alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
image

মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সর্বত্র

ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে শুরু হওয়া সহিংস বিক্ষোভে মেট্রো স্টেশন, ব্যাংক, টিভি ভবন, দোকান, বাস, গাড়ি, মোটরসাইকেল ইত্যাদি বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে পুড়ছে, আগুনে পুড়ছে মসজিদও। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সর্বত্র। এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে হাজার হাজার, লাখ লাখ ইরানি। লাখ লাখ লোক রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভকারীরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনি ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অপসারণও দাবি করেছে। ১৯৭৯ সনে গণঅভ্যুত্থানের পর এমন ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন ইতঃপূর্বে আর হয়নি। ২০২২ সনে হিজাবের ভেতর থেকে একটু চুল বেরিয়ে পড়ায় নৈতিকতা পুলিশের হাতে কুর্দি মেয়ে মাহসা আমিনির আটক এবং ৩ দিন পর নিরাপত্তা হেফাজতে তার মৃত্যুর ঘটনার পরও গণআন্দোলন হয়েছিল; কিন্তু সেই আন্দোলন এত ব্যাপক ও হিংসাত্মক ছিল না। সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের গুলি শুরু না করাই ভালো, কারণ আমরাও গুলি শুরু করব’।এছাড়াও তিনি বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল করতে বলেছেন। ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার উছিলা খুঁজছে আমেরিকা। সরকারের সমর্থনেও ইরানে বড় মিছিল হয়েছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছে করলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকেও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর মতো তুলে নিয়ে যেতে পারে, তবে সেই ইচ্ছা আমেরিকা এখনো করেনি। ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপের সময় ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আলি খামেনি কোথায় লুকিয়ে আছেন তা আমরা জানি, কিন্তু তাকে মারব না’। কত কুৎসিৎ ও ভয়ঙ্কর কথা, একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা না করে করুণা করার বাহবা নিচ্ছে আমেরিকা। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ করার সাহস ও সঙ্গতি মুসলিম দেশগুলোর নেই। মাত্র এক কোটি লোক-অধ্যুষিত ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো বারবার নাস্তানাবুদ হয়েছে। যুদ্ধ করার সামর্থ নেই বলেই পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়ার পরও ইরান চুপ করে পরাজয়ের অপমান সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু কী তাই, এখন সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। কিন্তু ট্রাম্প ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘সাহায্য আসছে’।

১৯৭৯ সনে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে বিপ্লবী ছাত্ররা ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মীকে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখে দেয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিমি কার্টার, নেহায়েত ভদ্রলোক, শান্তিপ্রিয়, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট থাকলে সম্ভবত ইরানের অস্তিত্ব বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে দিতেন। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত চলছেই। ১৯৫১ সনে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মোসাদ্দেক তাদের তেলসম্পদকে জাতীয়করণ করার ঘোষণা দিলে মার্কিন ও ব্রিটিশদের স্বার্থে আঘাত লাগে, তাদের গোয়েন্দাদের সহায়তায় ইরানের সেনাবাহিনী ১৯৫৩ সনে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় বসায় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে। ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে যুক্তরাষ্ট্র আজ যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে সেই যুক্তরাষ্ট্রই ৭৩ বছর আগে ইরানের গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, কারণ মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ছিলেন ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের প্রতি নতুন শাসক রেজা শাহ পাহলভির অতিরিক্ত আনুগত্য এবং বিরুদ্ধ মতকে ‘সাভাক’ নামক বিশেষ পুলিশ বাহিনী দ্বারা দমন করার কারণে ১৯৭৮ সনে শুরু হয় আন্দোলন, পতন হয় রেজা শাহ পাহলভি সরকারের, ক্ষমতায় আসেন নির্বাসিত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ক্ষমতায় এসে খোমেনি সরকার ‘সাভাক’-এর বদলে গড়ে তোলেন ‘সাভামা’। প্রতিবাদ দমনে খোমেনিদের আরও আছে বিপ্লবী গার্ড ও নৈতিক পুলিশ, মুখ খুললেই জেল। শান্তিতে নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মদী ২০২৩ সন থেকেই কারাগারে এবং আরেক নোবেলজয়ী শিরিন এবাদি ২০০৯ সন থেকে নির্বাসনে।

