বর্তমানে ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট শব্দগুলোর সাথে সাধারণ মানুষ বেশ পরিচিত। এই শব্দগুলো শুনলেই মাথায় ঘোরাফেরা করে হাজারও চিন্তা । কি জন্য বা কি পরিস্থিতিতে রোগীর জন্য এ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়; ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট থেকে রোগী কি আদৌ কি সুস্থ হয়? এই ধরনের হাজারও প্রশ্ন চিকিৎসকদের করেন রোগীর পরিবার, কিংবা এ নিয়ে কথকতা ও আশঙ্কা জনমানুষের মনে।
আমরা অনেকে ভাবি ভেন্টিলেশনে মানে আর বাঁচার আশা নেই। বাস্তবে সেটা নয়। কেউ ভেন্টিলেশনে রয়েছেন মানে তিনি অন্য সাধারণ রোগীর থেকে গুরুতরভাবে অসুস্থ। ভেন্টিলেশন একধরনের সাপোর্ট সিস্টেম। মানুষ যখন শ্বাস নিতে পারেন না, কিংবা তার শ্বাস নেয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, তখন তাকে ভেন্টিলেটর যন্ত্রে দেয়া হয়
আমরা অনেকে ভাবি ভেন্টিলেশনে মানে আর বাঁচার আশা নেই। বাস্তবে সেটা নয়। কেউ ভেন্টিলেশনে রয়েছেন মানে তিনি অন্য সাধারণ রোগীর থেকে গুরুতরভাবে অসুস্থ । ভেন্টিলেশন একধরনের সাপোর্ট সিস্টেম । মানুষ যখন শ্বাস নিতে পারেন না, কিংবা তাঁর শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, তখন তাঁকে ভেন্টিলেটর যন্ত্রে দেওয়া হয়।
ফুসফুসে যদি কোনও বড় সমস্যা থাকে, যেমন তীব্র নিউমোনিয়া অথবা যেসব রোগীর অজ্ঞান অবস্থায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে এবং রোগী নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না বা নিলেও শ্বাসনালি ঠিকমতো কাজ করে না; সাধারনত এসব কারণে রোগীকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয় ।
তবে কিছু সময় স্নায়ু রোগ জনিত সমস্যা থাকলেও ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে চিকিৎসা সেবার উন্নতির ছোঁয়ার শুরুর দিকেই কিন্তু এ প্রযুক্তির ব্যবহার ছিলনা। এমনকি, ১৯৫২ সালের আগে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিকিৎসা সেবায় নিযুক্তগণ আয়রন লাং (lung) নামক এক যন্ত্রের সাথে পরিচিত ছিল, যা দিয়ে শ্বাস নিতে অক্ষম-এমন রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হতো।
আয়রন লাং ছিল একধরনের নেগেটিভ প্রেসার ভেন্টিলেটর। ১৯২৮ সালে ফিলিপ ড্রিঙ্কার ও লুইস আগাসি শ’ নামে দুজন বিজ্ঞানী আয়রন লাং বা ড্রিঙ্কার ট্যাংক এর তৈরি করেন। তখনকার ভেন্টিলেটর হিসেবে পরিচিত এই আয়রন লাং বা ড্রিঙ্কার ট্যাংক ছিল বিশালাকার। এটি ছিল লোহার ট্যাংকের ভেতরে একটা বিছানা। রোগীকে সেখানে শোয়ানো হতো। তারপর সিল করে দেওয়া হতো ট্যাংকটি। শুধু মাথা ও গলা বেরিয়ে থাকত। ওখান দিয়ে যাতে বাতাস যাওয়া-আসা করতে না পারে, সেজন্য রাবার দিয়ে সিল করা থাকত গলার চারপাশে। একটা মোটর দিয়ে চালানো হতো এই আয়রন ট্যাংক। মোটরটি ট্যাংকের ভেতরে, রোগীর দেহের চারপাশের বাতাস বের করে নিত। ফলে, তৈরি হতো আংশিক ভ্যাকুয়াম। এভাবে রোগীর দেহের চারপাশের বদ্ধ জায়গাটুকুতে রুমের তুলনায় নেগেটিভ চাপ তৈরি করা হতো। সংকুচিত হয়ে যেত রোগীর ডায়াফ্রাম। ফলে, ফুসফুস ট্যাংকের বাইরে থাকা নাক ও মুখের মাধ্যমে শ্বাস টেনে নিত । আবার, সেটা বের করে দেয়ার জন্য ভেতরের বাতাসের উপর রুমের বায়ুম-লীয় চাপ থেকে বেশি চাপ দেয়া হতো। ফলে, বেরিয়ে যেত ফুসফুসের বাতাস। এভাবেই, আয়রন লাংনির্ভর চিকিৎসা চলছিল ১৯৫২ সাল পর্যন্ত।
১৯২৮ – ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের দেশে দেশে পোলিও আক্রান্তদের মৃত্যুহার ছিল অনেক বেশি। ১৯২৮ সালে বোস্টনের স্কুল অফ পাবলিক হেলথের চিকিৎসক ফিলিপ ড্রিঙ্কার ও ল্যুইস অ্যাগাসিস নামে দ্#৩৯;জন চিকিৎসক আয়রন লাংস নামে প্রথম মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর আবিষ্কার করেন। এর বহুদিন পরে ১৯৫২ সালে কোপেনহেগেনে পোলিওর মহামারি শুরু হয়। সেখানকার ব্লেগদাম হাসপাতালে পোলিও আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় নব্বই শতাংশ শ্বাসনালীর পেশি অকেজো হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
