alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

কানন পুরকায়স্থ

: শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক কুয়াইন লিখেছেন, ‘একজন বাস্তব অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে আমি বিজ্ঞানের ধারণাগত পরিকল্পনাকে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি হাতিয়ার হিসেবে মনে করি।’ হেনরি পঁয়েনকার তার ‘দ্যা ভ্যালু অব সায়েন্স’ প্রবন্ধে পরামর্শ দিয়েছেন যে, ‘বিজ্ঞানী যে ভাষায় একটি বাস্তবতা তৈরি করেন তা হলো সেই ভাষা, যার মাধ্যমে তিনি তা প্রকাশ করেন। যদি তিনি কোন সত্যের ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাহলে তিনি এই ভাষা ব্যবহার করবেন, এবং যারা এটি বলতে এবং বুঝতে পারেন, তাদের সকলের জন্য তার ভবিষ্যদ্বাণী অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত। তাছাড়া, এই ভবিষ্যদ্বাণী একবার করা হয়ে গেলে, এটি স্পষ্টতই তার উপর নির্ভর করে না যে এটি বাস্তবায়িত হবে কি না।’ সুতরাং, এটি বাস্তবায়ন যোগ্যতার কথা না ভেবেই আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করি এবং কুয়াইন যেমন বলেন যে বিজ্ঞান নিজেই তার ভবিষ্যদ্বাণী করতে ব্যবহৃত হয়। এই প্রবন্ধে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালে কিছু সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন উপস্থাপন করব।

২০২৫ সালে ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নাসা উল্লেখ করে যে মহাকাশ উৎক্ষেপণ করার রকেটটি নভোচারী দের নিয়ে মহাকাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই বছর নাসার আর্টেমিস-২ অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পরে প্রথমবারের মতো চারজন নভোচারীকে চাঁদে ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করবে। এই মিশন লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম পরীক্ষা করবে এবং কক্ষপথে অন্যান্য মহাকাশযানের সাথে দেখা করার জন্য একটি প্রোটোকলও নির্ধারণ করবে এবং যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে ২০২৭ সালে আর্টেমিস -৩ নভোচারীদের নিয়ে যাবে চাঁদে।১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭-এর চাঁদে শেষ ভ্রমণের পর অবশেষে এই প্রথম চাঁদের পৃষ্ঠে নভোচারীরা পা রাখবে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (এএসএ) এবং জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি (জেএএক্সএ) ২০২৬ সালে সৌরজগতের রহস্য উদঘাটনের জন্য বিভিন্ন মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা করেছে। ঔঅঢঅ-এর মঙ্গলগ্রহের চাঁদ অনুসন্ধান করার মহাকাশযান এই বছর উৎক্ষেপণ করা হবে । এই অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের চাঁদ কীভাবে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে এসেছিল - এটি কি গ্রহাণু থেকে নাকি মঙ্গল গ্রহের সাথে ধাক্কা খেয়ে চাঁদ তৈরি হয়েছিল, তা পরীক্ষা করে দেখা। অন্যদিকে, ঊঝঅ বুধ গ্রহের পৃষ্ঠতলের অনুসন্ধানে কাজ করছে। এই বছর বুধ গ্রহের পৃষ্ঠের ব্যাপকভাবে ম্যাপিং এবং বিশ্লেষণ করা হবে মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার স্পেকট্রোমিটারের মতো পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে। এটি গ্রহের রাতের দিকে যখন সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্হান করে, তখন অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চ সংখ্যক এক্স রশ্মি আসার রহস্য সমাধান করবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

কখনও কখনও পৃথিবীর পৃষ্ঠ যখন প্রয়োজন হয় তখন সূর্যালোক পায় না। এই বছর ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’ নামে একটি মার্কিন কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সূর্যালোক সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ করছে। তারা এই বছর তাদের প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে, যা বিভিন্ন স্থানে সূর্যালোক বিকিরণ করতে পারে। এটি একটি প্রাথমিক প্রকল্প এবং যদি এটি সফল হয়, তাহলে কোম্পানিটি আয়না দিয়ে সজ্জিত হাজার হাজার উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে, যাতে ‘দূরবর্তী কার্যক্রম, প্রতিরক্ষা, বেসামরিক অবকাঠামো এবং শক্তি উৎপাদনের’ জন্য পৃথিবীতে আলো প্রতিফলনের ব্যবস্থা করতে পারবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, উপগ্রহগুলি যখন তাদের আয়নাগুলির অবস্থান পরিবর্তন করে তখন সূর্যালোকের ঝলকানি সৃষ্টি করে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য যা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটা সত্য যে বায়ুম-লে আলোর বিচ্ছুরণ এবং অপচয় উপেক্ষা করা যায় না। তাই, পাইলট প্রকল্পটি প্রযুক্তির সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি পরীক্ষা করে দেখবে।

