alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

৩ জানুয়ারী ২০২৬; দক্ষিণ আমেরিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার অভিযোগ ভেনেজুয়েলা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন নামক মাদক যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের যে অভিযোগ মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে তা সত্য নয়, কারণ ভেনেজুয়েলায় কোকেন নামক মাদক উৎপাদন হয় না, এই মাদক উৎপাদিত হয় মূলত লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায় এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাচারে ভেনেজুয়ালাকে সীমিত পরিসরে ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও পাচারের প্রধান রুট হচ্ছে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। মাদকই যদি অপহরণের প্রধান কারণ হয় তাহলে প্রথমে অপহরণ করা উচিত ছিল কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টকে। প্রকৃত পক্ষে ভেনেজুলেয়া বহুদিন ধরে আমেরিকার কর্তৃত্ব স্বীকার করছে না, গাঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে। ভেনেজুয়েলার শাসকদের এমন স্পর্ধা আমেরিকা সহ্য করতে পারছিল না, আগের প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের আমল থেকেই আমেরিকা ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।

পৃথিবীর সব দেশে ড্রাগ কার্টেল বা মাদক বেচাকেনার গোপনীয় গোষ্ঠী বা দল থাকলেও সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোতে। সত্তর দশকের কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের মাদক ব্যবসার সর্দার পাবলো এসকোবার যে পরিমাণ টাকা উপার্জন করতেন সেই টাকার বা-িল করতে মাসে ২৫০০ ডলারের রাবার ব্যান্ট প্রয়োজন হতো। ব্যাংকে অর্থ রাখার সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর তার ২ বিলিয়ন ডলার নোট ইঁদুরে কেটে ফেলত। একবার শীতের রাতে পরিবার নিয়ে পালানোর সময় এসকোবারের মেয়ের শীত নিবারণের জন্য ১ ঘণ্টায় ২ মিলিয়ন ডলারের নোট পুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, সারা পৃথিবীর প্রায় সকল কোকেন তার মাধ্যমে সরবরাহ হলেও তিনি জীবনে কোন দিন কোকেন খেয়ে দেখেননি। ১৯৯৩ সনে কলম্বিয়া ও আমেরিকার কমান্ডোদের যৌথ অভিযানে গুলিতে এসকোবারের মৃত্যু হয়। অপরদিকে মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেল বা মাদক ব্যবসার লিডার এল চাপোর ছেলে মেক্সিকোর পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তার দলের সদস্যরা মেক্সিকো সিটি দখল করে শহরে সর্বত্র আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে, এমন অরাজকতা রোধ করতে না পেরে পুলিশ তার ছেলেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আমেরিকার মেরিন সেনারা যেই ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেও ঠিক সেই একই ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ, ট্যাঙ্ক, ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী কামান, হেলিকপ্টার, সাবমেরিন আছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে, তাদের কথামত আচরণ করলে এবং আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোন কাজ না করলে পৃথিবীর কোন দেশের শাসকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয় না, এমনকি মাদক ব্যবসা করলেও। প্রেসিডেন্ট ফুলগেনসিও বাতিস্তার আমলে কিউবা ছিল যৌন ব্যবসা, জুয়া আর মাদকের আড্ডাখানা, কিন্তু দেশ চালাতো আমেরিকার কথামতো, তাই তার বিরুদ্ধে আমেরিকার কোন অভিযোগ ছিল না। কিন্তু যেদিন তাকে সরিয়ে রাশিয়ার বন্ধু ফিদেল ক্যাস্ত্রো ক্ষমতায় আসল সেদিন থেকেই কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করল আমেরিকা। আমেরিকা নিজেকে গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলে বিশ্বে জাহির করে থাকে, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, পৃথিবীর কোন দেশে গণতন্ত্র থাকা আমেরিকার স্বার্থের জন্য অপরিহার্য নয়; বরং গণতন্ত্র না থাকলেই আমেরিকার স্বার্থের অনুকূল হয়। এই কারণেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত মিশরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসিকে আমেরিকা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনীর আবদুল ফাতাহ আল সিসিকে ক্ষমতায় বসায়। আবার ক্ষমতায় বসে আমেরিকার স্বার্থ অনবচ্ছিন্নভাবে রক্ষা না করলেও আমেরিকার আশীর্বাদপুষ্ট শাসককে তারা বেশিদিন ক্ষমতায় রাখে না। পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন এবং যতদিন মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় নরিয়েগা একনিষ্ঠ ছিলেন ততদিন তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের কোন অভিযোগ ছিল না; কিন্তু যেদিন থেকে তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু করলেন, পানামা খালের উপর পানামার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেন সেদিন থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয়ে গেলেন এবং মাদক পাচারের দায়ে অভিযুক্ত হলেন।

লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অবাধ্য সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে শক্তি প্রয়োগ করে আমেরিকায় নিয়ে বিচার করার আরও নজির আছে; ২০২২ সনে হ-ুরাসের অবসরপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট অরল্যন্ডো হার্নান্দেজকে তার বাড়ি থেকে তুলে আমেরিকায় নিয়ে দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মতো আমেরিকা ১৯৮৯ সনে পানামায়ও সামারিক আগ্রাসন চালায়, প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েও বাঁচতে পারেননি, মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। আত্মসমর্পণের পর তাকে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে জেল খাটা শেষ হলে অর্থ পাচারের সাজা ভোগের জন্য তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়; এরপর হত্যা ও অন্যান্য অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়, যেখানে তিনি বন্দী অবস্থায় ২০১৭ সনে ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে, তাদের কথামতো আচরণ করলে এবং আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোন কাজ না করলে পৃথিবীর কোন দেশের শাসকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয় না, এমনকি মাদক ব্যবসা করলেও

শত্রু দমনে আমেরিকার ছলের অভাব হয় না; কোথাও জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে, আবার কোথাও অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ওপর নির্দ্ধিধায় আক্রমণ চালিয়েছে ইরাকে জনবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অজুহাতে জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে ইরাককে ধ্বংস করছে, ধ্বংস করেছে সিরিয়া, লিবিয়া এবং আফগানিস্তান। আমেরিকার স্বার্থ ও ইসরায়েল বিরোধী ইরানকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে শায়েস্তা করেছে, কিন্তু এখনো মাথানত না করায় ইরান আমেরিকার রোষ থেকে বাঁচতে পারবে বলে মনে হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অহর্নিশ অন্য দেশের স্বার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করছে- কিছুদিন আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা মাটির গভীরে ঢুকিয়ে অকেজো করে দিয়েছে, ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর বোমা ফেলেছে, ইউক্রেনকে ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য ‘করছি, করব’ বলে রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণে প্রলুব্ধ করে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কিউবার কাছে পাটের বস্তা বিক্রি করায় ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছে। আমেরিকা এত বেপরোয়া হয়ে গেছে যে, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডাকে ট্রাম্প আমেরিকার অঙ্গরাজ্য হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন এক সময় তাদের একক শক্তিতে আমেরিকার আধিপত্য থামিয়ে দিয়েছিল; কিন্তু এখন পারছে না। নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বিবেচনায় আমেরিকা হয়ে যায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইউরোপ সব সময়ই আমেরিকার আজ্ঞাবহ মহাদেশ, এছাড়াও আমেরিকার পাশে রয়েছে অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। রাশিয়া সম্প্রতি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললেও তাদের মিলিত শক্তিকে আমেরিকা খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছে না। ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা মজবুত হলেও সামরিক শক্তি বিবেচনায় এখনো পরাশক্তির সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে আসতে পারেনি।

গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণের পর ধারণা করা হয়েছিল, ডনাল্ড ট্রাম্পের আশীর্বাদে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ভেনেজুয়েলার মারিয়া করিনা মাচাদোকে আমেরিকা ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে; কারণ ইতোমধ্যে তিনি ক্ষমতা পেলে ভেনিজুয়েলার মাটি ও খনিজ সম্পদ মার্কিনীদের হাতে নিঃশর্তে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প মাচাদোকে ‘জনসমর্থনহীন’ এবং ‘শ্রদ্ধার অযোগ্য’ অভিধায় অভিহিত করে বরং অপমান করেছেন।এই অবস্থায় ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ৯০ দিনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছে। রদ্রিগেজ তার অভিষেক ভাষণে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, তিনি আমেরিকার আগ্রাসনের কাছে নতি স্বীকার করবেন না এবং নিকোলা মাদুরোই থাকবেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে ট্রাম্প কড়া সুরে রদ্রিগেজকেও লক্ষ্য করে বলেছেন, তিনি যদি ঠিকমত কাজ না করেন তাহলে তাকেও মাদুরোর চেয়ে আরও বড় মূল্য চুকাতে হবে।

মনে হচ্ছে, রদ্রিগেজ কথা না শুনলে আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় পুনরায় সামরিক অভিযান চালাবে। আমেরিকাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ভেনেজুয়েলার নেই; আমেরিকা নিজ স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন, ভিন দেশের সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার কিছুরই ধার ধারে না।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

