লাবনী আক্তার শিমলা
বাংলার সৌন্দর্যের সবটাই গণিতে গড়ে ওঠে, গণিতের মধ্যে গড়ে ওঠে এর অর্থনীতি। ফুল ও মৌমাছির পারস্পরিক সম্পর্কে গণিতের হিসাবেই মিলবে কৃষির উত্তরণের পথ। ফুল ও মৌমাছির সান্নিধ্যে ঘটে পরাগায়ন। কৃষি যদি হয় একটি জটিল সমীকরণ, তবে পরাগায়ন তার প্রধান চলক। এই চলকের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা মানেই কৃষিকে সমুন্নত করা। সকালের সোনালি রোদে যখন সরিষার ক্ষেত মৌমাছির গুঞ্জনে নেচে ওঠে, তখন পরাগায়নের মাধ্যমে ঘটে সেই সমীকরণের কার্যকারিতা। গড়ে ওঠে বীজ, শস্য, খাদ্য ও বাণিজ্য। অর্থাৎ, পরাগায়ন শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্ভাবনা নয়; এটি কৃষির একটি পরিশীলিত গাণিতিক ব্যবস্থা। এই গাণিতিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা সম্ভাবনা তত্ত্বই গড়ে তোলে কৃষির প্রাণ।
যদি মৌমাছি বিলুপ্ত হয়, মানুষ চার বছরের বেশি বাঁচবে না-এই কথাটি বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের নামে প্রচলিত হলেও এর সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু উক্তিটির তাৎপর্য রয়েছে। মৌমাছিরা পরাগায়নে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। মৌমাছি ছাড়া খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে, মানবজাতি খাদ্যের অভাবে জর্জরিত হয়ে পড়বে। দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের প্রায় ৭০ শতাংশের পরাগায়ন মৌমাছির ওপর নির্ভরশীল। মৌমাছির নাম শুনলে শুধু মধুর কথা উঠে আসে, অথচ মৌমাছির পরাগায়নের ফলে ফল, বাদাম, ডাল, কফি, কোকো এবং বিভিন্ন সবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের ৭৫ শতাংশ ফসলের পরাগায়নে মৌমাছিসহ বিভিন্ন পতঙ্গের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঅজও)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছির পরাগায়নে আমের উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে, লিচুতে ৩৫ শতাংশ এবং কাঠবাদামে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, শুধু মৌমাছির মাধ্যমেই বাংলাদেশের ফল উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রায় ৪.৫ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়। শুধু ভালো পরাগায়ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন ১০ শতাংশ বাড়ানো যায়, এতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার টন সরিষা উৎপাদন সম্ভব, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি, ২০২১)-এর তথ্যমতে, দেশের ৩০টিরও বেশি ফসল সরাসরি পরাগায়ন-নির্ভর, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য আনুমানিক ১৫০০-২০০০ কোটি টাকা। ফসলি জমির মাঝখানে বা চারপাশে যে আইল, নালা বা সীমানা থাকে, সেখানে ফুলগাছ লাগানো হলে এই ফুলের সারি বা অঞ্চলটি একটি পথ তৈরি করে, যেখানে মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পোকা চলাচল, বিশ্রাম ও খাদ্য পায়। গাণিতিক মডেল বলছে, ছোট ও কম খরচের ব্যবস্থা-যেমন মাঠের আইলে ফুলের করিডর তৈরি করা হলে পুরো কৃষি নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াবে। এটি ফসলের উৎপাদন অনিশ্চয়তা কমায়। কার্যকর পরাগায়ন ব্যবস্থাপনা শুধু ফলনই বাড়ায় না; এটি ফসলের উৎপাদন ও আয়ের তারতম্য (ভ্যারিয়েন্স) ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে কৃষি-ব্যবসায়ের সামগ্রিক ঝুঁকি হ্রাস করে।
