alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ভোটে ইসলামী জোট

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

: শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হচ্ছে। তাদের অন্যতম জোট হচ্ছে ইসলামী দলগুলোর জোট।

জোটবদ্ধ দলগুলোর আদর্শকে পৃথকভাবে দেখলে দেখা যায়, জোটের মধ্যে এক ধরনের ককটেল আদর্শিক সংমিশ্রণ তৈরি হচ্ছে। এই বহুমাত্রিক আদর্শিক মিশ্রণে জোটের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে। আরেকটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে যে, নবগঠিত জোটটিতে পারস্পরিক বিপরীত আদর্শের নেতাদের সংমিশ্রণ ঘটছে। এসব প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে গণতন্ত্রের আলোর আশা করা হয়েছিল, তা সফল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এই রাজনৈতিক মিশ্রণে মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ব্যাহত হবে।

সমমনা বারো দল নিয়ে গঠিত হয়েছে ইসলামী রাজনৈতিক জোট। জোটটি সমমনার সমঝোতা হলেও এটি আবার ইসলামপন্থী জোট বা ওয়ান বক্স পলিটিক্স নামেও পরিচিত। জোটটি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, নির্বাচনের আগে গণভোট, সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ বাস্তবায়ন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে ইসলামী শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন এই দলের উদ্দেশ্য। দলটি ইকামতে দ্বীন (ইসলাম প্রতিষ্ঠা) নামক মতাদর্শকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বাংলাদেশের জামায়াত পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমিন)-এর আদর্শ ধারণ করে।

এই জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এটি ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন, আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী যুব শিবির, ভাসানীর ন্যাপের একাংশের নেতা এবং তমদ্দুন মজলিসের সংগঠক ভাষাসৈনিক মাসউদ খানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দলটির মধ্যকার আদর্শিক মিশ্রণটিও ককটেলধর্মী।

এই জোটের একটি দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর পূর্বনাম ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এটি বাংলাদেশের একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল। চরমোনাই পীর ঐতিহ্যগতভাবে দলের আমির বা প্রধান নেতা হন। দলের প্রতিষ্ঠাতা চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের শিকড় দারুল উলুম দেওবন্দে, বিশেষত দেওবন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির সঙ্গে সম্পর্কিত। দেওবন্দমুখী কওমি মাদ্রাসা ও উলামাদের পাশাপাশি সারা দেশে বিপুলসংখ্যক মুরিদ ও পীরের অনুসারী দলটির সমর্থনভিত্তি গঠন করে।

দলের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দাওয়াহ, সংগঠন, জ্ঞান আহরণ ও প্রশিক্ষণ, জনগণের ঐক্য, মানবতার সেবা, সামাজিক ও শিক্ষার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি, ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণআন্দোলন পরিচালনা।

খেলাফত মজলিস বাংলাদেশে ইসলামের আলোকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। এজন্য তারা ৭ দফা মৌল কর্মসূচি ও ২৫ দফা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ ও মসজিদটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চ, ১৯৯৪ সালের নাস্তিক-মুরতাদ তাসলিমা নাসরিনবিরোধী আন্দোলন করেছে তারা। তাদের মতে, ১৯৯৯ সালে শান্তিচুক্তির নামে সন্ত্রাসীদের হাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। তাই তারা শান্তিচুক্তির প্রতিবাদে লংমার্চসহ বিভিন্ন আন্দোলন করেছে।

আরেকটি দল হলো বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এটি বাংলাদেশের একটি নিবন্ধিত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী। এই দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতারা স্বৈরাচার এরশাদের পাতানো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল। ১৯৮০ সালে শফিউল আলম প্রধান দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জোটের আরেকটি দল বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি (যার পূর্বনাম ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি)। এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম ইসলামী রাজনৈতিক দল। পাকিস্তান আমলে এই দলের লক্ষ্য ছিল যে কোনো মূল্যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বর্তমানেও তারা বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করে রেখেছে।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামে একটি দল গঠন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জামায়াতের একটি কৌশল।