সেই সময় ইয়ন ইবসেন নামে এক অ্যানেস্থেশিয়া বিশেশজ্ঞ চিকিৎসক আধুনিক ভেন্টিলেটর তৈরি করেন ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে। নিজের উদ্যোগে বানানো সেই ভেন্টিলেটর ব্যবহার করে এক বছরের মধ্যেই পোলিওতে মৃত্যুহার নেমে আসে ১১%-এ। তারপর প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এসেছে এখনকার অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর। এর সাহায্যে অজস্র মুমুর্ষু রোগীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
রোগীর স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভেন্টিলেটর ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, রোগীর বড় অস্ত্রোপচারের সময় অজ্ঞান করা অবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে, অজ্ঞান অবস্থা থেকে জেগে ওঠা পর্যন্ত ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হঠাৎ অথবা দীর্ঘস্থায়ী যে কোন অসুস্থতা যথা; মস্তিষ্কে স্ট্রোক, তীব্র নিউমোনিয়া, ঈঙচউ (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), অজউঝ (তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা সিন্ড্রোম), তীব্র অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া (অ্যানাফিল্যাক্সিস) ইত্যাদি কারণে রোগী অনেক সময় নিজে নিজে শ্বাস নিতে পারেনা। এসব রোগীদের ভেন্টিলেটর সাপোর্টের প্রয়োজন হয়ে থাকে। স্নায়ু এবং পেশীগুলিকে প্রভাবিত করে এমন রোগ (যেমন গুইলেন-বারি সিন্ড্রোম) বা কোমা অবস্থায় রোগীর শ্বাসযন্ত্রকে সচল রাখার প্রয়োজনে ভেন্টিলেটরের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রয়োজন রয়েছে, এমন রোগীকে ভেন্টিলেশন দিতে দেরী হলে রোগের জটিলতা বাড়ে। কয়েকটি মিনিট বা কয়েকটি ঘন্টার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় অক্সিজেনের অভাবে দেহকোষের বিপাক ক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজনীয়তার নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আত্মীয়দের মতামত নিতেও বিলম্ব ঘটে।
ভেন্টিলেটর ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী অসুখ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা, হার্টের সমস্যা, যেমন হার্ট ফেলিওর, শরীরের পুষ্টি, গলার, জিভের ও বুকের মাংসপেশির শক্তি, রোগীর স্নায়বিক অবস্থা ও চেতনা, ইত্যাদি নানবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য রাখা হয়।
রোগ নিরাময়ে বিভিন্ন ঔষধ ও যন্ত্রপাতির মত ভেন্টিলেটর ব্যবহারেরও ঝুঁকি রয়েছে। ভেন্টিলেটরের শ্বাস-প্রশ্বাসের নলের মাধ্যমে ফুসফুসে সংক্রামক জীবাণু প্রবেশ করে নিউমোনিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একে বলা হয় ভেন্টিলেটর-সম্পর্কিত নিউমোনিয়া (VAP)। ফুসফুসের ক্ষত সৃষ্টি বা অক্সিজেনের চাপ বা পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ফুসফুসে ক্ষতি সাধন হতে পারে এবং নিউমোথোরাক্স অথবা ফুসফুসে তরল জমে পালমোনারি এডিমা রোগ সৃষ্টি হতে পারে। সাধারনের মধ্যে ধারনা আছে যে, রোগীকে ভেন্টিলেশনে দিলে সাধারনত আর বেঁচে ফেরত আসে না। এই ধারণা সঠিক নয়। আমেরিকার মত উন্নত স্বাস্থ্যসেবার দেশেও গড়ে বছরে ৮ লাখ মানুষের ওঈট তে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট প্রয়োজন পড়ে। বিখ্যাত (CHEST) মেডিক্যাল জার্নাল এ বিষয়ে এক নিবন্ধে ভেন্টিলেশনে ছিল এমন ৩৮৩ জন রোগীর মধ্যে ৬২% ভেন্টিলেশন মুক্ত করার তথ্য প্রকাশ করেছে।
