alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

শীতের নীরব আঘাত

মাহতাব হোসাইন মাজেদ

: শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে শীত একটি পরিচিত ঋতু। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুয়াশা, হিমেল বাতাস ও ক্রমশ কমতে থাকা তাপমাত্রা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কিছুটা শ্লথ করে দেয় এটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু যখন এই শীত স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয়, তখন তা আর নিছক ঋতু পরিবর্তনের ঘটনা থাকে না। এবারের শীত মানুষের জীবন, জীবিকা ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলছে। শৈত্যপ্রবাহ এক ধরনের নীরব দুর্যোগ। এটি বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হঠাৎ আঘাত হানে না, আবার শব্দ, ধ্বংস বা নাটকীয় দৃশ্যও তৈরি করে না। অথচ এর প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের শরীর, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে চেপে ধরে। শীত যত তীব্র হয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

শীতের তীব্রতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্রের কারণে শীতের প্রকোপ সর্বত্র সমান নয়। উত্তরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত এলাকা, চর ও হাওর অঞ্চলে শীতের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা পড়ে, সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে, আর ঠান্ডা বাতাস দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে শীত আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে। কৃষক মাঠে যেতে পারেন না, দিনমজুররা কাজ হারান, নৌপথে চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় বাজারে যাতায়াত কমে যায়, পণ্য পরিবহনে দেরি হয়। শহরাঞ্চলেও কুয়াশার কারণে যানবাহনের গতি কমে, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে শীত তাদের নিয়মিত পড়াশোনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

জীবিকা ও অর্থনীতিতে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব

তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা না দিলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। কৃষি খাতে অতিরিক্ত ঠান্ডা বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট করতে পারে, শাকসবজির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, আলু ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলে রোগ দেখা দেয়। কৃষকরা অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়েন, লাভের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। পশুপালন খাতেও শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গবাদিপশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হলে দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। অনেক দরিদ্র পরিবার, যাদের আয়ের বড় উৎস গবাদিপশু, তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।

পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পণ্য সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যার চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এভাবে শীত ধীরে ধীরে অর্থনীতির নীচু স্তরে অস্থিরতা তৈরি করে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক

শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। ঠান্ডাজনিত রোগ-সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, হাঁপানি শীতের সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায়, যা বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। শীতজনিত মৃত্যু অনেক সময় নীরবে ঘটে। এসব মৃত্যু খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো প্রতিরোধযোগ্য। পর্যাপ্ত গরম কাপড়, উষ্ণ আশ্রয়, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা পেলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো-এই নীরব মৃত্যুগুলো রোধে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর?

শীত ও সামাজিক বৈষম্য

শীত সামাজিক বৈষম্যকে আরও নগ্নভাবে সামনে আনে। যারা পাকা ঘর, উষ্ণ পোশাক ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সুবিধা ভোগ করেন তাদের কাছে শীত সহনীয়। কিন্তু যারা ফুটপাতে ঘুমান, বস্তিতে থাকেন কিংবা দিন আনে দিন খায় তাদের কাছে শীত মানে টিকে থাকার সংগ্রাম। একই শহরে, একই শীতে এই বৈপরীত্য আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর অসাম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতের নতুন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার চরমতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহ, বর্ষায় অতিবৃষ্টি আর শীতে অস্বাভাবিক ঠান্ডা এই ধারাবাহিকতা জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। শীত এখন আর শুধু ঠান্ডা নয়; এটি অনিশ্চয়তার প্রতীক। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শীত মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন নীতি অপরিহার্য।

রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা

তীব্র শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা, গরম কাপড় বিতরণ, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এসব কাজ সময়মতো ও পরিকল্পিতভাবে করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, প্রস্তুতি হয় দেরিতে এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম। মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।

সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব

শীত কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমাজেরও দায়িত্ব পরীক্ষা করে। বিত্তবান ও সক্ষম মানুষের উচিত এই সময়ে এগিয়ে আসা। একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা উষ্ণ খাবারের ব্যবস্থা কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এটি দান নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

বিনা-ভাড়ার ট্রেনযাত্রা

ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এশিয়া

ছবি

নামে ইসলামী, কাজে আবু জাহেল!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

