সৈয়দ আমিরুজ্জামান
৭ জানুয়ারি। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক ভয়াবহ, বেদনাবিধুর ও জাতীয় ক্ষতির দিন টেংরাটিলা দিবস। ২০০৫ সালের এই দিনে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডের মধ্য দিয়ে দেশের অমূল্য গ্যাস সম্পদ, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঘটনার ২১ বছর পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আজও ক্ষতিপূরণ পায়নি, বরং তারা প্রতিনিয়ত বসবাস করছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত অনিশ্চয়তার মধ্যে।
একটি দুর্ঘটনা নয়, রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতিচ্ছবি
টেংরাটিলার বিস্ফোরণ কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়; এটি ছিল পরিকল্পিত অবহেলা, অদক্ষতা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী জ্বালানি নীতির অনিবার্য পরিণতি। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং পরবর্তী সময়ে ২৪ জুন কানাডিয়ান বহুজাতিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেড কর্তৃক পরিচালিত ছাতক-২ (টেংরাটিলা) কূপে রিলিফ ওয়েল খননের সময় দুই দফা ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। কয়েক মাস ধরে জ্বলতে থাকা আগুন শুধু আকাশ নয়, জ্বালিয়ে দেয় মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।
ছাতক গ্যাসক্ষেত্র: ইতিহাস ও সম্ভাবনার অপচয়
ছাতক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৯ সালে। ছাতক-১ কূপ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ এই গ্যাসক্ষেত্রে মোট মজুদ ছিল প্রায় ৩৩২ থেকে ৪০০ বিলিয়ন ঘনফুট, যার সিংহভাগ আজও উত্তোলিত হয়নি।
এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে পাশ কাটিয়ে তৎকালীন সরকার ২০০৩-২০০৪ সালে নাইকোকে ইজারা দেয়। এখানেই শুরু হয় সর্বনাশের বীজ বপন।
বিস্ফোরণের কারিগরি কারণ: তদন্ত প্রতিবেদন কী বলেছে
সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেংরাটিলা বিস্ফোরণের মূল কারণ ছিল
ত্রুটিপূর্ণ কূপ-নকশা
অনিরাপদ খনন পদ্ধতি
যথাযথ কেসিং না করা
গ্যাসস্তর থেকে পুলিং আউটের সময় চরম অবহেলা
ফলে গ্যাস নরম বালির স্তরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভূগর্ভ ফাটল দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে উপরে উঠে আসে। এ ঘটনা ১৯৯৭ সালের মাগুরছড়া বিস্ফোরণের হুবহু পুনরাবৃত্তি, যেখানে অক্সিডেন্টাল কোম্পানির একই ধরনের ত্রুটির কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
অথচ মাগুরছড়ার দুর্ঘটনার কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত হওয়ার মাত্র আট বছরের মাথায় সেই অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করেই টেংরাটিলায় একই ভুল করা হয়। এটি কি নিছক অদক্ষতা, নাকি পরিকল্পিত উদাসীনতা?
ক্ষতির পরিমাণ: অঙ্কের বাইরে যে ধ্বংস
টেংরাটিলা ব্লো-আউটে তিন ধরনের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে
১. গ্যাস সম্পদের ক্ষতি
নাইকো ও বাপেক্স যৌথভাবে পুনর্মূল্যায়নে জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত গ্যাসস্তরে ১১৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬,৭১৬ কোটি টাকা। পুরো ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসের বর্তমান বাজারমূল্য ধরা হয় প্রায় ২৩,৩৬০ কোটি টাকা।
২. পরিবেশ ও কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি
প্রায় ৩ হাজার একর ফলের বাগান, শতাধিক পুকুরের মাছ, ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেত ধ্বংস হয়। আজও সেখানে কোনো ফসল হয় না, গাছ লাগালে এক বছরের বেশি টেকে না। মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে।
৩. মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি
টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, ইসলামপুর, ভুজনা, আলীপুর, শান্তিপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রামের হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বসতবাড়ি, গবাদিপশু, পানির উৎস সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: নীরব গণহত্যার শামিল
জেলা সিভিল সার্জন অফিসের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়
শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত: ৪৫ জন
হৃদরোগ: ২২ জন
চর্মরোগ: ৩৬ জন
অন্যান্য রোগ: ২২ জন
মোট আক্রান্ত: ১২৯ জন।
স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি।
আজও টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক, যার ফলে চর্মরোগ, চুল পড়া, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগে ভুগছেন মানুষ।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের ভাষায়, ‘অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্যাস নির্গমন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
অনিরাপদ গ্যাস ব্যবহার: জীবনের ঝুঁকিতে মানুষ