সারা বিশ্বে পানীয় জল একটি দুর্লভ সম্পদ। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু খরচ এবং অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ স্হানে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। যাইহোক, একটি নরওয়েজিয়ান কোম্পানি ‘ফ্লোসিয়ান ওয়ান’ নামে একটি প্ল্যান্ট ব্যবহার করে একটি পদ্ধতির পরীক্ষা করছে যা পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে। ফ্লোসিয়ানের পদ্ধতি হল সমুদ্রের গভীরে জল-পরিশোধক পড নিমজ্জিত করা, তারপর গভীরতায় সমুদ্রের জল থেকে লবণ আলাদা করা, তারপর মিঠা পানিকে স্থলে ফিরিয়ে আনা। এই প্রক্রিয়ায় কম শক্তি খরচ হয়, প্রচলিত ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের তুলনায় কমপক্ষে পঞ্চাশ শতাংশ কম। ফ্লোসিয়ান ওয়ান ধরণের ডিস্যালিনেশন সুবিধা ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি পারমাণবিক শক্তি:

ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। তবে, গলিত লবণ এবং উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস চুল্লি থেকে শুরু করে দ্রুত চুল্লি, সোডিয়াম-শীতল নকশা এবং চাপযুক্ত জল ব্যবস্থা সম্ভাব্য পারমাণবিক চুল্লির নকশাগুলির মধ্যে রয়েছে। আমরা ২০২৬ সালে এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতি দেখতে পাব। টেক্সাস ভিত্তিক কোম্পানি ন্যাচুরা রিসোর্সেস একটি গলিত লবণ চুল্লি তৈরি করেছে যা উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস চুল্লির চেয়ে খুব আলাদাভাবে কাজ করে এবং এটিকে সহজাতভাবে নিরাপদ বলেও মনে করা হয়। বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন যে গলিত লবণ চুল্লি বায়ুম-লীয় চাপে কাজ করে, তাই যেকোনো ধরণের দুর্ঘটনা কেবল রিয়্যাক্টারের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই, ২০২৬ সালে বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানি উন্নত চুল্লিগুলির পরীক্ষা দ্রুত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান ক্যান্সার ভ্যাকসিনের ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছে। ২০২৬ সালে অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অ্যান্টিবডি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি মূল উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে অথবা প্রোটিনের অংশগুলিকে পৃথক করে এবং পুনরায় একত্রিত করে প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া অ্যান্টিবডিগুলির গঠন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে অ্যান্টিবডিগুলির পরিবর্তিত সংস্করণ তৈরি হয়েছে যা, বেশ কয়েকটি স্বত:অনাক্রম্য রোগের ( ধঁঃড়রসসঁহব) বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে, যার মধ্যে ২০২৬ সালে ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের ফলাফল জানা যাবে। আরেকটি আশাব্যঞ্জক উন্নয়নকে ‘ইমিউন সেল থেরাপি’ বলা হয়, যার মধ্যে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ কোষের মূল এবং পরিবর্তিত সংস্করণ ব্যবহার করা জড়িত। একটি উদাহরণ হল ঈঅজ ঞ কোষ থেরাপি যেখানে একজন রোগীর নিজস্ব টি কোষগুলিকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং একজন ব্যক্তির ক্যান্সারকে লক্ষ্য করে জিনগতভাবে পরিবর্তিত করা হয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতাল স্বত:অনাক্রম্য রোগের রোগীদের জন্য ঈঅজ ঞ কোষ থেরাপি পরীক্ষা করছে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আইনি অবস্থানের ক্ষেত্রে, ২০২৬ সালে আমরা আরও পরিবর্তন দেখতে পাব। প্রাথমিক ইন্টারনেট ব্যবস্থায়, পরীক্ষা করে দেখা হয় যে তথ্যগুলি বাস্তব ছিল কিনা, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ যে বাস্তব তা প্রমাণ করা প্রয়োজন হবে। এর অর্থ হল, একজনকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনও যন্ত্র নয়। এই ক্ষেত্রে, মানুষের যাচাইকরণের জন্য ইতিমধ্যেই কিছু প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে কাজ করা একটি দল আদালতে যাবে, যাতে প্রমাণ করা যায় যে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত, চিন্তাশীল সত্তা। ২০২৬ সালে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ব্যক্তিত্ব’ (পার্সনহুড) পক্ষে প্রথম আইনি মামলা বিচারের মুখোমুখি হতে দেখব। আইনি অর্থে ‘ব্যক্তিত্ব’ শব্দটি অ-মানব সত্তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা তাদেরকে আদালতে আইনি অবস্থান বজায় রাখার সুযোগ দেয়। আমরা ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আইনি মামলার ফলাফল দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়াও, এ বছর কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে আরও উন্নয়নের খবর প্রকাশিত হবে।

