alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

বেশ কিছু দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। ওগুলো হলো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর নামে। কর্মকর্তা ঠিক থাকলে চতুর্থ শ্রেণির বা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী দুর্নীতিবাজ হয় কী করে? এর উত্তর কিন্তু পাওয়া যায় না। দুর্নীতিবাজ কয়েকজন কর্মচারী সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে কিছু কথা লিখছি। যেমন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চাকরিচ্যুত ড্রাইভার সৈয়দ আবেদ আলীর কয়েকটি অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার। আলোচিত এ গাড়িচালক, তার স্ত্রী ও সন্তানের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে পৃথক ৩টি মামলা। দুর্নীতি দমন কমিশন এ তথ্য জানায়।

কমিশন আরও জানায়, সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০ কোটি ৮৮ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১ টাকা জমা ও ২০ কোটি ৪১ লাখ ৩ হাজার ৭৪১ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মোট ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন ৩ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকার।

সৈয়দ আবেদ আলী জীবন বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁস করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমেরিকার ইন্ডিয়ানায় বাড়ি, ঢাকায় ১০ তলা ও ৭ তলা বাড়ি, মাদারীপুর সদর উপজেলার চরমুগুরিয়ায় বহুতল ভবন, ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি, সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় সান মেরিনা আবাসিক হোটেলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাটসহ একাধিক ভবনের মালিক হয়েছেন। এছাড়া ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের বোতলা গ্রামে সরকারি জমি দখল করে তৈরি করেছেন গরুর ফার্ম। সৈয়দ আবেদ আলীর পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন কোটি টাকার একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। এছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার জমি। বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসসহ বিভিন্ন দপ্তরে করতেন দালালি।

আবেদ আলী একজন গাড়িচালক। তার কাছে কি কোনো নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থাকার কথা আছে? এই প্রশ্নটির উত্তর হবে না। তাহলে আবেদ আলী এই প্রশ্নপত্র পেলেন কী করে? নিশ্চয়ই ওপরের মহলকে তিনি টাকা দিয়ে এই প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তার যে উপরের মহল আছে, তারা আবেদ আলী সংশ্লিষ্টতায় কত টাকার মালিক হলেন-সেই তথ্যটি কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি।

আমরা সবাই জানি, প্রকৌশল দপ্তরগুলো ঠিকাদারদের কাছ থেকে পারসেন্টেজ নিয়ে বিল দেন। এটা ওপেন সিক্রেট-বিষয়টি সবার জানা। বিল প্রদানকারী প্রকৌশলী সরাসরি ঠিকাদারদের কাছ থেকে এই পারসেন্টেজের টাকা নেন না; তিনি অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা উপসহকারী প্রকৌশলীর মাধ্যমে এই টাকা নিয়ে থাকেন। শোনা গেছে, প্রকৌশলীকে যদি ১ শতাংশ হারে পারসেন্টেজ দেয়া হয়, তাহলে গ্রহণকারী পায় ০.০২ শতাংশ; অর্থাৎ পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ। আবেদ আলীর প্রশ্ন বিক্রির টাকা এই নিয়মে হিসাব করলে কী ফল আসে?

আবেদ আলীর যিনি কর্তা ছিলেন, মানে তার অফিসার-তিনি কত টাকা কামিয়েছেন, একটু হিসাব করে দেখবেন পাঠকেরা। আবেদ আলীর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাবটা প্রকাশ্যে আসা জরুরি।

এই মালেকরা নিজে নিজে সৃষ্টি হয় না; এদের কেউ না কেউ সৃষ্টি করে। যারা সৃষ্টি করে, তাদের চিত্রটা প্রকাশিত হোক। কারণ বরাবরই নেপথ্যের কারিগররা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একজন সাবেক পিয়ন চারশ কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে-এমন তথ্য প্রকাশের পর তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম, তার স্ত্রী এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক।” আগের হিসাবের মতো এটাকেও ঐকিক নিয়মে বের করলে ফল কী দাঁড়ায় নিশ্চয়ই পাঠকরা বুঝতে পারছেন।

ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মনির হোসেন একজন সার্ভেয়ার। একজন সার্ভেয়ার জাতীয় বেতন স্কেলের ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী, যার বেতন সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। যদি ২০ বছর চাকরি করেন, তারপরও বেতন-বোনাস মিলিয়ে ৭০ লাখও হবে না। অথচ তার রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকায় রোজ গার্ডেন ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট, ডেমরার হাজি মিয়া রোডে গ্রিন কটেজ-১ ও গ্রিন কটেজ-২-এ তিনটি ফ্ল্যাট, একই এলাকায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ কাঠার প্লট, সাত কাঠা জমিতে নির্মিত ২০টি দোকান এবং একই এলাকায় গ্রিন কটেজ-৪ ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।

