alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

আনোয়ারুল হক

: বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬
image

‘পরাজিত হওয়া নাহি মানায়’, এমন কিছু তরুণ-তরুণীর প্রতারিত হয়ে পড়ার মুখচ্ছবি বারবার চোখে ভাসছে। চোখে ভাসছে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির মুখ সামান্থা শারমিন, তাজনূভা জাবীন, নূসরাত তাবাসুম, তাসনিম জারা, মনিরা শারমিন, নাহিদা সারোয়ার নিভা প্রমুখ তরুণীদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনার্ত মুখচ্ছবি। মনে পড়ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ উমামা ফাতেমার প্রায় ছমাস আগেই প্রতারিত হওয়ার কথা। তবে এই তরুণীদের মতো অনেক তরুণও নতুন দলে আছেন যারা একযোগে বাংলাদেশের জন্মবিরোধী, স্বাধীনতা-বিরোধী জামায়াত ইসলামের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন। দলের মুখ্য সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীনসহ ৩০ জন নেতা সেই চিঠিতে বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে।’ একের পর এক পদত্যাগ করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। স্পষ্টতই ভাঙনের মুখে দলটি। ইতোমধ্যে এনসিপি থেকে ১৬ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন এবং প্রতিদিনই সে সংখ্যা বাড়ছে। অনেকে নিজেদের আপাতত নিস্ক্রিয় ঘোষণা করেছেন।

যে তারুণ্য একটি উদার ও বৈষম্যহীন সমাজ চেয়েছিল, তাদের কাছে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে এনসিপির সখ্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে।তাদের কাছে দলটি এখন আর ‘নতুন রাজনীতির’ স্বপ্নের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত একটি গোষ্ঠী মাত্র। এনসিপির এ সিদ্ধান্ত দলটির ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেই প্রশ্ন রাজনীতির কারবারিদের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে এনসিপির নেতাকর্মীদের মাঝেও

নিশ্চয়ই স্মরণে আসছে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক মুখ এবং সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সেই সব বয়ান যে, তারা ‘মধ্যপন্থা অনুসরণ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে শামিল হবেন’। খেলাফত প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার মধ্যে মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন ছিল, সেটা নিছক কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল না। রাষ্ট্র যদি ইসলামকে জায়গা করে দিতে চায় তাহলে ইসলামই সীমিত ও নিপীড়নের অনুষঙ্গ হয়ে উঠবে। ইসলামী উম্মাহ বিশ্বজনীন ধারণা হিসেবে থাকবে, কিন্তু জাতি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেটা খাটে না। বিদ্যমান রাষ্ট্রের কাঠামোয় ইসলাম বা শরীয়াহ বাস্তবায়ন অসম্ভব।’ মাহফুজ আলম আরো বলেছিলেন ‘যে মাদ্রাসায় পড়েছি, সেখানে জামায়াত নেতাদের ভ্রান্ত আকিদার অনুসারী হিসেবে গণ্য করা হতো। আর জামায়াত নেতাদের ফাঁসিকে দেখা হতো তাদের আলেম ও সহিহ ইসলাম বিরোধিতার ফসল হিসেবে। জামায়াতকে আমরা ছোটবেলা থেকে আলেম-ওলামাবিরোধী হিসেবেই জেনে এসেছি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘জামায়াত যুদ্ধাপরাধের সহযোগী শক্তি ছিল।’ জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির ঐক্যের পর এখন তিনি বলতে বাধ্য হলেন ‘এই এনসিপির সঙ্গে আমি নাই’।

কিন্তু বিগত দেড় বছরের অধিককাল যাবত এনসিপি নেতৃত্বের বড় অংশই ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ভোগ করে, অর্থবিত্ত ও আয়েশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে এবং ‘যখন যা খুশি এ মন চায়’ আচরণ করে আগামী দিনেও কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব অথবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চান-তা তাদের ঘোষিত ‘মধ্যমপন্থা’ রাজনীতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বা বিরোধাত্মক হলেও, ক্ষমতার দৌড়ে টিকে থাকার এক অভিনব কৌশল হিসেবে এনসিপি জামায়াতের পকেটস্থ হলো।

