বাবুল রবিদাস
জীববৈচিত্রের অন্যতম অংশ বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত পশু-পাখি। কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতার অভাব, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিব্যবহার এবং যথোপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে একসময়কার সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী তো বটেই, এমনকি গৃহপালিত পশু-পাখির অবস্থাও আজ নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিবেশে বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত পশু-পাখির গুরুত্ব ও অবদান সম্পর্কে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা এবং তাদের আবাসস্থল ধ্বংসের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া গৃহপালিত পশু-পাখিও হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ আদিমকালে মানুষ কুকুরকেই প্রথম গৃহপালিত পশু হিসেবে পোষ মানিয়েছিল। কাজকর্মের পাশাপাশি প্রায়ই খবরের কাগজে কুকুর নিধনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন কর্তৃক জলাতঙ্ক রোগের বিস্তার রোধের আশঙ্কায় কুকুর নিধন করা হয়।
লেখাপড়া শিখলে মানুষকে শিক্ষিত বলা যায়, কিন্তু জ্ঞানী বলা যায় না। তার প্রমাণ সম্প্রতি ঈশ্বরদী উপজেলায় ‘মা’ কুকুরের অগোচরে আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দী করে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনা। উপরোক্ত ঘটনাটি মাত্র একটি উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে গ্রামগঞ্জে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যার অনেকাংশই প্রকাশিত হয় না।
গৃহপালিত শুধু কুকুরই নয়-বিড়াল, ছাগল, মহিষ, গরুর প্রতিও নিষ্ঠুরতার খবর সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রকাশিত হয়। বাসায় কুকুর তার মালিকের একমাত্র ভক্ত। রাত্রিবেলায় ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে ধনসম্পদ রক্ষা করে। অথচ তাকেই প্রহার করতে দেখা যায়। বিষয়টি একটি উদাহরণসহ নিচে তুলে ধরা হলো-
এক ধনী কৃষক একটি কুকুরকে তার বাড়িতে এনে লালন-পালন করে বড় করে তোলে। কৃষক সারাদিন পরিশ্রম করে আর রাতে এসে শান্তিতে ঘুমায়। একদিন রাতে কৃষক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই রাতে চোরেরা কৃষকের ঘরে চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রবেশের চেষ্টা করে। কুকুর চোরদের দেখে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করে। এতে কৃষকের ঘুম ভেঙে যায় এবং চোরেরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। ফলে কৃষকের সম্পদ রক্ষা পায়। কিন্তু কৃষক ঘর থেকে বাইরে এসে কাউকে না দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে লাঠি হাতে কুকুরকে প্রহার করতে শুরু করে এবং বলেÑ‘তুমি আমার কাঁচা ঘুম ভেঙে দিলে কেন?’ এ গল্প থেকে শিক্ষাÑ‘উপকারীকে বাঘে খায়।’
প্রত্যেক প্রাণী যেমন জন্ম নিয়েছে, তেমনি বেঁচে থাকার এবং স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
পৃথিবীতে কোনো প্রাণীর মাংসই অখাদ্য নয়। আমাদের কাছে যেটি নিষিদ্ধ খাদ্য, অন্য দেশে সেটিই প্রিয় খাদ্য। কুকুরের মাংস বাংলাদেশে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী খায় না; কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ কুকুরের মাংস খায়। কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও চীনে কুকুরের মাংস জনপ্রিয়। নেপালে কুকুরের প্রতি বিশেষ সেবা-যতœ নেওয়ার প্রথা রয়েছে। যদি কুকুরের পা ভেঙে যায়, তবে প্রাণীকল্যাণ বিভাগের সহায়তায় সেটিকে সুস্থ করে তোলা হয়। এছাড়া পৃথিবীর বহু দেশে পশু-পাখির হাসপাতাল রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা পরিত্যক্ত কুকুর-বিড়াল উদ্ধার করে সেখানে সেবা-যতেœ সারিয়ে তোলা হয়।
