alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

এম এ হোসাইন

: রোববার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

মার্ক টোয়েন বলতেন, ইতিহাস নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না কিন্তু প্রায়শই ছন্দ মিলিয়ে ফিরে আসে। গত ৩ জানুয়ারি,২০২৬, ওয়াশিংটন সেই পুরনো সুরেই আঘাত করলো। ৩৬ বছর আগে মার্কিন সেনারা পানামার শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে শিকল পরিয়ে ফ্লোরিডায় নিয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার তিন দশকেরও বেশি সময় পর, লাতিন আমেরিকার আরেক রাষ্ট্রপ্রধানকে একই কায়দায় তুলে নেয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। এবার লক্ষ্য নিকোলা মাদুরো ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট। স্ত্রীসহ তাকে আটক করে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। তাদেরকে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য ছিল আইন প্রয়োগ। কিন্তু আড়ালের পাঠ ছিল ক্ষমতা। আর উদ্দেশ্য খুব একটা গোপন নয় জ্বালানি। মাদুরো অপসারণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সৌজন্য ঝেড়ে ফেলে সোজাসাপটা বললেন- যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের ভান্ডার ‘ব্যবহার’ করবে এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করবে। এই বক্তব্য আইনি বৈধতার চেয়ে উদ্দেশ্যের স্পষ্টতার গুরুত্ব বেশি। এখানে শাসন পরিবর্তনকে মানবিক হস্তক্ষেপ বা গণতান্ত্রিক উদ্ধার হিসেবে পেশ করা হয়নি। এটি উপস্থাপিত হয়েছে একধরনের লেনদেন হিসেবে, শৃঙ্খলার বিনিময়ে তেল, সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে জ্বালানি।

এই যুক্তির বংশপরম্পরা দীর্ঘ। ১৯৮৯ সালে নোরিয়েগার পতনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পানামা খাল ছিল কৌশলগত প্রাপ্তি। তৎকালীন সময়ে, কোনো রাষ্ট্রের শাসকের চরিত্র নয়, বরং একটি চোকপয়েন্টের নিয়ন্ত্রণই ছিল মুখ্য। ভেনেজুয়েলায় প্রাপ্তি মাটির নিচে। দেশটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল মজুতের ওপর বসে আছে সৌদি আরবের চেয়েও বড়। দশকের পর দশক ধরে এই বাস্তবতা ভেনেজুয়েলার রাজনীতি গড়েছে, অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিকে প্রয়োজনে অপরিহার্যও করেছে, আবার প্রয়োজন ফুরোলে বর্জনযোগ্যও করেছে।

মাদুরোর প্রকৃত অপরাধ স্বৈরতন্ত্র নয়। ওয়াশিংটন এর চেয়েও নিকৃষ্ট শাসন দীর্ঘদিন সহ্য করছে। তার মারাত্মক পাপ ছিল আদর্শিক অবাধ্যতার সঙ্গে বাস্তব শক্তির সমন্বয়। হুগো শাভেজের পথ অনুসরণ করে মাদুরো মার্কিন ডলারকে নিরপেক্ষ বিনিময়মাধ্যম নয়, বরং আমেরিকান ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ভেনেজুয়েলা ডলারের বাইরে গিয়ে জ্বালানি বাণিজ্যের উদ্যোগে যুক্ত হয়, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার কথা তোলে এবং ডলার আধিপত্য দুর্বল করতে আগ্রহী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সুর মেলায়।

এখানেই ইতিহাস শিক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা দিয়েছিলেন ইরাক ডলারের বদলে ইউরোতে তেল বিক্রি করবে। তিন বছর পর গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে ইরাকে আক্রমণ হয়, যে অস্ত্র কখনোই পাওয়া যায়নি। ইউরো পরীক্ষার সমাপ্তি ঘটে। ইরাকি তেল ফের ডলারে মূল্যায়িত হয়। ২০০৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি সোনাভিত্তিক আফ্রিকান দিনারের প্রস্তাব দেন যার মাধ্যমে ডলারের বাইরে তেল বাণিজ্য সম্ভব হতো। দুই বছর পর মানবিক সুরক্ষার নামে লিবিয়ার আকাশে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান উড়ল। অক্টোবরে গাদ্দাফি নিহত হলেন। লিবিয়া ডুবে গেল দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায়। তার তেল আবার ডলারে হিসাব হলো।

