alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

মতিউর রহমান

: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের দিন ভোটাররা যখন ভোটকেন্দ্রে যান এবং পছন্দের প্রতীকে সিল মারেন, সেটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। এই একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিচয় এবং আচরণ আয়ত্ত করে। এটি কেবল কাকে ভোট দেবেন সেই সিদ্ধান্ত তৈরির বিষয় নয়; বরং ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের মৌলিক ভাবনার ভিত্তি নির্মাণের এক অবিরত ধারা। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন অথচ গভীরভাবে মেরুকৃত সমাজে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান -এই দুটি ক্ষেত্রই ভোটার তৈরির প্রধান কারখানা হিসেবে কাজ করে। সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে আমাদের চারপাশের চেনা সামাজিক পরিসরগুলো অলক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক মানস গঠন করে চলেছে।

রাজনৈতিক সামাজিকীকরণকে তাত্ত্বিকভাবে বোঝার জন্য ডেভিড ইস্টন এবং জ্যাক ডেনিসের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইস্টন তাঁর ‘সিস্টেমস থিওরি’ বা ব্যবস্থা তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও রূপান্তর নির্ভর করে সমাজ থেকে আসা বিভিন্ন ‘ইনপুট’-এর ওপর। এই ইনপুটগুলো হলো মানুষের মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যাশা। মানুষ যখন এই মূল্যবোধগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, তখন সে কেবল একজন নাগরিক নয়, বরং ব্যবস্থার একজন সক্রিয় উপাদানে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এই ইনপুটের সিংহভাগ সরবরাহ করে আমাদের পরিবার ও বিদ্যালয়। ফলে আমাদের ভোটারদের আচরণ বুঝতে হলে কেবল নির্বাচনের প্রচারণা দেখলে চলবে না, বরং তাদের শৈশব ও কৈশোরের সামাজিকীকরণের স্তরগুলো ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন।

পরিবার হলো রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশে পরিবার কেবল একটি সামাজিক একক নয়, এটি ইতিহাস এবং রাজনৈতিক স্মৃতির এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। এ দেশে প্রতিটি পরিবারের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক আখ্যান থাকে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনের স্মৃতি, নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিগত নির্বাচনগুলোর অনিয়ম ও উত্তেজনা-এসবই ডাইনিং টেবিলের গল্প বা বড়দের আলোচনার মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। আলবার্ট বান্দুরার ‘সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব’ বা সোশ্যাল লার্নিং থিওরি এখানে চমৎকারভাবে কাজ করে। বান্দুরা দেখিয়েছেন, মানুষ পর্যবেক্ষণ এবং অনুকরণের মাধ্যমে আচরণ শেখে। একটি শিশু যখন তার বাবা-মাকে নির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি প্রবল আবেগ দেখাতে দেখে কিংবা অন্য কোনো পক্ষকে ঘৃণা করতে দেখে, সে অবচেতনভাবেই সেই আদর্শ বা আবেগকে নিজের বলে গ্রহণ করে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা খুব ছোটবেলাতেই বুঝে যায় যে ‘আমরা’ কারা এবং ‘ওরা’ কারা। এই যে দলীয় পরিচয় বা ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’, এর বীজ মূলত রোপিত হয় পরিবারের চার দেয়ালের ভেতরেই।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের দিন ভোটাররা যখন ভোটকেন্দ্রে যান এবং পছন্দের প্রতীকে সিল মারেন, সেটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। এই একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিচয় এবং আচরণ আয়ত্ত করে

তবে পরিবারের এই প্রভাব সবার জন্য একরকম নয়। পিয়েরে বোর্দিয়ুর ‘হ্যাবিটাস’ ধারণাটি আমাদের শেখায় যে, একটি পরিবারের সামাজিক অবস্থান, শ্রেণি এবং ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের শহুরে উচ্চশিক্ষিত বা মধ্যবিত্ত পরিবারে একটি শিশু হয়তো কিছুটা বহুমাত্রিক রাজনৈতিক তথ্য ও মতামতের সংস্পর্শে আসে, যা তাকে কিছুটা সমালোচনামূলক হওয়ার সুযোগ দেয়। বিপরীতে, গ্রামীণ বা প্রান্তিক পরিবারগুলোতে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ অনেক সময় স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো, ইউনিয়ন পরিষদের রাজনীতি কিংবা সরাসরি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এখানে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে আনুগত্য এবং টিকে থাকার লড়াই বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে বোর্দিয়ুর ভাষায়, ব্যক্তির ‘হ্যাবিটাস’ বা তার অর্জিত স্বভাব তাকে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই বন্দি রাখে, যা থেকে বের হওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