যে তারুণ্য একটি উদার ও বৈষম্যহীন সমাজ চেয়েছিল, তাদের কাছে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে এনসিপির সখ্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে।তাদের কাছে দলটি এখন আর ‘নতুন রাজনীতির’ স্বপ্নের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত একটি গোষ্ঠী মাত্র। এনসিপির এ সিদ্ধান্ত দলটির ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেই প্রশ্ন রাজনীতির কারবারিদের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে এনসিপির নেতাকর্মীদের মাঝেও। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন দল থেকে এখনো পদত্যাগ না করলেও মন্তব্য করেছেন যে, ‘জামায়াতে ইসলামীর প্রেস কনফারেন্স থেকে জানতে পারলাম এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের আত্মপ্রকাশের দিন জোটের মুখপাত্র ও এনসিপির আহ্বায়কের বক্তব্য অনুযায়ী তা হওয়ার কথা নয়।’ সামান্থা বলেন, ‘তৃতীয় শক্তি তৈরির উদ্যোগকে ব্যাহত করে এমন অবস্থান জাতীয় নাগরিক পার্টির মূলধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির কিছু মানুষ কিছু আসনের বিনিময়ে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ বিকেল ৫.৩০-এ দলের মূল আকাক্সক্ষা থেকে বিচ্যুত হলো।’

দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক নূসরাত তাবাসুম লিখেছেন, ‘...জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমি মনে করি এনসিপির সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই এনসিপির মূল বক্তব্য থেকে চ্যুত হয়েছেন।’ কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন লিখেছেন, ‘যেখানে এনসিপিকে বলাই হয় জামায়াতের আরেকটা দোকান, তাহলে কেন এনসিপি আগে নিজের স্বকীয়তা, নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জামায়াতকে বেছে নিতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছে? তিনজন মন্ত্রী ছিল না ক্ষমতায়? পারে নাই তো!’ তাজনূভা আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব, এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে। এমন সময়ে এমনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যাতে এ সিদ্ধান্তের বিরোধীদের ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিকল্প পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ না থাকে। এবং এভাবে জুলাইকে কৌশলে জামাতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’

শুধু এনসিপির নেতাকর্মীরা নয়, জুলাইয়ের তারুণ্য এই প্রতারণা ভুলতে পারবে না। এনসিপি তো জুলাইয়ের তারুণ্যকে ফাঁকি দিয়ে ইসলামিক ধর্মীয় দলসমূহের সঙ্গে জোট করল। কিন্তু ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে? ইসলাম বলে, ‘মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ভঙ্গ করার মতো বড় পাপ এই পৃথিবীতে আর নাই। পাপের একভাগ পৃথিবীতেই ভোগ করে যেতে হবে’। কাউকে ঠকিয়ে কেউ মাফ পায় না; পায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে ‘প্রতারণাকারীরা যেন না মনে করে যে, তারা সফল হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা সফল হবে না’। এ মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও একটি উক্তি মনে পড়ছে, ‘মিথ্যাকে আশ্রয় করে যে মানুষ বাঁচিতে চায়, সে আপনাকেও ঠকায়, সকলকে ঠকায়।’

নতুন দলটি বিকাশ লাভ করার আগেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতের অধীনস্থ হয়ে পড়ায় নতুন দলের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে প্রভাবশালী দল হিসেবে জামাত স্বাভাবিকভাবে গ্রাস করতে চাইবে। যেহেতু এনসিপি দলের নেতৃত্বের মাঝেই প্রভাবশালী দলটির উগ্র সমর্থকরা পূর্ব থেকেই রয়েছেন সে জন্য এটা আরো সহজ হবে। এনসিপির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ ধারণাটি অকার্যকর মুখভরা বুলিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় না-ও লাগতে পারে। এভাবেই একটি স্বতন্ত্র দলীয় আদর্শিক কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা আঁতুড়ঘরেই মারা গেল। দলটি স্বাতন্ত্র নিয়ে টিকে থাকলে মোটাদাগে নির্বাচনে হারলেও অসংখ্য নেতাকর্মী তৈরি হতো ভবিষ্যতের জন্য। নাহিদ, সার্জিসরা বলার চেষ্টা করছেন, এটা শুধুই নির্বাচনী জোট। নির্বাচনের পরে নতুন সমীকরণ দাঁড়াতে পারে। তা দাঁড়াতে পারে এবং পদত্যাগকারীদের সঙ্গেও সমঝোতার ও দলে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা দল এবং নানা মহলের পক্ষ থেকে আছে। কিন্তু দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধী ধর্মাশ্রয়ী দলটির সঙ্গে তাদের নির্বাচনী বন্ধন স্বতন্ত্র আদর্শের মধ্যপন্থী দল হিসেবে বিকাশের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে দিল।