এই ধারাটি বুঝতে তেমন বেগ পেতে হয় না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ডলারভিত্তিক লেনদেনের যে মুদ্রা কাঠামো, তাকে চ্যালেঞ্জ করলে পরিণতি অবধারিত। কারণের ভিন্নতা থাকতে পারে সন্ত্রাস, মানবাধিকার, মাদক কিন্তু ফল প্রায় একই থাকে। মুদ্রাব্যবস্থা টিকে যায়; দেশটি টেকে না।

মাদুরো অভিযানের বিশেষত্ব তার উদ্দেশ্যে নয়, পদ্ধতিতে। এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্য সামরিক পদক্ষেপে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে অপসারণ করলো। মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে হস্তক্ষেপের ইতিহাস দীর্ঘ। দক্ষিণ আমেরিকায় সাধারণত চাপ, প্রক্সি বা অস্বীকারকৃত অভ্যুত্থানই ছিল পছন্দ। কিন্তু, এবার মুখোশ খুলে ফেলা হলো।

এই পরিবর্তন কেবল প্রেসিডেন্সিয়াল দম্ভের ফল নয়; এটি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে মার্কিন কৌশলের পুনঃসমন্বয়ের ইঙ্গিত। জিহাদি নেটওয়ার্কগুলো যখন কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে, তখন ওয়াশিংটন তার নিরাপত্তা তত্ত্বকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ ঘিরে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আল-কায়েদার জায়গা দখল করেছে আইন প্রয়োগের সমস্যা নয়, বরং অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে, যা তাদের সামরিক অভিযানের তথাকথিত বৈধতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

এই কাঠামোয় ভেনেজুয়েলা এক পরীক্ষাগার। আজ কারাকাস, কাল অন্য কোথাও। ট্রাম্পের ভাষা ইঙ্গিতবহ। তিনি পানামা খাল ‘ফিরিয়ে নেয়ার’ কথা বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তির প্রসঙ্গ তুলেছেন, কানাডাকে ৫১তম রাজ্য বলে ঠাট্টা করেছেন, এবং বারবার বলেছেন, ‘মেক্সিকো মাদক কারবারিদের দখলে।’ এই প্রশাসনে কথাবার্তা প্রায়শ্বই পরবর্তী অভিযানের মহড়ায় পরিণত হয়।

যারা মনে করেন এমন দৃঢ়তা আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরায়, তারা প্রকৃত অর্থে ভুল। বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল শক্তি প্রদর্শনে আসে না; আসে ফলাফলে। আর শাসন পরিবর্তনের ইতিহাস আশাব্যঞ্জক নয়। ইরাক স্থিতিশীল গণতন্ত্র হয়নি। লিবিয়া কার্যকর রাষ্ট্রে রূপ নেয়নি। আফগানিস্তান নির্ভরযোগ্য মিত্র হয়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শাসক অপসারণ সহজ ছিল; রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বিনির্মাণ কঠিন বা পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যভূষিত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলাও একই দ্বিধার মুখে। মাদুরো আটক হওয়ার পর দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই মাদুরোর মুক্তি দাবি করেন এবং তাকেই ভেনেজুয়েলার ‘একমাত্র প্রেসিডেন্ট’ বলেন। এটি রূপান্তরের চেয়ে বেশি ছিল অচলাবস্থা। যে প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই ভঙ্গুর ছিল, সেগুলো এখন চরম চাপে। নিষেধাজ্ঞা, কুশাসন ও অর্থপাচারের ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে। যে তেল উৎপাদনকে ওয়াশিংটন লোভনীয় বলে দাবি করছে, তা বলপ্রয়োগে স্থিতিশীল হয় না।

এটিকে গণতন্ত্র প্রসার হিসেবেও ভুল বোঝা উচিত নয়। ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলাকে ‘চালাবে’ এবং তেল আয়ের মাধ্যমে ব্যয় মেটাবে। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো ফিরবে, সম্পদের ক্ষতিপূরণ হবে, চুক্তি নতুন করে লেখা হবে। এটি নেশন-বিল্ডিং নয়; এটি ব্যালান্স-শিট রাজনীতি।

এই পদ্ধতির একটি নাম আছে এবং তা প্রশংসনীয় নয়, যা হলো শোষণ। জ্বালানি নিরাপত্তার নামে রাজনৈতিক আধিপত্যকে বৈধ ভাবা সাম্রাজ্যবাদের মতোই পুরনো কৌশল। স্থিতিশীলতা খুব কমই এসেছে; বরং এসেছে নির্ভরশীলতা, ক্ষোভ ও প্রতিরোধ। স্থানীয় জনগণ মূল্য দেয়; বিদেশি শক্তি লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে না পারলে সটকে পড়ে।