এ বছর যে মৌলিক গবেষণাগুলি হচ্ছে তার মধ্যে একটি হল মহাজাগতিক বিকর্ষণের উৎস জানা, যাকে মহাজাগতিক-প্রতি-মাধ্যাকর্ষণ বলা হয়ে থাকে। আমাদের মহাবিশ্ব দ্রুতহারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইনের মাধ্যাকর্ষণ হল একটি আকর্ষণ বা ধাক্কা দেওয়ার বল, যা মহাবিস্ফোরণের পর থেকে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বকে ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করতে বলে, কিন্তু বস্তত: মহাবিশ্ব ত্বরান্বিত হচ্ছে। এটি ব্যাখ্যা করার আরেকটি উপায় হল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্ব ব্যবহার করা। এ বছর, বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন যে লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি এবং মহাকাশ, অন্য কোনও বলের অধীন কিনা যা এটিকে দ্রুতহারে প্রসারিত করছে। আমরা কেবল ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি কিন্তু সময়ই জানিয়ে দেবে আমাদের ভবিষ্যত বাণী সঠিক কি না।

[লেখক: অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য]

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

সড়ক হোক নিরাপদ

স্কুল ব্যাংকিং: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

কানন পুরকায়স্থ

শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক কুয়াইন লিখেছেন, ‘একজন বাস্তব অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে আমি বিজ্ঞানের ধারণাগত পরিকল্পনাকে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি হাতিয়ার হিসেবে মনে করি।’ হেনরি পঁয়েনকার তার ‘দ্যা ভ্যালু অব সায়েন্স’ প্রবন্ধে পরামর্শ দিয়েছেন যে, ‘বিজ্ঞানী যে ভাষায় একটি বাস্তবতা তৈরি করেন তা হলো সেই ভাষা, যার মাধ্যমে তিনি তা প্রকাশ করেন। যদি তিনি কোন সত্যের ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাহলে তিনি এই ভাষা ব্যবহার করবেন, এবং যারা এটি বলতে এবং বুঝতে পারেন, তাদের সকলের জন্য তার ভবিষ্যদ্বাণী অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত। তাছাড়া, এই ভবিষ্যদ্বাণী একবার করা হয়ে গেলে, এটি স্পষ্টতই তার উপর নির্ভর করে না যে এটি বাস্তবায়িত হবে কি না।’ সুতরাং, এটি বাস্তবায়ন যোগ্যতার কথা না ভেবেই আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করি এবং কুয়াইন যেমন বলেন যে বিজ্ঞান নিজেই তার ভবিষ্যদ্বাণী করতে ব্যবহৃত হয়। এই প্রবন্ধে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালে কিছু সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন উপস্থাপন করব।