শুধু তরুণরাই কেনো, জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোতে এমন কোনো শ্রেণীপেশার মানুষ কি আছে যারা আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়নি? যে এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, হাজারে হাজারে আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তাতে ছাত্র, শ্রমিক, পথচারী, নারী, শিশু কোন শ্রেণীর মানুষের প্রতিনিধিত্ব নেই? সমন্বয়করা ছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাম প্রগতিশীল সংগঠনের বা চিন্তাধারার ছাত্র কর্মীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভ্যুত্থান সফল হতো না যদি না নারী সমাজ বিশেষত ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে না আসতেন। সমান তালে লড়লেও আজ কিন্তু তাদের আড়াল করে ফেলা হয়েছে। সেই লড়াকু নারী সমাজ, নানা শ্রেণীপেশার মানুষ এনসিপির সিদ্ধান্তে হতবাক। নারী নেতৃত্ব বিরোধী জামায়াত এমন একটি দল, যে দল কৃষ্ণ নন্দীর নেতৃত্ব মানলেও নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে নারাজ। জামায়াত থেকে একজন নারীও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পায়নি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় এবং পরে দেয়ালে দেয়ালে যে গ্রাফিতি আঁকা হয়, সেখানে বৈষম্যহীন এক গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন আঁকে আমাদের নতুন প্রজন্ম। এ স্বপ্ন দেখতে তো ভুল ছিল না। তবে এক সুদীর্ঘ কতৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের ফলাফল হিসেবে উগ্রবাদী দক্ষিণপন্থী শক্তি দেশী বিদেশি নানা শক্তির মদতে এ আন্দোলনের নেতৃত্বে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। মাথায় লাল-সবুজের পট্টি বেঁধে মানুষের মুখোশ পরে ছদ্মবেশে যে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা জুলাই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তারা আজ মুখোশ উন্মোচন করে হামলে পড়েছে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নারী স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী চিন্তাধারার ওপর। সুন্দরের ভেতর লুকিয়ে থাকা অসুন্দর প্রকাশ হয়ে পড়ছে তরুণদের স্বপ্নকে নাকচ করে দিয়ে। তবে এসব ঘটনাবলি জুলাইয়ের মাহাত্ম্যকে কমায় না, মানুষের আত্মদানকেও খাটো করে না। আন্দোলনের ন্যায্যতাকেও নাকচ করেনা। আবার অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মী যারা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে থাকলেও, নির্বিচার হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও, আন্দোলন বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান দেখে এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তীতে ওই সব শক্তির প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের সমর্থন দেখে থমকে গিয়েছিলেন। অতি সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের অবস্থানকেও এক কথায় নাকচ করার সুযোগ নেই। যদিও জনমানুষের সম্পৃক্ত ন্যায়সঙ্গত দাবির ন্যায্যতাকে স্বীকৃতি দিয়েই আন্দোলনের নেতিবাচক প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। দেশের মানুষের মাঝে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচার উচ্ছেদের এক অন্তর্নিহিত শক্তি পুঞ্জীভূত ছিল। ছাত্ররা যখন সুয়োগ করে দিয়েছিল নিজের বোধ থেকেই মানুষ নেমে পড়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে, মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে। অন্যদিকে ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে দেশি-বিদেশি নানা শক্তি বিশেষত, বিশ্ব মোড়লরা তাদের ‘স্টেক’ নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের অস্থির সময়ে নানা ভূমিকা গ্রহণ করেছে এবং করছে।