এতে অবশ্য মাদুরোর শাসনকে জনকল্যাণকর মনে করার কিছু নেই। তার অধীনে ভেনেজুয়েলা ছিল দমনমূলক, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু কুশাসন সার্বভৌমত্ব বাতিল করে না, আর ফৌজদারি অভিযোগ কোনো দেশের সম্পদের মালিকানা দেয় না। এখানে যে নজির স্থাপিত হচ্ছে, তা ভেনেজুয়েলার চেয়েও বড়। এটি জ্বালানিসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকে জানিয়ে দেয় স্বাধীনতা শর্তসাপেক্ষ। আর বিশ্বকে জানায় নিয়ম বেছে বেছে প্রয়োগ হয়।

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো এই কৌশল একধরনের অনিরাপত্তা প্রকাশ করে। আত্মবিশ্বাসী শক্তির তেল নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করতে হয় না। সে বিনিয়োগ করে, দর-কষাকষি করে, প্রতিযোগিতা করে। যে পরাশক্তি অপহরণের আশ্রয় নেয় তার পতন, সরবরাহ শৃঙ্খল ও পুরনো ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালানি আধুনিক অর্থনীতির প্রাণরস। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি যদি কেবল জ্বালানির চশমায় দেখা হয়, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই পথে আগেও হেঁটেছে। ফলাফল লেখা আছে বাগদাদের ধ্বংসস্তূপে, ত্রিপোলির বিশৃঙ্খলায়। শিগগিরই সেই তালিকায় কারাকাসও যুক্ত হতে পারে। ইতিহাস ছন্দবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু সে পুঞ্জীভূতও করে। প্রশ্নটি এই নয় যে আমেরিকা তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকে দখল করতে পারবে কিনা। প্রশ্নটি হলো, তারা কি বারবার এমনটা করার পরিণতি সহ্য করতে পারবে, এমন এক পৃথিবীতে যেখানে এখন আর আগের মতো কেউ একক নির্ভরশীল নয়।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

এম এ হোসাইন

রোববার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

মার্ক টোয়েন বলতেন, ইতিহাস নিজেকে হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না কিন্তু প্রায়শই ছন্দ মিলিয়ে ফিরে আসে। গত ৩ জানুয়ারি,২০২৬, ওয়াশিংটন সেই পুরনো সুরেই আঘাত করলো। ৩৬ বছর আগে মার্কিন সেনারা পানামার শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে শিকল পরিয়ে ফ্লোরিডায় নিয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার তিন দশকেরও বেশি সময় পর, লাতিন আমেরিকার আরেক রাষ্ট্রপ্রধানকে একই কায়দায় তুলে নেয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। এবার লক্ষ্য নিকোলা মাদুরো ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট। স্ত্রীসহ তাকে আটক করে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। তাদেরকে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য ছিল আইন প্রয়োগ। কিন্তু আড়ালের পাঠ ছিল ক্ষমতা। আর উদ্দেশ্য খুব একটা গোপন নয় জ্বালানি। মাদুরো অপসারণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সৌজন্য ঝেড়ে ফেলে সোজাসাপটা বললেন- যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের ভান্ডার ‘ব্যবহার’ করবে এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করবে। এই বক্তব্য আইনি বৈধতার চেয়ে উদ্দেশ্যের স্পষ্টতার গুরুত্ব বেশি। এখানে শাসন পরিবর্তনকে মানবিক হস্তক্ষেপ বা গণতান্ত্রিক উদ্ধার হিসেবে পেশ করা হয়নি। এটি উপস্থাপিত হয়েছে একধরনের লেনদেন হিসেবে, শৃঙ্খলার বিনিময়ে তেল, সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে জ্বালানি।

এই যুক্তির বংশপরম্পরা দীর্ঘ। ১৯৮৯ সালে নোরিয়েগার পতনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পানামা খাল ছিল কৌশলগত প্রাপ্তি। তৎকালীন সময়ে, কোনো রাষ্ট্রের শাসকের চরিত্র নয়, বরং একটি চোকপয়েন্টের নিয়ন্ত্রণই ছিল মুখ্য। ভেনেজুয়েলায় প্রাপ্তি মাটির নিচে। দেশটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল মজুতের ওপর বসে আছে সৌদি আরবের চেয়েও বড়। দশকের পর দশক ধরে এই বাস্তবতা ভেনেজুয়েলার রাজনীতি গড়েছে, অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিকে প্রয়োজনে অপরিহার্যও করেছে, আবার প্রয়োজন ফুরোলে বর্জনযোগ্যও করেছে।