বাংলাদেশ লেবার পার্টি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। দলটি ১৯৭৪ সালের ১৭ আগস্ট মাওলানা মতিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির ভাবাদর্শ হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ওমর-ই-সাম্যবাদ।

জোটের অন্যতম দল লিবারেল ডেমোক্রটিক পার্টি বা এলডিপি। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্নেল অলি আহমেদ ও বিএনপির আরও ২৪ জন নেতা একত্র হয়ে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৭ সালে আদর্শগত কারণে বিকল্প ধারা ও এলডিপি পৃথক হয়ে যায়। দলটির বর্তমান প্রধান কর্নেল অলি বীর বিক্রম, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম উপাধি পেয়েছেন। এই সূর্যসন্তানের জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুর একত্রীকরণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

জোটের সবচেয়ে আলোচিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে গঠিত একটি রাজনৈতিক দল। নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ১৯৪৭ সালের পূর্ববঙ্গ গঠন আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভাবনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবদান এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। দলটি বাম বা ডানপন্থার বাইরে মধ্যপন্থী রাজনীতির কথা বলছে এবং সাম্য, ন্যায়বিচার ও সুশাসনকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

জোটের আরেকটি দল আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটি ২০২০ সালের ২ মে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে অধিকারভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। এটি মূলত জামায়াতের সংস্কারপন্থীদের নতুন দল।

এবারের নির্বাচনে আলোচিত ব্যক্তি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন। তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে তিনি বিএনপি থেকে বরখাস্ত হন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং একসময় স্বাধীনতাবিরোধীদের ঘৃণা করতেন। অথচ আজ তিনি জামায়াতে যোগ দিয়েছেন।

এই জোটের আত্মপ্রকাশের পর বোঝা যায়, বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক আদর্শ তাদের মূল ভিত্তি ছিল না। তাই তাদের স্বার্থান্বেষী বলা অমূলক নয়। এই ধরনের রাজনৈতিক চরিত্র থেকেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শ ভুলুণ্ঠিত হয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]

শীতের নীরব আঘাত

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

বিনা-ভাড়ার ট্রেনযাত্রা

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এশিয়া

ছবি

নামে ইসলামী, কাজে আবু জাহেল!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ভোটে ইসলামী জোট

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হচ্ছে। তাদের অন্যতম জোট হচ্ছে ইসলামী দলগুলোর জোট।

জোটবদ্ধ দলগুলোর আদর্শকে পৃথকভাবে দেখলে দেখা যায়, জোটের মধ্যে এক ধরনের ককটেল আদর্শিক সংমিশ্রণ তৈরি হচ্ছে। এই বহুমাত্রিক আদর্শিক মিশ্রণে জোটের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে। আরেকটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে যে, নবগঠিত জোটটিতে পারস্পরিক বিপরীত আদর্শের নেতাদের সংমিশ্রণ ঘটছে। এসব প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে গণতন্ত্রের আলোর আশা করা হয়েছিল, তা সফল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এই রাজনৈতিক মিশ্রণে মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ব্যাহত হবে।

সমমনা বারো দল নিয়ে গঠিত হয়েছে ইসলামী রাজনৈতিক জোট। জোটটি সমমনার সমঝোতা হলেও এটি আবার ইসলামপন্থী জোট বা ওয়ান বক্স পলিটিক্স নামেও পরিচিত। জোটটি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, নির্বাচনের আগে গণভোট, সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ বাস্তবায়ন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে ইসলামী শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন এই দলের উদ্দেশ্য। দলটি ইকামতে দ্বীন (ইসলাম প্রতিষ্ঠা) নামক মতাদর্শকে মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বাংলাদেশের জামায়াত পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী এবং মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমিন)-এর আদর্শ ধারণ করে।

এই জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। এটি ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন, আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী যুব শিবির, ভাসানীর ন্যাপের একাংশের নেতা এবং তমদ্দুন মজলিসের সংগঠক ভাষাসৈনিক মাসউদ খানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দলটির মধ্যকার আদর্শিক মিশ্রণটিও ককটেলধর্মী।