পরিবার যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আবেগীয় ভিত্তি গড়ে দেয়, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিদ্যালয় কাজ করে এর প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জঁ-জাক রুশোর নাগরিক গঠনের ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষা কেবল তথ্য প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং এটি একজন আদর্শ নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া। তাত্ত্বিকভাবে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংবিধান, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বীজ বপন করা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বেশ জটিল। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যখন গণতন্ত্রের পাঠ পড়ে, তখন তারা আসলে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও নাগরিকত্বের একটি কাঠামোবদ্ধ ধারণা লাভ করে। জর্জ হারবার্ট মিডের ‘প্রতীকী পারস্পরিক ক্রিয়া তত্ত্ব’ অনুসারে, ব্যক্তি তার আত্মপরিচয় গড়ে তোলে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মুখোমুখি হয়, তারা রাষ্ট্রের একটি ‘সাধারণীকৃত অন্য’ বা জেনারালাইজড আদার সম্পর্কে ধারণা পায়। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চার চেয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনই বেশি প্রবল। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মধ্যে যখন প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করা হয়, তখন সেটি পরোক্ষভাবে নাগরিককে কর্তৃত্ববাদী শাসন মেনে নিতেই অভ্যস্ত করে তোলে। এটি রুশোর স্বপ্নের ‘সক্রিয় নাগরিক’ তৈরির পথে একটি বড় বাধা।

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো ছাত্ররাজনীতি। সি. রাইট মিলসের ‘ক্ষমতা-সংঘর্ষ তত্ত্ব’ অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক সময় বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে পুনরুৎপাদন করার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতির প্রবল উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের নাগরিকত্বের বৃহত্তর আদর্শের চেয়ে ক্ষুদ্র দলীয় পরিচয়ে বেশি আবিষ্ট করে ফেলে। এখানে অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান চর্চার চেয়ে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির আদর্শিক বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে পাওলো ফ্রেইরের ‘মুক্তিমুখী শিক্ষাদর্শন’ আমাদের একটি বিকল্প পথ দেখায়। ফ্রেইরে মনে করতেন, শিক্ষা যদি সংলাপধর্মী এবং প্রতিফলনমূলক না হয়, তবে তা মানুষকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে। বাংলাদেশের কিছু ক্ষেত্রে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মুক্তিমুখী চিন্তার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা তাদের একতরফা সামাজিকীকরণের বলয় থেকে বের করে আনতে সাহায্য করে।

এই রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় লিঙ্গীয় বৈষম্য একটি বড় এবং অনুচ্চারিত বিষয়। আমাদের সমাজকাঠামোতে এখনো ছেলে শিশুদের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশকে যতটা স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়, মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় নিরুৎসাহিত করা হয়। পরিবারে মেয়েদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রবণতা তাদের মধ্যে এক ধরণের ‘রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবোধ’ তৈরি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বৈষম্য দূর করার কথা থাকলেও বাস্তবে লিঙ্গভিত্তিক এই সামাজিকীকরণ নারী ভোটারদের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস এবং সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। ফলে ভোটার তালিকায় নারীর সংখ্যা বাড়লেও নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের প্রভাবমুক্ত হতে পারে না।