ইরানে ইচ্ছে করলেই কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে না, কে প্রার্থী হবে তা নির্ধারণ করে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল বা অভিভাবক পরিষদ। সর্বোচ্চ নেতা খোমেনিরা ক্ষমতায় থাকেন আমৃত্যু।১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভীর পতনের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন এবং ১৯৮৯ সনে তার মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনি ৩৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন, পতন না হলে সম্ভবত মৃত্যু অবধি থাকবেন। ইরানের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা এত কঠোর যে, দলের ভেতরেও ভিন্নমত সহ্য করা হয় না।কট্টরপন্থী আলেমদের সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় বিপ্লবোত্তর ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুল হাসান বনি সদরকে প্রাণ নিয়ে গোপনে দেশ ছাড়তে হয়েছে।ইরানের সেনাবাহিনীর অবস্থান সরকারের কট্টরপন্থীদের পক্ষে থাকায় আভ্যন্তরীণ আন্দোলনগুলোর মীমাংসা হয়েছে নির্যাতন আর ফাঁসির দ-ে।

ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে ইরান চলমান আন্দোলনও কঠোর হস্তে দমন করছে, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ২ হাজার ৫৭১ জন মানুষ ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১৪৭ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আটক করা হয়েছে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ, আর একজনকে ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার’ অভিযোগ এনে মাত্র ২ দিনের ট্রায়ালে ফাঁসির আদেশ দিয়ে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২২ সনে হিজাব বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন হাত-পা বেঁধে, মাথা কালো ব্যাগ দিয়ে ঢেকে ক্রেন থেকে ঝুঁলিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল মাজিদ রেজাকে।আর বিক্ষোভ উত্তর শুধু ২০২৩ সনে বিভিন্ন অপরাধে ইরানে ৮৩৪ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়, এর মধ্যে ৭ জনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় জনসম্মুখে। একই বছর সারা পৃথিবীতে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছিল ১১৫৩টি, আর ইরান একাই মৃত্যুদ- কার্যকর করে ৭৪ শতাংশ। তাই ইরানে শুধু স্বৈরতন্ত্র নয়, ফ্যাসিজমও বিদ্যমান।

ইরান কোন আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বা সমালোচনাকে পাত্তা দেয় না। প্রায় সবগুলো মুসলিম দেশেরই একই অবস্থা। ১৯৮৭ সনে হজ্ব ব্যবস্থাপনা ও ইসরায়েল বিরোধী স্লোগান দিয়ে মিছিল করায় প্রায় ৪০০ ইরানি হাজ্বীকে সউদি আরব গুলি করে হত্যা করে। ১৯৭০ সনে পাকিস্তানের ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে ফিলিস্তিন উদ্বাস্তুদের জর্ডান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেই সংঘাতে নাকি ১০ হাজার লোক মারা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহর শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টু শব্দ করার সাহস কোন নাগরিকের নেই। সাংবাদিক জামাল খাসোগি সউদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা করায় তাকে ২০১৮ সনে তুরস্কের সউদি দূতাবাসে করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরা হয়েছিল। সারা বিশ্ব এই জঘন্য হত্যার নিন্দা করলেও ট্রাম্প করেননি, কারণ তিনি এর সুযোগ নিয়ে সউদি আরবের কাছে ৪ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছেন।

বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ তেল ও গ্যাস মজুত ইরানে। কিন্তু ইরানের উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। দুর্নীতি ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরান এখন দিশাহারা। অতি সম্প্রতি আবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, এই শুল্ক আরোপে শুধু ইরান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন, তুরস্ক ও ভারত। ইরানের মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়ন করতে করতে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে, ১ ডলার সমান ১৪ লক্ষ ৫৭ হাজার রিয়াল, অথচ ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা গ্রহণের বছর অর্থাৎ ১৯৭৯ সনে এক ডলারের মূল্য ছিল মাত্র ৭০ রিয়াল।। অন্যদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৪০ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৭২ শতাংশ এবং ওষুধের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। ২০১৮ সনের পর তেল রপ্তানি কমেছে ৬০-৮০ শতাংশ, আরও কমেছে মাথাপিছু আয় এবং গড় আয়ু। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে কালোবাজারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কম দরে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে বিধায় সরকারের উপর অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রভাব ব্যাপক।

মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা কঠিন।গণঅসন্তোষ আর গণঅভ্যুত্থানে ‘স্বৈরশাসন’, ‘ফ্যাসিজম’ ইত্যাদি অভিধায় অভিযুক্ত যে সকল শাসকের পতন হয়েছে তাদেরই আবার ক্ষমতায় ফেরত এনেছে জনগণ। ফিলিপিন্সের একনায়ক ও দুর্নীতিবাজ ফার্দিনান্দ মার্কোসের ছেলে বোংবং মার্কোস এখন ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট; অথচ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ফার্দিনান্দ মার্কোস ও তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসকে জনরোষে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত থাইল্যা-ের প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা এবং কন্যা পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাইল্যা- শাসন করেছেন। শ্রীলঙ্কায়ও পতিত সরকারের গোটাবায়ের পরিবারের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের ঢেউয়ে যাদের পতন হয়েছে তাদের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। ১৯৯০ সনে মার্কিন বাহিনী পানামার শাসক মানুয়েল নরিয়েগাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় পানামার জনগণ মার্কিন সেনাদের স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেনি, কিন্তু সেই জনগণই এখন দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে।কারণ একটাই এবং তা হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে, দুর্নীতি বেড়ছে, বাক স্বাধীনতা হয়েছে রুদ্ধ।

ইরানেও ১৯৭৯ সনের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির সন্তান প্রিন্স রেজা পাহলভির নামে চলমান আন্দোলনে স্লোগান দিয়ে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রে’র নিপাত কামনা করা হচ্ছে এবং রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি তোলা হচ্ছে; স্লোগানে বলা হচ্ছে, ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’, ‘এটাই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরবে’। ইরান ইতোমধ্যে বিক্ষোভ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। তারপরও বর্তমান সরকার হঠাৎ ধ্বসে পড়তে পারে; কারণ ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় বহুদিন পূর্ব থেকেই ক্ষয় শুরু হয়েছে, ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা গ্রহণের পর অনেকগুলো আন্দোলন কঠোরহস্তে দমন করা হলেও এবার কিন্তু চলমান আন্দোলনে ধর্মীয় শাসনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।তাই এক্ষুণি ধ্বস না নামলেও আমেরিকার প্রেসারে ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

image

মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সর্বত্র

শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে শুরু হওয়া সহিংস বিক্ষোভে মেট্রো স্টেশন, ব্যাংক, টিভি ভবন, দোকান, বাস, গাড়ি, মোটরসাইকেল ইত্যাদি বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে পুড়ছে, আগুনে পুড়ছে মসজিদও। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের সর্বত্র। এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে হাজার হাজার, লাখ লাখ ইরানি। লাখ লাখ লোক রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভকারীরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনি ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অপসারণও দাবি করেছে। ১৯৭৯ সনে গণঅভ্যুত্থানের পর এমন ব্যাপক ও তীব্র আন্দোলন ইতঃপূর্বে আর হয়নি। ২০২২ সনে হিজাবের ভেতর থেকে একটু চুল বেরিয়ে পড়ায় নৈতিকতা পুলিশের হাতে কুর্দি মেয়ে মাহসা আমিনির আটক এবং ৩ দিন পর নিরাপত্তা হেফাজতে তার মৃত্যুর ঘটনার পরও গণআন্দোলন হয়েছিল; কিন্তু সেই আন্দোলন এত ব্যাপক ও হিংসাত্মক ছিল না। সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের গুলি শুরু না করাই ভালো, কারণ আমরাও গুলি শুরু করব’।এছাড়াও তিনি বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল করতে বলেছেন। ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার উছিলা খুঁজছে আমেরিকা। সরকারের সমর্থনেও ইরানে বড় মিছিল হয়েছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছে করলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকেও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর মতো তুলে নিয়ে যেতে পারে, তবে সেই ইচ্ছা আমেরিকা এখনো করেনি। ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপের সময় ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আলি খামেনি কোথায় লুকিয়ে আছেন তা আমরা জানি, কিন্তু তাকে মারব না’। কত কুৎসিৎ ও ভয়ঙ্কর কথা, একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা না করে করুণা করার বাহবা নিচ্ছে আমেরিকা। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ করার সাহস ও সঙ্গতি মুসলিম দেশগুলোর নেই। মাত্র এক কোটি লোক-অধ্যুষিত ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো বারবার নাস্তানাবুদ হয়েছে। যুদ্ধ করার সামর্থ নেই বলেই পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়ার পরও ইরান চুপ করে পরাজয়ের অপমান সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু কী তাই, এখন সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। কিন্তু ট্রাম্প ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘সাহায্য আসছে’।