দেশ যখন এমন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন বছরের শুরুতেই বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার যুদ্ধ উন্মাদ বড় মোড়ল নিজেকে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নয়, সারা দুনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করতে চাইছেন। তার হুকুমেই দুনিয়ার সব দেশকে চলতে হবে- এমন ঘোষণা দিচ্ছেন, আর তা না হলে তিনি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক অপহরণ করতে পারবেন। অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রবাদ ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। আমাদের চেনা-জানা দুনিয়া পাল্টে গেছে। এ ধরনের জাতীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশের তাবৎ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি এবং মধ্যমপন্থী ও উদার গণতন্ত্রীদের এক ব্যাপকতর সমঝোতায় শামিল হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তা নাহলে আরও সংঘাত, আরও ভাঙন, আরও বিপর্যয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেক প্রতিভাবান তরুণ-তরুণী সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন। জুলাইয়ের তরুণরা বুঝতে পারছেন, যে নেতৃত্ব একবার প্রতারণা করেছে, তারা আবারও করবে। তারা মনে করছেন যে, জীবন মাঝেমাঝে ঠকিয়ে শেখায়, যাতে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠা যায়। সে প্রচেষ্টা তারা শুরু করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতির কুশীলবদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা দুনিয়া এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছে। তবে মনে রাখা দরকার, আজ যা চলছে, সেটাই শেষ কথা নয়। শত শত বছরের ইতিহাস পরিক্রমায় একটি মুহূর্ত মাত্র। আমরা প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারো দানে পাওয়া নয় দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে।

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

বিনা-ভাড়ার ট্রেনযাত্রা

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এশিয়া

ছবি

নামে ইসলামী, কাজে আবু জাহেল!

জলবায়ু পরিবর্তন: স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি

অস্থির পেঁয়াজের বাজার: আমদানি কি সত্যিই সমাধান?

মূল্যবৃদ্ধির ঘেরাটোপ: সংকটাক্রান্ত পরিবার ও সামাজিক রূপান্তর

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

আনোয়ারুল হক

image

বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

‘পরাজিত হওয়া নাহি মানায়’, এমন কিছু তরুণ-তরুণীর প্রতারিত হয়ে পড়ার মুখচ্ছবি বারবার চোখে ভাসছে। চোখে ভাসছে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির মুখ সামান্থা শারমিন, তাজনূভা জাবীন, নূসরাত তাবাসুম, তাসনিম জারা, মনিরা শারমিন, নাহিদা সারোয়ার নিভা প্রমুখ তরুণীদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনার্ত মুখচ্ছবি। মনে পড়ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ উমামা ফাতেমার প্রায় ছমাস আগেই প্রতারিত হওয়ার কথা। তবে এই তরুণীদের মতো অনেক তরুণও নতুন দলে আছেন যারা একযোগে বাংলাদেশের জন্মবিরোধী, স্বাধীনতা-বিরোধী জামায়াত ইসলামের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছেন। দলের মুখ্য সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীনসহ ৩০ জন নেতা সেই চিঠিতে বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে।’ একের পর এক পদত্যাগ করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। স্পষ্টতই ভাঙনের মুখে দলটি। ইতোমধ্যে এনসিপি থেকে ১৬ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন এবং প্রতিদিনই সে সংখ্যা বাড়ছে। অনেকে নিজেদের আপাতত নিস্ক্রিয় ঘোষণা করেছেন।

যে তারুণ্য একটি উদার ও বৈষম্যহীন সমাজ চেয়েছিল, তাদের কাছে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে এনসিপির সখ্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে।তাদের কাছে দলটি এখন আর ‘নতুন রাজনীতির’ স্বপ্নের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত একটি গোষ্ঠী মাত্র। এনসিপির এ সিদ্ধান্ত দলটির ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেই প্রশ্ন রাজনীতির কারবারিদের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে এনসিপির নেতাকর্মীদের মাঝেও

