alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

: সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক ক্রমেই সহযোগিতা থেকে প্রতিযোগিতা এবং প্রতিযোগিতা থেকে কাঠামোগত সংঘাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই দ্বন্ধের কেন্দ্রে রয়েছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। এক সময় শুল্ক আরোপ, বাণিজ্য ঘাটতি ও বাজার প্রবেশাধিকারের মতো ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকা যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধ আজ রূপ নিয়েছে গভীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্ধিতায়। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথকে নতুনভাবে নির্ধারণ করছে।

১. বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা

প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য ভারসাম্য পুনর্গঠন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি করেন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। এরই ধারাবাহিকতায় উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-সংক্রান্ত প্রযুক্তির ওপর কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সামরিক আধুনিকায়নকে সীমিত করতে চাইছে। জবাবে চীন ‘স্বনির্ভর প্রযুক্তি’ নীতিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে এবং দেশীয় উদ্ভাবন, গবেষণা ও শিল্পোন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে তথাকথিত ‘চিপ যুদ্ধ’ শুধু শিল্পগত প্রতিযোগিতা নয়; এটি সামরিক শক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।

২. প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পুনর্গঠন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের দীর্ঘদিনের আন্তঃনির্ভরশীল কাঠামোকে ভেঙে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, যা একাধিক দেশ ও অঞ্চলের সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত জোট গড়ে তুলে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে চীন বিকল্প বাজার, নিজস্ব প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গতি শ্লথ হওয়া এবং বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো এই নতুন সরবরাহ কাঠামোর মধ্যে কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে জটিল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হচ্ছে।

৩. বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র—চীন প্রযুক্তি ও বাণিজ্য দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহে পুনর্বিন্যাস, বাজার বিভাজন বা ‘সিলেকটিভ ডিকাপলিং’ এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-সহ বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি দ্বিধাবিভক্ত কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক ক্রমেই রাজনৈতিক জোট ও কৌশলগত আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এর ফলে মুক্ত বাণিজ্য ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার যে ধারণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি ছিল, তা নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

৪. ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অভিঘাত

যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধের এই নতুন অধ্যায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির পুনর্বিন্যাসকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রযুক্তিগত আধিপত্য ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান নির্ধারকে পরিণত হওয়ায় এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই দ্বন্দ্ব শুধু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোকে এই প্রতিযোগিতার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুধু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি আধুনিক ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, চিপ যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পুনর্গঠন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাস্তববাদী কূটনীতি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং কৌশলগত অভিযোজন অপরিহার্য—যাতে তারা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেদের স্বার্থ, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

[লেখক: আইনজীবী]

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

পেঁয়াজ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি

মাধ্যমিকে অব্যবস্থাপনা

‘কক অ্যান্ড বুল স্টোরি’

মব সংস্কৃতি, ন্যায়বিচারের সংকট ও সমাজের আত্মক্ষয়

শীতকালীন জীবন: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতা

অ্যালগরিদমের রাজনীতি

চারদিকে আতঙ্ক আর শঙ্কা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

জাহাঙ্গীর আলম সরকার

সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক ক্রমেই সহযোগিতা থেকে প্রতিযোগিতা এবং প্রতিযোগিতা থেকে কাঠামোগত সংঘাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই দ্বন্ধের কেন্দ্রে রয়েছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। এক সময় শুল্ক আরোপ, বাণিজ্য ঘাটতি ও বাজার প্রবেশাধিকারের মতো ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকা যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধ আজ রূপ নিয়েছে গভীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্ধিতায়। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথকে নতুনভাবে নির্ধারণ করছে।

১. বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা

প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য ভারসাম্য পুনর্গঠন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি করেন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। এরই ধারাবাহিকতায় উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-সংক্রান্ত প্রযুক্তির ওপর কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সামরিক আধুনিকায়নকে সীমিত করতে চাইছে। জবাবে চীন ‘স্বনির্ভর প্রযুক্তি’ নীতিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে এবং দেশীয় উদ্ভাবন, গবেষণা ও শিল্পোন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে তথাকথিত ‘চিপ যুদ্ধ’ শুধু শিল্পগত প্রতিযোগিতা নয়; এটি সামরিক শক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।

২. প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পুনর্গঠন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের দীর্ঘদিনের আন্তঃনির্ভরশীল কাঠামোকে ভেঙে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, যা একাধিক দেশ ও অঞ্চলের সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত জোট গড়ে তুলে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে চীন বিকল্প বাজার, নিজস্ব প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গতি শ্লথ হওয়া এবং বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো এই নতুন সরবরাহ কাঠামোর মধ্যে কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে জটিল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হচ্ছে।

৩. বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র—চীন প্রযুক্তি ও বাণিজ্য দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহে পুনর্বিন্যাস, বাজার বিভাজন বা ‘সিলেকটিভ ডিকাপলিং’ এবং অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-সহ বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি দ্বিধাবিভক্ত কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক ক্রমেই রাজনৈতিক জোট ও কৌশলগত আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এর ফলে মুক্ত বাণিজ্য ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার যে ধারণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি ছিল, তা নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

৪. ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অভিঘাত

যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধের এই নতুন অধ্যায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির পুনর্বিন্যাসকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রযুক্তিগত আধিপত্য ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান নির্ধারকে পরিণত হওয়ায় এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই দ্বন্দ্ব শুধু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোকে এই প্রতিযোগিতার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র—চীন বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুধু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি আধুনিক ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, চিপ যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের পুনর্গঠন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাস্তববাদী কূটনীতি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং কৌশলগত অভিযোজন অপরিহার্য—যাতে তারা পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নিজেদের স্বার্থ, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

[লেখক: আইনজীবী]

back to top