আনোয়ারুল হক

খালেদা জিয়া
কাছ থেকে দেখা মানে এমনটা নয়, যে কখনো তার কাছাকাছি থেকেছি। যখন রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম বিশেষত এরশাদ জমানায় সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে ছিলাম তখনকার দেখাটাকে কাছ থেকে দেখা বলতে চেয়েছি।
তিনবার তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়ই তিনি বিরোধী নেত্রী। তার কথাবার্তার ধরন ও চাহনির মধ্যে বিনয়ের প্রকাশটা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। আবার সামরিক ছাউনির যে কিছুটা ভিন্ন উচ্চারণ ভঙ্গি এবং কমান্ডিং টোন থাকে সেটাও দৃষ্টি এড়ায়নি
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি দলীয় নেতৃবৃন্দের অনেকে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সঙ্গে যোগ দেন। সেই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বিএনপিতে ভাইস চেয়ারম?্যান হিসেবে যোগ দেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
স্মৃতি বড়ই প্রতারণা করছে। অনেক কিছুই স্মরণে আসছে না। তবে সামরিক শাসনামলে সম্ভবত দুবার বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। প্রথমবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের একজন হিসেবে। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন যখন সংগঠিত রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রস্তুতির অভাব- সে প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন শেখ হাসিনাসহ জোট নেতাদের সঙ্গে যেমন বৈঠক হয়, তেমনি একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়। বৈঠকে খালেদা জিয়া আমাদের বক্তব্য, আন্দোলনের প্রস্তুতি ইত্যাদি বিষয়াদি মনোযোগ দিয়ে শোনার পর আমাদের প্রশংসা করে বিএনপির তৎকালীন ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিব ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে বিএনপির বক্তব্য বলার জন?্য আহ্বান জানান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ছাত্রদলের অন্তর্ভুক্তি না থাকায় বিএনপি নেতৃত্ব কিছুটা শীতল মনোভাব পোষণ করেও আমাদের সঙ্গে সংহতি জানান।
ওই সময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত না করার প্রধান কারণ ছিল সংগঠনটি তখন ভাঙা-গড়ার মধ্যে ছিল। জেনারেল এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলতে ছাত্র দলে ভাঙন সৃষ্টি করার জন?্য সব ধরনের প্রচেষ্টা সামরিক সরকার নেয়। তাই সাময়িকভাবে ছাত্র দলের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলার কৌশল নেয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র দলও ওই সময়ে সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত হতে উৎসাহী ছিল না। বেশ পরে ছাত্র দলসহ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে উঠেছিল, যা হোক বেগম খালেদা জিয়াকে সামনাসামনি সেই প্রথম দেখা।
দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় ১৯৮৯ সালে। সিমিটার কোম্পানির সঙ্গে সিলেটের হরিপুরে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন ঢাকা-সিলেট পদযাত্রার আয়োজন করেছিল। ১৩ দিনের পদযাত্রা শেষে সিলেট শহীদ মিনারের পাদদেশের গণসমাবেশে বিএনপি নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানাতে ধানমন্ডির বিএনপি কার্যালয়ে আমরা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তার সঙ্গে তখন ছিলেন সাইফুর রহমান ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বেগম জিয়া আমাদের বক্তব্য শোনার পর ধন?্যবাদ জানিয়ে নিজে আর কিছু না বলে ড. মোশাররফকে কথা বলতে বলেন। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানী হিসেবে রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফকে আমাদের গণসমাবেশে বক্তা হিসেবে উপস্থিত করা। এখানে একটা মজার কথা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। সভাশেষে সভাকক্ষ থেকে বের হওয়ার পর সাইফুর রহমান আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বিএনপি আবার যুব ইউনিয়ন কবে সৃষ্টি করেছে? বুঝলাম, তিনি শুধু অর্থনীতি ও বাজেট নিয়েই আছেন!