২০২৫ সালে ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নাসা উল্লেখ করে যে মহাকাশ উৎক্ষেপণ করার রকেটটি নভোচারী দের নিয়ে মহাকাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই বছর নাসার আর্টেমিস-২ অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পরে প্রথমবারের মতো চারজন নভোচারীকে চাঁদে ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করবে। এই মিশন লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম পরীক্ষা করবে এবং কক্ষপথে অন্যান্য মহাকাশযানের সাথে দেখা করার জন্য একটি প্রোটোকলও নির্ধারণ করবে এবং যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে ২০২৭ সালে আর্টেমিস -৩ নভোচারীদের নিয়ে যাবে চাঁদে।১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭-এর চাঁদে শেষ ভ্রমণের পর অবশেষে এই প্রথম চাঁদের পৃষ্ঠে নভোচারীরা পা রাখবে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (এএসএ) এবং জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি (জেএএক্সএ) ২০২৬ সালে সৌরজগতের রহস্য উদঘাটনের জন্য বিভিন্ন মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা করেছে। ঔঅঢঅ-এর মঙ্গলগ্রহের চাঁদ অনুসন্ধান করার মহাকাশযান এই বছর উৎক্ষেপণ করা হবে । এই অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মঙ্গল গ্রহের চাঁদ কীভাবে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে এসেছিল - এটি কি গ্রহাণু থেকে নাকি মঙ্গল গ্রহের সাথে ধাক্কা খেয়ে চাঁদ তৈরি হয়েছিল, তা পরীক্ষা করে দেখা। অন্যদিকে, ঊঝঅ বুধ গ্রহের পৃষ্ঠতলের অনুসন্ধানে কাজ করছে। এই বছর বুধ গ্রহের পৃষ্ঠের ব্যাপকভাবে ম্যাপিং এবং বিশ্লেষণ করা হবে মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার স্পেকট্রোমিটারের মতো পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে। এটি গ্রহের রাতের দিকে যখন সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্হান করে, তখন অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চ সংখ্যক এক্স রশ্মি আসার রহস্য সমাধান করবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

কখনও কখনও পৃথিবীর পৃষ্ঠ যখন প্রয়োজন হয় তখন সূর্যালোক পায় না। এই বছর ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’ নামে একটি মার্কিন কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সূর্যালোক সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ করছে। তারা এই বছর তাদের প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে, যা বিভিন্ন স্থানে সূর্যালোক বিকিরণ করতে পারে। এটি একটি প্রাথমিক প্রকল্প এবং যদি এটি সফল হয়, তাহলে কোম্পানিটি আয়না দিয়ে সজ্জিত হাজার হাজার উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে, যাতে ‘দূরবর্তী কার্যক্রম, প্রতিরক্ষা, বেসামরিক অবকাঠামো এবং শক্তি উৎপাদনের’ জন্য পৃথিবীতে আলো প্রতিফলনের ব্যবস্থা করতে পারবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, উপগ্রহগুলি যখন তাদের আয়নাগুলির অবস্থান পরিবর্তন করে তখন সূর্যালোকের ঝলকানি সৃষ্টি করে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য যা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটা সত্য যে বায়ুম-লে আলোর বিচ্ছুরণ এবং অপচয় উপেক্ষা করা যায় না। তাই, পাইলট প্রকল্পটি প্রযুক্তির সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি পরীক্ষা করে দেখবে।

সারা বিশ্বে পানীয় জল একটি দুর্লভ সম্পদ। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু খরচ এবং অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ স্হানে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। যাইহোক, একটি নরওয়েজিয়ান কোম্পানি ‘ফ্লোসিয়ান ওয়ান’ নামে একটি প্ল্যান্ট ব্যবহার করে একটি পদ্ধতির পরীক্ষা করছে যা পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে। ফ্লোসিয়ানের পদ্ধতি হল সমুদ্রের গভীরে জল-পরিশোধক পড নিমজ্জিত করা, তারপর গভীরতায় সমুদ্রের জল থেকে লবণ আলাদা করা, তারপর মিঠা পানিকে স্থলে ফিরিয়ে আনা। এই প্রক্রিয়ায় কম শক্তি খরচ হয়, প্রচলিত ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের তুলনায় কমপক্ষে পঞ্চাশ শতাংশ কম। ফ্লোসিয়ান ওয়ান ধরণের ডিস্যালিনেশন সুবিধা ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডেটা সেন্টারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি পারমাণবিক শক্তি:

ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে। তবে, গলিত লবণ এবং উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস চুল্লি থেকে শুরু করে দ্রুত চুল্লি, সোডিয়াম-শীতল নকশা এবং চাপযুক্ত জল ব্যবস্থা সম্ভাব্য পারমাণবিক চুল্লির নকশাগুলির মধ্যে রয়েছে। আমরা ২০২৬ সালে এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতি দেখতে পাব। টেক্সাস ভিত্তিক কোম্পানি ন্যাচুরা রিসোর্সেস একটি গলিত লবণ চুল্লি তৈরি করেছে যা উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস চুল্লির চেয়ে খুব আলাদাভাবে কাজ করে এবং এটিকে সহজাতভাবে নিরাপদ বলেও মনে করা হয়। বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন যে গলিত লবণ চুল্লি বায়ুম-লীয় চাপে কাজ করে, তাই যেকোনো ধরণের দুর্ঘটনা কেবল রিয়্যাক্টারের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই, ২০২৬ সালে বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানি উন্নত চুল্লিগুলির পরীক্ষা দ্রুত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান ক্যান্সার ভ্যাকসিনের ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছে। ২০২৬ সালে অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অ্যান্টিবডি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি মূল উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে অথবা প্রোটিনের অংশগুলিকে পৃথক করে এবং পুনরায় একত্রিত করে প্রাকৃতিকভাবে ঘটে যাওয়া অ্যান্টিবডিগুলির গঠন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে অ্যান্টিবডিগুলির পরিবর্তিত সংস্করণ তৈরি হয়েছে যা, বেশ কয়েকটি স্বত:অনাক্রম্য রোগের ( ধঁঃড়রসসঁহব) বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে, যার মধ্যে ২০২৬ সালে ক্যান্সার সহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের ফলাফল জানা যাবে। আরেকটি আশাব্যঞ্জক উন্নয়নকে ‘ইমিউন সেল থেরাপি’ বলা হয়, যার মধ্যে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ কোষের মূল এবং পরিবর্তিত সংস্করণ ব্যবহার করা জড়িত। একটি উদাহরণ হল ঈঅজ ঞ কোষ থেরাপি যেখানে একজন রোগীর নিজস্ব টি কোষগুলিকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং একজন ব্যক্তির ক্যান্সারকে লক্ষ্য করে জিনগতভাবে পরিবর্তিত করা হয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতাল স্বত:অনাক্রম্য রোগের রোগীদের জন্য ঈঅজ ঞ কোষ থেরাপি পরীক্ষা করছে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আইনি অবস্থানের ক্ষেত্রে, ২০২৬ সালে আমরা আরও পরিবর্তন দেখতে পাব। প্রাথমিক ইন্টারনেট ব্যবস্থায়, পরীক্ষা করে দেখা হয় যে তথ্যগুলি বাস্তব ছিল কিনা, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ যে বাস্তব তা প্রমাণ করা প্রয়োজন হবে। এর অর্থ হল, একজনকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনও যন্ত্র নয়। এই ক্ষেত্রে, মানুষের যাচাইকরণের জন্য ইতিমধ্যেই কিছু প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে কাজ করা একটি দল আদালতে যাবে, যাতে প্রমাণ করা যায় যে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত, চিন্তাশীল সত্তা। ২০২৬ সালে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ব্যক্তিত্ব’ (পার্সনহুড) পক্ষে প্রথম আইনি মামলা বিচারের মুখোমুখি হতে দেখব। আইনি অর্থে ‘ব্যক্তিত্ব’ শব্দটি অ-মানব সত্তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা তাদেরকে আদালতে আইনি অবস্থান বজায় রাখার সুযোগ দেয়। আমরা ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আইনি মামলার ফলাফল দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়াও, এ বছর কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে আরও উন্নয়নের খবর প্রকাশিত হবে।

এ বছর যে মৌলিক গবেষণাগুলি হচ্ছে তার মধ্যে একটি হল মহাজাগতিক বিকর্ষণের উৎস জানা, যাকে মহাজাগতিক-প্রতি-মাধ্যাকর্ষণ বলা হয়ে থাকে। আমাদের মহাবিশ্ব দ্রুতহারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইনের মাধ্যাকর্ষণ হল একটি আকর্ষণ বা ধাক্কা দেওয়ার বল, যা মহাবিস্ফোরণের পর থেকে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বকে ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করতে বলে, কিন্তু বস্তত: মহাবিশ্ব ত্বরান্বিত হচ্ছে। এটি ব্যাখ্যা করার আরেকটি উপায় হল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্ব ব্যবহার করা। এ বছর, বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন যে লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি এবং মহাকাশ, অন্য কোনও বলের অধীন কিনা যা এটিকে দ্রুতহারে প্রসারিত করছে। আমরা কেবল ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি কিন্তু সময়ই জানিয়ে দেবে আমাদের ভবিষ্যত বাণী সঠিক কি না।

[লেখক: অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য]

back to top