নিশ্চয়ই স্মরণে আসছে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক মুখ এবং সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সেই সব বয়ান যে, তারা ‘মধ্যপন্থা অনুসরণ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে শামিল হবেন’। খেলাফত প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার মধ্যে মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন ছিল, সেটা নিছক কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ছিল না। রাষ্ট্র যদি ইসলামকে জায়গা করে দিতে চায় তাহলে ইসলামই সীমিত ও নিপীড়নের অনুষঙ্গ হয়ে উঠবে। ইসলামী উম্মাহ বিশ্বজনীন ধারণা হিসেবে থাকবে, কিন্তু জাতি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেটা খাটে না। বিদ্যমান রাষ্ট্রের কাঠামোয় ইসলাম বা শরীয়াহ বাস্তবায়ন অসম্ভব।’ মাহফুজ আলম আরো বলেছিলেন ‘যে মাদ্রাসায় পড়েছি, সেখানে জামায়াত নেতাদের ভ্রান্ত আকিদার অনুসারী হিসেবে গণ্য করা হতো। আর জামায়াত নেতাদের ফাঁসিকে দেখা হতো তাদের আলেম ও সহিহ ইসলাম বিরোধিতার ফসল হিসেবে। জামায়াতকে আমরা ছোটবেলা থেকে আলেম-ওলামাবিরোধী হিসেবেই জেনে এসেছি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘জামায়াত যুদ্ধাপরাধের সহযোগী শক্তি ছিল।’ জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির ঐক্যের পর এখন তিনি বলতে বাধ্য হলেন ‘এই এনসিপির সঙ্গে আমি নাই’।

কিন্তু বিগত দেড় বছরের অধিককাল যাবত এনসিপি নেতৃত্বের বড় অংশই ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ভোগ করে, অর্থবিত্ত ও আয়েশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে এবং ‘যখন যা খুশি এ মন চায়’ আচরণ করে আগামী দিনেও কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব অথবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চান-তা তাদের ঘোষিত ‘মধ্যমপন্থা’ রাজনীতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বা বিরোধাত্মক হলেও, ক্ষমতার দৌড়ে টিকে থাকার এক অভিনব কৌশল হিসেবে এনসিপি জামায়াতের পকেটস্থ হলো।

যে তারুণ্য একটি উদার ও বৈষম্যহীন সমাজ চেয়েছিল, তাদের কাছে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে এনসিপির সখ্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে।তাদের কাছে দলটি এখন আর ‘নতুন রাজনীতির’ স্বপ্নের প্রতিনিধি নয়, বরং ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারার খেলায় মত্ত একটি গোষ্ঠী মাত্র। এনসিপির এ সিদ্ধান্ত দলটির ভবিষ্যতকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেই প্রশ্ন রাজনীতির কারবারিদের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি রয়েছে এনসিপির নেতাকর্মীদের মাঝেও। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন দল থেকে এখনো পদত্যাগ না করলেও মন্তব্য করেছেন যে, ‘জামায়াতে ইসলামীর প্রেস কনফারেন্স থেকে জানতে পারলাম এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের আত্মপ্রকাশের দিন জোটের মুখপাত্র ও এনসিপির আহ্বায়কের বক্তব্য অনুযায়ী তা হওয়ার কথা নয়।’ সামান্থা বলেন, ‘তৃতীয় শক্তি তৈরির উদ্যোগকে ব্যাহত করে এমন অবস্থান জাতীয় নাগরিক পার্টির মূলধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির কিছু মানুষ কিছু আসনের বিনিময়ে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ বিকেল ৫.৩০-এ দলের মূল আকাক্সক্ষা থেকে বিচ্যুত হলো।’

দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক নূসরাত তাবাসুম লিখেছেন, ‘...জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমি মনে করি এনসিপির সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই এনসিপির মূল বক্তব্য থেকে চ্যুত হয়েছেন।’ কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন লিখেছেন, ‘যেখানে এনসিপিকে বলাই হয় জামায়াতের আরেকটা দোকান, তাহলে কেন এনসিপি আগে নিজের স্বকীয়তা, নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জামায়াতকে বেছে নিতে মরিয়া হয়ে যাচ্ছে? তিনজন মন্ত্রী ছিল না ক্ষমতায়? পারে নাই তো!’ তাজনূভা আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব, এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে। এমন সময়ে এমনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যাতে এ সিদ্ধান্তের বিরোধীদের ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিকল্প পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ না থাকে। এবং এভাবে জুলাইকে কৌশলে জামাতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’