আর একবার অবশ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০১ সনের ২০ জানুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ওই দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়েছিল, যেখানে ৫ জন নিহত ও অনেকে আহত হন, যা ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মধ্যে একটি। হাসপাতালে বেগম জিয়া আহতদের দেখতে আসেন। পার্টির নেতৃস্থানীয় কেউ তখন ওই ওয়ার্ডে ছিলেন না। বেগম জিয়া তখন আহতদের পাশে থাকা আমার স্ত্রীর দিকে এগিয়ে আসেন এবং ?আমার স্ত্রী সালাম দেয়ার আগেই তিনি সালাম দেন। আহতদের খোঁজখবর নিয়ে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রীর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন আমি তো প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। আপনাদের নেতৃবৃন্দকে বলবেন আমি আগামীকাল আরো কিছু টাকা চিকিৎসা সহায়তার জন্য পাঠাব।
তিনবার তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়ই তিনি বিরোধী নেত্রী। তার কথাবার্তার ধরন ও চাহনির মধ্যে বিনয়ের প্রকাশটা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। আবার সামরিক ছাউনির যে কিছুটা ভিন্ন উচ্চারণ ভঙ্গি এবং কমান্ডিং টোন থাকে সেটাও দৃষ্টি এড়ায়নি। পত্রপত্রিকা ও রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলে থাকেন এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রামে নিরলস ভূমিকা রেখে তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। হতে পারে। তবে আমি বিষয়টা ভিন্নভাবে দেখি।
আপসহীনতা আর মানসিক দৃঢ়তা তিনি অর্জন করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাদের প্রধান শত্রু ও টার্গেট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে আটক করে একেবারে পিন্ডিতে তাদের কব্জায় নিতে সক্ষম হয়। শেখ মুজিবকে আটকে ফেলতে পারায় মুজিব পরিবার সামরিক নজরদারির মধ্যে থাকলেও পাকবাহিনীর স্বস্তি ছিল, যে মুজিব তো তাদের হাতে। আর মুজিবকে বন্দী করে তারা যখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে তখন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতারা মেজর জিয়ার ওপর দায়িত্ব দেন কালুরঘাট তথা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার। আর তা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আবার নেমে এলো ‘৭ মার্চ’ - ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম.......’। বাংলাদেশের মানুষ আশ্বস্ত হলো ভরসা পেল, সশস্ত্র সামরিক শক্তিও স্বাধীনতার যুদ্ধে আছে।
মেজর জিয়া তো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমে পড়লেন। তিনি তখন পাকবাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেগম জিয়ার কী পরিণতি হলো? স্বাভাবিকভাবেই জিয়ার ওপর পাক বাহিনীর আক্রোশ পড়ল বেগম জিয়ার ওপরে।
মেজর জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর বেগম জিয়া বোরখা পরে গোপনে নৌপথে পালিয়ে এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সেখান থেকে তার ভগ্নিপতি তাকে ঢাকায় নিজ বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন পাক সেনাবাহিনী বেগম জিয়ার খোঁজ করছেন তখন স্থান বদল করে করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বাসায় তাকে রাখার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়া সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যান। গ্রেপ্তার করা হয় আশ্রয়দাতাকে এবং পরবর্তীতে ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হকসহ সব আশ্রয়দাতাকেই গ্রেপ্তার হতে হয় এবং তারা ক্যান্টনমেন্টে নির্মম নির্যাতনের সম্মুখীন হন।
দুই শিশুসন্তানসহ বেগম জিয়াকে একজন সিনিয়র বাঙালি অফিসারের বাসার সঙ্গেই অপর একটি বাসার কক্ষে আটক রাখা হয়। কোনো পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন ছাড়াই দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি গোটা যুদ্ধকালীন সময়ে এক নিসঙ্গ জীবন অতিবাহিত করেন। যে পরিচারিকা তাকে খাবার দিয়ে যেত তিনিও কোনো কথা বলতেন না। যে সিনিয়র বাঙালি অফিসারের বাসার পাশের বাসায় বেগম জিয়া আটক ছিলেন ওই সামরিক কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তা সূত্রে পরবর্তী সময়ে আমার স্ত্রীর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারাও ক্যান্টনমেন্টে নজরদারিতে ছিলেন। বেগম জিয়াকে মাঝেমধ্যে দেখেছেন, কিন্তু কথাবার্তা বলার সুযোগ ছিল না। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে স্বামীর বীরোচিত নেতৃত্বদান অন্যদিকে এক ভয়সংকুল পরিস্থিতিতে আটক অবস্থা তার জীবনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে এবং তিনি তখন থেকেই একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বেগম জিয়া ব্যক্তিগত জীবনে সুন্দরভাবে গুছিয়ে থাকতে, পছন্দ করতেন। এবং ওই বন্দীদশায়ও তার হেরফের হয়নি। তার এই বন্দী জীবন নিয়ে যারা কুৎসা প্রচার করেছেন তারা নিম্নরুচি ও ছোট মনের পরিচয় দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবন এবং সাজ-পোশাকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে চলতে পারলেও রাজনৈতিক জীবনে সুন্দরের মাঝে কখনো কখনো অসুন্দরও বেরিয়ে এসেছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া কার্যত বিএনপিকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ১৯৯১ সনে এরশাদের পতনের পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও আসেন। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল যখন পরবর্তী নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দাবি করে তখন তিনি বেঁকে বসেন।
এবং দীর্ঘস্থায়ী এক আন্দোলনের মুখে অবশেষে তিনি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হন। আমার ব্যাক্তিগত ধারণা বিরোধী আন্দোলনের ব্যপকতা সৃষ্টির আগেই যদি বিএনপি বা বেগম জিয়ার উদযোগে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হতো তবে ১৯৯৬ সনেও সরকার বদল হতো বলে মনে হয় না।
২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরে ধীরে ধীরে ক্ষমতা কাঠামোয় হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক এক পৃথক বলয় সৃষ্টি হয়- যা সরকার ও বিএনপির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। এসব বিষয়ে বেগম জিয়া কঠোর অবস্থান নিতে পারেননি, বরং ২০০৬ সনে এসে পরবর্তী নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের অনুকূলে রাখতে বিচারপতিদের চাকরির বয়স সীমা বাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেন এবং রাজনীতির মাঠে এক সংঘাতমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা ১/১১ ডেকে আনতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এজন্যে জিয়া পরিবার ও বিএনপিকে চড়া মূল্য দিতে হয়।
সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কাজটি ছিল দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সব অপকর্মের দোসর যুদ্ধাপরাধী জামায়াত ইসলামকে ২০০১- এর মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া। ওই সময়ে দেশে আইএসআই-এর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, জঙ্গী তৎপরতা বাড়ে এবং ক্ষমতার অংশীদারত্বের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধ অপরাধীদের দল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে। জঙ্গীগোষ্ঠী ওই সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রীকে হত্যার নানা প্রচেষ্টা নেয় এবং সে ধরনের এক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার জনসভায় এক ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায়। পরিণতিতে ২৪ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন গুরুতর আহত হয়। বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন ওই সময়ের সরকার ‘লুকিং ফর শত্রুজ’ ঘোষণা দেয়া ছাড়া ওই সব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতদিন পরে এসে বিএনপি টের পাচ্ছে ওই সমস্ত শক্তির উর্দ্ধত ফনার নিশানায় তারাও আছে।
এক-এগারোর সরকার শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত মামলা দায়ের করেছিল, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়লাভ করলে তা সবই প্রত্যাহার, নিষ্ক্রিয় করাসহ নানা পন্থায় দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু বেগম জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসমূহ চলমান রাখা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৬টা মামলা ছিল আর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল ১৫টি মামলা। ক্ষমতায় এসে সেগুলো তিনি স্কোয়াশ করলেন অন্যদিকে বেগম জিয়ার ৬টা মামলার জায়গায় আরো নতুন করে মামলা সংযুক্ত হলো, এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো। মানুষের কাছে এই বিচারকে বিচার মনে হয়নি। ক্ষমতার লড়াইয়ের নোংরা খেলা মনে হয়েছে এবং খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়েছে।
গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরেও এবং পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন নিবেদন করার পরেও খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না দেয়ায় তার প্রতি মানুষের দরদ আরো বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিল। তাই ৫ আগস্টের পরে দেশ বিদেশে সব ধরনের চিকিৎসার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে তাকে হার মানতে হয়েছে।
কিন্তু জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম, ‘৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে বিগত এক যুগ যাবৎ কতৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে হার না মানা যে লড়াই করেছেন তা তাকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবে। বেগম জিয়া সৌন্দর্যচর্চাকে পছন্দ করতেন। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন। তবে জীবনের সৌন্দর্য শুধু পোশাক-পরিচ্ছদ ও রূপচর্চায় ফুটে ওঠে না, ৫ আগস্টের পরে অসুস্থ বেগম জিয়া তার প্রথম প্রতিক্রিয়ায় যে বললেন, ‘আর নয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি’- তখন কিন্তু তার জীবনের সৌন্দর্যেরও প্রকাশ হলো।
তার রেখে যাওয়া দল কিন্তু সেই সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। আর অন্তর্বর্তী সরকার তো চায়নি, তাই পারেওনি। একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে দেশ। সকল দলের জন্য নির্বাচনের মাঠ উন্মুক্ত না করে শেখ হাসিনা আমলের মতো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি স্থায়ী সমস্যা কিন্তু জিইয়ে রাখা হলো। জুলাই হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের বিচারের আওতায় রেখেও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আয়োজন করা যেতে পারত। জুলাই আন্দোলনে দেশের তরুণ-তরুণীরা সব ক্ষেত্রে বৈষম্য মুক্তির আকাক্সক্ষা ও অকুণ্ঠ আত্মোৎসর্গের মধ্যদিয়ে জীবনের যে সৌন্দর্য দেখিয়েছিলেন তা থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি দূরেই রয়ে গেল!
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ারুল হক

খালেদা জিয়া
রোববার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
কাছ থেকে দেখা মানে এমনটা নয়, যে কখনো তার কাছাকাছি থেকেছি। যখন রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম বিশেষত এরশাদ জমানায় সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে ছিলাম তখনকার দেখাটাকে কাছ থেকে দেখা বলতে চেয়েছি।
তিনবার তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়ই তিনি বিরোধী নেত্রী। তার কথাবার্তার ধরন ও চাহনির মধ্যে বিনয়ের প্রকাশটা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। আবার সামরিক ছাউনির যে কিছুটা ভিন্ন উচ্চারণ ভঙ্গি এবং কমান্ডিং টোন থাকে সেটাও দৃষ্টি এড়ায়নি
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি দলীয় নেতৃবৃন্দের অনেকে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সঙ্গে যোগ দেন। সেই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বিএনপিতে ভাইস চেয়ারম?্যান হিসেবে যোগ দেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
স্মৃতি বড়ই প্রতারণা করছে। অনেক কিছুই স্মরণে আসছে না। তবে সামরিক শাসনামলে সম্ভবত দুবার বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। প্রথমবার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের একজন হিসেবে। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন যখন সংগঠিত রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রস্তুতির অভাব- সে প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন শেখ হাসিনাসহ জোট নেতাদের সঙ্গে যেমন বৈঠক হয়, তেমনি একপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়। বৈঠকে খালেদা জিয়া আমাদের বক্তব্য, আন্দোলনের প্রস্তুতি ইত্যাদি বিষয়াদি মনোযোগ দিয়ে শোনার পর আমাদের প্রশংসা করে বিএনপির তৎকালীন ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিব ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে বিএনপির বক্তব্য বলার জন?্য আহ্বান জানান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ছাত্রদলের অন্তর্ভুক্তি না থাকায় বিএনপি নেতৃত্ব কিছুটা শীতল মনোভাব পোষণ করেও আমাদের সঙ্গে সংহতি জানান।