প্রকৃতিতে পরাগায়ন গণিতের প্রথম পর্যায় শুরু হয় প্রকৃতির নিজস্ব ‘খেলা তত্ত্ব’ দিয়ে। ফুল এবং পরাগায়নকারীর মধ্যে যে সম্পর্ক, তা প্রকৃতির সবচেয়ে সফল দ্বৈত কার্যকরী সমস্যার উদাহরণ। ফুলের কাছে সমস্যাটি এমন কীভাবে সর্বনিম্ন নেক্টার উৎপাদন খরচে সর্বোচ্চ পরাগায়ন সাফল্য অর্জন করা যায়। অন্যদিকে মৌমাছি বা প্রজাপতির কাছে সমস্যাটি ভিন্ন কীভাবে সর্বনিম্ন শক্তি ব্যয়ে সর্বোচ্চ নেক্টার সংগ্রহ করা যায়। ফুল ও মৌমাছির এই সম্পর্ক প্রকৃতির একটি ভারসাম্য তৈরি করে, যা অর্থনীতির ভাষায় ন্যাশ ভারসাম্য নামে পরিচিত। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে ফুলও সর্বনিম্ন খরচে বেশি পরাগায়ন পায়, আবার মৌমাছিও কম শক্তি ব্যয়ে বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারে। কেউ যদি একতরফাভাবে কৌশল পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে উভয়েরই ক্ষতি হবে ফুল যদি নেক্টার কমায়, মৌমাছি চলে যাবে; আবার মৌমাছি যদি অন্য ফুলে যায়, তার শক্তি বেশি ব্যয় হবে। ফলে প্রকৃতিতে একটি মাঝামাঝি, স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে কেউ একা কৌশল বদলালে লাভবান হতে পারে না। এটিই হলো ফুল-মৌমাছির ন্যাশ ভারসাম্য।
বাংলাদেশের কৃষি প্রেক্ষাপটে এই গণিত আরও জটিল হয়, কারণ এখানে শুধু একটি প্রজাতি নয়-এপিস সেরানা (স্থানীয় মৌমাছি), এপিস ডোরসাটা (বন মৌমাছি, যারা ঝুলন্ত চাক তৈরি করে এবং লিচু-কাঁঠালের জন্য সর্বোত্তম), টেট্রাগোনুলা ইরিডিপেনিস (ঝাঁক মৌমাছি বা ফণীমনসা মৌমাছি, যারা ছোট ফুল ও মসলা ফসলের গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী) সহ কমপক্ষে ১২টি স্থানীয় মৌমাছি প্রজাতি রয়েছে। প্রতিটি প্রজাতির পরাগায়ন দক্ষতা, পছন্দের ফুল এবং কাজের সময় আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, একটি লিচু ফুলে একটি মৌমাছির অবতরণের সম্ভাবনা চ নির্ভর করে ? (আকর্ষণ সূচক), উ (ঘনত্ব ফ্যাক্টর), ঈ (পরাগায়নকারীর প্রাচুর্য) এবং ঞ (বিষাক্ততা ফ্যাক্টর)-এর ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঞ-এর মান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এই সম্ভাবনাকে কখনো কখনো শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়নিকোটিনয়েড জাতীয় কীটনাশক মৌমাছির স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়; ফলে তারা ফুল চিনতে ও ফিরে আসতে পারে না এবং শেষ পর্যন্ত কলোনি ধ্বংস হয়ে যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে মৌমাছির স্বাভাবিক কার্যক্রমে। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। মডেল বলছে, এতে পরাগায়ন দক্ষতা ৪ শতাংশ এবং পরাগায়ননির্ভর ফসলের ফলন ২.৫–৩.০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ আরও ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফলনে ৬-৮ শতাংশ পতনের কারণ হতে পারে (সূত্র: ওচঈঈ প্রতিবেদন)। এছাড়া, ফুল ফোটার চূড়ান্ত সময়ে যেমন লিচুর ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি-মার্চে এক দিনের অসময়ে ভারী বৃষ্টি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পরাগ ধুয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের জলবায়ু এখন আরও অনিশ্চিত; তাই পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
এই গাণিতিক সম্পর্ক বাস্তবে একটি জালের মতো কাজ করে -যেখানে প্রতিটি ফসলের ক্ষেত একটি কেন্দ্রবিন্দু, আর মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারীর চলাচল সেই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত ভঙ্গুর একটি মাত্র বাধা পুরো সিস্টেমকে ব্যাহত করতে পারে। ধরা যাক, দিনাজপুরের কোনো একফসলি এলাকায় নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতা সূচক (ঘ)-এর মান মাত্র ৩.২ ধরা যায়, যেখানে সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার এলাকায় প্রাকৃতিক বৈচিত্রের কারণে এটি ৯.