১৯৭৯ সনে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে বিপ্লবী ছাত্ররা ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মীকে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখে দেয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিমি কার্টার, নেহায়েত ভদ্রলোক, শান্তিপ্রিয়, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট থাকলে সম্ভবত ইরানের অস্তিত্ব বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে দিতেন। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত চলছেই। ১৯৫১ সনে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মোসাদ্দেক তাদের তেলসম্পদকে জাতীয়করণ করার ঘোষণা দিলে মার্কিন ও ব্রিটিশদের স্বার্থে আঘাত লাগে, তাদের গোয়েন্দাদের সহায়তায় ইরানের সেনাবাহিনী ১৯৫৩ সনে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় বসায় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে। ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে যুক্তরাষ্ট্র আজ যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে সেই যুক্তরাষ্ট্রই ৭৩ বছর আগে ইরানের গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, কারণ মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ছিলেন ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের প্রতি নতুন শাসক রেজা শাহ পাহলভির অতিরিক্ত আনুগত্য এবং বিরুদ্ধ মতকে ‘সাভাক’ নামক বিশেষ পুলিশ বাহিনী দ্বারা দমন করার কারণে ১৯৭৮ সনে শুরু হয় আন্দোলন, পতন হয় রেজা শাহ পাহলভি সরকারের, ক্ষমতায় আসেন নির্বাসিত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ক্ষমতায় এসে খোমেনি সরকার ‘সাভাক’-এর বদলে গড়ে তোলেন ‘সাভামা’। প্রতিবাদ দমনে খোমেনিদের আরও আছে বিপ্লবী গার্ড ও নৈতিক পুলিশ, মুখ খুললেই জেল। শান্তিতে নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মদী ২০২৩ সন থেকেই কারাগারে এবং আরেক নোবেলজয়ী শিরিন এবাদি ২০০৯ সন থেকে নির্বাসনে।

ইরানে ইচ্ছে করলেই কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে না, কে প্রার্থী হবে তা নির্ধারণ করে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল বা অভিভাবক পরিষদ। সর্বোচ্চ নেতা খোমেনিরা ক্ষমতায় থাকেন আমৃত্যু।১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভীর পতনের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন এবং ১৯৮৯ সনে তার মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনি ৩৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন, পতন না হলে সম্ভবত মৃত্যু অবধি থাকবেন। ইরানের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা এত কঠোর যে, দলের ভেতরেও ভিন্নমত সহ্য করা হয় না।কট্টরপন্থী আলেমদের সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় বিপ্লবোত্তর ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুল হাসান বনি সদরকে প্রাণ নিয়ে গোপনে দেশ ছাড়তে হয়েছে।ইরানের সেনাবাহিনীর অবস্থান সরকারের কট্টরপন্থীদের পক্ষে থাকায় আভ্যন্তরীণ আন্দোলনগুলোর মীমাংসা হয়েছে নির্যাতন আর ফাঁসির দ-ে।

ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে ইরান চলমান আন্দোলনও কঠোর হস্তে দমন করছে, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ২ হাজার ৫৭১ জন মানুষ ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১৪৭ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আটক করা হয়েছে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ, আর একজনকে ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার’ অভিযোগ এনে মাত্র ২ দিনের ট্রায়ালে ফাঁসির আদেশ দিয়ে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২২ সনে হিজাব বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন হাত-পা বেঁধে, মাথা কালো ব্যাগ দিয়ে ঢেকে ক্রেন থেকে ঝুঁলিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল মাজিদ রেজাকে।আর বিক্ষোভ উত্তর শুধু ২০২৩ সনে বিভিন্ন অপরাধে ইরানে ৮৩৪ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়, এর মধ্যে ৭ জনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় জনসম্মুখে। একই বছর সারা পৃথিবীতে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছিল ১১৫৩টি, আর ইরান একাই মৃত্যুদ- কার্যকর করে ৭৪ শতাংশ। তাই ইরানে শুধু স্বৈরতন্ত্র নয়, ফ্যাসিজমও বিদ্যমান।