হেনরি তাজফেল এবং জন টার্নারের ‘সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব’ বাংলাদেশের ভোটারদের মানসিকতা বোঝার জন্য এক অপরিহার্য দলিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ তার আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল কেবল মতাদর্শ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তি বলে ‘আমি অমুক আদর্শের সমর্থক’, তখন সে আসলে তাজফেলের ভাষায় তার ‘ইন-গ্রুপ’ বা নিজ দলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায় এবং ‘আউট-গ্রুপ’ বা বিপক্ষ দলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। পরিবার এবং বিদ্যালয় এই গোষ্ঠীগত চেতনাকে লালন করে। ফলে নির্বাচনের সময় ভোটার আচরণ কেবল একটি যৌক্তিক বা লাভ-ক্ষতির সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং এটি তার অস্তিত্ব, আবেগ এবং গোষ্ঠীগত আনুগত্যের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় এখন নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হচ্ছে। নগরায়ন, ডিজিটাল মিডিয়া এবং বিশ্বায়ন প্রথাগত পরিবার ও বিদ্যালয়ের প্রভাবকে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ করছে। এখনকার তরুণ ভোটাররা কেবল পরিবারের বড়দের কথা শুনে বা পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠিক করছে না। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা দেশ-বিদেশের নানা রাজনৈতিক প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু তাতেও সামাজিকীকরণের মূল সুরটি খুব একটা বদলায়নি। বরং অনেক সময় দেখা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল পুরনো মেরুকরণকেই নতুন মোড়কে আরও তীব্র করছে।

বাংলাদেশের ভোটারদের রাজনৈতিক আচরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি জটিল সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ফল। ডেভিড ইস্টন থেকে শুরু করে পাওলো ফ্রেইরে পর্যন্ত সকল সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ এটিই প্রমাণ করে যে, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ার জন্য কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ। আমাদের পরিবারগুলোকে হতে হবে পরমতসহিষ্ণুতার প্রথম পাঠশালা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হবে মুক্তচিন্তা ও নাগরিক অধিকার চর্চার কেন্দ্র। যদি আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া আনুগত্যের পরিবর্তে সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধ শেখাতে পারে, তবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও গভীর ও টেকসই ভিত্তি পাবে। একজন সচেতন ভোটার কেবল ভোটকেন্দ্রে তৈরি হয় না, তাকে তৈরি হতে হয় শৈশবের গল্পে এবং ক্লাসরুমের সংলাপে।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রচলনের ইতিকথা

২০২৬-এর বাংলাদেশ: স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির সন্ধানে এক নতুন শুরু

ছবি

স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন বছর

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

মতিউর রহমান

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের দিন ভোটাররা যখন ভোটকেন্দ্রে যান এবং পছন্দের প্রতীকে সিল মারেন, সেটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। এই একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিচয় এবং আচরণ আয়ত্ত করে। এটি কেবল কাকে ভোট দেবেন সেই সিদ্ধান্ত তৈরির বিষয় নয়; বরং ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের মৌলিক ভাবনার ভিত্তি নির্মাণের এক অবিরত ধারা। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন অথচ গভীরভাবে মেরুকৃত সমাজে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এখানে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান -এই দুটি ক্ষেত্রই ভোটার তৈরির প্রধান কারখানা হিসেবে কাজ করে। সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কীভাবে আমাদের চারপাশের চেনা সামাজিক পরিসরগুলো অলক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক মানস গঠন করে চলেছে।

রাজনৈতিক সামাজিকীকরণকে তাত্ত্বিকভাবে বোঝার জন্য ডেভিড ইস্টন এবং জ্যাক ডেনিসের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইস্টন তাঁর ‘সিস্টেমস থিওরি’ বা ব্যবস্থা তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও রূপান্তর নির্ভর করে সমাজ থেকে আসা বিভিন্ন ‘ইনপুট’-এর ওপর। এই ইনপুটগুলো হলো মানুষের মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যাশা। মানুষ যখন এই মূল্যবোধগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, তখন সে কেবল একজন নাগরিক নয়, বরং ব্যবস্থার একজন সক্রিয় উপাদানে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এই ইনপুটের সিংহভাগ সরবরাহ করে আমাদের পরিবার ও বিদ্যালয়। ফলে আমাদের ভোটারদের আচরণ বুঝতে হলে কেবল নির্বাচনের প্রচারণা দেখলে চলবে না, বরং তাদের শৈশব ও কৈশোরের সামাজিকীকরণের স্তরগুলো ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন।

