আশাফা সেলিম

মোনাজাতউদ্দিন
তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবাদে আমরা পেয়েছি গণমাধ্যমের অনলাইন ভার্সন, অনলাইন নিউজপোর্টাল, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদি। এসব মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক সংবাদ, অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট বা তথ্যে নানা ধরনের মিথ্যাচার চোখে পড়ে। আজকাল কত সহজেই জীবন্ত মানুষের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া হয়! এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে একজনের মাথা আরেকজনের দেহে বসিয়ে, বানোয়াট সংবাদ প্রচার করা হয়। এসব সংবাদ প্রচারকারীরা একটি সংবাদ বা খবরের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও বোধ করে না। আর এসব বানোয়াট নিউজ দেখলেই চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের কথা মনে পড়ে; যিনি একটি সংবাদের পেছনের সংবাদ সংগ্রহ করতে এবং বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে কি-ই না করেছেন! একবার তো রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিজেই রোগী সেজে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যম আজও তাদের বস্তুনিষ্ঠতা তথা তাদের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটা সযত্নে ধরে রেখেছেন। বাকিরা এসব মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বা তথ্যদাতারা খুব সহজেই তৈরি করে ফেলেন যেকোনো সংবাদ। কখনও কখনও শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোর লোগো ব্যবহার করেও বানোয়াট সব ডিজিটাল কনটেন্ট বাজারে ছেড়ে দেন! আর এসব মিথ্যে সংবাদের এমন সব আকর্ষণীয়, নজরকাড়া শিরোনাম করেন যে, চোখে পড়লে পাঠকের আর না পড়ে উপায় থাকে না। এজন্যে অবশ্য তাদের জবাবদিহির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তাদের সাংবাদিকতার নিয়ম-কানুন-নীতিমালা কিছুই জানতে বা মানতে হয় না। একটা অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন থাকলেই হলো। যে কেউই তথ্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই, কিংবা একদমই যেকোনো কনটেন্ট তৈরি করে আপলোড করে দেন। সেই কনটেন্টের বস্তুনিষ্ঠতা, প্রকাশের পরে এর ফলশ্রুতি কোনো কিছুরই ধার ধারেন না তারা। সত্য-মিথ্যা, শ্লীল-অশ্লীল যাই হোক কিছু একটা আপলোড করতে পারলেই হলো। ব্যস, শুরু হয়ে গেল ভিউ সংখ্যার কাউন্টডাউন! এই প্রবণতাই ধীরে ধীরে একসময় তাদের ‘ভাইরাল’ হতে মরিয়া করে তোলে।
মোনাজাত ভাইয়ের আমলে এমন ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না। সেসময় তথ্য সংগ্রহ, নিউজ তৈরি এবং সেই নিউজ সারাদেশ থেকে ঢাকায় পাঠানোটা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। অথচ সেই কষ্টকে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন নিজ যোগ্যতায়। ফলে, রংপুর থেকে কাজ করে তিনি দৈনিক সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গোটা উত্তরাঞ্চলজুড়ে সমগ্র সংবাদপত্র মিলে এই পদে মাত্র একজন মানুষই ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন।
চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। মোনাজাতউদ্দিনকে নিয়ে, তার কাজ এবং তার গ্রন্থগুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। বিশেষ করে এই প্রজন্মের গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যে। সামাজিক মাধ্যম কিংবা অনলাইন নিউজপোর্টাল, ইউটিউব ইত্যাদির কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যেও মোনাজাতউদ্দিনের কাজ, কাজের ধরন, এক্সক্লুসিভ সংবাদের বিষয়বস্তু নির্বাচন, সংবাদ আবিষ্কার বা সংগ্রহে তার নিজস্ব কৌশল ইত্যাদি খুবই দরকারি। অর্থাৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতার যুগে এসেও মোনাজাতউদ্দিন সমভাবেই প্রাসঙ্গিক। সঙ্গত কারণে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মোনাজাতউদ্দিনকে পরিচিত করানো ততোধিক প্রাসঙ্গিক।
মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন একজন সৃজনশীল মানুষ। শুধু সাংবাদিকতায়ই নয়, বরং তার সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় শিল্পসাহিত্যের নানা শাখায় তার পদচারণা থেকে। যেমন মোনাজাতউদ্দিনের হাতের লেখা ছিল খুবই শৈল্পিক সুন্দর। রংপুর শহরের অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের লেখা এবং ডিজাইন তার করা। আজও তার সেসব ডিজাইন প্রতিষ্ঠানগুলোর শোভাবর্ধন করে আছে। নাটক, ছোটগল্প, ছড়া রচনায়ও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই তার সৃজনশীলতার সর্বাধিক স্বাক্ষর মেলে। সংবাদ তিনি শুধু লিখতেনই না, সৃজন করতেন, আবিষ্কার করতেন।
এ প্রসঙ্গে ‘বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৯২’-এ মোনাজাতউদ্দিনের একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যায়। আর্জেন্টিনা সেই বছর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, সারাদেশ, সারাবিশ্বের গণমাধ্যমগুলো তখন বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা ম্যারাডোনাকে নিয়ে মাতোয়ারা। সেসময় মোনাজাতউদ্দিনও বিশ্বকাপ এবং ম্যারাডোনাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিলেন। তার সেই প্রতিবেদনটি ছিল গাইবান্ধার বামনডাঙার একজন কৃষাণীর সাক্ষাৎকারসহ। সাক্ষাৎকারে কিষাণী মোনাজাত ভাইকে বলেছিলেন, তিনি ম্যারাডোনাকে চেনেন না এমনকি তার নামটিও শোনেননি! সেই প্রতিবেদনটি ছাপা হয় দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায়। শিরোনাম ছিল ‘ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৯২’। বোস্টন থেকে বামনডাঙা; রহিমা বেগম জানেন না ম্যারাডোনা কে’। নারী শিক্ষার অগ্রদূত মহিয়সী বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরীদের হাল আমলের অবস্থান তিনিই প্রথম গণমাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে তার ‘পায়রাবন্দের শিকড় সংবাদ’ গ্রন্থে।
গণমানুষই ছিলেন মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিকতার প্রধান লক্ষ্য। তাই শত সংবাদকে পাশ কাটিয়ে মোনাজাতউদ্দিনের সংবাদই হয়ে উঠতো গণমানুষের সংবাদ। যেমন কোনো এক ঈদের দিন দেশের মানুষ যখন পোলাও, কোর্মা, সেমাই ইত্যাদি খাবার নিয়ে ব্যস্ত, সেসময় মোনাজাতউদ্দিন ছুটে গেছেন গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারীতে। এক্সক্লুসিভ নিউজের সন্ধানে। সেখানে গিয়ে দেখেন, এক দরিদ্র পরিবারে খাবারের জন্য কচু সিদ্ধ করার প্রস্তুতি চলছিল। কারণ, তাদের ঘরে খাবার চাল নেই। মোনাজাতউদ্দিন ছবিসহ এই সংবাদটি পত্রিকায় পাঠান। আজকালকার সামাজিক মাধ্যম বা অনলাইন মিডিয়ার সুযোগ তখন ছিল না। তাই, ঈদের ছুটির পর, প্রথমদিন প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম পাতায় মোনাজাতউদ্দিনের এই এক্সক্লুসিভ সংবাদ/প্রতিবেদনটি ছাপা হয়।
রংপুরে জন্ম নেয়া, একুশে পদকপ্রাপ্ত, ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সেসময় দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হচ্ছিল ট্যাংকলরীর তেল চুরির ঘটনা নিয়ে মোনাজাতউদ্দিনের লেখা দুঃসাহসিক সিরিজ প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়িঘাট এলাকায়, যমুনা নদীর কালাসোনা চরে ফেরির ছাদ থেকে নদীতে পড়ে তার মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, ওই তেল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল এক শক্তিশালী মাফিয়া চক্র।
[লেখক: ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আশাফা সেলিম

