সিরাজ প্রামাণিক
কেউ যদি আপনার বাড়ির চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়, আলো-বাতাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাহলে কীভাবে আপনার অধিকার ফিরে পাবেন? ধরুন, আপনি দীর্ঘদিন ধরে একটি রাস্তা ব্যবহার করে আসছেন যেটি মূলত আপনার প্রতিবেশীর বা অন্য কারো ব্যক্তিগত জমির অংশ। হঠাৎ সেই পথ বন্ধ করে দিল। এখন সে বলছে, আপনার বিকল্প রাস্তা নিতে হবে অথবা তার কাছ থেকে জমি কিনে নিতে হবে। চলাচলের একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে দিলে সাধারণত শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হয়। সেকারণ তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য ফৌজদারি আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সবচেয়ে দ্রুততম মাধ্যম। এক্ষেত্রে প্রধানত দুটি ধারায় মামলা করা যায়।
১. ফৌজদারি কার্যবিধি এর ১৪৭ ধারা : এটি রাস্তার বিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ফৌজদারি প্রতিকার। যদি রাস্তাটি ব্যবহার করার অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় এবং শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে, তবে ভুক্তভোগী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই ধারায় মামলা করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তসাপেক্ষে যদি প্রমাণ পান যে ওই রাস্তার ওপর বাদীর ব্যবহারের অধিকার আছে, তবে তিনি বিবাদীকে রাস্তাটি উন্মুক্ত রাখার এবং ভবিষ্যতে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। শুধু তাই নয়, কোন মসজিদে নামাজ পড়া, কোন পুকুরে গোছল করা, কোন নদীতে মাছ ধরা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে গোলযোগ হলে তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট এই ধারার বিধানমতে প্রয়োজনীয় আদেশ দান করতে পারেন।
২. দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩৪১ ধারা (অন্যায়ভাবে বাধা দান) : রাস্তাটি যদি বাদীর চলাচলের একমাত্র পথ হয় এবং বিবাদী ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে বাধা সৃষ্টি করে (যেমন: বেড়া দিয়ে বা গর্ত খুঁড়ে), তবে এটি অন্যায়ভাবে বাঁধা দানের অপরাধ। এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ। ভুক্তভোগী থানায় এজাহার বা আদালতে সি.আর মামলা করতে পারেন। অপরাধ প্রমাণ হলে বিবাদীর ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। আর আপনি রাস্তার অধিকার, আলো-বাতাসের অধিকার, প্রতিবেশী হিসেবে আপনার অধিকার চিরস্থায়ীভাবে ফিরে পেতে দেওয়ানী আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন এর ৫৫ ধারা মতে বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা জারি করেও প্রতিকার পেতে পারেন। আর রাস্তাটি যদি ইতোমধ্যে ‘বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে’, এমনটি হয় তখন শুধু সাধারণ নিষেধাজ্ঞায় কাজ হবে না। আপনাকে তখন ‘বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা’ চাইতে হবে। সে অনুযায়ী আদালত বিবাদীকে নির্দেশ দেবেন যে প্রতিবেশীর চলার বাধা দিতে যে ইটের দেয়াল বা বেড়া তৈরি করা হয়েছে, তা বিবাদীর নিজ খরচে ভেঙে ফেলে রাস্তাটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে। সংক্ষুব্ধ পক্ষকে শুধু নিষেধাজ্ঞার দরখাস্তই নয় সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার বিধান মতে রাস্তাটি ব্যবহারের আইনগত অধিকার বাদীর আছে এই মর্মে আদালতের ঘোষণা বা ডিক্লারেশন চাইতে হবে। আর তামাদি আইন এর ২৬ ধারায় সুখাধিকার অর্জন সম্পর্কে বলা আছে। যদি বাদী প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি বা তার পূর্বসূরিরা ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে এই রাস্তাটি বিনা বাধায়, প্রকাশ্যে এবং অধিকার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন, তবে তিনি সুখাধিকার অর্জন করবেন। আর আমাদের ইজমেন্ট অ্যাক্ট এর ১৩ ধারায় আবশ্যিক সুখাধিকার সম্পর্কে বলা আছে যে, বাড়ীর একমাত্র রাস্তা যদি হয়, ওই রাস্তা ছাড়া বাদীর বাড়িতে ঢোকার আর কোনো বিকল্প পথ নেই, তবে ২০ বছর ব্যবহার না করলেও বাদী আবশ্যিক সুখাধিকার দাবি করতে পারেন। এটি খুবই শক্তিশালী একটি পয়েন্ট। তবে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে আপনি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এবং কোনো বাধা ছাড়াই রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আপনার ব্যবহার যদি বাড়িতে যাতায়াত, মালপত্র আনা-নেয়ার মতো সাধারণ কাজে হয়ে থাকে তবে তা বৈধ। কিন্তু পতিতাবৃত্তি, জুয়া, বা অবৈধ ব্যবসায় ব্যবহৃত হলে তা পদাধিকার হিসেবে ধরা হবে না। এটি রাস্তা হিসেবেই ব্যবহৃত হতে হবে। ব্যবসার জন্য বড় ট্রাক নিয়ে চলাচল করলে তা পদাধিকার নয়। যদি এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হয়, তাহলে কমপক্ষে ২০ বছর ব্যবহার করতে হবে। যদি সরকারি জমি হয়, তাহলে ৬০ বছর ভোগদখলের ইতিহাস থাকতে হবে।
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
সিরাজ প্রামাণিক
বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
কেউ যদি আপনার বাড়ির চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়, আলো-বাতাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাহলে কীভাবে আপনার অধিকার ফিরে পাবেন? ধরুন, আপনি দীর্ঘদিন ধরে একটি রাস্তা ব্যবহার করে আসছেন যেটি মূলত আপনার প্রতিবেশীর বা অন্য কারো ব্যক্তিগত জমির অংশ। হঠাৎ সেই পথ বন্ধ করে দিল। এখন সে বলছে, আপনার বিকল্প রাস্তা নিতে হবে অথবা তার কাছ থেকে জমি কিনে নিতে হবে। চলাচলের একমাত্র রাস্তা বন্ধ করে দিলে সাধারণত শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা তৈরি হয়। সেকারণ তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য ফৌজদারি আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সবচেয়ে দ্রুততম মাধ্যম। এক্ষেত্রে প্রধানত দুটি ধারায় মামলা করা যায়।
১. ফৌজদারি কার্যবিধি এর ১৪৭ ধারা : এটি রাস্তার বিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ফৌজদারি প্রতিকার। যদি রাস্তাটি ব্যবহার করার অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় এবং শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে, তবে ভুক্তভোগী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই ধারায় মামলা করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তসাপেক্ষে যদি প্রমাণ পান যে ওই রাস্তার ওপর বাদীর ব্যবহারের অধিকার আছে, তবে তিনি বিবাদীকে রাস্তাটি উন্মুক্ত রাখার এবং ভবিষ্যতে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। শুধু তাই নয়, কোন মসজিদে নামাজ পড়া, কোন পুকুরে গোছল করা, কোন নদীতে মাছ ধরা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে গোলযোগ হলে তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট এই ধারার বিধানমতে প্রয়োজনীয় আদেশ দান করতে পারেন।
২. দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩৪১ ধারা (অন্যায়ভাবে বাধা দান) : রাস্তাটি যদি বাদীর চলাচলের একমাত্র পথ হয় এবং বিবাদী ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে বাধা সৃষ্টি করে (যেমন: বেড়া দিয়ে বা গর্ত খুঁড়ে), তবে এটি অন্যায়ভাবে বাঁধা দানের অপরাধ। এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ। ভুক্তভোগী থানায় এজাহার বা আদালতে সি.আর মামলা করতে পারেন। অপরাধ প্রমাণ হলে বিবাদীর ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। আর আপনি রাস্তার অধিকার, আলো-বাতাসের অধিকার, প্রতিবেশী হিসেবে আপনার অধিকার চিরস্থায়ীভাবে ফিরে পেতে দেওয়ানী আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন এর ৫৫ ধারা মতে বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা জারি করেও প্রতিকার পেতে পারেন। আর রাস্তাটি যদি ইতোমধ্যে ‘বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে’, এমনটি হয় তখন শুধু সাধারণ নিষেধাজ্ঞায় কাজ হবে না। আপনাকে তখন ‘বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা’ চাইতে হবে। সে অনুযায়ী আদালত বিবাদীকে নির্দেশ দেবেন যে প্রতিবেশীর চলার বাধা দিতে যে ইটের দেয়াল বা বেড়া তৈরি করা হয়েছে, তা বিবাদীর নিজ খরচে ভেঙে ফেলে রাস্তাটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে। সংক্ষুব্ধ পক্ষকে শুধু নিষেধাজ্ঞার দরখাস্তই নয় সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার বিধান মতে রাস্তাটি ব্যবহারের আইনগত অধিকার বাদীর আছে এই মর্মে আদালতের ঘোষণা বা ডিক্লারেশন চাইতে হবে। আর তামাদি আইন এর ২৬ ধারায় সুখাধিকার অর্জন সম্পর্কে বলা আছে। যদি বাদী প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি বা তার পূর্বসূরিরা ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে এই রাস্তাটি বিনা বাধায়, প্রকাশ্যে এবং অধিকার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন, তবে তিনি সুখাধিকার অর্জন করবেন। আর আমাদের ইজমেন্ট অ্যাক্ট এর ১৩ ধারায় আবশ্যিক সুখাধিকার সম্পর্কে বলা আছে যে, বাড়ীর একমাত্র রাস্তা যদি হয়, ওই রাস্তা ছাড়া বাদীর বাড়িতে ঢোকার আর কোনো বিকল্প পথ নেই, তবে ২০ বছর ব্যবহার না করলেও বাদী আবশ্যিক সুখাধিকার দাবি করতে পারেন। এটি খুবই শক্তিশালী একটি পয়েন্ট। তবে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে আপনি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এবং কোনো বাধা ছাড়াই রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আপনার ব্যবহার যদি বাড়িতে যাতায়াত, মালপত্র আনা-নেয়ার মতো সাধারণ কাজে হয়ে থাকে তবে তা বৈধ। কিন্তু পতিতাবৃত্তি, জুয়া, বা অবৈধ ব্যবসায় ব্যবহৃত হলে তা পদাধিকার হিসেবে ধরা হবে না। এটি রাস্তা হিসেবেই ব্যবহৃত হতে হবে। ব্যবসার জন্য বড় ট্রাক নিয়ে চলাচল করলে তা পদাধিকার নয়। যদি এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হয়, তাহলে কমপক্ষে ২০ বছর ব্যবহার করতে হবে। যদি সরকারি জমি হয়, তাহলে ৬০ বছর ভোগদখলের ইতিহাস থাকতে হবে।
[লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]