১ পর্যন্ত হতে পারে। এই পার্থক্যই বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটোই তৈরি করেছে। নেটওয়ার্ক তত্ত্ব আমাদের বলে, একটি সিস্টেমের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে প্রজাতির সংখ্যা, সংযোগ ঘনত্ব এবং বিকল্প পথের ওপর। বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি যখন একফসলি প্রবণতার দিকে যাচ্ছে, তখন এই নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা কমছে। আর যখন কৃষকেরা মাঠের আইলে দেশি ফুলগাছ রাখেন, বেড়ায় লতাগুল্ম জমান কিংবা ফসলের বৈচিত্র বজায় রাখেন, তখন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়। এই নেটওয়ার্কের গাণিতিক সৌন্দর্য হলো-এটি রৈখিক নয়; বরং এক্সপোনেনশিয়াল (বক্ররেখা)। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে, কারণ এটি শুধু সংযোগই বাড়ায় না, বিকল্প পথও তৈরি করে।
যেসব কৃষক কম কীটনাশক ব্যবহার করেন এবং জমির আইলে দেশি ফুল ও গাছ রেখে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পোকার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেন, তাদের উৎপাদিত ফল ও ফসল আলাদা করে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই ফসলগুলোকে ‘পরাগায়নবান্ধব’ নামে লেবেল বা সনদ দিয়ে বাজারে তুললে সেগুলো সাধারণ পণ্যের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। এর ফলে কৃষক বেশি আয় পাবেন, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং কৃষিভিত্তিক একটি নতুন পরিবেশবান্ধব বাজার ব্যবস্থা বা ভ্যালু চেইন গড়ে উঠবে।
ভারমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. টেলর রিকেটস তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ‘প্রাকৃতিক পরাগায়নের অবদান প্রায়শই কৃত্রিম পরাগায়নের চেয়ে বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।’ বাংলাদেশের জন্য এই উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রয়োজন-
একটি জাতীয় ‘পোলিনেটর অ্যাকশন প্ল্যান’, যেখানে থাকবে ফসলের জমির অন্তত ৫ শতাংশ স্থানীয় ফুলের করিডর হিসেবে সংরক্ষণ, ফুল ফোটার সময় কীটনাশক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় মৌমাছি প্রজাতির সংরক্ষণ ও চাষে প্রণোদনা। এছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তির সংযোগ সৃষ্টি। অর্থাৎ, স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে ‘পরাগায়নের অর্থনীতি’ অন্তর্ভুক্ত করা, একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা, যেখানে কৃষক ফসলের ছবি আপলোড করলে এআই মডেল পরাগায়নকারীর উপস্থিতি ও সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করে পরামর্শ দেবে। আরেকটি অত্যবশ্যকীয় করণীয় হল গবেষণায় বিনিয়োগ। অতএব, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘অ্যাগ্রো-ইকোলজিক্যাল মডেলিং’ বিভাগ চালু করতে হবে, যেখানে গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃষিবিদ্যা একত্রে শেখানো হবে।
মৌমাছির প্রজনন রক্ষার্থে গাছ রোপণ করা ও কৃত্রিম উপায়ে মৌমাছি চাষ করা জরুরি। এতে একইসঙ্গে মধু উৎপাদন বাড়বে, ফুলের সাথে মৌমাছির সংযোগ বাড়বে। ফলে পরাগায়ন আরও ভালো হবে। এজন্য জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এর বিপরীতে জৈব সারের মূল্য কমিয়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ফুল, মৌমাছি আর আমাদের ফসলের মাঝের এই গণিত খুব জটিল নয়। এটি হলো প্রকৃতির সহজ সমীকরণ: ফুলের আয়োজন + মৌমাছির আগমন = সমৃদ্ধির ফসল ।ফুল ও মৌমাছির প্রাকৃতিক গণিতে আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনা বেঁচে থাকে। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের একান্ত কাম্য।
[লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
লাবনী আক্তার শিমলা
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
বাংলার সৌন্দর্যের সবটাই গণিতে গড়ে ওঠে, গণিতের মধ্যে গড়ে ওঠে এর অর্থনীতি। ফুল ও মৌমাছির পারস্পরিক সম্পর্কে গণিতের হিসাবেই মিলবে কৃষির উত্তরণের পথ। ফুল ও মৌমাছির সান্নিধ্যে ঘটে পরাগায়ন। কৃষি যদি হয় একটি জটিল সমীকরণ, তবে পরাগায়ন তার প্রধান চলক। এই চলকের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা মানেই কৃষিকে সমুন্নত করা। সকালের সোনালি রোদে যখন সরিষার ক্ষেত মৌমাছির গুঞ্জনে নেচে ওঠে, তখন পরাগায়নের মাধ্যমে ঘটে সেই সমীকরণের কার্যকারিতা। গড়ে ওঠে বীজ, শস্য, খাদ্য ও বাণিজ্য। অর্থাৎ, পরাগায়ন শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্ভাবনা নয়; এটি কৃষির একটি পরিশীলিত গাণিতিক ব্যবস্থা। এই গাণিতিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা সম্ভাবনা তত্ত্বই গড়ে তোলে কৃষির প্রাণ।
যদি মৌমাছি বিলুপ্ত হয়, মানুষ চার বছরের বেশি বাঁচবে না-এই কথাটি বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের নামে প্রচলিত হলেও এর সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু উক্তিটির তাৎপর্য রয়েছে। মৌমাছিরা পরাগায়নে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। মৌমাছি ছাড়া খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়বে, মানবজাতি খাদ্যের অভাবে জর্জরিত হয়ে পড়বে। দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের প্রায় ৭০ শতাংশের পরাগায়ন মৌমাছির ওপর নির্ভরশীল। মৌমাছির নাম শুনলে শুধু মধুর কথা উঠে আসে, অথচ মৌমাছির পরাগায়নের ফলে ফল, বাদাম, ডাল, কফি, কোকো এবং বিভিন্ন সবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের ৭৫ শতাংশ ফসলের পরাগায়নে মৌমাছিসহ বিভিন্ন পতঙ্গের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঅজও)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছির পরাগায়নে আমের উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে, লিচুতে ৩৫ শতাংশ এবং কাঠবাদামে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, শুধু মৌমাছির মাধ্যমেই বাংলাদেশের ফল উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রায় ৪.৫ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়। শুধু ভালো পরাগায়ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন ১০ শতাংশ বাড়ানো যায়, এতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার টন সরিষা উৎপাদন সম্ভব, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি, ২০২১)-এর তথ্যমতে, দেশের ৩০টিরও বেশি ফসল সরাসরি পরাগায়ন-নির্ভর, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য আনুমানিক ১৫০০-২০০০ কোটি টাকা। ফসলি জমির মাঝখানে বা চারপাশে যে আইল, নালা বা সীমানা থাকে, সেখানে ফুলগাছ লাগানো হলে এই ফুলের সারি বা অঞ্চলটি একটি পথ তৈরি করে, যেখানে মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পোকা চলাচল, বিশ্রাম ও খাদ্য পায়। গাণিতিক মডেল বলছে, ছোট ও কম খরচের ব্যবস্থা-যেমন মাঠের আইলে ফুলের করিডর তৈরি করা হলে পুরো কৃষি নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াবে। এটি ফসলের উৎপাদন অনিশ্চয়তা কমায়। কার্যকর পরাগায়ন ব্যবস্থাপনা শুধু ফলনই বাড়ায় না; এটি ফসলের উৎপাদন ও আয়ের তারতম্য (ভ্যারিয়েন্স) ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে কৃষি-ব্যবসায়ের সামগ্রিক ঝুঁকি হ্রাস করে।
প্রকৃতিতে পরাগায়ন গণিতের প্রথম পর্যায় শুরু হয় প্রকৃতির নিজস্ব ‘খেলা তত্ত্ব’ দিয়ে। ফুল এবং পরাগায়নকারীর মধ্যে যে সম্পর্ক, তা প্রকৃতির সবচেয়ে সফল দ্বৈত কার্যকরী সমস্যার উদাহরণ। ফুলের কাছে সমস্যাটি এমন কীভাবে সর্বনিম্ন নেক্টার উৎপাদন খরচে সর্বোচ্চ পরাগায়ন সাফল্য অর্জন করা যায়। অন্যদিকে মৌমাছি বা প্রজাপতির কাছে সমস্যাটি ভিন্ন কীভাবে সর্বনিম্ন শক্তি ব্যয়ে সর্বোচ্চ নেক্টার সংগ্রহ করা যায়। ফুল ও মৌমাছির এই সম্পর্ক প্রকৃতির একটি ভারসাম্য তৈরি করে, যা অর্থনীতির ভাষায় ন্যাশ ভারসাম্য নামে পরিচিত। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে ফুলও সর্বনিম্ন খরচে বেশি পরাগায়ন পায়, আবার মৌমাছিও কম শক্তি ব্যয়ে বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারে। কেউ যদি একতরফাভাবে কৌশল পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে উভয়েরই ক্ষতি হবে ফুল যদি নেক্টার কমায়, মৌমাছি চলে যাবে; আবার মৌমাছি যদি অন্য ফুলে যায়, তার শক্তি বেশি ব্যয় হবে। ফলে প্রকৃতিতে একটি মাঝামাঝি, স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে কেউ একা কৌশল বদলালে লাভবান হতে পারে না। এটিই হলো ফুল-মৌমাছির ন্যাশ ভারসাম্য।
বাংলাদেশের কৃষি প্রেক্ষাপটে এই গণিত আরও জটিল হয়, কারণ এখানে শুধু একটি প্রজাতি নয়-এপিস সেরানা (স্থানীয় মৌমাছি), এপিস ডোরসাটা (বন মৌমাছি, যারা ঝুলন্ত চাক তৈরি করে এবং লিচু-কাঁঠালের জন্য সর্বোত্তম), টেট্রাগোনুলা ইরিডিপেনিস (ঝাঁক মৌমাছি বা ফণীমনসা মৌমাছি, যারা ছোট ফুল ও মসলা ফসলের গুরুত্বপূর্ণ পরাগায়নকারী) সহ কমপক্ষে ১২টি স্থানীয় মৌমাছি প্রজাতি রয়েছে। প্রতিটি প্রজাতির পরাগায়ন দক্ষতা, পছন্দের ফুল এবং কাজের সময় আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, একটি লিচু ফুলে একটি মৌমাছির অবতরণের সম্ভাবনা চ নির্ভর করে ? (আকর্ষণ সূচক), উ (ঘনত্ব ফ্যাক্টর), ঈ (পরাগায়নকারীর প্রাচুর্য) এবং ঞ (বিষাক্ততা ফ্যাক্টর)-এর ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঞ-এর মান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এই সম্ভাবনাকে কখনো কখনো শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়নিকোটিনয়েড জাতীয় কীটনাশক মৌমাছির স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়; ফলে তারা ফুল চিনতে ও ফিরে আসতে পারে না এবং শেষ পর্যন্ত কলোনি ধ্বংস হয়ে যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে মৌমাছির স্বাভাবিক কার্যক্রমে। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। মডেল বলছে, এতে পরাগায়ন দক্ষতা ৪ শতাংশ এবং পরাগায়ননির্ভর ফসলের ফলন ২.৫–৩.০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ আরও ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফলনে ৬-৮ শতাংশ পতনের কারণ হতে পারে (সূত্র: ওচঈঈ প্রতিবেদন)। এছাড়া, ফুল ফোটার চূড়ান্ত সময়ে যেমন লিচুর ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি-মার্চে এক দিনের অসময়ে ভারী বৃষ্টি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পরাগ ধুয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের জলবায়ু এখন আরও অনিশ্চিত; তাই পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
এই গাণিতিক সম্পর্ক বাস্তবে একটি জালের মতো কাজ করে -যেখানে প্রতিটি ফসলের ক্ষেত একটি কেন্দ্রবিন্দু, আর মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারীর চলাচল সেই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত ভঙ্গুর একটি মাত্র বাধা পুরো সিস্টেমকে ব্যাহত করতে পারে। ধরা যাক, দিনাজপুরের কোনো একফসলি এলাকায় নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতা সূচক (ঘ)-এর মান মাত্র ৩.২ ধরা যায়, যেখানে সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার এলাকায় প্রাকৃতিক বৈচিত্রের কারণে এটি ৯.