এই সার্ভেয়ার কি এসিল্যান্ডের অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইল ওকে করতে পারে? যদি তা না পারে, তাহলে ওই সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ডদের সম্পদের হিসাবটাও গণমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত। কারণ সার্ভেয়ার বা কানুনগো সহকারী কমিশনারের অনুমোদন ছাড়া কোনো রেকর্ড বা কাগজপত্র ওকে করতে পারে না।

১৯৯৪ সালে যমুনা অয়েল কোম্পানিতে অস্থায়ী পদে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে চাকরি শুরু করেন ইয়াকুব। তিন বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠানের টাইপিস্ট পদে তার চাকরি স্থায়ী হয়। তিনি শত কোটি টাকার মালিক। একজন টাইপিস্ট কী করে শত কোটি টাকার মালিক হন? তার মনিটরিং কর্মকর্তা কি বসে বসে আঙুল চুষছিলেন, নাকি আঙুলে শুধু মধু মাখতেন? এই বিষয়টি কি দুদক তদন্ত করছেন?

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ ছিলেন আবদুল মালেক (৪২)। বিভিন্ন দুর্নীতি করার অপরাধে ২০১৫ সালে চাকরিচ্যুত হন। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় চিপস ব্যবহার, বিভিন্ন কোটায় নকল সার্টিফিকেট তৈরি করে চাকরি পাইয়ে দেয়ার নাম করে এরই মধ্যে বনে গেছেন শত কোটি টাকার মালিক। মালেক প্রতারণার মাধ্যমে অনেক সম্পত্তি ও শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকার বেশি এফডিআর রয়েছে।

এছাড়া ঢাকা জেলার ধামরাই থানার ফোর্ডনগর এলাকায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রাজধানীর মণিপুরী ও ৬০ ফিট এলাকায় তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা। কুষ্টিয়ার সদর থানার বড়িয়া এলাকায় জাহান সুপার মার্কেট ছাড়াও নিজ গ্রামে ২৫ বিঘা জমি এবং একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার জাহান গ্রুপ নামে একটি কনজ্যুমার প্রোডাক্টস কারখানা আছে। এছাড়া কুষ্টিয়া এক্সপ্রেস নামে একটি বাস ও চারটি ট্রাক রয়েছে।

১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া মালেক ১৯৯৩ সালে দাখিল এবং ১৯৯৫ সালে আলিম পাস করেন। এরপর স্থানীয় একটি কলেজ থেকে বি-কম ও এম-কম ডিগ্রি পড়েন। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি শুরু করেন। এরপর থেকে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকেন। মালেকের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা কত সম্পদের মালিক হলেন, তার হিসাবটাও পাশাপাশি আসা দরকার।

এই মালেকরা নিজে নিজে সৃষ্টি হয় না; এদের কেউ না কেউ সৃষ্টি করে। যারা সৃষ্টি করে, তাদের চিত্রটা প্রকাশিত হোক। কারণ বরাবরই নেপথ্যের কারিগররা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এসব লিখতে গিয়ে একটি গল্পের কথা মনে পড়ল। এক ভদ্রলোক শুনতে পেলেন, তার পাশের গ্রামে লাল মিঞা ও কালা মিঞা নামে দুই ভাই বাস করে। রঙের নামে যেহেতু তাদের নাম, তাই তাদের দেখার তার ইচ্ছে জাগল। একদিন তিনি তাদের দেখতে গেলেন। বাড়ির কাছে গিয়ে লাল মিঞা ও কালা মিঞা নামে ডাক দিলেন। একজন লোক বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। এসে বললেন, কাকে চাই? ভদ্রলোক বললেন, আমি লাল মিঞা ও কালা মিঞাকে দেখতে এসেছি। লোকটি তখন বললেন, আমি লাল মিঞা; আপনি একটু দাঁড়ান, কালা মিঞাকে ডেকে আনছি। ভদ্রলোক দেখলেন, লাল মিঞা কুচকুচে কালো। তাই তিনি লাল মিঞাকে বললেন, তা আর ডাকতে হবে না কারণ লাল মিঞা যদি এত কালো হয়, তাহলে কালা মিঞা কেমন হবে, তা আমি বুঝতে পারছি।

বাংলাদেশের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে দ্বিতীয়, প্রথম ও তদূর্ধ্বদের অবস্থাটা যে কী, তা সাধারণ মানুষ অনুধাবন করতে পারছে।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নির্বাচন কি মবোক্রেসি বন্ধ করবে?

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড: স্বচ্ছতা না নতুন ঝুঁকি?