মোনাজাতউদ্দিন
সোমবার, ০৫ জানুয়ারী ২০২৬
তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবাদে আমরা পেয়েছি গণমাধ্যমের অনলাইন ভার্সন, অনলাইন নিউজপোর্টাল, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদি। এসব মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক সংবাদ, অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট বা তথ্যে নানা ধরনের মিথ্যাচার চোখে পড়ে। আজকাল কত সহজেই জীবন্ত মানুষের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া হয়! এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে একজনের মাথা আরেকজনের দেহে বসিয়ে, বানোয়াট সংবাদ প্রচার করা হয়। এসব সংবাদ প্রচারকারীরা একটি সংবাদ বা খবরের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও বোধ করে না। আর এসব বানোয়াট নিউজ দেখলেই চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের কথা মনে পড়ে; যিনি একটি সংবাদের পেছনের সংবাদ সংগ্রহ করতে এবং বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে কি-ই না করেছেন! একবার তো রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিজেই রোগী সেজে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যম আজও তাদের বস্তুনিষ্ঠতা তথা তাদের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটা সযত্নে ধরে রেখেছেন। বাকিরা এসব মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বা তথ্যদাতারা খুব সহজেই তৈরি করে ফেলেন যেকোনো সংবাদ। কখনও কখনও শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোর লোগো ব্যবহার করেও বানোয়াট সব ডিজিটাল কনটেন্ট বাজারে ছেড়ে দেন! আর এসব মিথ্যে সংবাদের এমন সব আকর্ষণীয়, নজরকাড়া শিরোনাম করেন যে, চোখে পড়লে পাঠকের আর না পড়ে উপায় থাকে না। এজন্যে অবশ্য তাদের জবাবদিহির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তাদের সাংবাদিকতার নিয়ম-কানুন-নীতিমালা কিছুই জানতে বা মানতে হয় না। একটা অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন থাকলেই হলো। যে কেউই তথ্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই, কিংবা একদমই যেকোনো কনটেন্ট তৈরি করে আপলোড করে দেন। সেই কনটেন্টের বস্তুনিষ্ঠতা, প্রকাশের পরে এর ফলশ্রুতি কোনো কিছুরই ধার ধারেন না তারা। সত্য-মিথ্যা, শ্লীল-অশ্লীল যাই হোক কিছু একটা আপলোড করতে পারলেই হলো। ব্যস, শুরু হয়ে গেল ভিউ সংখ্যার কাউন্টডাউন! এই প্রবণতাই ধীরে ধীরে একসময় তাদের ‘ভাইরাল’ হতে মরিয়া করে তোলে।
মোনাজাত ভাইয়ের আমলে এমন ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না। সেসময় তথ্য সংগ্রহ, নিউজ তৈরি এবং সেই নিউজ সারাদেশ থেকে ঢাকায় পাঠানোটা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। অথচ সেই কষ্টকে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন নিজ যোগ্যতায়। ফলে, রংপুর থেকে কাজ করে তিনি দৈনিক সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গোটা উত্তরাঞ্চলজুড়ে সমগ্র সংবাদপত্র মিলে এই পদে মাত্র একজন মানুষই ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন।
চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। মোনাজাতউদ্দিনকে নিয়ে, তার কাজ এবং তার গ্রন্থগুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। বিশেষ করে এই প্রজন্মের গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যে। সামাজিক মাধ্যম কিংবা অনলাইন নিউজপোর্টাল, ইউটিউব ইত্যাদির কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যেও মোনাজাতউদ্দিনের কাজ, কাজের ধরন, এক্সক্লুসিভ সংবাদের বিষয়বস্তু নির্বাচন, সংবাদ আবিষ্কার বা সংগ্রহে তার নিজস্ব কৌশল ইত্যাদি খুবই দরকারি। অর্থাৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতার যুগে এসেও মোনাজাতউদ্দিন সমভাবেই প্রাসঙ্গিক। সঙ্গত কারণে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মোনাজাতউদ্দিনকে পরিচিত করানো ততোধিক প্রাসঙ্গিক।
মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন একজন সৃজনশীল মানুষ। শুধু সাংবাদিকতায়ই নয়, বরং তার সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় শিল্পসাহিত্যের নানা শাখায় তার পদচারণা থেকে। যেমন মোনাজাতউদ্দিনের হাতের লেখা ছিল খুবই শৈল্পিক সুন্দর। রংপুর শহরের অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের লেখা এবং ডিজাইন তার করা। আজও তার সেসব ডিজাইন প্রতিষ্ঠানগুলোর শোভাবর্ধন করে আছে। নাটক, ছোটগল্প, ছড়া রচনায়ও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই তার সৃজনশীলতার সর্বাধিক স্বাক্ষর মেলে। সংবাদ তিনি শুধু লিখতেনই না, সৃজন করতেন, আবিষ্কার করতেন।
এ প্রসঙ্গে ‘বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৯২’-এ মোনাজাতউদ্দিনের একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যায়। আর্জেন্টিনা সেই বছর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর, সারাদেশ, সারাবিশ্বের গণমাধ্যমগুলো তখন বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা ম্যারাডোনাকে নিয়ে মাতোয়ারা। সেসময় মোনাজাতউদ্দিনও বিশ্বকাপ এবং ম্যারাডোনাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিলেন। তার সেই প্রতিবেদনটি ছিল গাইবান্ধার বামনডাঙার একজন কৃষাণীর সাক্ষাৎকারসহ। সাক্ষাৎকারে কিষাণী মোনাজাত ভাইকে বলেছিলেন, তিনি ম্যারাডোনাকে চেনেন না এমনকি তার নামটিও শোনেননি! সেই প্রতিবেদনটি ছাপা হয় দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায়। শিরোনাম ছিল ‘ফুটবল বিশ্বকাপ ১৯৯২’। বোস্টন থেকে বামনডাঙা; রহিমা বেগম জানেন না ম্যারাডোনা কে’। নারী শিক্ষার অগ্রদূত মহিয়সী বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরীদের হাল আমলের অবস্থান তিনিই প্রথম গণমাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে তার ‘পায়রাবন্দের শিকড় সংবাদ’ গ্রন্থে।
গণমানুষই ছিলেন মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিকতার প্রধান লক্ষ্য। তাই শত সংবাদকে পাশ কাটিয়ে মোনাজাতউদ্দিনের সংবাদই হয়ে উঠতো গণমানুষের সংবাদ। যেমন কোনো এক ঈদের দিন দেশের মানুষ যখন পোলাও, কোর্মা, সেমাই ইত্যাদি খাবার নিয়ে ব্যস্ত, সেসময় মোনাজাতউদ্দিন ছুটে গেছেন গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারীতে। এক্সক্লুসিভ নিউজের সন্ধানে। সেখানে গিয়ে দেখেন, এক দরিদ্র পরিবারে খাবারের জন্য কচু সিদ্ধ করার প্রস্তুতি চলছিল। কারণ, তাদের ঘরে খাবার চাল নেই। মোনাজাতউদ্দিন ছবিসহ এই সংবাদটি পত্রিকায় পাঠান। আজকালকার সামাজিক মাধ্যম বা অনলাইন মিডিয়ার সুযোগ তখন ছিল না। তাই, ঈদের ছুটির পর, প্রথমদিন প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম পাতায় মোনাজাতউদ্দিনের এই এক্সক্লুসিভ সংবাদ/প্রতিবেদনটি ছাপা হয়।
রংপুরে জন্ম নেয়া, একুশে পদকপ্রাপ্ত, ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সেসময় দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হচ্ছিল ট্যাংকলরীর তেল চুরির ঘটনা নিয়ে মোনাজাতউদ্দিনের লেখা দুঃসাহসিক সিরিজ প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়িঘাট এলাকায়, যমুনা নদীর কালাসোনা চরে ফেরির ছাদ থেকে নদীতে পড়ে তার মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, ওই তেল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল এক শক্তিশালী মাফিয়া চক্র।
[লেখক: ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী]