alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

শঙ্কর প্রসাদ দে

: শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

সৌরজগতে ধূমকেতুর চলাফেরা নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক ধূমকেতু কখন আমাদের দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করবে সেটিও বিজ্ঞানীরা দিনক্ষণসহ বলে দিচ্ছেন। এডমন্ড হ্যালি অন্ধকষে ১৭০৫ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- হ্যালির ধূমকেতুটি একবার খালি চোখে দেখা যাবে ১৯৮৬ সালে। ৭৫-৭৬ বছর পর আবার দেখা যাবে ২০৬১ সালে। অর্থাৎ প্রতি ৭৫-৭৬ বছরে হ্যালির ধূমকেতু আমাদের দৃশ্যপটে উপস্থিত হবে। বিশ্ববাসীর মতো আমি নিজেও খালি চোখে ১৯৮৬ দেখতে পেয়েছি হ্যালির ধূমকেতু। এটি এই প্রজন্মের জন্য শেষ দেখা। কারণ ২০৬১ সালে আবার যখন এটি উপস্থিত হবে তখন আমরা কেউই বেঁচে থাকব না।

এবারের বিষ্ময় ৩১/অঞখঅঝ। এটি ২৯-৩০ অক্টোবর সূর্যের কাছাকাছি অবস্থানে এসে পড়েছিল এবং ২৭০ মিলিয়ন কি.মি. দূর দিয়ে পৃথিবীকে অতিক্রম করেছে। এটির গতি হলো সেকেন্ডে ৬০ কি.মি.। তাই বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো সৌরজগতের কোন ধূমকেতুর পক্ষে এমন গতি সম্ভব নয়; অর্থাৎ সৌর পরিবারের বাইরের অন্য কোন সৌর পরিবার থেকে এটির আগমন ও ছুটে চলা। অবশ্য উৎপত্তি যেখানেই হোক এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কোন একটি সৌর পরিবার থেকে ছুটে এসেছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে সূর্য আছে লাখ লাখ। সুতরাং সৌর পরিবারের সংখ্যাও লাখ লাখ। আলোর গতিতে চললেও মিল্কিওয়ে অতিক্রমে লাগবে এক লাখ বছর। মিল্কিওয়েতে ছোটাছুটি করছে হ্যালির ধূমকেতুর মতো লাখ লাখ ছোট-বড় ধূমকেতু।

একজন বিজ্ঞানী আভাস দিয়েছেন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কোথাও না কোথাও পৃথিবীর মতো গ্রহ আছে। মানুষের মতো উন্নত সভ্যতা আছে। অর্থাৎ ভিনগ্রহের উন্নত মনুষ্যরাই এই ৩ও/অঞখঅঝ ধূমকেতু সদৃশ বস্তুটি ব্রহ্মান্ডে নিক্ষেপ করেছে। আমরা যেমন নিক্ষেপ করেছি ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২। যুক্তি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে অন্য দশটি ধূমকেতুর মতো এটির লেজ নেই। প্রাকৃতিক হলে অবশ্যই লেজ বা পুচ্ছ থাকতোই। বিজ্ঞানীদের অন্যগ্রুপ মনে করেন ৩ও/অঞখঅঝ এলিয়েন প্রেরিত ধূমকেতু সম্ভবত নয়। এলিয়েনরা যদি পাঠিয়েই থাকে তবে বুঝবো ব্রহ্মান্ডে আমাদের মতো উন্নত প্রাণ ও সভ্যতা আছে।

বিংশ শতাব্দীতে অন্যতম বিতর্কের বিষয় ছিল পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেছে? প্রাণ বিকাশের প্রাথমিক রাসায়নিক উপাদানগুলো নিতান্ত এই গ্রহের নিজস্ব নাকি ধূমকেতু বা উল্কাপিন্ডের মাধ্যমে অন্য গ্রহ থেকে এসে পতিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের ওপর বিজ্ঞানীরা মনে করছেন জীবনের বিল্ডিং ব্লকগুলো এসেছে ভিনগ্রহ থেকে। ২ বিলিয়ন বছর বয়সী এক উল্কাপিন্ড পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এখানে প্রাপ্ত উঘঅ মানুষের জিনগত উঘঅ কাঠামোর মতোই। এর অর্থ দাঁড়ায় মনুষ্য উঘঅ ভিনগ্রহ বা মহাবিশ্বের অন্য কোন উৎস থেকে পৃথিবীতে এসেছিল। লক্ষ-কোটি বছরের বিবর্তনে যা আজকের মনুষ্য সৃষ্টি প্রক্রিয়া বলবৎ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে সেদিন খুব নিকটবর্তী যেদিন বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করবেন মনুষ্য সদৃশ প্রজাতি এই সৌরজগৎ বা অন্য সৌরজগৎ বা অন্য গ্যালাক্সি বা অন্য ক্লাস্টার বা অন্য সুপার ক্লাস্টারে অবশ্যই আছে। ওইরূপ কোন আবিষ্কার আবির্ভূত হলে দুঃখ থাকবে আমাদের জীবদ্দশায় তা দেখে যেতে পারব না।

এডুইন হাবল আমার মতোই আইনজীবী ছিলেন। ছিলেন সৌখিন ফটোগ্রাফার। একদিন বসে পড়লেন দালানের ছাদে নিজের আবিষ্কৃত দূরবীন নিয়ে। শহরের বড় বড় বিজ্ঞানীদের ডেকে এনে দেখালেন মহাকাশের মহাকাশ। সবাই বিস্ময়ে দেখল গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ গ্যালাক্সিগুলো প্রসারণশীল। সহজভাবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে যত নক্ষত্র আছে, তারা একের কাছ থেকে অন্যটি সরে যাচ্ছে। তেমনি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি দূরে সরে যাচ্ছে। একইভাবে ব্রহ্মান্ডের লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি অনবরত ছুটছে একে অন্যের নিকট থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বা পালাচ্ছে।

হাবলের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে ঘোষণা করলেন, বেলজিয়াম পাদ্রি জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং তত্ত্বটিই সঠিক। হাবলের সম্প্রসারণ তত্ত্বকে উল্টো করে ভাবলে দেখা যায় সমস্ত ব্রহ্মান্ড একসময় এক বিন্দুতে স্থিত ছিল। এর নাম দেয়া হয়েছে সিঙ্গুলারিটি। অকল্পনীয় ঘনত্বের এই বিন্দুতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেকেন্ডের ভগ্নাংশে শুরু হয় সম্প্রসারণ। লিথিয়াম হিলিয়াম হাইড্রোজেন কার্বন ডাই-অক্সাইড অক্সিজেনসহ অজস্রর উপাদান রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি করেছে ধুলাবালি, উল্কাপিন্ড, ধূমকেতু, উপগ্রহ, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদি। বলা হচ্ছে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এই বিস্ফোরণ হয়েছিল। বিজ্ঞান বলছে এই সুন্দর পৃথিবী, পৃথিবীতে মানুষসহ যত প্রাণ আছে, সমস্ত জীবজগৎ এবং মহাকাশের সমস্ত গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি পদার্থবিদ্যার নিয়মানুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এখনো নতুন নতুন প্রাণের উদ্ভব হচ্ছে। বহু প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে বা বিলুপ্তির পথে। বহু নক্ষত্র মরে যাচ্ছে আবার নতুন নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে। আকাশে বিশেষ আলোর ঝলক দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন সূর্যের চেয়ে অনেক বড় নক্ষত্রের মৃত্যু হয়েছে। নক্ষত্রের এই শেষ পরিণতির নাম সুপারনোভা। বহুদিন ধরে ভাবছি ১৩.৮ বিলিয়ন বছর সময়টি বিজ্ঞানীরা মাপলেন কীভাবে? আসলে বিষয়টি খুব বেশি জটিল নয়; অনেকটাই সহজ। আইনস্টাইন বলেছিলেন ব্রহ্মান্ডে আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কিছুই নেই। আলো সেকেন্ডে ৩ লাখ কিলোমিটার অতিক্রম করে। এই হিসাব ধরে আলো এক বছরে যে পথ অতিক্রম করে তার দৈর্ঘ্য হলো ৯৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার। মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ তত্ত্ব বা বর্ণালির রেডশিপ ঘনত্ব ব্যবহার করে ব্রহ্মান্ডের এই বয়সসীমা নির্ধারিত হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষের পক্ষে ওইসব তত্ত্ব জানা বা বোঝার দরকার নেই। তবে ইদানীং বিজ্ঞানীরা বলছে বিগব্যাং মুহূর্ত্বে যে আলো ছুটতে শুরু করেছিল তা আজও নিশ্চয়ই ছুটছে। আজ হোক, কাল হোক জন্ম মুহূর্ত্বের সেই আলো ধরা পড়বেই। তরুণ বাঙালি বিজ্ঞানী লামিয়া মাওলা বলছেন বিগব্যাং মুহূর্তে কী ঘটেছিল তা মানুষ জানতে পারবে অতি নিকট ভবিষ্যতে।

সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি বা তত্ত্ব আছে; সেসব তত্ত্বে পৃথিবী চাঁদ সূর্যের বাইরে কোন বক্তব্য নেই। বিজ্ঞান গ্যালাক্সি, লোকাল গ্যালাক্সি বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বা সুপার ক্লাস্টারের মতো যেই অনন্ত মহাবিশ্বের কথা বলছে তা নিতান্তই বিজ্ঞানের বিষয়। পৃথিবীর যে জনগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা দেশ দ্রুতসময়ে বিজ্ঞানকে আয়ত্তে আনতে পারবে সেই জাতি হবে তত উন্নত ও সমৃদ্ধশালী।

[লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

স্বর্ণের মোহ ও মানবিক দ্বন্দ্ব

ভালোবাসার দেহধারণ: বড়দিনের তাৎপর্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

শঙ্কর প্রসাদ দে

শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

সৌরজগতে ধূমকেতুর চলাফেরা নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক ধূমকেতু কখন আমাদের দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করবে সেটিও বিজ্ঞানীরা দিনক্ষণসহ বলে দিচ্ছেন। এডমন্ড হ্যালি অন্ধকষে ১৭০৫ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- হ্যালির ধূমকেতুটি একবার খালি চোখে দেখা যাবে ১৯৮৬ সালে। ৭৫-৭৬ বছর পর আবার দেখা যাবে ২০৬১ সালে। অর্থাৎ প্রতি ৭৫-৭৬ বছরে হ্যালির ধূমকেতু আমাদের দৃশ্যপটে উপস্থিত হবে। বিশ্ববাসীর মতো আমি নিজেও খালি চোখে ১৯৮৬ দেখতে পেয়েছি হ্যালির ধূমকেতু। এটি এই প্রজন্মের জন্য শেষ দেখা। কারণ ২০৬১ সালে আবার যখন এটি উপস্থিত হবে তখন আমরা কেউই বেঁচে থাকব না।

এবারের বিষ্ময় ৩১/অঞখঅঝ। এটি ২৯-৩০ অক্টোবর সূর্যের কাছাকাছি অবস্থানে এসে পড়েছিল এবং ২৭০ মিলিয়ন কি.মি. দূর দিয়ে পৃথিবীকে অতিক্রম করেছে। এটির গতি হলো সেকেন্ডে ৬০ কি.মি.। তাই বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো সৌরজগতের কোন ধূমকেতুর পক্ষে এমন গতি সম্ভব নয়; অর্থাৎ সৌর পরিবারের বাইরের অন্য কোন সৌর পরিবার থেকে এটির আগমন ও ছুটে চলা। অবশ্য উৎপত্তি যেখানেই হোক এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কোন একটি সৌর পরিবার থেকে ছুটে এসেছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে সূর্য আছে লাখ লাখ। সুতরাং সৌর পরিবারের সংখ্যাও লাখ লাখ। আলোর গতিতে চললেও মিল্কিওয়ে অতিক্রমে লাগবে এক লাখ বছর। মিল্কিওয়েতে ছোটাছুটি করছে হ্যালির ধূমকেতুর মতো লাখ লাখ ছোট-বড় ধূমকেতু।

একজন বিজ্ঞানী আভাস দিয়েছেন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কোথাও না কোথাও পৃথিবীর মতো গ্রহ আছে। মানুষের মতো উন্নত সভ্যতা আছে। অর্থাৎ ভিনগ্রহের উন্নত মনুষ্যরাই এই ৩ও/অঞখঅঝ ধূমকেতু সদৃশ বস্তুটি ব্রহ্মান্ডে নিক্ষেপ করেছে। আমরা যেমন নিক্ষেপ করেছি ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২। যুক্তি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে অন্য দশটি ধূমকেতুর মতো এটির লেজ নেই। প্রাকৃতিক হলে অবশ্যই লেজ বা পুচ্ছ থাকতোই। বিজ্ঞানীদের অন্যগ্রুপ মনে করেন ৩ও/অঞখঅঝ এলিয়েন প্রেরিত ধূমকেতু সম্ভবত নয়। এলিয়েনরা যদি পাঠিয়েই থাকে তবে বুঝবো ব্রহ্মান্ডে আমাদের মতো উন্নত প্রাণ ও সভ্যতা আছে।

বিংশ শতাব্দীতে অন্যতম বিতর্কের বিষয় ছিল পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেছে? প্রাণ বিকাশের প্রাথমিক রাসায়নিক উপাদানগুলো নিতান্ত এই গ্রহের নিজস্ব নাকি ধূমকেতু বা উল্কাপিন্ডের মাধ্যমে অন্য গ্রহ থেকে এসে পতিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের ওপর বিজ্ঞানীরা মনে করছেন জীবনের বিল্ডিং ব্লকগুলো এসেছে ভিনগ্রহ থেকে। ২ বিলিয়ন বছর বয়সী এক উল্কাপিন্ড পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এখানে প্রাপ্ত উঘঅ মানুষের জিনগত উঘঅ কাঠামোর মতোই। এর অর্থ দাঁড়ায় মনুষ্য উঘঅ ভিনগ্রহ বা মহাবিশ্বের অন্য কোন উৎস থেকে পৃথিবীতে এসেছিল। লক্ষ-কোটি বছরের বিবর্তনে যা আজকের মনুষ্য সৃষ্টি প্রক্রিয়া বলবৎ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে সেদিন খুব নিকটবর্তী যেদিন বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করবেন মনুষ্য সদৃশ প্রজাতি এই সৌরজগৎ বা অন্য সৌরজগৎ বা অন্য গ্যালাক্সি বা অন্য ক্লাস্টার বা অন্য সুপার ক্লাস্টারে অবশ্যই আছে। ওইরূপ কোন আবিষ্কার আবির্ভূত হলে দুঃখ থাকবে আমাদের জীবদ্দশায় তা দেখে যেতে পারব না।

এডুইন হাবল আমার মতোই আইনজীবী ছিলেন। ছিলেন সৌখিন ফটোগ্রাফার। একদিন বসে পড়লেন দালানের ছাদে নিজের আবিষ্কৃত দূরবীন নিয়ে। শহরের বড় বড় বিজ্ঞানীদের ডেকে এনে দেখালেন মহাকাশের মহাকাশ। সবাই বিস্ময়ে দেখল গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ গ্যালাক্সিগুলো প্রসারণশীল। সহজভাবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে যত নক্ষত্র আছে, তারা একের কাছ থেকে অন্যটি সরে যাচ্ছে। তেমনি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি দূরে সরে যাচ্ছে। একইভাবে ব্রহ্মান্ডের লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি অনবরত ছুটছে একে অন্যের নিকট থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বা পালাচ্ছে।

হাবলের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে ঘোষণা করলেন, বেলজিয়াম পাদ্রি জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং তত্ত্বটিই সঠিক। হাবলের সম্প্রসারণ তত্ত্বকে উল্টো করে ভাবলে দেখা যায় সমস্ত ব্রহ্মান্ড একসময় এক বিন্দুতে স্থিত ছিল। এর নাম দেয়া হয়েছে সিঙ্গুলারিটি। অকল্পনীয় ঘনত্বের এই বিন্দুতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেকেন্ডের ভগ্নাংশে শুরু হয় সম্প্রসারণ। লিথিয়াম হিলিয়াম হাইড্রোজেন কার্বন ডাই-অক্সাইড অক্সিজেনসহ অজস্রর উপাদান রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি করেছে ধুলাবালি, উল্কাপিন্ড, ধূমকেতু, উপগ্রহ, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদি। বলা হচ্ছে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এই বিস্ফোরণ হয়েছিল। বিজ্ঞান বলছে এই সুন্দর পৃথিবী, পৃথিবীতে মানুষসহ যত প্রাণ আছে, সমস্ত জীবজগৎ এবং মহাকাশের সমস্ত গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি পদার্থবিদ্যার নিয়মানুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এখনো নতুন নতুন প্রাণের উদ্ভব হচ্ছে। বহু প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে বা বিলুপ্তির পথে। বহু নক্ষত্র মরে যাচ্ছে আবার নতুন নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে। আকাশে বিশেষ আলোর ঝলক দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন সূর্যের চেয়ে অনেক বড় নক্ষত্রের মৃত্যু হয়েছে। নক্ষত্রের এই শেষ পরিণতির নাম সুপারনোভা। বহুদিন ধরে ভাবছি ১৩.৮ বিলিয়ন বছর সময়টি বিজ্ঞানীরা মাপলেন কীভাবে? আসলে বিষয়টি খুব বেশি জটিল নয়; অনেকটাই সহজ। আইনস্টাইন বলেছিলেন ব্রহ্মান্ডে আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কিছুই নেই। আলো সেকেন্ডে ৩ লাখ কিলোমিটার অতিক্রম করে। এই হিসাব ধরে আলো এক বছরে যে পথ অতিক্রম করে তার দৈর্ঘ্য হলো ৯৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার। মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ তত্ত্ব বা বর্ণালির রেডশিপ ঘনত্ব ব্যবহার করে ব্রহ্মান্ডের এই বয়সসীমা নির্ধারিত হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষের পক্ষে ওইসব তত্ত্ব জানা বা বোঝার দরকার নেই। তবে ইদানীং বিজ্ঞানীরা বলছে বিগব্যাং মুহূর্ত্বে যে আলো ছুটতে শুরু করেছিল তা আজও নিশ্চয়ই ছুটছে। আজ হোক, কাল হোক জন্ম মুহূর্ত্বের সেই আলো ধরা পড়বেই। তরুণ বাঙালি বিজ্ঞানী লামিয়া মাওলা বলছেন বিগব্যাং মুহূর্তে কী ঘটেছিল তা মানুষ জানতে পারবে অতি নিকট ভবিষ্যতে।

সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি বা তত্ত্ব আছে; সেসব তত্ত্বে পৃথিবী চাঁদ সূর্যের বাইরে কোন বক্তব্য নেই। বিজ্ঞান গ্যালাক্সি, লোকাল গ্যালাক্সি বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বা সুপার ক্লাস্টারের মতো যেই অনন্ত মহাবিশ্বের কথা বলছে তা নিতান্তই বিজ্ঞানের বিষয়। পৃথিবীর যে জনগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা দেশ দ্রুতসময়ে বিজ্ঞানকে আয়ত্তে আনতে পারবে সেই জাতি হবে তত উন্নত ও সমৃদ্ধশালী।

[লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]

back to top