শীতের নীরব আঘাত

মাহতাব হোসাইন মাজেদ

শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে শীত একটি পরিচিত ঋতু। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুয়াশা, হিমেল বাতাস ও ক্রমশ কমতে থাকা তাপমাত্রা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কিছুটা শ্লথ করে দেয় এটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু যখন এই শীত স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয়, তখন তা আর নিছক ঋতু পরিবর্তনের ঘটনা থাকে না। এবারের শীত মানুষের জীবন, জীবিকা ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলছে। শৈত্যপ্রবাহ এক ধরনের নীরব দুর্যোগ। এটি বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হঠাৎ আঘাত হানে না, আবার শব্দ, ধ্বংস বা নাটকীয় দৃশ্যও তৈরি করে না। অথচ এর প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের শরীর, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে চেপে ধরে। শীত যত তীব্র হয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

শীতের তীব্রতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্রের কারণে শীতের প্রকোপ সর্বত্র সমান নয়। উত্তরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত এলাকা, চর ও হাওর অঞ্চলে শীতের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা পড়ে, সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে, আর ঠান্ডা বাতাস দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে শীত আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে। কৃষক মাঠে যেতে পারেন না, দিনমজুররা কাজ হারান, নৌপথে চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় বাজারে যাতায়াত কমে যায়, পণ্য পরিবহনে দেরি হয়। শহরাঞ্চলেও কুয়াশার কারণে যানবাহনের গতি কমে, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে শীত তাদের নিয়মিত পড়াশোনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

জীবিকা ও অর্থনীতিতে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব

তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা না দিলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। কৃষি খাতে অতিরিক্ত ঠান্ডা বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট করতে পারে, শাকসবজির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, আলু ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলে রোগ দেখা দেয়। কৃষকরা অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়েন, লাভের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। পশুপালন খাতেও শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গবাদিপশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হলে দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। অনেক দরিদ্র পরিবার, যাদের আয়ের বড় উৎস গবাদিপশু, তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।

পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পণ্য সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যার চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এভাবে শীত ধীরে ধীরে অর্থনীতির নীচু স্তরে অস্থিরতা তৈরি করে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক

শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। ঠান্ডাজনিত রোগ-সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, হাঁপানি শীতের সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায়, যা বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। শীতজনিত মৃত্যু অনেক সময় নীরবে ঘটে। এসব মৃত্যু খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো প্রতিরোধযোগ্য। পর্যাপ্ত গরম কাপড়, উষ্ণ আশ্রয়, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা পেলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো-এই নীরব মৃত্যুগুলো রোধে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর?

শীত ও সামাজিক বৈষম্য

শীত সামাজিক বৈষম্যকে আরও নগ্নভাবে সামনে আনে। যারা পাকা ঘর, উষ্ণ পোশাক ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সুবিধা ভোগ করেন তাদের কাছে শীত সহনীয়। কিন্তু যারা ফুটপাতে ঘুমান, বস্তিতে থাকেন কিংবা দিন আনে দিন খায় তাদের কাছে শীত মানে টিকে থাকার সংগ্রাম। একই শহরে, একই শীতে এই বৈপরীত্য আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর অসাম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও শীতের নতুন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার চরমতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট। গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহ, বর্ষায় অতিবৃষ্টি আর শীতে অস্বাভাবিক ঠান্ডা এই ধারাবাহিকতা জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। শীত এখন আর শুধু ঠান্ডা নয়; এটি অনিশ্চয়তার প্রতীক। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় শীত মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন নীতি অপরিহার্য।

রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা

তীব্র শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা, গরম কাপড় বিতরণ, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এসব কাজ সময়মতো ও পরিকল্পিতভাবে করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, প্রস্তুতি হয় দেরিতে এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম। মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।

সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব

শীত কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমাজেরও দায়িত্ব পরীক্ষা করে। বিত্তবান ও সক্ষম মানুষের উচিত এই সময়ে এগিয়ে আসা। একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা উষ্ণ খাবারের ব্যবস্থা কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এটি দান নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব।

[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

back to top