তাইওয়ানের একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেশন ব্যবহার করা ১৩০৭ জনের মধ্যে ১০০৭ জনের পরবর্তীতে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয়নি। ফিজিশিয়ানদের জার্নাল ঔঅচও-তে প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান বলেছে যে, ওঈট তে ভর্তি ১১৫০ জন রোগীর মধ্যে যে ৩৯৭ জন ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে, যাদের ৫৭.৭৫% ই ভেন্টিলেশন থেকে মুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের হাসপাতালসমূহে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি সংখ্যক ভেন্টিলেটর রয়েছে। সব হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সুলভ নয়, তথাপি শেষ মুহূর্তে ভেন্টিলেটর ব্যবহারের পরও প্রায় সিংহভাগ রোগী সুস্থ হওয়ার তথ্য রয়েছে।
যদিও ভেন্টিলেটরে থাকা রোগীদের আরোগ্যের হার মূলত তাদের শারীরিক অবস্থা এবং রোগের গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে আইসিইউ-তে ভেন্টিলেটর বা যান্ত্রিক শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা পাওয়া রোগীদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার হার প্রায় ৬৩%। ভেন্টিলেটর ব্যবহারে অস্ত্রোপচার পরবর্তী রোগীদের ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার হার বেশি। প্রায় ৬৯%। ভেন্টিলেটর গ্রহণ করা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৭% এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলক কম, প্রায় ১৭%।
লাইফ সাপোর্ট (Life Support) বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলেও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের বাইরে এর সম্বন্ধে ধারনা, ব্যবহার, অপব্যবহার, আইনগত দিকসহ প্রচলিত ধ্যান-ধারনা নিয়ে ভুল ধারনা রয়েছে। যখন শরীরের এক বা একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে যায় তখন জীবন বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তাকে টিকিয়ে রাখা হয়। এটাকেই লাইফ সাপোর্ট বলে। এটা স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ বা তন্ত্রকে যথেষ্ট সময় দেওয়া যাতে ঐ অঙ্গটি পুনরায় কর্মক্ষম হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। অঙ্গগুলির মধ্যে হার্ট, লাংস, কিডনী ইত্যাদিই প্রধান; তবে কৃত্রিমভাবে শরীরের পুষ্টি, পানি এবং লবণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাও লাইফ সাপোর্টের আওতায় আসে। জীবন বাঁচাতে চিকিৎসা সেবাসমূহ বিভিন্ন স্তরের লাইফ সাপোর্ট হিসাবে গন্য করা হয়।
কার্ডিয়াক এরেস্ট বা হঠাৎ করে হার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কারণেই হতে পারে। হার্টের রক্তনালীতে ব্লক থাকা, ছন্দপতন হওয়া, লবনের তারতম্য, ইলেকট্রিক শক, লাংসের রোগের কারনে হার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই যে পদ্ধতির মাধ্যমে হার্ট এবং লাংসের কাজ ফেরত আনা হয় সেটাকে বলা হয় বেসিক লাইফ সাপোর্ট। অইঈ (Airway, Breathing, Circulation) ক্রমানুসারে এ লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়। এতে বুক চেপে চেপে হার্টকে সচল করা হয় (বয়সানুসারে এটা মিনিটে ১০০ থেকে ১৩০ বার হতে পারে, মুখ দিয়ে শ্বাসনালীতে বাতাস পাম্প করা হয়(প্রতি ১৫ বার হার্ট চাপার পর ২ বার মুখে শ্বাস দেওয়া হয়)। অনেক সময় এতেই হার্ট এবং লাংসের কাজ ফেরত আসতে পারে নইলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। শুধুমাত্র নয়, বেসিক লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার জন্য টেকনিশিয়ান, নার্স, ভলান্টিয়ার, এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠিকে প্রশিক্ষন দেওয়া হয় এবং বিদেশে বিভিন্ন শপিং মলে ডিফিব্রিলেটরসহ রিসাসসিটেশন টিম অপেক্ষমান থাকেন। এর ফলে অকস্মাৎ মৃত্যুর হাত থেকে অনেক মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
