alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

সুলতান মাহমুদ সরকার

: রোববার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ নামক ভূখ-টির জন্ম, বিকাশ ও টিকে থাকার ইতিহাসের সঙ্গে যে শব্দটি সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো কৃষি। নদীমাতৃক এই জনপদের মাটি, পানি, আবহাওয়া ও মানুষের জীবনযাপন সবকিছুই কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে শত শত বছর ধরে। কৃষি কেবল এ দেশের অর্থনীতির একটি খাত নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির শেকড়, সামাজিক জীবনের ভিত্তি, খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যত অর্থনৈতিক উত্থান-পতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক সংকট এসেছে প্রতিবারই কৃষি এই দেশকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচিয়েছে, টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।

কিন্তু সময় বদলেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, কৃষিজমি কমেছে, জলবায়ু পরিবর্তন আগ্রাসী রূপ নিয়েছে, বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির গতিপথ কোনদিকে যাচ্ছে? এটি কি আগের মতোই নীরবভাবে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, নাকি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৫ সালের কৃষি অর্থনীতির বাস্তব চিত্রের দিকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি নানা চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এই সংকটের মধ্যেও কৃষি খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে, যদিও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কৃষির ভূমিকা আরও বড়, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা এখনো কৃষিকেন্দ্রিক। অথচ কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছরে ২ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা উদ্বেগজনক।

এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, কৃষিজমির ক্রমাগত সংকোচন। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন প্রকল্প ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ, সেচ, বীজ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় কৃষকের লাভের অঙ্ক বাড়েনি। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অকাল বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ ফসল উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারপরও বাংলাদেশের কৃষি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। বরং সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষক উৎপাদন ধরে রেখেছেন। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, আলু, ফলবহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি। মাছ ও পোলট্রি খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ের ফল, আধুনিক কৃষি অর্থনীতির কাক্সিক্ষত রূপান্তরের ফল নয়।

২০২৬ সালের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয় বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে রয়েছে প্রযুক্তি, বাজার ও বৈশ্বিক চাহিদার নতুন সম্ভাবনা। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন পথটি বেছে নেব?

২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা বলে, কৃষি খাতকে অবহেলা করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিল্প ও সেবা খাত যতই বাড়–ক না কেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ আয় নিশ্চিত করতে কৃষির বিকল্প নেই। বিশেষ করে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে নিজস্ব খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা একটি কৌশলগত সম্পদ।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্টভাবে উঠে আসে। প্রথমত, সরকারী নীতির ভূমিকা। সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে কৃষি খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। সার ও বীজে ভর্তুকি, কৃষিঋণ বিতরণ, প্রণোদনামূলক ক্রয় এসব উদ্যোগ কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই নীতিগুলো কি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারছে, নাকি শুধু অস্থায়ী স্বস্তি দিচ্ছে?

২০২৬ সালে কৃষি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; মূল্য সংযোজন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি পণ্য এখনো মূলত কাঁচামাল আকারে বাজারে যায়। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র?্যান্ডিং দুর্বল। ফলে কৃষক ও দেশ উভয়ই ন্যায্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়।

অথচ সম্ভাবনা কম নয়। বিশ্বের বাজারে নিরাপদ খাদ্য, হালাল পণ্য, অর্গানিক কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের জলবায়ু ও শ্রমব্যবস্থা এসব খাতে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। শাকসবজি, ফল, মসলা, চা, ফুল, মাছ এইসব খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালে যদি নীতিগত সমর্থন ও অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায়, তবে কৃষি রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার। ডিজিটাল কৃষি, স্মার্ট সেচ, উন্নত বীজ, যান্ত্রিকীকরণ এসব বিষয় এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। কৃষকের বড় একটি অংশ এখনো আধুনিক প্রযুক্তির বাইরে। ২০২৬ সালে কৃষি অর্থনীতির গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ওপর। প্রযুক্তি শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, এটি ঝুঁকি কমায়, খরচ নিয়ন্ত্রণ করে এবং কৃষককে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে।

তবে প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষকের সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা সহজ নয়। এজন্য সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ, ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ অপরিহার্য।

২০২৬ সালে কৃষি অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রম ও জনসংখ্যার পরিবর্তন। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম কৃষিকে পেশা হিসেবে আকর্ষণীয় মনে করছে না। এর ফলে কৃষিতে শ্রম সংকট তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় কৃষিকে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