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

বেশ কিছু দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। ওগুলো হলো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর নামে। কর্মকর্তা ঠিক থাকলে চতুর্থ শ্রেণির বা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী দুর্নীতিবাজ হয় কী করে? এর উত্তর কিন্তু পাওয়া যায় না। দুর্নীতিবাজ কয়েকজন কর্মচারী সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে কিছু কথা লিখছি। যেমন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) চাকরিচ্যুত ড্রাইভার সৈয়দ আবেদ আলীর কয়েকটি অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার। আলোচিত এ গাড়িচালক, তার স্ত্রী ও সন্তানের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে পৃথক ৩টি মামলা। দুর্নীতি দমন কমিশন এ তথ্য জানায়।

কমিশন আরও জানায়, সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০ কোটি ৮৮ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১ টাকা জমা ও ২০ কোটি ৪১ লাখ ৩ হাজার ৭৪১ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মোট ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন ৩ কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকার।

সৈয়দ আবেদ আলী জীবন বিসিএসের প্রশ্ন ফাঁস করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমেরিকার ইন্ডিয়ানায় বাড়ি, ঢাকায় ১০ তলা ও ৭ তলা বাড়ি, মাদারীপুর সদর উপজেলার চরমুগুরিয়ায় বহুতল ভবন, ডাসার উপজেলার পশ্চিম বোতলা গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি, সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় সান মেরিনা আবাসিক হোটেলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাটসহ একাধিক ভবনের মালিক হয়েছেন। এছাড়া ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের বোতলা গ্রামে সরকারি জমি দখল করে তৈরি করেছেন গরুর ফার্ম। সৈয়দ আবেদ আলীর পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন কোটি টাকার একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। এছাড়া নামে-বেনামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার জমি। বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসসহ বিভিন্ন দপ্তরে করতেন দালালি।

আবেদ আলী একজন গাড়িচালক। তার কাছে কি কোনো নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থাকার কথা আছে? এই প্রশ্নটির উত্তর হবে না। তাহলে আবেদ আলী এই প্রশ্নপত্র পেলেন কী করে? নিশ্চয়ই ওপরের মহলকে তিনি টাকা দিয়ে এই প্রশ্নপত্র পেয়েছেন। তার যে উপরের মহল আছে, তারা আবেদ আলী সংশ্লিষ্টতায় কত টাকার মালিক হলেন-সেই তথ্যটি কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি।

আমরা সবাই জানি, প্রকৌশল দপ্তরগুলো ঠিকাদারদের কাছ থেকে পারসেন্টেজ নিয়ে বিল দেন। এটা ওপেন সিক্রেট-বিষয়টি সবার জানা। বিল প্রদানকারী প্রকৌশলী সরাসরি ঠিকাদারদের কাছ থেকে এই পারসেন্টেজের টাকা নেন না; তিনি অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা উপসহকারী প্রকৌশলীর মাধ্যমে এই টাকা নিয়ে থাকেন। শোনা গেছে, প্রকৌশলীকে যদি ১ শতাংশ হারে পারসেন্টেজ দেয়া হয়, তাহলে গ্রহণকারী পায় ০.০২ শতাংশ; অর্থাৎ পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ। আবেদ আলীর প্রশ্ন বিক্রির টাকা এই নিয়মে হিসাব করলে কী ফল আসে?

আবেদ আলীর যিনি কর্তা ছিলেন, মানে তার অফিসার-তিনি কত টাকা কামিয়েছেন, একটু হিসাব করে দেখবেন পাঠকেরা। আবেদ আলীর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাবটা প্রকাশ্যে আসা জরুরি।

এই মালেকরা নিজে নিজে সৃষ্টি হয় না; এদের কেউ না কেউ সৃষ্টি করে। যারা সৃষ্টি করে, তাদের চিত্রটা প্রকাশিত হোক। কারণ বরাবরই নেপথ্যের কারিগররা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একজন সাবেক পিয়ন চারশ কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে-এমন তথ্য প্রকাশের পর তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম, তার স্ত্রী এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক।” আগের হিসাবের মতো এটাকেও ঐকিক নিয়মে বের করলে ফল কী দাঁড়ায় নিশ্চয়ই পাঠকরা বুঝতে পারছেন।

ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মনির হোসেন একজন সার্ভেয়ার। একজন সার্ভেয়ার জাতীয় বেতন স্কেলের ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী, যার বেতন সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। যদি ২০ বছর চাকরি করেন, তারপরও বেতন-বোনাস মিলিয়ে ৭০ লাখও হবে না। অথচ তার রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকায় রোজ গার্ডেন ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট, ডেমরার হাজি মিয়া রোডে গ্রিন কটেজ-১ ও গ্রিন কটেজ-২-এ তিনটি ফ্ল্যাট, একই এলাকায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ কাঠার প্লট, সাত কাঠা জমিতে নির্মিত ২০টি দোকান এবং একই এলাকায় গ্রিন কটেজ-৪ ভবনে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।