অনেকসময় বেসিক লাইফ সাপোর্ট জীবন বাঁচিয়ে রাখলেও এটা হার্টের মূল সমস্যা যেমন মারাত্মক ধরনের ছন্দপতন নির্মূল করতে পারেনা। এক্ষেত্রে ডিফিব্রিলেটর (উবভরনৎরষষধঃড়ৎ) মেশিনের সাহায্য নিয়ে বুকের উপর ইলেকট্রিক শক প্রয়োগ করা হয়। এতে বড় ধরনের কারেন্টের প্রভাবে হার্টের সমস্ত ইলেক্ট্রিক্যাল কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, অব্যবহিত পরেই হার্ট তার নিজস্ব ছন্দে আবার কাজ শুরু করে।
এ ছাড়া রোগীর চরম সংকটময় অবস্থায় শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিলে এবং রক্তে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা রক্ষা করতে না পারে এই অবস্থাকে আমরা বলি রেস্পিরেটরি ফেইলর। সেই অবস্থায় শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখার প্রক্রিয়া হলো ভেন্টিলেশন, যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেটাকে বলে লাইফ সাপোর্ট।
অর্থাৎ চিকিৎসাসেবার ভাষায়, লাইফ সাপোর্ট হলো বিশেষায়িত সরঞ্জামের মাধ্যমে শরীরের বিকল অঙ্গগুলোর অপরিহার্য কাজগুলো সচল রাখা। এর মধ্যে ফুসফুস, হৃৎপি-, কিডনি অথবা এ সবকটির সাপোর্ট অন্তর্ভুক্ত। ফুসফুস তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেললে সাপোর্টের জন্য ভেন্টিলেশন মেশিন ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ভেন্টিলেশনে থাকা মানে এক প্রকার লাইফ সাপোর্টে থাকা। কিডনির জন্য বিভিন্ন ধরনের ডায়ালাইসিস মেশিন, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের বিকল্প হিসেবে ইসিএমও মেশিন ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ঊঈগঙ আছে। যেমন ভেনোভেনাস (Venovenus) শুধুমাত্র লাংসকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য, আবার ভেনো আর্টেরিয়াল (Venoarterial) ঊঈগঙ দিয়ে হার্ট-
লাংস উভয়কেই সাপোর্ট দেওয়া যায়। এ ছাড়া হার্টের পাম্পের ছন্দ বজায় রাখতে ওঅইচ (IntraaorticBalloon Pump) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হার্টের বাম দিককে সাহায্য করার জন্য (LVAD- Left Ventricular Assist Device), ডান দিককে সচল রাখার জন্য (RVAD- Right Ventricular Assist Device) অথবা উভয় ভেন্ট্রিকলকে সচল রাখতে Biventricular Assist Device প্রভৃতি পরিসেবাগুলোও লাইফ সাপোর্টের অংশ হিসেবে পরিগনিত।
লাইফ সাপোর্ট একটি ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত চিকিৎসা। নাজুক পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসা নিতে হয় সুতরাং লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার সিদ্ধান্ত, সেটা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত এবং লাইফ সাপোর্ট থেকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তও অনেক জটিল। এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের টীম রোগীর আত্মীয়স্বজন, সাক্ষী সবদ, প্রয়োজনে আদালতের সিদ্ধান্তও নিতে হয়। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, লাইফ সাপোর্ট সেবা গ্রহণকারী রোগীর ব্রেন ডেথ হয়ে গেছে; কিন্তু হার্ট লাংস কৃত্রিম মেশিনের সাহায্যে তখনও চালু আছে; তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দল রোগীর নিকটজনের সাথে পরামর্শ করে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দিতে পারে।
সুতরাং, চিকিৎসা সেবায় ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করে তোলার আধুনিক ও সর্বোত্তম প্রচেষ্টা। এ নিয়ে অমূলক আশঙ্কা, ভীতি বা প্রশ্নের চেয়ে রোগীর স্বজন হিসেবে চিকিৎসকগণ যাতে সঠিক সময়ে এ সেবা চালু এবং শুরু করতে সক্ষম হয়, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
[লেখক: পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]শ্বাস নিতে পারেন না, কিংবা তার শ্বাস নেয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, তখন তাকে ভেন্টিলেটর যন্ত্রে দেয়া হয়
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