মাদুরোর প্রকৃত অপরাধ স্বৈরতন্ত্র নয়। ওয়াশিংটন এর চেয়েও নিকৃষ্ট শাসন দীর্ঘদিন সহ্য করছে। তার মারাত্মক পাপ ছিল আদর্শিক অবাধ্যতার সঙ্গে বাস্তব শক্তির সমন্বয়। হুগো শাভেজের পথ অনুসরণ করে মাদুরো মার্কিন ডলারকে নিরপেক্ষ বিনিময়মাধ্যম নয়, বরং আমেরিকান ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ভেনেজুয়েলা ডলারের বাইরে গিয়ে জ্বালানি বাণিজ্যের উদ্যোগে যুক্ত হয়, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার কথা তোলে এবং ডলার আধিপত্য দুর্বল করতে আগ্রহী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সুর মেলায়।

এখানেই ইতিহাস শিক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা দিয়েছিলেন ইরাক ডলারের বদলে ইউরোতে তেল বিক্রি করবে। তিন বছর পর গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে ইরাকে আক্রমণ হয়, যে অস্ত্র কখনোই পাওয়া যায়নি। ইউরো পরীক্ষার সমাপ্তি ঘটে। ইরাকি তেল ফের ডলারে মূল্যায়িত হয়। ২০০৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি সোনাভিত্তিক আফ্রিকান দিনারের প্রস্তাব দেন যার মাধ্যমে ডলারের বাইরে তেল বাণিজ্য সম্ভব হতো। দুই বছর পর মানবিক সুরক্ষার নামে লিবিয়ার আকাশে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান উড়ল। অক্টোবরে গাদ্দাফি নিহত হলেন। লিবিয়া ডুবে গেল দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায়। তার তেল আবার ডলারে হিসাব হলো।

এই ধারাটি বুঝতে তেমন বেগ পেতে হয় না। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ডলারভিত্তিক লেনদেনের যে মুদ্রা কাঠামো, তাকে চ্যালেঞ্জ করলে পরিণতি অবধারিত। কারণের ভিন্নতা থাকতে পারে সন্ত্রাস, মানবাধিকার, মাদক কিন্তু ফল প্রায় একই থাকে। মুদ্রাব্যবস্থা টিকে যায়; দেশটি টেকে না।

মাদুরো অভিযানের বিশেষত্ব তার উদ্দেশ্যে নয়, পদ্ধতিতে। এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্য সামরিক পদক্ষেপে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে অপসারণ করলো। মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে হস্তক্ষেপের ইতিহাস দীর্ঘ। দক্ষিণ আমেরিকায় সাধারণত চাপ, প্রক্সি বা অস্বীকারকৃত অভ্যুত্থানই ছিল পছন্দ। কিন্তু, এবার মুখোশ খুলে ফেলা হলো।

এই পরিবর্তন কেবল প্রেসিডেন্সিয়াল দম্ভের ফল নয়; এটি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে মার্কিন কৌশলের পুনঃসমন্বয়ের ইঙ্গিত। জিহাদি নেটওয়ার্কগুলো যখন কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে, তখন ওয়াশিংটন তার নিরাপত্তা তত্ত্বকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ ঘিরে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আল-কায়েদার জায়গা দখল করেছে আইন প্রয়োগের সমস্যা নয়, বরং অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে, যা তাদের সামরিক অভিযানের তথাকথিত বৈধতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

এই কাঠামোয় ভেনেজুয়েলা এক পরীক্ষাগার। আজ কারাকাস, কাল অন্য কোথাও। ট্রাম্পের ভাষা ইঙ্গিতবহ। তিনি পানামা খাল ‘ফিরিয়ে নেয়ার’ কথা বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তির প্রসঙ্গ তুলেছেন, কানাডাকে ৫১তম রাজ্য বলে ঠাট্টা করেছেন, এবং বারবার বলেছেন, ‘মেক্সিকো মাদক কারবারিদের দখলে।’ এই প্রশাসনে কথাবার্তা প্রায়শ্বই পরবর্তী অভিযানের মহড়ায় পরিণত হয়।