কৃষকের আয় বাড়ানো ছাড়া কৃষি অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির গল্প দিয়ে কৃষকের জীবনমান বদলায় না। ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণ সুবিধা, বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার এসব নিশ্চিত করতে না পারলে কৃষি খাত দুর্বলই থেকে যাবে।

২০২৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে উঠতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে আবহাওয়ার অস্থিরতা বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চলে খরা, হাওর এলাকায় অকাল বন্যা এই বৈচিত্রময় ঝুঁকি মোকাবিলা করতে না পারলে কৃষি উৎপাদন বড় ধাক্কা খেতে পারে। জলবায়ু সহনশীল জাত, অভিযোজনমূলক কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভবিষ্যৎ কৃষি অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে কয়েকটি মূল বিষয়ের ওপর তা হলো নীতির ধারাবাহিকতা, প্রযুক্তির প্রসার, বাজার সংস্কার, জলবায়ু অভিযোজন ও কৃষকের ক্ষমতায়ন। এই পাঁচটি স্তম্ভ যদি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে, তবে কৃষি অর্থনীতি শুধু টিকে থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এ কথা আমরা গর্ব করে বলি। কিন্তু সেই গর্বকে বাস্তব শক্তিতে রূপ দিতে হলে কৃষিকে শুধু ঐতিহ্য হিসেবে নয়, আধুনিক অর্থনীতির কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ২০২৬ সাল হতে পারে সেই রূপান্তরের সূচনা বিন্দু, যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুবই সহজ কৃষি ছাড়া বাংলাদেশ নয়, কৃষক ছাড়া অর্থনীতি নয়। এই মৌলিক সত্যকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের কৃষি অর্থনীতির পথচলা নির্ধারিত হওয়া উচিত। কৃষিকে অবহেলা করলে দেশ দুর্বল হবে, আর কৃষিকে শক্তিশালী করলে বাংলাদেশ আরও আত্মনির্ভরশীল ও স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

[লেখক: শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ]

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই

দিপু দাস হত্যাকাণ্ড ও মব সন্ত্রাস

ভোগের দৃশ্যপট: ঢাকায় আধুনিকতা কেন কেবল অল্প কিছু মানুষের জন্য?

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

সুলতান মাহমুদ সরকার

রোববার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ নামক ভূখ-টির জন্ম, বিকাশ ও টিকে থাকার ইতিহাসের সঙ্গে যে শব্দটি সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো কৃষি। নদীমাতৃক এই জনপদের মাটি, পানি, আবহাওয়া ও মানুষের জীবনযাপন সবকিছুই কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে শত শত বছর ধরে। কৃষি কেবল এ দেশের অর্থনীতির একটি খাত নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির শেকড়, সামাজিক জীবনের ভিত্তি, খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যত অর্থনৈতিক উত্থান-পতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক সংকট এসেছে প্রতিবারই কৃষি এই দেশকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচিয়েছে, টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।

কিন্তু সময় বদলেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, কৃষিজমি কমেছে, জলবায়ু পরিবর্তন আগ্রাসী রূপ নিয়েছে, বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির গতিপথ কোনদিকে যাচ্ছে? এটি কি আগের মতোই নীরবভাবে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাবে, নাকি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০২৫ সালের কৃষি অর্থনীতির বাস্তব চিত্রের দিকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি নানা চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এই সংকটের মধ্যেও কৃষি খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে, যদিও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কৃষির ভূমিকা আরও বড়, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা এখনো কৃষিকেন্দ্রিক। অথচ কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছরে ২ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে, যা উদ্বেগজনক।

এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, কৃষিজমির ক্রমাগত সংকোচন। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, আবাসন প্রকল্প ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ, সেচ, বীজ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় কৃষকের লাভের অঙ্ক বাড়েনি। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অকাল বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ ফসল উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারপরও বাংলাদেশের কৃষি পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েনি। বরং সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষক উৎপাদন ধরে রেখেছেন। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, আলু, ফলবহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি। মাছ ও পোলট্রি খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ের ফল, আধুনিক কৃষি অর্থনীতির কাক্সিক্ষত রূপান্তরের ফল নয়।

২০২৬ সালের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয় বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে রয়েছে প্রযুক্তি, বাজার ও বৈশ্বিক চাহিদার নতুন সম্ভাবনা। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন পথটি বেছে নেব?