বর্তমানে ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট শব্দগুলোর সাথে সাধারণ মানুষ বেশ পরিচিত। এই শব্দগুলো শুনলেই মাথায় ঘোরাফেরা করে হাজারও চিন্তা । কি জন্য বা কি পরিস্থিতিতে রোগীর জন্য এ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়; ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট থেকে রোগী কি আদৌ কি সুস্থ হয়? এই ধরনের হাজারও প্রশ্ন চিকিৎসকদের করেন রোগীর পরিবার, কিংবা এ নিয়ে কথকতা ও আশঙ্কা জনমানুষের মনে।
আমরা অনেকে ভাবি ভেন্টিলেশনে মানে আর বাঁচার আশা নেই। বাস্তবে সেটা নয়। কেউ ভেন্টিলেশনে রয়েছেন মানে তিনি অন্য সাধারণ রোগীর থেকে গুরুতরভাবে অসুস্থ। ভেন্টিলেশন একধরনের সাপোর্ট সিস্টেম। মানুষ যখন শ্বাস নিতে পারেন না, কিংবা তার শ্বাস নেয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, তখন তাকে ভেন্টিলেটর যন্ত্রে দেয়া হয়
আমরা অনেকে ভাবি ভেন্টিলেশনে মানে আর বাঁচার আশা নেই। বাস্তবে সেটা নয়। কেউ ভেন্টিলেশনে রয়েছেন মানে তিনি অন্য সাধারণ রোগীর থেকে গুরুতরভাবে অসুস্থ । ভেন্টিলেশন একধরনের সাপোর্ট সিস্টেম । মানুষ যখন শ্বাস নিতে পারেন না, কিংবা তাঁর শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, তখন তাঁকে ভেন্টিলেটর যন্ত্রে দেওয়া হয়।
ফুসফুসে যদি কোনও বড় সমস্যা থাকে, যেমন তীব্র নিউমোনিয়া অথবা যেসব রোগীর অজ্ঞান অবস্থায় বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে এবং রোগী নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না বা নিলেও শ্বাসনালি ঠিকমতো কাজ করে না; সাধারনত এসব কারণে রোগীকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয় ।
তবে কিছু সময় স্নায়ু রোগ জনিত সমস্যা থাকলেও ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে চিকিৎসা সেবার উন্নতির ছোঁয়ার শুরুর দিকেই কিন্তু এ প্রযুক্তির ব্যবহার ছিলনা। এমনকি, ১৯৫২ সালের আগে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চিকিৎসা সেবায় নিযুক্তগণ আয়রন লাং (lung) নামক এক যন্ত্রের সাথে পরিচিত ছিল, যা দিয়ে শ্বাস নিতে অক্ষম-এমন রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হতো।
আয়রন লাং ছিল একধরনের নেগেটিভ প্রেসার ভেন্টিলেটর। ১৯২৮ সালে ফিলিপ ড্রিঙ্কার ও লুইস আগাসি শ’ নামে দুজন বিজ্ঞানী আয়রন লাং বা ড্রিঙ্কার ট্যাংক এর তৈরি করেন। তখনকার ভেন্টিলেটর হিসেবে পরিচিত এই আয়রন লাং বা ড্রিঙ্কার ট্যাংক ছিল বিশালাকার। এটি ছিল লোহার ট্যাংকের ভেতরে একটা বিছানা। রোগীকে সেখানে শোয়ানো হতো। তারপর সিল করে দেওয়া হতো ট্যাংকটি। শুধু মাথা ও গলা বেরিয়ে থাকত। ওখান দিয়ে যাতে বাতাস যাওয়া-আসা করতে না পারে, সেজন্য রাবার দিয়ে সিল করা থাকত গলার চারপাশে। একটা মোটর দিয়ে চালানো হতো এই আয়রন ট্যাংক। মোটরটি ট্যাংকের ভেতরে, রোগীর দেহের চারপাশের বাতাস বের করে নিত। ফলে, তৈরি হতো আংশিক ভ্যাকুয়াম। এভাবে রোগীর দেহের চারপাশের বদ্ধ জায়গাটুকুতে রুমের তুলনায় নেগেটিভ চাপ তৈরি করা হতো। সংকুচিত হয়ে যেত রোগীর ডায়াফ্রাম। ফলে, ফুসফুস ট্যাংকের বাইরে থাকা নাক ও মুখের মাধ্যমে শ্বাস টেনে নিত । আবার, সেটা বের করে দেয়ার জন্য ভেতরের বাতাসের উপর রুমের বায়ুম-লীয় চাপ থেকে বেশি চাপ দেয়া হতো। ফলে, বেরিয়ে যেত ফুসফুসের বাতাস। এভাবেই, আয়রন লাংনির্ভর চিকিৎসা চলছিল ১৯৫২ সাল পর্যন্ত।
১৯২৮ – ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের দেশে দেশে পোলিও আক্রান্তদের মৃত্যুহার ছিল অনেক বেশি। ১৯২৮ সালে বোস্টনের স্কুল অফ পাবলিক হেলথের চিকিৎসক ফিলিপ ড্রিঙ্কার ও ল্যুইস অ্যাগাসিস নামে দ্#৩৯;জন চিকিৎসক আয়রন লাংস নামে প্রথম মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর আবিষ্কার করেন। এর বহুদিন পরে ১৯৫২ সালে কোপেনহেগেনে পোলিওর মহামারি শুরু হয়। সেখানকার ব্লেগদাম হাসপাতালে পোলিও আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় নব্বই শতাংশ শ্বাসনালীর পেশি অকেজো হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
সেই সময় ইয়ন ইবসেন নামে এক অ্যানেস্থেশিয়া বিশেশজ্ঞ চিকিৎসক আধুনিক ভেন্টিলেটর তৈরি করেন ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে। নিজের উদ্যোগে বানানো সেই ভেন্টিলেটর ব্যবহার করে এক বছরের মধ্যেই পোলিওতে মৃত্যুহার নেমে আসে ১১%-এ। তারপর প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এসেছে এখনকার অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর। এর সাহায্যে অজস্র মুমুর্ষু রোগীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
রোগীর স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভেন্টিলেটর ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, রোগীর বড় অস্ত্রোপচারের সময় অজ্ঞান করা অবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে, অজ্ঞান অবস্থা থেকে জেগে ওঠা পর্যন্ত ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হঠাৎ অথবা দীর্ঘস্থায়ী যে কোন অসুস্থতা যথা; মস্তিষ্কে স্ট্রোক, তীব্র নিউমোনিয়া, ঈঙচউ (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ), অজউঝ (তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা সিন্ড্রোম), তীব্র অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া (অ্যানাফিল্যাক্সিস) ইত্যাদি কারণে রোগী অনেক সময় নিজে নিজে শ্বাস নিতে পারেনা। এসব রোগীদের ভেন্টিলেটর সাপোর্টের প্রয়োজন হয়ে থাকে। স্নায়ু এবং পেশীগুলিকে প্রভাবিত করে এমন রোগ (যেমন গুইলেন-বারি সিন্ড্রোম) বা কোমা অবস্থায় রোগীর শ্বাসযন্ত্রকে সচল রাখার প্রয়োজনে ভেন্টিলেটরের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রয়োজন রয়েছে, এমন রোগীকে ভেন্টিলেশন দিতে দেরী হলে রোগের জটিলতা বাড়ে। কয়েকটি মিনিট বা কয়েকটি ঘন্টার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় অক্সিজেনের অভাবে দেহকোষের বিপাক ক্রিয়া ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজনীয়তার নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আত্মীয়দের মতামত নিতেও বিলম্ব ঘটে।
ভেন্টিলেটর ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী অসুখ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা, হার্টের সমস্যা, যেমন হার্ট ফেলিওর, শরীরের পুষ্টি, গলার, জিভের ও বুকের মাংসপেশির শক্তি, রোগীর স্নায়বিক অবস্থা ও চেতনা, ইত্যাদি নানবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য রাখা হয়।
রোগ নিরাময়ে বিভিন্ন ঔষধ ও যন্ত্রপাতির মত ভেন্টিলেটর ব্যবহারেরও ঝুঁকি রয়েছে। ভেন্টিলেটরের শ্বাস-প্রশ্বাসের নলের মাধ্যমে ফুসফুসে সংক্রামক জীবাণু প্রবেশ করে নিউমোনিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একে বলা হয় ভেন্টিলেটর-সম্পর্কিত নিউমোনিয়া (VAP)। ফুসফুসের ক্ষত সৃষ্টি বা অক্সিজেনের চাপ বা পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ফুসফুসে ক্ষতি সাধন হতে পারে এবং নিউমোথোরাক্স অথবা ফুসফুসে তরল জমে পালমোনারি এডিমা রোগ সৃষ্টি হতে পারে। সাধারনের মধ্যে ধারনা আছে যে, রোগীকে ভেন্টিলেশনে দিলে সাধারনত আর বেঁচে ফেরত আসে না। এই ধারণা সঠিক নয়। আমেরিকার মত উন্নত স্বাস্থ্যসেবার দেশেও গড়ে বছরে ৮ লাখ মানুষের ওঈট তে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট প্রয়োজন পড়ে। বিখ্যাত (CHEST) মেডিক্যাল জার্নাল এ বিষয়ে এক নিবন্ধে ভেন্টিলেশনে ছিল এমন ৩৮৩ জন রোগীর মধ্যে ৬২% ভেন্টিলেশন মুক্ত করার তথ্য প্রকাশ করেছে।
তাইওয়ানের একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেশন ব্যবহার করা ১৩০৭ জনের মধ্যে ১০০৭ জনের পরবর্তীতে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হয়নি। ফিজিশিয়ানদের জার্নাল ঔঅচও-তে প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান বলেছে যে, ওঈট তে ভর্তি ১১৫০ জন রোগীর মধ্যে যে ৩৯৭ জন ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে, যাদের ৫৭.৭৫% ই ভেন্টিলেশন থেকে মুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের হাসপাতালসমূহে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি সংখ্যক ভেন্টিলেটর রয়েছে। সব হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সুলভ নয়, তথাপি শেষ মুহূর্তে ভেন্টিলেটর ব্যবহারের পরও প্রায় সিংহভাগ রোগী সুস্থ হওয়ার তথ্য রয়েছে।
যদিও ভেন্টিলেটরে থাকা রোগীদের আরোগ্যের হার মূলত তাদের শারীরিক অবস্থা এবং রোগের গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে আইসিইউ-তে ভেন্টিলেটর বা যান্ত্রিক শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা পাওয়া রোগীদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার হার প্রায় ৬৩%। ভেন্টিলেটর ব্যবহারে অস্ত্রোপচার পরবর্তী রোগীদের ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার হার বেশি। প্রায় ৬৯%। ভেন্টিলেটর গ্রহণ করা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৭% এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলক কম, প্রায় ১৭%।
লাইফ সাপোর্ট (Life Support) বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলেও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের বাইরে এর সম্বন্ধে ধারনা, ব্যবহার, অপব্যবহার, আইনগত দিকসহ প্রচলিত ধ্যান-ধারনা নিয়ে ভুল ধারনা রয়েছে। যখন শরীরের এক বা একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে যায় তখন জীবন বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তাকে টিকিয়ে রাখা হয়। এটাকেই লাইফ সাপোর্ট বলে। এটা স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ বা তন্ত্রকে যথেষ্ট সময় দেওয়া যাতে ঐ অঙ্গটি পুনরায় কর্মক্ষম হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। অঙ্গগুলির মধ্যে হার্ট, লাংস, কিডনী ইত্যাদিই প্রধান; তবে কৃত্রিমভাবে শরীরের পুষ্টি, পানি এবং লবণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাও লাইফ সাপোর্টের আওতায় আসে। জীবন বাঁচাতে চিকিৎসা সেবাসমূহ বিভিন্ন স্তরের লাইফ সাপোর্ট হিসাবে গন্য করা হয়।
কার্ডিয়াক এরেস্ট বা হঠাৎ করে হার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কারণেই হতে পারে। হার্টের রক্তনালীতে ব্লক থাকা, ছন্দপতন হওয়া, লবনের তারতম্য, ইলেকট্রিক শক, লাংসের রোগের কারনে হার্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই যে পদ্ধতির মাধ্যমে হার্ট এবং লাংসের কাজ ফেরত আনা হয় সেটাকে বলা হয় বেসিক লাইফ সাপোর্ট। অইঈ (Airway, Breathing, Circulation) ক্রমানুসারে এ লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়। এতে বুক চেপে চেপে হার্টকে সচল করা হয় (বয়সানুসারে এটা মিনিটে ১০০ থেকে ১৩০ বার হতে পারে, মুখ দিয়ে শ্বাসনালীতে বাতাস পাম্প করা হয়(প্রতি ১৫ বার হার্ট চাপার পর ২ বার মুখে শ্বাস দেওয়া হয়)। অনেক সময় এতেই হার্ট এবং লাংসের কাজ ফেরত আসতে পারে নইলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। শুধুমাত্র নয়, বেসিক লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার জন্য টেকনিশিয়ান, নার্স, ভলান্টিয়ার, এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠিকে প্রশিক্ষন দেওয়া হয় এবং বিদেশে বিভিন্ন শপিং মলে ডিফিব্রিলেটরসহ রিসাসসিটেশন টিম অপেক্ষমান থাকেন। এর ফলে অকস্মাৎ মৃত্যুর হাত থেকে অনেক মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
অনেকসময় বেসিক লাইফ সাপোর্ট জীবন বাঁচিয়ে রাখলেও এটা হার্টের মূল সমস্যা যেমন মারাত্মক ধরনের ছন্দপতন নির্মূল করতে পারেনা। এক্ষেত্রে ডিফিব্রিলেটর (উবভরনৎরষষধঃড়ৎ) মেশিনের সাহায্য নিয়ে বুকের উপর ইলেকট্রিক শক প্রয়োগ করা হয়। এতে বড় ধরনের কারেন্টের প্রভাবে হার্টের সমস্ত ইলেক্ট্রিক্যাল কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, অব্যবহিত পরেই হার্ট তার নিজস্ব ছন্দে আবার কাজ শুরু করে।
এ ছাড়া রোগীর চরম সংকটময় অবস্থায় শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিলে এবং রক্তে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা রক্ষা করতে না পারে এই অবস্থাকে আমরা বলি রেস্পিরেটরি ফেইলর। সেই অবস্থায় শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখার প্রক্রিয়া হলো ভেন্টিলেশন, যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেটাকে বলে লাইফ সাপোর্ট।
অর্থাৎ চিকিৎসাসেবার ভাষায়, লাইফ সাপোর্ট হলো বিশেষায়িত সরঞ্জামের মাধ্যমে শরীরের বিকল অঙ্গগুলোর অপরিহার্য কাজগুলো সচল রাখা। এর মধ্যে ফুসফুস, হৃৎপি-, কিডনি অথবা এ সবকটির সাপোর্ট অন্তর্ভুক্ত। ফুসফুস তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেললে সাপোর্টের জন্য ভেন্টিলেশন মেশিন ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ ভেন্টিলেশনে থাকা মানে এক প্রকার লাইফ সাপোর্টে থাকা। কিডনির জন্য বিভিন্ন ধরনের ডায়ালাইসিস মেশিন, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের বিকল্প হিসেবে ইসিএমও মেশিন ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের ঊঈগঙ আছে। যেমন ভেনোভেনাস (Venovenus) শুধুমাত্র লাংসকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য, আবার ভেনো আর্টেরিয়াল (Venoarterial) ঊঈগঙ দিয়ে হার্ট-
লাংস উভয়কেই সাপোর্ট দেওয়া যায়। এ ছাড়া হার্টের পাম্পের ছন্দ বজায় রাখতে ওঅইচ (IntraaorticBalloon Pump) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হার্টের বাম দিককে সাহায্য করার জন্য (LVAD- Left Ventricular Assist Device), ডান দিককে সচল রাখার জন্য (RVAD- Right Ventricular Assist Device) অথবা উভয় ভেন্ট্রিকলকে সচল রাখতে Biventricular Assist Device প্রভৃতি পরিসেবাগুলোও লাইফ সাপোর্টের অংশ হিসেবে পরিগনিত।
লাইফ সাপোর্ট একটি ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত চিকিৎসা। নাজুক পরিস্থিতিতে এখানে চিকিৎসা নিতে হয় সুতরাং লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার সিদ্ধান্ত, সেটা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত এবং লাইফ সাপোর্ট থেকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তও অনেক জটিল। এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের টীম রোগীর আত্মীয়স্বজন, সাক্ষী সবদ, প্রয়োজনে আদালতের সিদ্ধান্তও নিতে হয়। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, লাইফ সাপোর্ট সেবা গ্রহণকারী রোগীর ব্রেন ডেথ হয়ে গেছে; কিন্তু হার্ট লাংস কৃত্রিম মেশিনের সাহায্যে তখনও চালু আছে; তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক দল রোগীর নিকটজনের সাথে পরামর্শ করে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দিতে পারে।
সুতরাং, চিকিৎসা সেবায় ভেন্টিলেটর বা লাইফ সাপোর্ট গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করে তোলার আধুনিক ও সর্বোত্তম প্রচেষ্টা। এ নিয়ে অমূলক আশঙ্কা, ভীতি বা প্রশ্নের চেয়ে রোগীর স্বজন হিসেবে চিকিৎসকগণ যাতে সঠিক সময়ে এ সেবা চালু এবং শুরু করতে সক্ষম হয়, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
[লেখক: পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]শ্বাস নিতে পারেন না, কিংবা তার শ্বাস নেয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, তখন তাকে ভেন্টিলেটর যন্ত্রে দেয়া হয়