পরিবার হলো রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশে পরিবার কেবল একটি সামাজিক একক নয়, এটি ইতিহাস এবং রাজনৈতিক স্মৃতির এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। এ দেশে প্রতিটি পরিবারের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক আখ্যান থাকে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনের স্মৃতি, নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিগত নির্বাচনগুলোর অনিয়ম ও উত্তেজনা-এসবই ডাইনিং টেবিলের গল্প বা বড়দের আলোচনার মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। আলবার্ট বান্দুরার ‘সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব’ বা সোশ্যাল লার্নিং থিওরি এখানে চমৎকারভাবে কাজ করে। বান্দুরা দেখিয়েছেন, মানুষ পর্যবেক্ষণ এবং অনুকরণের মাধ্যমে আচরণ শেখে। একটি শিশু যখন তার বাবা-মাকে নির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি প্রবল আবেগ দেখাতে দেখে কিংবা অন্য কোনো পক্ষকে ঘৃণা করতে দেখে, সে অবচেতনভাবেই সেই আদর্শ বা আবেগকে নিজের বলে গ্রহণ করে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা খুব ছোটবেলাতেই বুঝে যায় যে ‘আমরা’ কারা এবং ‘ওরা’ কারা। এই যে দলীয় পরিচয় বা ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’, এর বীজ মূলত রোপিত হয় পরিবারের চার দেয়ালের ভেতরেই।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের দিন ভোটাররা যখন ভোটকেন্দ্রে যান এবং পছন্দের প্রতীকে সিল মারেন, সেটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। এই একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, পরিচয় এবং আচরণ আয়ত্ত করে

তবে পরিবারের এই প্রভাব সবার জন্য একরকম নয়। পিয়েরে বোর্দিয়ুর ‘হ্যাবিটাস’ ধারণাটি আমাদের শেখায় যে, একটি পরিবারের সামাজিক অবস্থান, শ্রেণি এবং ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের শহুরে উচ্চশিক্ষিত বা মধ্যবিত্ত পরিবারে একটি শিশু হয়তো কিছুটা বহুমাত্রিক রাজনৈতিক তথ্য ও মতামতের সংস্পর্শে আসে, যা তাকে কিছুটা সমালোচনামূলক হওয়ার সুযোগ দেয়। বিপরীতে, গ্রামীণ বা প্রান্তিক পরিবারগুলোতে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ অনেক সময় স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো, ইউনিয়ন পরিষদের রাজনীতি কিংবা সরাসরি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এখানে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে আনুগত্য এবং টিকে থাকার লড়াই বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে বোর্দিয়ুর ভাষায়, ব্যক্তির ‘হ্যাবিটাস’ বা তার অর্জিত স্বভাব তাকে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই বন্দি রাখে, যা থেকে বের হওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

পরিবার যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আবেগীয় ভিত্তি গড়ে দেয়, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিদ্যালয় কাজ করে এর প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জঁ-জাক রুশোর নাগরিক গঠনের ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষা কেবল তথ্য প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং এটি একজন আদর্শ নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া। তাত্ত্বিকভাবে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংবিধান, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বীজ বপন করা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বেশ জটিল। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যখন গণতন্ত্রের পাঠ পড়ে, তখন তারা আসলে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও নাগরিকত্বের একটি কাঠামোবদ্ধ ধারণা লাভ করে। জর্জ হারবার্ট মিডের ‘প্রতীকী পারস্পরিক ক্রিয়া তত্ত্ব’ অনুসারে, ব্যক্তি তার আত্মপরিচয় গড়ে তোলে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মুখোমুখি হয়, তারা রাষ্ট্রের একটি ‘সাধারণীকৃত অন্য’ বা জেনারালাইজড আদার সম্পর্কে ধারণা পায়। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক চর্চার চেয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনই বেশি প্রবল। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মধ্যে যখন প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করা হয়, তখন সেটি পরোক্ষভাবে নাগরিককে কর্তৃত্ববাদী শাসন মেনে নিতেই অভ্যস্ত করে তোলে। এটি রুশোর স্বপ্নের ‘সক্রিয় নাগরিক’ তৈরির পথে একটি বড় বাধা।