২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা বলে, কৃষি খাতকে অবহেলা করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিল্প ও সেবা খাত যতই বাড়–ক না কেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ আয় নিশ্চিত করতে কৃষির বিকল্প নেই। বিশেষ করে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগে নিজস্ব খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা একটি কৌশলগত সম্পদ।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্টভাবে উঠে আসে। প্রথমত, সরকারী নীতির ভূমিকা। সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে কৃষি খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। সার ও বীজে ভর্তুকি, কৃষিঋণ বিতরণ, প্রণোদনামূলক ক্রয় এসব উদ্যোগ কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই নীতিগুলো কি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারছে, নাকি শুধু অস্থায়ী স্বস্তি দিচ্ছে?

২০২৬ সালে কৃষি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; মূল্য সংযোজন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি পণ্য এখনো মূলত কাঁচামাল আকারে বাজারে যায়। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র?্যান্ডিং দুর্বল। ফলে কৃষক ও দেশ উভয়ই ন্যায্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়।

অথচ সম্ভাবনা কম নয়। বিশ্বের বাজারে নিরাপদ খাদ্য, হালাল পণ্য, অর্গানিক কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের জলবায়ু ও শ্রমব্যবস্থা এসব খাতে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। শাকসবজি, ফল, মসলা, চা, ফুল, মাছ এইসব খাতে রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালে যদি নীতিগত সমর্থন ও অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায়, তবে কৃষি রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার। ডিজিটাল কৃষি, স্মার্ট সেচ, উন্নত বীজ, যান্ত্রিকীকরণ এসব বিষয় এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। কৃষকের বড় একটি অংশ এখনো আধুনিক প্রযুক্তির বাইরে। ২০২৬ সালে কৃষি অর্থনীতির গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ওপর। প্রযুক্তি শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, এটি ঝুঁকি কমায়, খরচ নিয়ন্ত্রণ করে এবং কৃষককে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে।

তবে প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষকের সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা সহজ নয়। এজন্য সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ, ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ অপরিহার্য।

২০২৬ সালে কৃষি অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রম ও জনসংখ্যার পরিবর্তন। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম কৃষিকে পেশা হিসেবে আকর্ষণীয় মনে করছে না। এর ফলে কৃষিতে শ্রম সংকট তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় কৃষিকে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

কৃষকের আয় বাড়ানো ছাড়া কৃষি অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির গল্প দিয়ে কৃষকের জীবনমান বদলায় না। ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণ সুবিধা, বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার এসব নিশ্চিত করতে না পারলে কৃষি খাত দুর্বলই থেকে যাবে।

২০২৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে উঠতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে আবহাওয়ার অস্থিরতা বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চলে খরা, হাওর এলাকায় অকাল বন্যা এই বৈচিত্রময় ঝুঁকি মোকাবিলা করতে না পারলে কৃষি উৎপাদন বড় ধাক্কা খেতে পারে। জলবায়ু সহনশীল জাত, অভিযোজনমূলক কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভবিষ্যৎ কৃষি অর্থনীতি কল্পনা করা যায় না।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে কয়েকটি মূল বিষয়ের ওপর তা হলো নীতির ধারাবাহিকতা, প্রযুক্তির প্রসার, বাজার সংস্কার, জলবায়ু অভিযোজন ও কৃষকের ক্ষমতায়ন। এই পাঁচটি স্তম্ভ যদি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে, তবে কৃষি অর্থনীতি শুধু টিকে থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এ কথা আমরা গর্ব করে বলি। কিন্তু সেই গর্বকে বাস্তব শক্তিতে রূপ দিতে হলে কৃষিকে শুধু ঐতিহ্য হিসেবে নয়, আধুনিক অর্থনীতির কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ২০২৬ সাল হতে পারে সেই রূপান্তরের সূচনা বিন্দু, যদি আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুবই সহজ কৃষি ছাড়া বাংলাদেশ নয়, কৃষক ছাড়া অর্থনীতি নয়। এই মৌলিক সত্যকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের কৃষি অর্থনীতির পথচলা নির্ধারিত হওয়া উচিত। কৃষিকে অবহেলা করলে দেশ দুর্বল হবে, আর কৃষিকে শক্তিশালী করলে বাংলাদেশ আরও আত্মনির্ভরশীল ও স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

[লেখক: শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ]

back to top