ওই সময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত না করার প্রধান কারণ ছিল সংগঠনটি তখন ভাঙা-গড়ার মধ্যে ছিল। জেনারেল এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলতে ছাত্র দলে ভাঙন সৃষ্টি করার জন?্য সব ধরনের প্রচেষ্টা সামরিক সরকার নেয়। তাই সাময়িকভাবে ছাত্র দলের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলার কৌশল নেয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র দলও ওই সময়ে সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত হতে উৎসাহী ছিল না। বেশ পরে ছাত্র দলসহ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে উঠেছিল, যা হোক বেগম খালেদা জিয়াকে সামনাসামনি সেই প্রথম দেখা।
দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয় ১৯৮৯ সালে। সিমিটার কোম্পানির সঙ্গে সিলেটের হরিপুরে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন ঢাকা-সিলেট পদযাত্রার আয়োজন করেছিল। ১৩ দিনের পদযাত্রা শেষে সিলেট শহীদ মিনারের পাদদেশের গণসমাবেশে বিএনপি নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানাতে ধানমন্ডির বিএনপি কার্যালয়ে আমরা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তার সঙ্গে তখন ছিলেন সাইফুর রহমান ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বেগম জিয়া আমাদের বক্তব্য শোনার পর ধন?্যবাদ জানিয়ে নিজে আর কিছু না বলে ড. মোশাররফকে কথা বলতে বলেন। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানী হিসেবে রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফকে আমাদের গণসমাবেশে বক্তা হিসেবে উপস্থিত করা। এখানে একটা মজার কথা বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। সভাশেষে সভাকক্ষ থেকে বের হওয়ার পর সাইফুর রহমান আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বিএনপি আবার যুব ইউনিয়ন কবে সৃষ্টি করেছে? বুঝলাম, তিনি শুধু অর্থনীতি ও বাজেট নিয়েই আছেন!
আর একবার অবশ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০১ সনের ২০ জানুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ওই দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়েছিল, যেখানে ৫ জন নিহত ও অনেকে আহত হন, যা ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মধ্যে একটি। হাসপাতালে বেগম জিয়া আহতদের দেখতে আসেন। পার্টির নেতৃস্থানীয় কেউ তখন ওই ওয়ার্ডে ছিলেন না। বেগম জিয়া তখন আহতদের পাশে থাকা আমার স্ত্রীর দিকে এগিয়ে আসেন এবং ?আমার স্ত্রী সালাম দেয়ার আগেই তিনি সালাম দেন। আহতদের খোঁজখবর নিয়ে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রীর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন আমি তো প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। আপনাদের নেতৃবৃন্দকে বলবেন আমি আগামীকাল আরো কিছু টাকা চিকিৎসা সহায়তার জন্য পাঠাব।
তিনবার তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়ই তিনি বিরোধী নেত্রী। তার কথাবার্তার ধরন ও চাহনির মধ্যে বিনয়ের প্রকাশটা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। আবার সামরিক ছাউনির যে কিছুটা ভিন্ন উচ্চারণ ভঙ্গি এবং কমান্ডিং টোন থাকে সেটাও দৃষ্টি এড়ায়নি। পত্রপত্রিকা ও রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলে থাকেন এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রামে নিরলস ভূমিকা রেখে তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। হতে পারে। তবে আমি বিষয়টা ভিন্নভাবে দেখি।
আপসহীনতা আর মানসিক দৃঢ়তা তিনি অর্জন করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাদের প্রধান শত্রু ও টার্গেট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে আটক করে একেবারে পিন্ডিতে তাদের কব্জায় নিতে সক্ষম হয়। শেখ মুজিবকে আটকে ফেলতে পারায় মুজিব পরিবার সামরিক নজরদারির মধ্যে থাকলেও পাকবাহিনীর স্বস্তি ছিল, যে মুজিব তো তাদের হাতে। আর মুজিবকে বন্দী করে তারা যখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে তখন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতারা মেজর জিয়ার ওপর দায়িত্ব দেন কালুরঘাট তথা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার। আর তা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আবার নেমে এলো ‘৭ মার্চ’ - ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম.......’। বাংলাদেশের মানুষ আশ্বস্ত হলো ভরসা পেল, সশস্ত্র সামরিক শক্তিও স্বাধীনতার যুদ্ধে আছে।