এই জোটের একটি দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এর পূর্বনাম ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এটি বাংলাদেশের একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক দল। চরমোনাই পীর ঐতিহ্যগতভাবে দলের আমির বা প্রধান নেতা হন। দলের প্রতিষ্ঠাতা চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করিমের শিকড় দারুল উলুম দেওবন্দে, বিশেষত দেওবন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহির সঙ্গে সম্পর্কিত। দেওবন্দমুখী কওমি মাদ্রাসা ও উলামাদের পাশাপাশি সারা দেশে বিপুলসংখ্যক মুরিদ ও পীরের অনুসারী দলটির সমর্থনভিত্তি গঠন করে।

দলের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দাওয়াহ, সংগঠন, জ্ঞান আহরণ ও প্রশিক্ষণ, জনগণের ঐক্য, মানবতার সেবা, সামাজিক ও শিক্ষার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি, ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণআন্দোলন পরিচালনা।

খেলাফত মজলিস বাংলাদেশে ইসলামের আলোকে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। এজন্য তারা ৭ দফা মৌল কর্মসূচি ও ২৫ দফা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ ও মসজিদটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চ, ১৯৯৪ সালের নাস্তিক-মুরতাদ তাসলিমা নাসরিনবিরোধী আন্দোলন করেছে তারা। তাদের মতে, ১৯৯৯ সালে শান্তিচুক্তির নামে সন্ত্রাসীদের হাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। তাই তারা শান্তিচুক্তির প্রতিবাদে লংমার্চসহ বিভিন্ন আন্দোলন করেছে।

আরেকটি দল হলো বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এটি বাংলাদেশের একটি নিবন্ধিত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী। এই দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতারা স্বৈরাচার এরশাদের পাতানো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল। ১৯৮০ সালে শফিউল আলম প্রধান দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জোটের আরেকটি দল বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি (যার পূর্বনাম ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি)। এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম ইসলামী রাজনৈতিক দল। পাকিস্তান আমলে এই দলের লক্ষ্য ছিল যে কোনো মূল্যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বর্তমানেও তারা বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করে রেখেছে।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামে একটি দল গঠন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জামায়াতের একটি কৌশল।

বাংলাদেশ লেবার পার্টি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। দলটি ১৯৭৪ সালের ১৭ আগস্ট মাওলানা মতিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির ভাবাদর্শ হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ওমর-ই-সাম্যবাদ।

জোটের অন্যতম দল লিবারেল ডেমোক্রটিক পার্টি বা এলডিপি। ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্নেল অলি আহমেদ ও বিএনপির আরও ২৪ জন নেতা একত্র হয়ে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৭ সালে আদর্শগত কারণে বিকল্প ধারা ও এলডিপি পৃথক হয়ে যায়। দলটির বর্তমান প্রধান কর্নেল অলি বীর বিক্রম, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম উপাধি পেয়েছেন। এই সূর্যসন্তানের জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুর একত্রীকরণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

জোটের সবচেয়ে আলোচিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে গঠিত একটি রাজনৈতিক দল। নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক করে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ১৯৪৭ সালের পূর্ববঙ্গ গঠন আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভাবনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবদান এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। দলটি বাম বা ডানপন্থার বাইরে মধ্যপন্থী রাজনীতির কথা বলছে এবং সাম্য, ন্যায়বিচার ও সুশাসনকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

জোটের আরেকটি দল আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটি ২০২০ সালের ২ মে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে অধিকারভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে। এটি মূলত জামায়াতের সংস্কারপন্থীদের নতুন দল।

এবারের নির্বাচনে আলোচিত ব্যক্তি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন। তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে তিনি বিএনপি থেকে বরখাস্ত হন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং একসময় স্বাধীনতাবিরোধীদের ঘৃণা করতেন। অথচ আজ তিনি জামায়াতে যোগ দিয়েছেন।

এই জোটের আত্মপ্রকাশের পর বোঝা যায়, বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক আদর্শ তাদের মূল ভিত্তি ছিল না। তাই তাদের স্বার্থান্বেষী বলা অমূলক নয়। এই ধরনের রাজনৈতিক চরিত্র থেকেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শ ভুলুণ্ঠিত হয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]

back to top