শুধু এনসিপির নেতাকর্মীরা নয়, জুলাইয়ের তারুণ্য এই প্রতারণা ভুলতে পারবে না। এনসিপি তো জুলাইয়ের তারুণ্যকে ফাঁকি দিয়ে ইসলামিক ধর্মীয় দলসমূহের সঙ্গে জোট করল। কিন্তু ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে? ইসলাম বলে, ‘মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ভঙ্গ করার মতো বড় পাপ এই পৃথিবীতে আর নাই। পাপের একভাগ পৃথিবীতেই ভোগ করে যেতে হবে’। কাউকে ঠকিয়ে কেউ মাফ পায় না; পায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে ‘প্রতারণাকারীরা যেন না মনে করে যে, তারা সফল হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা সফল হবে না’। এ মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও একটি উক্তি মনে পড়ছে, ‘মিথ্যাকে আশ্রয় করে যে মানুষ বাঁচিতে চায়, সে আপনাকেও ঠকায়, সকলকে ঠকায়।’

নতুন দলটি বিকাশ লাভ করার আগেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতের অধীনস্থ হয়ে পড়ায় নতুন দলের রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে প্রভাবশালী দল হিসেবে জামাত স্বাভাবিকভাবে গ্রাস করতে চাইবে। যেহেতু এনসিপি দলের নেতৃত্বের মাঝেই প্রভাবশালী দলটির উগ্র সমর্থকরা পূর্ব থেকেই রয়েছেন সে জন্য এটা আরো সহজ হবে। এনসিপির ‘নতুন বন্দোবস্ত’ ধারণাটি অকার্যকর মুখভরা বুলিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় না-ও লাগতে পারে। এভাবেই একটি স্বতন্ত্র দলীয় আদর্শিক কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা আঁতুড়ঘরেই মারা গেল। দলটি স্বাতন্ত্র নিয়ে টিকে থাকলে মোটাদাগে নির্বাচনে হারলেও অসংখ্য নেতাকর্মী তৈরি হতো ভবিষ্যতের জন্য। নাহিদ, সার্জিসরা বলার চেষ্টা করছেন, এটা শুধুই নির্বাচনী জোট। নির্বাচনের পরে নতুন সমীকরণ দাঁড়াতে পারে। তা দাঁড়াতে পারে এবং পদত্যাগকারীদের সঙ্গেও সমঝোতার ও দলে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা দল এবং নানা মহলের পক্ষ থেকে আছে। কিন্তু দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী যুদ্ধাপরাধী ধর্মাশ্রয়ী দলটির সঙ্গে তাদের নির্বাচনী বন্ধন স্বতন্ত্র আদর্শের মধ্যপন্থী দল হিসেবে বিকাশের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে দিল।