ইরান কোন আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বা সমালোচনাকে পাত্তা দেয় না। প্রায় সবগুলো মুসলিম দেশেরই একই অবস্থা। ১৯৮৭ সনে হজ্ব ব্যবস্থাপনা ও ইসরায়েল বিরোধী স্লোগান দিয়ে মিছিল করায় প্রায় ৪০০ ইরানি হাজ্বীকে সউদি আরব গুলি করে হত্যা করে। ১৯৭০ সনে পাকিস্তানের ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে ফিলিস্তিন উদ্বাস্তুদের জর্ডান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেই সংঘাতে নাকি ১০ হাজার লোক মারা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহর শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টু শব্দ করার সাহস কোন নাগরিকের নেই। সাংবাদিক জামাল খাসোগি সউদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা করায় তাকে ২০১৮ সনে তুরস্কের সউদি দূতাবাসে করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরা হয়েছিল। সারা বিশ্ব এই জঘন্য হত্যার নিন্দা করলেও ট্রাম্প করেননি, কারণ তিনি এর সুযোগ নিয়ে সউদি আরবের কাছে ৪ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছেন।

বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ তেল ও গ্যাস মজুত ইরানে। কিন্তু ইরানের উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। দুর্নীতি ও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরান এখন দিশাহারা। অতি সম্প্রতি আবার ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, এই শুল্ক আরোপে শুধু ইরান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন, তুরস্ক ও ভারত। ইরানের মুদ্রা রিয়ালের অবমূল্যায়ন করতে করতে এমন এক পর্যায়ে এসেছে যে, ১ ডলার সমান ১৪ লক্ষ ৫৭ হাজার রিয়াল, অথচ ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা গ্রহণের বছর অর্থাৎ ১৯৭৯ সনে এক ডলারের মূল্য ছিল মাত্র ৭০ রিয়াল।। অন্যদিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৪০ শতাংশ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৭২ শতাংশ এবং ওষুধের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। ২০১৮ সনের পর তেল রপ্তানি কমেছে ৬০-৮০ শতাংশ, আরও কমেছে মাথাপিছু আয় এবং গড় আয়ু। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে কালোবাজারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কম দরে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে বিধায় সরকারের উপর অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রভাব ব্যাপক।

মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করা কঠিন।গণঅসন্তোষ আর গণঅভ্যুত্থানে ‘স্বৈরশাসন’, ‘ফ্যাসিজম’ ইত্যাদি অভিধায় অভিযুক্ত যে সকল শাসকের পতন হয়েছে তাদেরই আবার ক্ষমতায় ফেরত এনেছে জনগণ। ফিলিপিন্সের একনায়ক ও দুর্নীতিবাজ ফার্দিনান্দ মার্কোসের ছেলে বোংবং মার্কোস এখন ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট; অথচ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ফার্দিনান্দ মার্কোস ও তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসকে জনরোষে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত থাইল্যা-ের প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা এবং কন্যা পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাইল্যা- শাসন করেছেন। শ্রীলঙ্কায়ও পতিত সরকারের গোটাবায়ের পরিবারের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের ঢেউয়ে যাদের পতন হয়েছে তাদের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। ১৯৯০ সনে মার্কিন বাহিনী পানামার শাসক মানুয়েল নরিয়েগাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় পানামার জনগণ মার্কিন সেনাদের স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেনি, কিন্তু সেই জনগণই এখন দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে।কারণ একটাই এবং তা হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে, দুর্নীতি বেড়ছে, বাক স্বাধীনতা হয়েছে রুদ্ধ।

ইরানেও ১৯৭৯ সনের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির সন্তান প্রিন্স রেজা পাহলভির নামে চলমান আন্দোলনে স্লোগান দিয়ে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রে’র নিপাত কামনা করা হচ্ছে এবং রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি তোলা হচ্ছে; স্লোগানে বলা হচ্ছে, ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’, ‘এটাই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরবে’। ইরান ইতোমধ্যে বিক্ষোভ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। তারপরও বর্তমান সরকার হঠাৎ ধ্বসে পড়তে পারে; কারণ ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় বহুদিন পূর্ব থেকেই ক্ষয় শুরু হয়েছে, ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা গ্রহণের পর অনেকগুলো আন্দোলন কঠোরহস্তে দমন করা হলেও এবার কিন্তু চলমান আন্দোলনে ধর্মীয় শাসনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।তাই এক্ষুণি ধ্বস না নামলেও আমেরিকার প্রেসারে ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

back to top