অতি সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপ শহরে গভীর রাতে এক সদ্যজাত মানবশিশু রেলওয়ে কর্মচারীদের কলোনির পাশে শীতের মধ্যে পড়ে ছিল। সেই অসহায় শিশুটিকে বৃত্তাকারে ঘিরে পাহারা দিচ্ছিল একদল বেওয়ারিশ কুকুর। স্থানীয়রা গণমাধ্যমকে জানায়, উদ্ধারের আগ পর্যন্ত কুকুরগুলো শিশুটিকে আগলে রেখেছিল, যাতে কোনো হিংস্র প্রাণী তার ক্ষতি করতে না পারে।
এবার ‘বলি প্রথা’ নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রয়োজনে মানুষ পশু বা পাখি হত্যা করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু দেব-দেবীর নামে পশু হত্যা করে ফেলে দেওয়া বা পুঁতে রাখা কি গ্রহণযোগ্য? নেপালে ‘বলিদান প্রথা’ ২০১৫ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও পশুহত্যা নিরুৎসাহিত করার নির্দেশ দেয়। তবুও নেপালে গাধিমাই বলি উৎসবে ছাগল, গরু, মহিষ, ইঁদুর, মুরগি, শূকর ও কবুতর বলি দেওয়া হয়। পশু অধিকারকর্মীদের বরাতে এএফপি জানায়, ২০১৪ সালে প্রায় দুই লাখ প্রাণী বলি দেওয়া হয়েছিল। পুরোহিতদের মতে, শক্তির দেবী গাধিমাই স্বপ্নে রক্তপাতের নির্দেশ দেওয়ায় এই বলি প্রথার প্রচলন।
আগের দিনে পশুবলি, সতীদাহ, নরবলি প্রভৃতি নিষ্ঠুর প্রথার কাহিনি শোনা যেত। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। তবুও মাঝেমধ্যে নিষ্ঠুরতার এমন ঘটনা আমাদের বিব্রত করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নিলেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। আসুন, নিরীহ জীবজন্তু হত্যার পথ থেকে সরে আসি। তাদের স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা দিই।
[লেখক: অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
বাবুল রবিদাস
শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
জীববৈচিত্রের অন্যতম অংশ বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত পশু-পাখি। কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতার অভাব, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিব্যবহার এবং যথোপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে একসময়কার সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী তো বটেই, এমনকি গৃহপালিত পশু-পাখির অবস্থাও আজ নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিবেশে বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত পশু-পাখির গুরুত্ব ও অবদান সম্পর্কে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা এবং তাদের আবাসস্থল ধ্বংসের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া গৃহপালিত পশু-পাখিও হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ আদিমকালে মানুষ কুকুরকেই প্রথম গৃহপালিত পশু হিসেবে পোষ মানিয়েছিল। কাজকর্মের পাশাপাশি প্রায়ই খবরের কাগজে কুকুর নিধনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন কর্তৃক জলাতঙ্ক রোগের বিস্তার রোধের আশঙ্কায় কুকুর নিধন করা হয়।
লেখাপড়া শিখলে মানুষকে শিক্ষিত বলা যায়, কিন্তু জ্ঞানী বলা যায় না। তার প্রমাণ সম্প্রতি ঈশ্বরদী উপজেলায় ‘মা’ কুকুরের অগোচরে আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দী করে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনা। উপরোক্ত ঘটনাটি মাত্র একটি উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে গ্রামগঞ্জে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যার অনেকাংশই প্রকাশিত হয় না।
গৃহপালিত শুধু কুকুরই নয়-বিড়াল, ছাগল, মহিষ, গরুর প্রতিও নিষ্ঠুরতার খবর সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রকাশিত হয়। বাসায় কুকুর তার মালিকের একমাত্র ভক্ত। রাত্রিবেলায় ঘরবাড়ি পাহারা দিয়ে ধনসম্পদ রক্ষা করে। অথচ তাকেই প্রহার করতে দেখা যায়। বিষয়টি একটি উদাহরণসহ নিচে তুলে ধরা হলো-
এক ধনী কৃষক একটি কুকুরকে তার বাড়িতে এনে লালন-পালন করে বড় করে তোলে। কৃষক সারাদিন পরিশ্রম করে আর রাতে এসে শান্তিতে ঘুমায়। একদিন রাতে কৃষক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই রাতে চোরেরা কৃষকের ঘরে চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রবেশের চেষ্টা করে। কুকুর চোরদের দেখে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করে। এতে কৃষকের ঘুম ভেঙে যায় এবং চোরেরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। ফলে কৃষকের সম্পদ রক্ষা পায়। কিন্তু কৃষক ঘর থেকে বাইরে এসে কাউকে না দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে লাঠি হাতে কুকুরকে প্রহার করতে শুরু করে এবং বলেÑ‘তুমি আমার কাঁচা ঘুম ভেঙে দিলে কেন?’ এ গল্প থেকে শিক্ষাÑ‘উপকারীকে বাঘে খায়।’
প্রত্যেক প্রাণী যেমন জন্ম নিয়েছে, তেমনি বেঁচে থাকার এবং স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
পৃথিবীতে কোনো প্রাণীর মাংসই অখাদ্য নয়। আমাদের কাছে যেটি নিষিদ্ধ খাদ্য, অন্য দেশে সেটিই প্রিয় খাদ্য। কুকুরের মাংস বাংলাদেশে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী খায় না; কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ কুকুরের মাংস খায়। কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও চীনে কুকুরের মাংস জনপ্রিয়। নেপালে কুকুরের প্রতি বিশেষ সেবা-যতœ নেওয়ার প্রথা রয়েছে। যদি কুকুরের পা ভেঙে যায়, তবে প্রাণীকল্যাণ বিভাগের সহায়তায় সেটিকে সুস্থ করে তোলা হয়। এছাড়া পৃথিবীর বহু দেশে পশু-পাখির হাসপাতাল রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা পরিত্যক্ত কুকুর-বিড়াল উদ্ধার করে সেখানে সেবা-যতেœ সারিয়ে তোলা হয়।
অতি সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপ শহরে গভীর রাতে এক সদ্যজাত মানবশিশু রেলওয়ে কর্মচারীদের কলোনির পাশে শীতের মধ্যে পড়ে ছিল। সেই অসহায় শিশুটিকে বৃত্তাকারে ঘিরে পাহারা দিচ্ছিল একদল বেওয়ারিশ কুকুর। স্থানীয়রা গণমাধ্যমকে জানায়, উদ্ধারের আগ পর্যন্ত কুকুরগুলো শিশুটিকে আগলে রেখেছিল, যাতে কোনো হিংস্র প্রাণী তার ক্ষতি করতে না পারে।
এবার ‘বলি প্রথা’ নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রয়োজনে মানুষ পশু বা পাখি হত্যা করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু দেব-দেবীর নামে পশু হত্যা করে ফেলে দেওয়া বা পুঁতে রাখা কি গ্রহণযোগ্য? নেপালে ‘বলিদান প্রথা’ ২০১৫ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমনকি সুপ্রিম কোর্টও পশুহত্যা নিরুৎসাহিত করার নির্দেশ দেয়। তবুও নেপালে গাধিমাই বলি উৎসবে ছাগল, গরু, মহিষ, ইঁদুর, মুরগি, শূকর ও কবুতর বলি দেওয়া হয়। পশু অধিকারকর্মীদের বরাতে এএফপি জানায়, ২০১৪ সালে প্রায় দুই লাখ প্রাণী বলি দেওয়া হয়েছিল। পুরোহিতদের মতে, শক্তির দেবী গাধিমাই স্বপ্নে রক্তপাতের নির্দেশ দেওয়ায় এই বলি প্রথার প্রচলন।
আগের দিনে পশুবলি, সতীদাহ, নরবলি প্রভৃতি নিষ্ঠুর প্রথার কাহিনি শোনা যেত। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। তবুও মাঝেমধ্যে নিষ্ঠুরতার এমন ঘটনা আমাদের বিব্রত করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নিলেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। আসুন, নিরীহ জীবজন্তু হত্যার পথ থেকে সরে আসি। তাদের স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা দিই।
[লেখক: অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]