১ পর্যন্ত হতে পারে। এই পার্থক্যই বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটোই তৈরি করেছে। নেটওয়ার্ক তত্ত্ব আমাদের বলে, একটি সিস্টেমের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে প্রজাতির সংখ্যা, সংযোগ ঘনত্ব এবং বিকল্প পথের ওপর। বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি যখন একফসলি প্রবণতার দিকে যাচ্ছে, তখন এই নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা কমছে। আর যখন কৃষকেরা মাঠের আইলে দেশি ফুলগাছ রাখেন, বেড়ায় লতাগুল্ম জমান কিংবা ফসলের বৈচিত্র বজায় রাখেন, তখন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়। এই নেটওয়ার্কের গাণিতিক সৌন্দর্য হলো-এটি রৈখিক নয়; বরং এক্সপোনেনশিয়াল (বক্ররেখা)। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে, কারণ এটি শুধু সংযোগই বাড়ায় না, বিকল্প পথও তৈরি করে।
যেসব কৃষক কম কীটনাশক ব্যবহার করেন এবং জমির আইলে দেশি ফুল ও গাছ রেখে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পোকার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেন, তাদের উৎপাদিত ফল ও ফসল আলাদা করে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই ফসলগুলোকে ‘পরাগায়নবান্ধব’ নামে লেবেল বা সনদ দিয়ে বাজারে তুললে সেগুলো সাধারণ পণ্যের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। এর ফলে কৃষক বেশি আয় পাবেন, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং কৃষিভিত্তিক একটি নতুন পরিবেশবান্ধব বাজার ব্যবস্থা বা ভ্যালু চেইন গড়ে উঠবে।
ভারমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. টেলর রিকেটস তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ‘প্রাকৃতিক পরাগায়নের অবদান প্রায়শই কৃত্রিম পরাগায়নের চেয়ে বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর।’ বাংলাদেশের জন্য এই উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রয়োজন-
একটি জাতীয় ‘পোলিনেটর অ্যাকশন প্ল্যান’, যেখানে থাকবে ফসলের জমির অন্তত ৫ শতাংশ স্থানীয় ফুলের করিডর হিসেবে সংরক্ষণ, ফুল ফোটার সময় কীটনাশক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় মৌমাছি প্রজাতির সংরক্ষণ ও চাষে প্রণোদনা। এছাড়া শিক্ষা ও প্রযুক্তির সংযোগ সৃষ্টি। অর্থাৎ, স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে ‘পরাগায়নের অর্থনীতি’ অন্তর্ভুক্ত করা, একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা, যেখানে কৃষক ফসলের ছবি আপলোড করলে এআই মডেল পরাগায়নকারীর উপস্থিতি ও সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করে পরামর্শ দেবে। আরেকটি অত্যবশ্যকীয় করণীয় হল গবেষণায় বিনিয়োগ। অতএব, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘অ্যাগ্রো-ইকোলজিক্যাল মডেলিং’ বিভাগ চালু করতে হবে, যেখানে গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃষিবিদ্যা একত্রে শেখানো হবে।
মৌমাছির প্রজনন রক্ষার্থে গাছ রোপণ করা ও কৃত্রিম উপায়ে মৌমাছি চাষ করা জরুরি। এতে একইসঙ্গে মধু উৎপাদন বাড়বে, ফুলের সাথে মৌমাছির সংযোগ বাড়বে। ফলে পরাগায়ন আরও ভালো হবে। এজন্য জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এর বিপরীতে জৈব সারের মূল্য কমিয়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ফুল, মৌমাছি আর আমাদের ফসলের মাঝের এই গণিত খুব জটিল নয়। এটি হলো প্রকৃতির সহজ সমীকরণ: ফুলের আয়োজন + মৌমাছির আগমন = সমৃদ্ধির ফসল ।ফুল ও মৌমাছির প্রাকৃতিক গণিতে আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনা বেঁচে থাকে। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের একান্ত কাম্য।
[লেখক: শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]