এই সার্ভেয়ার কি এসিল্যান্ডের অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইল ওকে করতে পারে? যদি তা না পারে, তাহলে ওই সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ডদের সম্পদের হিসাবটাও গণমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত। কারণ সার্ভেয়ার বা কানুনগো সহকারী কমিশনারের অনুমোদন ছাড়া কোনো রেকর্ড বা কাগজপত্র ওকে করতে পারে না।

১৯৯৪ সালে যমুনা অয়েল কোম্পানিতে অস্থায়ী পদে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে চাকরি শুরু করেন ইয়াকুব। তিন বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠানের টাইপিস্ট পদে তার চাকরি স্থায়ী হয়। তিনি শত কোটি টাকার মালিক। একজন টাইপিস্ট কী করে শত কোটি টাকার মালিক হন? তার মনিটরিং কর্মকর্তা কি বসে বসে আঙুল চুষছিলেন, নাকি আঙুলে শুধু মধু মাখতেন? এই বিষয়টি কি দুদক তদন্ত করছেন?

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ ছিলেন আবদুল মালেক (৪২)। বিভিন্ন দুর্নীতি করার অপরাধে ২০১৫ সালে চাকরিচ্যুত হন। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় চিপস ব্যবহার, বিভিন্ন কোটায় নকল সার্টিফিকেট তৈরি করে চাকরি পাইয়ে দেয়ার নাম করে এরই মধ্যে বনে গেছেন শত কোটি টাকার মালিক। মালেক প্রতারণার মাধ্যমে অনেক সম্পত্তি ও শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকার বেশি এফডিআর রয়েছে।

এছাড়া ঢাকা জেলার ধামরাই থানার ফোর্ডনগর এলাকায় ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। রাজধানীর মণিপুরী ও ৬০ ফিট এলাকায় তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা। কুষ্টিয়ার সদর থানার বড়িয়া এলাকায় জাহান সুপার মার্কেট ছাড়াও নিজ গ্রামে ২৫ বিঘা জমি এবং একটি পাকা বাড়ি রয়েছে। কুষ্টিয়ায় তার জাহান গ্রুপ নামে একটি কনজ্যুমার প্রোডাক্টস কারখানা আছে। এছাড়া কুষ্টিয়া এক্সপ্রেস নামে একটি বাস ও চারটি ট্রাক রয়েছে।

১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া মালেক ১৯৯৩ সালে দাখিল এবং ১৯৯৫ সালে আলিম পাস করেন। এরপর স্থানীয় একটি কলেজ থেকে বি-কম ও এম-কম ডিগ্রি পড়েন। ২০০৪ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি শুরু করেন। এরপর থেকে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকেন। মালেকের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা কত সম্পদের মালিক হলেন, তার হিসাবটাও পাশাপাশি আসা দরকার।

এই মালেকরা নিজে নিজে সৃষ্টি হয় না; এদের কেউ না কেউ সৃষ্টি করে। যারা সৃষ্টি করে, তাদের চিত্রটা প্রকাশিত হোক। কারণ বরাবরই নেপথ্যের কারিগররা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এসব লিখতে গিয়ে একটি গল্পের কথা মনে পড়ল। এক ভদ্রলোক শুনতে পেলেন, তার পাশের গ্রামে লাল মিঞা ও কালা মিঞা নামে দুই ভাই বাস করে। রঙের নামে যেহেতু তাদের নাম, তাই তাদের দেখার তার ইচ্ছে জাগল। একদিন তিনি তাদের দেখতে গেলেন। বাড়ির কাছে গিয়ে লাল মিঞা ও কালা মিঞা নামে ডাক দিলেন। একজন লোক বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। এসে বললেন, কাকে চাই? ভদ্রলোক বললেন, আমি লাল মিঞা ও কালা মিঞাকে দেখতে এসেছি। লোকটি তখন বললেন, আমি লাল মিঞা; আপনি একটু দাঁড়ান, কালা মিঞাকে ডেকে আনছি। ভদ্রলোক দেখলেন, লাল মিঞা কুচকুচে কালো। তাই তিনি লাল মিঞাকে বললেন, তা আর ডাকতে হবে না কারণ লাল মিঞা যদি এত কালো হয়, তাহলে কালা মিঞা কেমন হবে, তা আমি বুঝতে পারছি।

বাংলাদেশের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে দ্বিতীয়, প্রথম ও তদূর্ধ্বদের অবস্থাটা যে কী, তা সাধারণ মানুষ অনুধাবন করতে পারছে।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

back to top