচরিত ‘কম্বল বিতরণ’ উৎসব শুরু হয়। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান সবাই ফটোসেশনের মাধ্যমে কম্বল বিলিয়ে দায় সারে। কিন্তু এটি কি কোনো স্থায়ী সমাধান? ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে টেকসই অভিযোজন নিয়ে। আমরা কেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বলতে কেবল বন্যা আর ঘূর্ণিঝড় বুঝি? শৈত্যপ্রবাহকে কেন এখনও ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে না?
আমাদের প্রয়োজন এমন নগর পরিকল্পনা, যেখানে বস্তিবাসীদের জন্য তাপ-সহনশীল সাশ্রয়ী আবাসন থাকবে। শীতকালীন ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য ক্যাম্প এবং শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে গরম জলের ব্যবস্থা ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু তহবিল বা ‘ক্লাইমেট ফান্ড’-এর অর্থ কেবল বাঁধ নির্মাণে নয়, শীতকালীন দুর্যোগ মোকাবিলাতেও বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। আমাদের কৃষি পরিকল্পনায় শীতকালীন ফসল রক্ষা এবং গবাদি পশুর সুরক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে এক উদীয়মান শক্তি। কিন্তু উন্নয়নের উজ্জ্বল আলোর নিচে শৈত্যপ্রবাহে থরথর করে কাঁপা মানুষের দীর্ঘশ্বাস আমাদের সাফল্যের ওপর কালো ছায়া ফেলে। ২০২৬ সালের শীত আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের গল্প নয়, এটি বর্তমানের কঠিন সত্য এবং এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেইসব মানুষ, যারা কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে কম ভূমিকা রেখেছে।
প্রকৃতি এখন আর শহরকে ছাড় দিচ্ছে না। ইট-পাথরের জঙ্গলও আর নিরাপদ নয়। যদি আমরা আমাদের নীতি-নির্ধারণে শীতকে গুরুত্ব না দিই, যদি আমরা বৈষম্যের এই দেয়াল ভাঙতে না পারি, তবে প্রতি বছর শীত আসবে আরও করাল রূপ নিয়ে। প্রতিটি হিমশীতল মৃত্যু আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার সাক্ষ্য দেবে। আমরা কি কেবল ফটোসেশনের জন্য কম্বল হাতে দাঁড়িয়ে থাকব, নাকি একটি মানবিক ও সুরক্ষিত আগামীর ভিত গড়ব? সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। কারণ, প্রকৃতির এই নতুন বিষদাঁত আগামীতে আরও তীক্ষè হবে।
শীত কাটলে আমরা যেন ভুলে না যাই যে, পরের বছর আবার একটি হাড়কাঁপানো অন্ধকার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। উন্নয়ন হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক, সুরক্ষা হোক সবার জন্য। তবেই বাংলাদেশ ২০২৬ সালের এই রূপান্তরের সন্ধিক্ষণকে সফলভাবে পার করতে পারবে।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]