মেজর জিয়া তো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমে পড়লেন। তিনি তখন পাকবাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেগম জিয়ার কী পরিণতি হলো? স্বাভাবিকভাবেই জিয়ার ওপর পাক বাহিনীর আক্রোশ পড়ল বেগম জিয়ার ওপরে।
মেজর জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর বেগম জিয়া বোরখা পরে গোপনে নৌপথে পালিয়ে এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সেখান থেকে তার ভগ্নিপতি তাকে ঢাকায় নিজ বাসায় নিয়ে আসেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন পাক সেনাবাহিনী বেগম জিয়ার খোঁজ করছেন তখন স্থান বদল করে করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বাসায় তাকে রাখার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়া সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যান। গ্রেপ্তার করা হয় আশ্রয়দাতাকে এবং পরবর্তীতে ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হকসহ সব আশ্রয়দাতাকেই গ্রেপ্তার হতে হয় এবং তারা ক্যান্টনমেন্টে নির্মম নির্যাতনের সম্মুখীন হন।
দুই শিশুসন্তানসহ বেগম জিয়াকে একজন সিনিয়র বাঙালি অফিসারের বাসার সঙ্গেই অপর একটি বাসার কক্ষে আটক রাখা হয়। কোনো পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন ছাড়াই দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি গোটা যুদ্ধকালীন সময়ে এক নিসঙ্গ জীবন অতিবাহিত করেন। যে পরিচারিকা তাকে খাবার দিয়ে যেত তিনিও কোনো কথা বলতেন না। যে সিনিয়র বাঙালি অফিসারের বাসার পাশের বাসায় বেগম জিয়া আটক ছিলেন ওই সামরিক কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর সঙ্গে আত্মীয়তা সূত্রে পরবর্তী সময়ে আমার স্ত্রীর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। তারাও ক্যান্টনমেন্টে নজরদারিতে ছিলেন। বেগম জিয়াকে মাঝেমধ্যে দেখেছেন, কিন্তু কথাবার্তা বলার সুযোগ ছিল না। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে স্বামীর বীরোচিত নেতৃত্বদান অন্যদিকে এক ভয়সংকুল পরিস্থিতিতে আটক অবস্থা তার জীবনের ওপর গভীর ছাপ ফেলে এবং তিনি তখন থেকেই একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বেগম জিয়া ব্যক্তিগত জীবনে সুন্দরভাবে গুছিয়ে থাকতে, পছন্দ করতেন। এবং ওই বন্দীদশায়ও তার হেরফের হয়নি। তার এই বন্দী জীবন নিয়ে যারা কুৎসা প্রচার করেছেন তারা নিম্নরুচি ও ছোট মনের পরিচয় দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবন এবং সাজ-পোশাকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে চলতে পারলেও রাজনৈতিক জীবনে সুন্দরের মাঝে কখনো কখনো অসুন্দরও বেরিয়ে এসেছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া কার্যত বিএনপিকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ১৯৯১ সনে এরশাদের পতনের পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও আসেন। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল যখন পরবর্তী নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দাবি করে তখন তিনি বেঁকে বসেন।
এবং দীর্ঘস্থায়ী এক আন্দোলনের মুখে অবশেষে তিনি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হন। আমার ব্যাক্তিগত ধারণা বিরোধী আন্দোলনের ব্যপকতা সৃষ্টির আগেই যদি বিএনপি বা বেগম জিয়ার উদযোগে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হতো তবে ১৯৯৬ সনেও সরকার বদল হতো বলে মনে হয় না।
২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরে ধীরে ধীরে ক্ষমতা কাঠামোয় হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক এক পৃথক বলয় সৃষ্টি হয়- যা সরকার ও বিএনপির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। এসব বিষয়ে বেগম জিয়া কঠোর অবস্থান নিতে পারেননি, বরং ২০০৬ সনে এসে পরবর্তী নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের অনুকূলে রাখতে বিচারপতিদের চাকরির বয়স সীমা বাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেন এবং রাজনীতির মাঠে এক সংঘাতমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা ১/১১ ডেকে আনতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এজন্যে জিয়া পরিবার ও বিএনপিকে চড়া মূল্য দিতে হয়।
সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কাজটি ছিল দেশের জন্মযুদ্ধবিরোধী এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সব অপকর্মের দোসর যুদ্ধাপরাধী জামায়াত ইসলামকে ২০০১- এর মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া। ওই সময়ে দেশে আইএসআই-এর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, জঙ্গী তৎপরতা বাড়ে এবং ক্ষমতার অংশীদারত্বের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধ অপরাধীদের দল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে। জঙ্গীগোষ্ঠী ওই সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রীকে হত্যার নানা প্রচেষ্টা নেয় এবং সে ধরনের এক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার জনসভায় এক ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায়। পরিণতিতে ২৪ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন গুরুতর আহত হয়। বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন ওই সময়ের সরকার ‘লুকিং ফর শত্রুজ’ ঘোষণা দেয়া ছাড়া ওই সব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এতদিন পরে এসে বিএনপি টের পাচ্ছে ওই সমস্ত শক্তির উর্দ্ধত ফনার নিশানায় তারাও আছে।
এক-এগারোর সরকার শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত মামলা দায়ের করেছিল, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়লাভ করলে তা সবই প্রত্যাহার, নিষ্ক্রিয় করাসহ নানা পন্থায় দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু বেগম জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসমূহ চলমান রাখা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৬টা মামলা ছিল আর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল ১৫টি মামলা। ক্ষমতায় এসে সেগুলো তিনি স্কোয়াশ করলেন অন্যদিকে বেগম জিয়ার ৬টা মামলার জায়গায় আরো নতুন করে মামলা সংযুক্ত হলো, এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো। মানুষের কাছে এই বিচারকে বিচার মনে হয়নি। ক্ষমতার লড়াইয়ের নোংরা খেলা মনে হয়েছে এবং খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়েছে।
গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরেও এবং পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন নিবেদন করার পরেও খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না দেয়ায় তার প্রতি মানুষের দরদ আরো বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিল। তাই ৫ আগস্টের পরে দেশ বিদেশে সব ধরনের চিকিৎসার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে তাকে হার মানতে হয়েছে।
কিন্তু জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম, ‘৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে বিগত এক যুগ যাবৎ কতৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে হার না মানা যে লড়াই করেছেন তা তাকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখবে। বেগম জিয়া সৌন্দর্যচর্চাকে পছন্দ করতেন। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন। তবে জীবনের সৌন্দর্য শুধু পোশাক-পরিচ্ছদ ও রূপচর্চায় ফুটে ওঠে না, ৫ আগস্টের পরে অসুস্থ বেগম জিয়া তার প্রথম প্রতিক্রিয়ায় যে বললেন, ‘আর নয় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি’- তখন কিন্তু তার জীবনের সৌন্দর্যেরও প্রকাশ হলো।
তার রেখে যাওয়া দল কিন্তু সেই সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। আর অন্তর্বর্তী সরকার তো চায়নি, তাই পারেওনি। একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে দেশ। সকল দলের জন্য নির্বাচনের মাঠ উন্মুক্ত না করে শেখ হাসিনা আমলের মতো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি স্থায়ী সমস্যা কিন্তু জিইয়ে রাখা হলো। জুলাই হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের বিচারের আওতায় রেখেও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আয়োজন করা যেতে পারত। জুলাই আন্দোলনে দেশের তরুণ-তরুণীরা সব ক্ষেত্রে বৈষম্য মুক্তির আকাক্সক্ষা ও অকুণ্ঠ আত্মোৎসর্গের মধ্যদিয়ে জীবনের যে সৌন্দর্য দেখিয়েছিলেন তা থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি দূরেই রয়ে গেল!
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]