৩ জানুয়ারী ২০২৬; দক্ষিণ আমেরিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার অভিযোগ ভেনেজুয়েলা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন নামক মাদক যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের যে অভিযোগ মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে তা সত্য নয়, কারণ ভেনেজুয়েলায় কোকেন নামক মাদক উৎপাদন হয় না, এই মাদক উৎপাদিত হয় মূলত লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায় এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাচারে ভেনেজুয়ালাকে সীমিত পরিসরে ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও পাচারের প্রধান রুট হচ্ছে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা। মাদকই যদি অপহরণের প্রধান কারণ হয় তাহলে প্রথমে অপহরণ করা উচিত ছিল কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টকে। প্রকৃত পক্ষে ভেনেজুলেয়া বহুদিন ধরে আমেরিকার কর্তৃত্ব স্বীকার করছে না, গাঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে। ভেনেজুয়েলার শাসকদের এমন স্পর্ধা আমেরিকা সহ্য করতে পারছিল না, আগের প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের আমল থেকেই আমেরিকা ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে।

পৃথিবীর সব দেশে ড্রাগ কার্টেল বা মাদক বেচাকেনার গোপনীয় গোষ্ঠী বা দল থাকলেও সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোতে। সত্তর দশকের কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের মাদক ব্যবসার সর্দার পাবলো এসকোবার যে পরিমাণ টাকা উপার্জন করতেন সেই টাকার বা-িল করতে মাসে ২৫০০ ডলারের রাবার ব্যান্ট প্রয়োজন হতো। ব্যাংকে অর্থ রাখার সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর তার ২ বিলিয়ন ডলার নোট ইঁদুরে কেটে ফেলত। একবার শীতের রাতে পরিবার নিয়ে পালানোর সময় এসকোবারের মেয়ের শীত নিবারণের জন্য ১ ঘণ্টায় ২ মিলিয়ন ডলারের নোট পুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, সারা পৃথিবীর প্রায় সকল কোকেন তার মাধ্যমে সরবরাহ হলেও তিনি জীবনে কোন দিন কোকেন খেয়ে দেখেননি। ১৯৯৩ সনে কলম্বিয়া ও আমেরিকার কমান্ডোদের যৌথ অভিযানে গুলিতে এসকোবারের মৃত্যু হয়। অপরদিকে মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেল বা মাদক ব্যবসার লিডার এল চাপোর ছেলে মেক্সিকোর পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তার দলের সদস্যরা মেক্সিকো সিটি দখল করে শহরে সর্বত্র আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে, এমন অরাজকতা রোধ করতে না পেরে পুলিশ তার ছেলেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আমেরিকার মেরিন সেনারা যেই ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেও ঠিক সেই একই ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ, ট্যাঙ্ক, ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী কামান, হেলিকপ্টার, সাবমেরিন আছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে, তাদের কথামত আচরণ করলে এবং আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোন কাজ না করলে পৃথিবীর কোন দেশের শাসকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয় না, এমনকি মাদক ব্যবসা করলেও। প্রেসিডেন্ট ফুলগেনসিও বাতিস্তার আমলে কিউবা ছিল যৌন ব্যবসা, জুয়া আর মাদকের আড্ডাখানা, কিন্তু দেশ চালাতো আমেরিকার কথামতো, তাই তার বিরুদ্ধে আমেরিকার কোন অভিযোগ ছিল না। কিন্তু যেদিন তাকে সরিয়ে রাশিয়ার বন্ধু ফিদেল ক্যাস্ত্রো ক্ষমতায় আসল সেদিন থেকেই কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করল আমেরিকা। আমেরিকা নিজেকে গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলে বিশ্বে জাহির করে থাকে, কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, পৃথিবীর কোন দেশে গণতন্ত্র থাকা আমেরিকার স্বার্থের জন্য অপরিহার্য নয়; বরং গণতন্ত্র না থাকলেই আমেরিকার স্বার্থের অনুকূল হয়। এই কারণেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত মিশরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসিকে আমেরিকা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনীর আবদুল ফাতাহ আল সিসিকে ক্ষমতায় বসায়। আবার ক্ষমতায় বসে আমেরিকার স্বার্থ অনবচ্ছিন্নভাবে রক্ষা না করলেও আমেরিকার আশীর্বাদপুষ্ট শাসককে তারা বেশিদিন ক্ষমতায় রাখে না। পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন এবং যতদিন মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় নরিয়েগা একনিষ্ঠ ছিলেন ততদিন তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের কোন অভিযোগ ছিল না; কিন্তু যেদিন থেকে তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু করলেন, পানামা খালের উপর পানামার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেন সেদিন থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয়ে গেলেন এবং মাদক পাচারের দায়ে অভিযুক্ত হলেন।

লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অবাধ্য সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে শক্তি প্রয়োগ করে আমেরিকায় নিয়ে বিচার করার আরও নজির আছে; ২০২২ সনে হ-ুরাসের অবসরপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট অরল্যন্ডো হার্নান্দেজকে তার বাড়ি থেকে তুলে আমেরিকায় নিয়ে দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মতো আমেরিকা ১৯৮৯ সনে পানামায়ও সামারিক আগ্রাসন চালায়, প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েও বাঁচতে পারেননি, মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। আত্মসমর্পণের পর তাকে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে জেল খাটা শেষ হলে অর্থ পাচারের সাজা ভোগের জন্য তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়; এরপর হত্যা ও অন্যান্য অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে পানামায় ফেরত পাঠানো হয়, যেখানে তিনি বন্দী অবস্থায় ২০১৭ সনে ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে, তাদের কথামতো আচরণ করলে এবং আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোন কাজ না করলে পৃথিবীর কোন দেশের শাসকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হয় না, এমনকি মাদক ব্যবসা করলেও

শত্রু দমনে আমেরিকার ছলের অভাব হয় না; কোথাও জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে, আবার কোথাও অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ওপর নির্দ্ধিধায় আক্রমণ চালিয়েছে ইরাকে জনবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অজুহাতে জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে ইরাককে ধ্বংস করছে, ধ্বংস করেছে সিরিয়া, লিবিয়া এবং আফগানিস্তান। আমেরিকার স্বার্থ ও ইসরায়েল বিরোধী ইরানকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে শায়েস্তা করেছে, কিন্তু এখনো মাথানত না করায় ইরান আমেরিকার রোষ থেকে বাঁচতে পারবে বলে মনে হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অহর্নিশ অন্য দেশের স্বার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করছে- কিছুদিন আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা মাটির গভীরে ঢুকিয়ে অকেজো করে দিয়েছে, ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর বোমা ফেলেছে, ইউক্রেনকে ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য ‘করছি, করব’ বলে রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণে প্রলুব্ধ করে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কিউবার কাছে পাটের বস্তা বিক্রি করায় ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছে। আমেরিকা এত বেপরোয়া হয়ে গেছে যে, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডাকে ট্রাম্প আমেরিকার অঙ্গরাজ্য হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন এক সময় তাদের একক শক্তিতে আমেরিকার আধিপত্য থামিয়ে দিয়েছিল; কিন্তু এখন পারছে না। নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বিবেচনায় আমেরিকা হয়ে যায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইউরোপ সব সময়ই আমেরিকার আজ্ঞাবহ মহাদেশ, এছাড়াও আমেরিকার পাশে রয়েছে অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। রাশিয়া সম্প্রতি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললেও তাদের মিলিত শক্তিকে আমেরিকা খুব বেশি পাত্তা দিচ্ছে না। ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা মজবুত হলেও সামরিক শক্তি বিবেচনায় এখনো পরাশক্তির সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে আসতে পারেনি।

গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণের পর ধারণা করা হয়েছিল, ডনাল্ড ট্রাম্পের আশীর্বাদে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ভেনেজুয়েলার মারিয়া করিনা মাচাদোকে আমেরিকা ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে; কারণ ইতোমধ্যে তিনি ক্ষমতা পেলে ভেনিজুয়েলার মাটি ও খনিজ সম্পদ মার্কিনীদের হাতে নিঃশর্তে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প মাচাদোকে ‘জনসমর্থনহীন’ এবং ‘শ্রদ্ধার অযোগ্য’ অভিধায় অভিহিত করে বরং অপমান করেছেন।এই অবস্থায় ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ৯০ দিনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছে। রদ্রিগেজ তার অভিষেক ভাষণে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, তিনি আমেরিকার আগ্রাসনের কাছে নতি স্বীকার করবেন না এবং নিকোলা মাদুরোই থাকবেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে ট্রাম্প কড়া সুরে রদ্রিগেজকেও লক্ষ্য করে বলেছেন, তিনি যদি ঠিকমত কাজ না করেন তাহলে তাকেও মাদুরোর চেয়ে আরও বড় মূল্য চুকাতে হবে।

মনে হচ্ছে, রদ্রিগেজ কথা না শুনলে আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় পুনরায় সামরিক অভিযান চালাবে। আমেরিকাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ভেনেজুয়েলার নেই; আমেরিকা নিজ স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন, ভিন দেশের সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার কিছুরই ধার ধারে না।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top