যারা মনে করেন এমন দৃঢ়তা আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরায়, তারা প্রকৃত অর্থে ভুল। বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল শক্তি প্রদর্শনে আসে না; আসে ফলাফলে। আর শাসন পরিবর্তনের ইতিহাস আশাব্যঞ্জক নয়। ইরাক স্থিতিশীল গণতন্ত্র হয়নি। লিবিয়া কার্যকর রাষ্ট্রে রূপ নেয়নি। আফগানিস্তান নির্ভরযোগ্য মিত্র হয়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শাসক অপসারণ সহজ ছিল; রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বিনির্মাণ কঠিন বা পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যভূষিত হয়েছে।

ভেনেজুয়েলাও একই দ্বিধার মুখে। মাদুরো আটক হওয়ার পর দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই মাদুরোর মুক্তি দাবি করেন এবং তাকেই ভেনেজুয়েলার ‘একমাত্র প্রেসিডেন্ট’ বলেন। এটি রূপান্তরের চেয়ে বেশি ছিল অচলাবস্থা। যে প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই ভঙ্গুর ছিল, সেগুলো এখন চরম চাপে। নিষেধাজ্ঞা, কুশাসন ও অর্থপাচারের ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার মুখে। যে তেল উৎপাদনকে ওয়াশিংটন লোভনীয় বলে দাবি করছে, তা বলপ্রয়োগে স্থিতিশীল হয় না।

এটিকে গণতন্ত্র প্রসার হিসেবেও ভুল বোঝা উচিত নয়। ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলাকে ‘চালাবে’ এবং তেল আয়ের মাধ্যমে ব্যয় মেটাবে। মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো ফিরবে, সম্পদের ক্ষতিপূরণ হবে, চুক্তি নতুন করে লেখা হবে। এটি নেশন-বিল্ডিং নয়; এটি ব্যালান্স-শিট রাজনীতি।

এই পদ্ধতির একটি নাম আছে এবং তা প্রশংসনীয় নয়, যা হলো শোষণ। জ্বালানি নিরাপত্তার নামে রাজনৈতিক আধিপত্যকে বৈধ ভাবা সাম্রাজ্যবাদের মতোই পুরনো কৌশল। স্থিতিশীলতা খুব কমই এসেছে; বরং এসেছে নির্ভরশীলতা, ক্ষোভ ও প্রতিরোধ। স্থানীয় জনগণ মূল্য দেয়; বিদেশি শক্তি লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাতে না পারলে সটকে পড়ে।

এতে অবশ্য মাদুরোর শাসনকে জনকল্যাণকর মনে করার কিছু নেই। তার অধীনে ভেনেজুয়েলা ছিল দমনমূলক, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু কুশাসন সার্বভৌমত্ব বাতিল করে না, আর ফৌজদারি অভিযোগ কোনো দেশের সম্পদের মালিকানা দেয় না। এখানে যে নজির স্থাপিত হচ্ছে, তা ভেনেজুয়েলার চেয়েও বড়। এটি জ্বালানিসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকে জানিয়ে দেয় স্বাধীনতা শর্তসাপেক্ষ। আর বিশ্বকে জানায় নিয়ম বেছে বেছে প্রয়োগ হয়।

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো এই কৌশল একধরনের অনিরাপত্তা প্রকাশ করে। আত্মবিশ্বাসী শক্তির তেল নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করতে হয় না। সে বিনিয়োগ করে, দর-কষাকষি করে, প্রতিযোগিতা করে। যে পরাশক্তি অপহরণের আশ্রয় নেয় তার পতন, সরবরাহ শৃঙ্খল ও পুরনো ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালানি আধুনিক অর্থনীতির প্রাণরস। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি যদি কেবল জ্বালানির চশমায় দেখা হয়, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই পথে আগেও হেঁটেছে। ফলাফল লেখা আছে বাগদাদের ধ্বংসস্তূপে, ত্রিপোলির বিশৃঙ্খলায়। শিগগিরই সেই তালিকায় কারাকাসও যুক্ত হতে পারে। ইতিহাস ছন্দবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু সে পুঞ্জীভূতও করে। প্রশ্নটি এই নয় যে আমেরিকা তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকে দখল করতে পারবে কিনা। প্রশ্নটি হলো, তারা কি বারবার এমনটা করার পরিণতি সহ্য করতে পারবে, এমন এক পৃথিবীতে যেখানে এখন আর আগের মতো কেউ একক নির্ভরশীল নয়।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

back to top