শুধু তরুণরাই কেনো, জুলাই আন্দোলনের দিনগুলোতে এমন কোনো শ্রেণীপেশার মানুষ কি আছে যারা আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়নি? যে এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, হাজারে হাজারে আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তাতে ছাত্র, শ্রমিক, পথচারী, নারী, শিশু কোন শ্রেণীর মানুষের প্রতিনিধিত্ব নেই? সমন্বয়করা ছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাম প্রগতিশীল সংগঠনের বা চিন্তাধারার ছাত্র কর্মীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভ্যুত্থান সফল হতো না যদি না নারী সমাজ বিশেষত ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে না আসতেন। সমান তালে লড়লেও আজ কিন্তু তাদের আড়াল করে ফেলা হয়েছে। সেই লড়াকু নারী সমাজ, নানা শ্রেণীপেশার মানুষ এনসিপির সিদ্ধান্তে হতবাক। নারী নেতৃত্ব বিরোধী জামায়াত এমন একটি দল, যে দল কৃষ্ণ নন্দীর নেতৃত্ব মানলেও নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে নারাজ। জামায়াত থেকে একজন নারীও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পায়নি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় এবং পরে দেয়ালে দেয়ালে যে গ্রাফিতি আঁকা হয়, সেখানে বৈষম্যহীন এক গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন আঁকে আমাদের নতুন প্রজন্ম। এ স্বপ্ন দেখতে তো ভুল ছিল না। তবে এক সুদীর্ঘ কতৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের ফলাফল হিসেবে উগ্রবাদী দক্ষিণপন্থী শক্তি দেশী বিদেশি নানা শক্তির মদতে এ আন্দোলনের নেতৃত্বে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়। মাথায় লাল-সবুজের পট্টি বেঁধে মানুষের মুখোশ পরে ছদ্মবেশে যে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা জুলাই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন তারা আজ মুখোশ উন্মোচন করে হামলে পড়েছে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নারী স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী চিন্তাধারার ওপর। সুন্দরের ভেতর লুকিয়ে থাকা অসুন্দর প্রকাশ হয়ে পড়ছে তরুণদের স্বপ্নকে নাকচ করে দিয়ে। তবে এসব ঘটনাবলি জুলাইয়ের মাহাত্ম্যকে কমায় না, মানুষের আত্মদানকেও খাটো করে না। আন্দোলনের ন্যায্যতাকেও নাকচ করেনা। আবার অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মী যারা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে থাকলেও, নির্বিচার হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও, আন্দোলন বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান দেখে এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তীতে ওই সব শক্তির প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের সমর্থন দেখে থমকে গিয়েছিলেন। অতি সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের অবস্থানকেও এক কথায় নাকচ করার সুযোগ নেই। যদিও জনমানুষের সম্পৃক্ত ন্যায়সঙ্গত দাবির ন্যায্যতাকে স্বীকৃতি দিয়েই আন্দোলনের নেতিবাচক প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। দেশের মানুষের মাঝে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচার উচ্ছেদের এক অন্তর্নিহিত শক্তি পুঞ্জীভূত ছিল। ছাত্ররা যখন সুয়োগ করে দিয়েছিল নিজের বোধ থেকেই মানুষ নেমে পড়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে, মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে। অন্যদিকে ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে দেশি-বিদেশি নানা শক্তি বিশেষত, বিশ্ব মোড়লরা তাদের ‘স্টেক’ নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের অস্থির সময়ে নানা ভূমিকা গ্রহণ করেছে এবং করছে।

দেশ যখন এমন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তখন বছরের শুরুতেই বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার যুদ্ধ উন্মাদ বড় মোড়ল নিজেকে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নয়, সারা দুনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করতে চাইছেন। তার হুকুমেই দুনিয়ার সব দেশকে চলতে হবে- এমন ঘোষণা দিচ্ছেন, আর তা না হলে তিনি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক অপহরণ করতে পারবেন। অন্যদিকে ধর্মীয় উগ্রবাদ ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। আমাদের চেনা-জানা দুনিয়া পাল্টে গেছে। এ ধরনের জাতীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশের তাবৎ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি এবং মধ্যমপন্থী ও উদার গণতন্ত্রীদের এক ব্যাপকতর সমঝোতায় শামিল হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তা নাহলে আরও সংঘাত, আরও ভাঙন, আরও বিপর্যয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

জুলাই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের একটা অংশ বাংলাদেশের গৌরবজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোতে আমরা প্রতারিতবোধ করলেও নেতৃত্বের অনেক প্রতিভাবান তরুণ-তরুণী সাহসের সঙ্গে জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, সোচ্চার হচ্ছেন। জুলাইয়ের তরুণরা বুঝতে পারছেন, যে নেতৃত্ব একবার প্রতারণা করেছে, তারা আবারও করবে। তারা মনে করছেন যে, জীবন মাঝেমাঝে ঠকিয়ে শেখায়, যাতে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠা যায়। সে প্রচেষ্টা তারা শুরু করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতির কুশীলবদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা দুনিয়া এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নেমেছে। তবে মনে রাখা দরকার, আজ যা চলছে, সেটাই শেষ কথা নয়। শত শত বছরের ইতিহাস পরিক্রমায় একটি মুহূর্ত মাত্র। আমরা প্রতারিত হতে পারি, আমরা হয়তো একদিন থাকবও না। কিন্তু পরের প্রজন্ম লড়বে এবং বিশ্ববাসী দেখবে ‘কারো দানে পাওয়া নয় দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ’ অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করেছে।

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

back to top