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো-আজও গ্যাসফিল্ড-সংলগ্ন এলাকায় কিছু জলাশয় থেকে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হচ্ছে। শতাধিক পরিবার দেশীয় প্রযুক্তিতে অনিরাপদভাবে রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার করছে, যা যে কোনো সময় নতুন দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
সরকারি তদন্ত কমিটি নাইকোর ওপর মাত্র ১০ কোটি টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে যা ক্ষতির তুলনায় একটি উপহাস। মাগুরছড়ার মতো টেংরাটিলার ক্ষেত্রেও সরকার ক্ষতিপূরণ আদায়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকলেও ২১ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কিছুই পায়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলো একের পর এক মালিকানা বদল করে পার পেয়ে যাচ্ছে, আর রাষ্ট্র নির্বিকার দর্শক।
বাপেক্স বনাম বহুজাতিক কোম্পানি: ভুল নীতির খেসারত
বাংলাদেশের গ্যাসকূপ খননে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্স ইতোমধ্যে একাধিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও সফলভাবে উৎপাদন চালু রেখেছে ফেঞ্চুগঞ্জ, সালদানদী তার উদাহরণ।
প্রতিটি কূপে যেখানে খরচ মাত্র ৪০ কোটি টাকা, সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস মজুদ থাকা সত্ত্বেও ‘অর্থনৈতিক অসঙ্গতি’ দেখানো নিছক প্রতারণা।
উপসংহার: টেংরাটিলা আমাদের জন্য কী শিক্ষা রেখে গেল
টেংরাটিলা ব্লো-আউট কেবল একটি দুর্ঘটনা নয় এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দলিল।
২১ বছর পরও ক্ষতিপূরণহীন মানুষ, দূষিত পরিবেশ ও অব্যাহত স্বাস্থ্যঝুঁকি জাতীয় বিবেককে নাড়া দেয়ার কথা।
দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও মানুষের অধিকার রক্ষার স্বার্থেই
নাইকোর কাছ থেকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায়
ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসন
গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে বাপেক্সকে পূর্ণ দায়িত্ব প্রদান
বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে অসম চুক্তি বাতিল
এগুলো আর দাবি নয় জাতীয় প্রয়োজন। টেংরাটিলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জাতীয় সম্পদের প্রশ্নে অবহেলা মানেই ভবিষ্যতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
৭ জানুয়ারি। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক ভয়াবহ, বেদনাবিধুর ও জাতীয় ক্ষতির দিন টেংরাটিলা দিবস। ২০০৫ সালের এই দিনে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডের মধ্য দিয়ে দেশের অমূল্য গ্যাস সম্পদ, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঘটনার ২১ বছর পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আজও ক্ষতিপূরণ পায়নি, বরং তারা প্রতিনিয়ত বসবাস করছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত অনিশ্চয়তার মধ্যে।
একটি দুর্ঘটনা নয়, রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতিচ্ছবি
টেংরাটিলার বিস্ফোরণ কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়; এটি ছিল পরিকল্পিত অবহেলা, অদক্ষতা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী জ্বালানি নীতির অনিবার্য পরিণতি। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং পরবর্তী সময়ে ২৪ জুন কানাডিয়ান বহুজাতিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেড কর্তৃক পরিচালিত ছাতক-২ (টেংরাটিলা) কূপে রিলিফ ওয়েল খননের সময় দুই দফা ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। কয়েক মাস ধরে জ্বলতে থাকা আগুন শুধু আকাশ নয়, জ্বালিয়ে দেয় মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।
ছাতক গ্যাসক্ষেত্র: ইতিহাস ও সম্ভাবনার অপচয়
ছাতক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৯ সালে। ছাতক-১ কূপ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ এই গ্যাসক্ষেত্রে মোট মজুদ ছিল প্রায় ৩৩২ থেকে ৪০০ বিলিয়ন ঘনফুট, যার সিংহভাগ আজও উত্তোলিত হয়নি।
এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে পাশ কাটিয়ে তৎকালীন সরকার ২০০৩-২০০৪ সালে নাইকোকে ইজারা দেয়। এখানেই শুরু হয় সর্বনাশের বীজ বপন।
বিস্ফোরণের কারিগরি কারণ: তদন্ত প্রতিবেদন কী বলেছে
সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেংরাটিলা বিস্ফোরণের মূল কারণ ছিল
ত্রুটিপূর্ণ কূপ-নকশা
অনিরাপদ খনন পদ্ধতি
যথাযথ কেসিং না করা
গ্যাসস্তর থেকে পুলিং আউটের সময় চরম অবহেলা
ফলে গ্যাস নরম বালির স্তরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভূগর্ভ ফাটল দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে উপরে উঠে আসে। এ ঘটনা ১৯৯৭ সালের মাগুরছড়া বিস্ফোরণের হুবহু পুনরাবৃত্তি, যেখানে অক্সিডেন্টাল কোম্পানির একই ধরনের ত্রুটির কারণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
অথচ মাগুরছড়ার দুর্ঘটনার কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত হওয়ার মাত্র আট বছরের মাথায় সেই অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করেই টেংরাটিলায় একই ভুল করা হয়। এটি কি নিছক অদক্ষতা, নাকি পরিকল্পিত উদাসীনতা?