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো ছাত্ররাজনীতি। সি. রাইট মিলসের ‘ক্ষমতা-সংঘর্ষ তত্ত্ব’ অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক সময় বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে পুনরুৎপাদন করার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতির প্রবল উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের নাগরিকত্বের বৃহত্তর আদর্শের চেয়ে ক্ষুদ্র দলীয় পরিচয়ে বেশি আবিষ্ট করে ফেলে। এখানে অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান চর্চার চেয়ে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির আদর্শিক বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে পাওলো ফ্রেইরের ‘মুক্তিমুখী শিক্ষাদর্শন’ আমাদের একটি বিকল্প পথ দেখায়। ফ্রেইরে মনে করতেন, শিক্ষা যদি সংলাপধর্মী এবং প্রতিফলনমূলক না হয়, তবে তা মানুষকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করে। বাংলাদেশের কিছু ক্ষেত্রে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মুক্তিমুখী চিন্তার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা তাদের একতরফা সামাজিকীকরণের বলয় থেকে বের করে আনতে সাহায্য করে।

এই রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় লিঙ্গীয় বৈষম্য একটি বড় এবং অনুচ্চারিত বিষয়। আমাদের সমাজকাঠামোতে এখনো ছেলে শিশুদের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশকে যতটা স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়, মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় নিরুৎসাহিত করা হয়। পরিবারে মেয়েদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রবণতা তাদের মধ্যে এক ধরণের ‘রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবোধ’ তৈরি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বৈষম্য দূর করার কথা থাকলেও বাস্তবে লিঙ্গভিত্তিক এই সামাজিকীকরণ নারী ভোটারদের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস এবং সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। ফলে ভোটার তালিকায় নারীর সংখ্যা বাড়লেও নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের প্রভাবমুক্ত হতে পারে না।

হেনরি তাজফেল এবং জন টার্নারের ‘সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব’ বাংলাদেশের ভোটারদের মানসিকতা বোঝার জন্য এক অপরিহার্য দলিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ তার আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল কেবল মতাদর্শ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তি বলে ‘আমি অমুক আদর্শের সমর্থক’, তখন সে আসলে তাজফেলের ভাষায় তার ‘ইন-গ্রুপ’ বা নিজ দলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায় এবং ‘আউট-গ্রুপ’ বা বিপক্ষ দলের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। পরিবার এবং বিদ্যালয় এই গোষ্ঠীগত চেতনাকে লালন করে। ফলে নির্বাচনের সময় ভোটার আচরণ কেবল একটি যৌক্তিক বা লাভ-ক্ষতির সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং এটি তার অস্তিত্ব, আবেগ এবং গোষ্ঠীগত আনুগত্যের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় এখন নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হচ্ছে। নগরায়ন, ডিজিটাল মিডিয়া এবং বিশ্বায়ন প্রথাগত পরিবার ও বিদ্যালয়ের প্রভাবকে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ করছে। এখনকার তরুণ ভোটাররা কেবল পরিবারের বড়দের কথা শুনে বা পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠিক করছে না। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা দেশ-বিদেশের নানা রাজনৈতিক প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু তাতেও সামাজিকীকরণের মূল সুরটি খুব একটা বদলায়নি। বরং অনেক সময় দেখা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল পুরনো মেরুকরণকেই নতুন মোড়কে আরও তীব্র করছে।

বাংলাদেশের ভোটারদের রাজনৈতিক আচরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি জটিল সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ফল। ডেভিড ইস্টন থেকে শুরু করে পাওলো ফ্রেইরে পর্যন্ত সকল সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের বিশ্লেষণ এটিই প্রমাণ করে যে, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ার জন্য কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ। আমাদের পরিবারগুলোকে হতে হবে পরমতসহিষ্ণুতার প্রথম পাঠশালা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে হতে হবে মুক্তচিন্তা ও নাগরিক অধিকার চর্চার কেন্দ্র। যদি আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া আনুগত্যের পরিবর্তে সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধ শেখাতে পারে, তবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও গভীর ও টেকসই ভিত্তি পাবে। একজন সচেতন ভোটার কেবল ভোটকেন্দ্রে তৈরি হয় না, তাকে তৈরি হতে হয় শৈশবের গল্পে এবং ক্লাসরুমের সংলাপে।

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top