ক্ষতির পরিমাণ: অঙ্কের বাইরে যে ধ্বংস
টেংরাটিলা ব্লো-আউটে তিন ধরনের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে
১. গ্যাস সম্পদের ক্ষতি
নাইকো ও বাপেক্স যৌথভাবে পুনর্মূল্যায়নে জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত গ্যাসস্তরে ১১৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬,৭১৬ কোটি টাকা। পুরো ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসের বর্তমান বাজারমূল্য ধরা হয় প্রায় ২৩,৩৬০ কোটি টাকা।
২. পরিবেশ ও কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি
প্রায় ৩ হাজার একর ফলের বাগান, শতাধিক পুকুরের মাছ, ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেত ধ্বংস হয়। আজও সেখানে কোনো ফসল হয় না, গাছ লাগালে এক বছরের বেশি টেকে না। মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে।
৩. মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি
টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, ইসলামপুর, ভুজনা, আলীপুর, শান্তিপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রামের হাজারো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বসতবাড়ি, গবাদিপশু, পানির উৎস সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: নীরব গণহত্যার শামিল
জেলা সিভিল সার্জন অফিসের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়
শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত: ৪৫ জন
হৃদরোগ: ২২ জন
চর্মরোগ: ৩৬ জন
অন্যান্য রোগ: ২২ জন
মোট আক্রান্ত: ১২৯ জন।
স্থানীয়দের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি।
আজও টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক, যার ফলে চর্মরোগ, চুল পড়া, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগে ভুগছেন মানুষ।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের ভাষায়, ‘অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্যাস নির্গমন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।’
অনিরাপদ গ্যাস ব্যবহার: জীবনের ঝুঁকিতে মানুষ
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো-আজও গ্যাসফিল্ড-সংলগ্ন এলাকায় কিছু জলাশয় থেকে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হচ্ছে। শতাধিক পরিবার দেশীয় প্রযুক্তিতে অনিরাপদভাবে রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার করছে, যা যে কোনো সময় নতুন দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
সরকারি তদন্ত কমিটি নাইকোর ওপর মাত্র ১০ কোটি টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে যা ক্ষতির তুলনায় একটি উপহাস। মাগুরছড়ার মতো টেংরাটিলার ক্ষেত্রেও সরকার ক্ষতিপূরণ আদায়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকলেও ২১ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কিছুই পায়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলো একের পর এক মালিকানা বদল করে পার পেয়ে যাচ্ছে, আর রাষ্ট্র নির্বিকার দর্শক।
বাপেক্স বনাম বহুজাতিক কোম্পানি: ভুল নীতির খেসারত
বাংলাদেশের গ্যাসকূপ খননে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্স ইতোমধ্যে একাধিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও সফলভাবে উৎপাদন চালু রেখেছে ফেঞ্চুগঞ্জ, সালদানদী তার উদাহরণ।
প্রতিটি কূপে যেখানে খরচ মাত্র ৪০ কোটি টাকা, সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস মজুদ থাকা সত্ত্বেও ‘অর্থনৈতিক অসঙ্গতি’ দেখানো নিছক প্রতারণা।
উপসংহার: টেংরাটিলা আমাদের জন্য কী শিক্ষা রেখে গেল
টেংরাটিলা ব্লো-আউট কেবল একটি দুর্ঘটনা নয় এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দলিল।
২১ বছর পরও ক্ষতিপূরণহীন মানুষ, দূষিত পরিবেশ ও অব্যাহত স্বাস্থ্যঝুঁকি জাতীয় বিবেককে নাড়া দেয়ার কথা।
দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও মানুষের অধিকার রক্ষার স্বার্থেই
নাইকোর কাছ থেকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায়
ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসন
গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে বাপেক্সকে পূর্ণ দায়িত্ব প্রদান
বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে অসম চুক্তি বাতিল
এগুলো আর দাবি নয় জাতীয় প্রয়োজন। টেংরাটিলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জাতীয় সম্পদের প্রশ্নে অবহেলা মানেই ভবিষ্যতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
[লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি]