alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

: সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

সংস্কৃতি চর্চা মানে হলো একটি সমাজের বিশ্বাস, আচরণ, শিল্পকলা, প্রথা এবং জীবনযাত্রার সামগ্রিক অনুশীলন। এই প্রক্রিয়াটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। চর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতিতে নতুন কিছু যোগ হয়। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজের ভিত্তি মজবুত হয়, মেধার বিকাশ ঘটে এবং আলোকিত মানুষ গড়ে ওঠে। সংস্কৃতির এই প্রক্রিয়াটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক জীবনে চর্চিত হয়। এদের মাধ্যমেই তা তৃণমূল পর্যায়ে প্রসারিত হয়।

সংস্কৃতি চর্চা হলো-

১. সামাজিক উত্তরাধিকার হিসেবে সমাজের অর্জিত জ্ঞান, যোগ্যতা, বিশ্বাস, শিল্প, আইন ও প্রথার অনুশীলন।

২. মানুষের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তৈরি কৌশল ও উপায় সংস্কৃতি চর্চার অংশ।

৩. সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে একটি জাতি তার ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনের অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পায়।

সুপ্রতিম বড়ুয়া তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন- সহজ-সরল গ্রাম্য মানুষের আচার-আচরণ, অভ্যাস, স্মৃতি, সংস্কার ও কুসংস্কারবদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের রূপকথা দ্বারা নির্মিত আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয়। আমাদের শিকড়-সংস্কৃতি ছাড়া দেশের ইতিহাস পরিপূর্ণতা দাবি করতে পারে না। তাই অকৃত্রিম ও সব ইতিহাসের মা আবহমান গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতিকে জানা প্রয়োজন। আমাদের দেশের অন্তর্দৃষ্টি জানতে হলে তার গ্রামীণ মানুষ, তার ভাষা-সাহিত্য, লৌকিক শিল্পপ্রকৃতি ও গ্রামীণ সমাজকে অবশ্যই বাস্তব দৃষ্টিতে অকপটে নিরীক্ষণ করতে হবে। ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পটভূমিতে আমাদের গ্রামীণ জীবন বিবেচ্য। লৌকিক প্রতিবেশে লোকজীবনের ভাষা-সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যনাট্য, শিল্প, ধর্মবিশ্বাস, উৎসব-পার্বণ ইত্যাদি বহু বিচিত্র অভিব্যক্তি যুক্ত, আর আদি পল্লীজীবন ও আরণ্য জনপদই সেই আবহমান সংস্কৃতির শিকড়ের লালনক্ষেত্র।

মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিক বিচিত্র ও সচেতন সহযোগিতার বিষয় নিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক জগৎ। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল কৃষিপ্রধান দেশে শতকরা ৭০ জন মানুষই খেতখামার করে জীবিকা নির্বাহ করে। নিতান্ত অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত যারা, তাদের অধিকাংশই বাংলার পল্লীতে কৃষি ও অন্যান্য সামান্য কাজকর্ম করে জীবিকা চালান। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ বহির্জগতের সুন্দর ও সুশিক্ষিত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। তবু আছে তাদের জীবনচর্চা, জীবনের সুখ-দুঃখ, সমাজ, ধর্ম এবং দেহ-মনের বিবিধ ভাবনা।

কিন্তু করপোরেট থাবা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাণিজ্যিকীকরণ ঘটিয়ে মূলধারা থেকে বিচ্যুতি এবং স্বকীয়তা হরণ করছে। টেলিকম ও অন্যান্য করপোরেট প্রতিষ্ঠান স্পন্সরশিপের নামে সংস্কৃতিকে পণ্যে পরিণত করছে, মিডিয়ার মাধ্যমে অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটাচ্ছে এবং ভাষা ও ঐতিহ্যের ওপর বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব বাড়াচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় শিল্প-সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির গভীরতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাছাড়া এই প্রক্রিয়ায় কিছু আঁতেলও যুক্ত হয়েছেন। এদের কারণে সাহিত্য ও শিল্পের মৌলিক উদ্দেশ্য সরে গিয়ে সংস্কৃতি হয়ে উঠছে লাভের এক ধরনের পণ্য। এরা সাংস্কৃতিক চর্চার উৎসবকে বানিয়েছে ব্যবসার কেন্দ্রে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে গড়ে উঠেছে কিছু আঁতেল সংগঠন। এই সংগঠনগুলো অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক। এরা কিছু পুরস্কারের প্রবর্তন করেছে; পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানও একধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তারা কথিত কিছু জ্ঞানী ও গুণীদের সংবর্ধনা দিয়ে থাকে। সংস্কৃতি জগতের প্রকৃত জ্ঞানী-গুণীদের পুরস্কৃত করা অবশ্যই মহৎ কাজ, তবে এরা যা করছে তা কতটা মহৎ- তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ নামকাওয়াস্তে কিছু ভুঁইফোড় সাহিত্য সংগঠন গড়ে উঠেছে, যারা কথিত জ্ঞানী-গুণীদের সংবর্ধনার আয়োজন করে। শোনা যায়, অর্থের বিনিময়ে কথিত জ্ঞানীরা সংবর্ধিত হন এবং পুরস্কার পেয়ে থাকেন।

সম্প্রতি রাজশাহী শহরের একটি সাহিত্য সংগঠনের মাসিক সভায় গিয়ে আমি কিছুটা বিচলিত হই। পৌঢ় এক ভদ্রলোক, সংগঠনটির উপদেষ্টা, বক্তৃতায় বেশ কয়েকটি সংগঠনের নাম উল্লেখ করে বলেন- ‘আমরা এই কজনই ঘুরে ফিরে এই শহরের লেখালেখি করি।’ তার ভাষায় বোঝা গেল, এই কয়েকজনের মধ্যেই সাহিত্যচর্চা সীমাবদ্ধ রাখতে তারা আগ্রহী। বাস্তবে তারা তাই রাখতে চায়। এই সার্কেলে কিছু লেখালেখি করা মানুষ দেখা যায়, যাদের চলন-বলন ও আচরণে একধরনের কৌলিন্যবোধ ফুটে ওঠে; অথচ তারা অন্তঃসারশূন্য- অনেকটা ‘শূন্য কলস বাজে বেশি’ প্রবাদটির মতো।

বাংলাদেশের অনেক শহরেই দেখা যায়, একটি লেখকশ্রেণী ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহকে পরিণত হয়েছে। গত হাসিনার আমলে রাজশাহীতে কথিত কিছু লেখকের সমন্বয়ে একটি বিশাল সংগঠন গড়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় এই সংগঠন বাড়ি দখল, ব্যাংকের টাকা লুটসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। এরা অভিজাততান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন। নিজেদের লেখা গ্রন্থ নিজের টাকায় ছাপে, কোনো পাঠক কেনে না; তারপর নিজেদের মহাজ্ঞানী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার হীন প্রচেষ্টা চালায়। সেই শ্রেণীটি এখন ভিন্ন বেশ ধারণ করেছে। বর্তমান সরকারব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আবার নবোদ্যমে তারা সক্রিয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজশাহীর মিঞাপাড়ার পাবলিক লাইব্রেরিটির নেতৃত্ব তাদের হাতেই। অথচ এরা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। করপোরেট আগ্রাসন তাদের চোখে পড়ে না, কারণ তারা প্রকৃত অর্থে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করে না। বর্তমানে করপোরেট বিজ্ঞাপনে বাংলা ভাষার ব্যবহার বদলে যাচ্ছে; বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং ভাষার মৌলিকত্ব নষ্ট হচ্ছে। প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য করপোরেট স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তার মর্যাদা ও গভীরতা হ্রাস করছে। আমরা দেখছি, লালনের সংগীত চর্চার বিকৃতির অপচেষ্টা চলছে।

শিল্পীরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ছে। করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পীরা নিজেদের সৃজনশীলতার চেয়ে স্পন্সরের চাহিদা পূরণে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। ফলে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিবাদী বিষয়গুলো শিল্পে উঠে আসছে না।

বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি বর্তমানে আকাশ-সংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসনের শিকার। নয়া উদারবাদ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশে সবকিছুই বাণিজ্যিক হিসাবে পরিচালিত হচ্ছে; সংস্কৃতিও এর বাইরে নেই। সংস্কৃতি এখন বড় ধরনের বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি যে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আদর্শিক ও জাতীয় স্বকীয়তায় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ- সেই চরিত্র হারাতে বসেছে। আন্তর্জাতিকতার নামে কেবল পণ্য হিসেবে দেখার ফলে জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এই অবক্ষয়ে বড় ভূমিকা রাখছে কথিত ছোট ছোট সংগঠনের কিছু লেখক। এরা নিজেদের ব্রাহ্মণ ভাবে, অন্যদের ভাবে চ-াল। নিজেদের লেখাকে মহার্ঘ্য আর অন্যদের লেখাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। নিজের টাকায় বই ছাপাতে হয়, কোনো পত্রিকায় লেখা ছাপে না; তারপর নানা কৌশলে চাঁদাবাজি করে উৎসবের আয়োজন করে সামান্য লাভ করে। মাঠপর্যায়ে যারা প্রকৃত লেখালেখির প্রসার ঘটাচ্ছেন, তাদের কাজ নিয়ে এরা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে।

বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে যেমন আকাশ-সংস্কৃতি বড় অন্তরায়, তেমনি চাটুকার কিছু লেখক-কবি সংগঠনও বড় বাধা। যারা অর্থের বিনিময়ে পদক, সম্মান ও গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করছে। এরা তৃণমূলে সাহিত্য বিকাশে নানাভাবে পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি করে। সমাজে সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে কুকথা ছড়ায়। এরা আত্মকেন্দ্রিক; নিজেদের জ্ঞানী মনে করে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের লেখক-কবি হিসেবে গ্রহণ করে না। এদের কর্মকাণ্ড ও মূলত ফেসবুককেন্দ্রিক- লাইক ও কমেন্ট দিয়েই জনপ্রিয়তা মাপা হয়।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

ছবি

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

সংস্কৃতি চর্চা মানে হলো একটি সমাজের বিশ্বাস, আচরণ, শিল্পকলা, প্রথা এবং জীবনযাত্রার সামগ্রিক অনুশীলন। এই প্রক্রিয়াটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। চর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতিতে নতুন কিছু যোগ হয়। সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজের ভিত্তি মজবুত হয়, মেধার বিকাশ ঘটে এবং আলোকিত মানুষ গড়ে ওঠে। সংস্কৃতির এই প্রক্রিয়াটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক জীবনে চর্চিত হয়। এদের মাধ্যমেই তা তৃণমূল পর্যায়ে প্রসারিত হয়।

সংস্কৃতি চর্চা হলো-

১. সামাজিক উত্তরাধিকার হিসেবে সমাজের অর্জিত জ্ঞান, যোগ্যতা, বিশ্বাস, শিল্প, আইন ও প্রথার অনুশীলন।

২. মানুষের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তৈরি কৌশল ও উপায় সংস্কৃতি চর্চার অংশ।

৩. সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে একটি জাতি তার ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনের অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে পায়।

সুপ্রতিম বড়ুয়া তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন- সহজ-সরল গ্রাম্য মানুষের আচার-আচরণ, অভ্যাস, স্মৃতি, সংস্কার ও কুসংস্কারবদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের রূপকথা দ্বারা নির্মিত আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয়। আমাদের শিকড়-সংস্কৃতি ছাড়া দেশের ইতিহাস পরিপূর্ণতা দাবি করতে পারে না। তাই অকৃত্রিম ও সব ইতিহাসের মা আবহমান গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতিকে জানা প্রয়োজন। আমাদের দেশের অন্তর্দৃষ্টি জানতে হলে তার গ্রামীণ মানুষ, তার ভাষা-সাহিত্য, লৌকিক শিল্পপ্রকৃতি ও গ্রামীণ সমাজকে অবশ্যই বাস্তব দৃষ্টিতে অকপটে নিরীক্ষণ করতে হবে। ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের পটভূমিতে আমাদের গ্রামীণ জীবন বিবেচ্য। লৌকিক প্রতিবেশে লোকজীবনের ভাষা-সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যনাট্য, শিল্প, ধর্মবিশ্বাস, উৎসব-পার্বণ ইত্যাদি বহু বিচিত্র অভিব্যক্তি যুক্ত, আর আদি পল্লীজীবন ও আরণ্য জনপদই সেই আবহমান সংস্কৃতির শিকড়ের লালনক্ষেত্র।

মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিক বিচিত্র ও সচেতন সহযোগিতার বিষয় নিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক জগৎ। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল কৃষিপ্রধান দেশে শতকরা ৭০ জন মানুষই খেতখামার করে জীবিকা নির্বাহ করে। নিতান্ত অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত যারা, তাদের অধিকাংশই বাংলার পল্লীতে কৃষি ও অন্যান্য সামান্য কাজকর্ম করে জীবিকা চালান। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ বহির্জগতের সুন্দর ও সুশিক্ষিত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। তবু আছে তাদের জীবনচর্চা, জীবনের সুখ-দুঃখ, সমাজ, ধর্ম এবং দেহ-মনের বিবিধ ভাবনা।

কিন্তু করপোরেট থাবা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাণিজ্যিকীকরণ ঘটিয়ে মূলধারা থেকে বিচ্যুতি এবং স্বকীয়তা হরণ করছে। টেলিকম ও অন্যান্য করপোরেট প্রতিষ্ঠান স্পন্সরশিপের নামে সংস্কৃতিকে পণ্যে পরিণত করছে, মিডিয়ার মাধ্যমে অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটাচ্ছে এবং ভাষা ও ঐতিহ্যের ওপর বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব বাড়াচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় শিল্প-সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির গভীরতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাছাড়া এই প্রক্রিয়ায় কিছু আঁতেলও যুক্ত হয়েছেন। এদের কারণে সাহিত্য ও শিল্পের মৌলিক উদ্দেশ্য সরে গিয়ে সংস্কৃতি হয়ে উঠছে লাভের এক ধরনের পণ্য। এরা সাংস্কৃতিক চর্চার উৎসবকে বানিয়েছে ব্যবসার কেন্দ্রে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে গড়ে উঠেছে কিছু আঁতেল সংগঠন। এই সংগঠনগুলো অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক। এরা কিছু পুরস্কারের প্রবর্তন করেছে; পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানও একধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তারা কথিত কিছু জ্ঞানী ও গুণীদের সংবর্ধনা দিয়ে থাকে। সংস্কৃতি জগতের প্রকৃত জ্ঞানী-গুণীদের পুরস্কৃত করা অবশ্যই মহৎ কাজ, তবে এরা যা করছে তা কতটা মহৎ- তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ নামকাওয়াস্তে কিছু ভুঁইফোড় সাহিত্য সংগঠন গড়ে উঠেছে, যারা কথিত জ্ঞানী-গুণীদের সংবর্ধনার আয়োজন করে। শোনা যায়, অর্থের বিনিময়ে কথিত জ্ঞানীরা সংবর্ধিত হন এবং পুরস্কার পেয়ে থাকেন।

সম্প্রতি রাজশাহী শহরের একটি সাহিত্য সংগঠনের মাসিক সভায় গিয়ে আমি কিছুটা বিচলিত হই। পৌঢ় এক ভদ্রলোক, সংগঠনটির উপদেষ্টা, বক্তৃতায় বেশ কয়েকটি সংগঠনের নাম উল্লেখ করে বলেন- ‘আমরা এই কজনই ঘুরে ফিরে এই শহরের লেখালেখি করি।’ তার ভাষায় বোঝা গেল, এই কয়েকজনের মধ্যেই সাহিত্যচর্চা সীমাবদ্ধ রাখতে তারা আগ্রহী। বাস্তবে তারা তাই রাখতে চায়। এই সার্কেলে কিছু লেখালেখি করা মানুষ দেখা যায়, যাদের চলন-বলন ও আচরণে একধরনের কৌলিন্যবোধ ফুটে ওঠে; অথচ তারা অন্তঃসারশূন্য- অনেকটা ‘শূন্য কলস বাজে বেশি’ প্রবাদটির মতো।

বাংলাদেশের অনেক শহরেই দেখা যায়, একটি লেখকশ্রেণী ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহকে পরিণত হয়েছে। গত হাসিনার আমলে রাজশাহীতে কথিত কিছু লেখকের সমন্বয়ে একটি বিশাল সংগঠন গড়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় এই সংগঠন বাড়ি দখল, ব্যাংকের টাকা লুটসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। এরা অভিজাততান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন। নিজেদের লেখা গ্রন্থ নিজের টাকায় ছাপে, কোনো পাঠক কেনে না; তারপর নিজেদের মহাজ্ঞানী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার হীন প্রচেষ্টা চালায়। সেই শ্রেণীটি এখন ভিন্ন বেশ ধারণ করেছে। বর্তমান সরকারব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে আবার নবোদ্যমে তারা সক্রিয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজশাহীর মিঞাপাড়ার পাবলিক লাইব্রেরিটির নেতৃত্ব তাদের হাতেই। অথচ এরা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। করপোরেট আগ্রাসন তাদের চোখে পড়ে না, কারণ তারা প্রকৃত অর্থে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করে না। বর্তমানে করপোরেট বিজ্ঞাপনে বাংলা ভাষার ব্যবহার বদলে যাচ্ছে; বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং ভাষার মৌলিকত্ব নষ্ট হচ্ছে। প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য করপোরেট স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তার মর্যাদা ও গভীরতা হ্রাস করছে। আমরা দেখছি, লালনের সংগীত চর্চার বিকৃতির অপচেষ্টা চলছে।

শিল্পীরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ছে। করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পীরা নিজেদের সৃজনশীলতার চেয়ে স্পন্সরের চাহিদা পূরণে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। ফলে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিবাদী বিষয়গুলো শিল্পে উঠে আসছে না।

বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতি বর্তমানে আকাশ-সংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসনের শিকার। নয়া উদারবাদ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশে সবকিছুই বাণিজ্যিক হিসাবে পরিচালিত হচ্ছে; সংস্কৃতিও এর বাইরে নেই। সংস্কৃতি এখন বড় ধরনের বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি যে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আদর্শিক ও জাতীয় স্বকীয়তায় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ- সেই চরিত্র হারাতে বসেছে। আন্তর্জাতিকতার নামে কেবল পণ্য হিসেবে দেখার ফলে জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এই অবক্ষয়ে বড় ভূমিকা রাখছে কথিত ছোট ছোট সংগঠনের কিছু লেখক। এরা নিজেদের ব্রাহ্মণ ভাবে, অন্যদের ভাবে চ-াল। নিজেদের লেখাকে মহার্ঘ্য আর অন্যদের লেখাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। নিজের টাকায় বই ছাপাতে হয়, কোনো পত্রিকায় লেখা ছাপে না; তারপর নানা কৌশলে চাঁদাবাজি করে উৎসবের আয়োজন করে সামান্য লাভ করে। মাঠপর্যায়ে যারা প্রকৃত লেখালেখির প্রসার ঘটাচ্ছেন, তাদের কাজ নিয়ে এরা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে।

বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে যেমন আকাশ-সংস্কৃতি বড় অন্তরায়, তেমনি চাটুকার কিছু লেখক-কবি সংগঠনও বড় বাধা। যারা অর্থের বিনিময়ে পদক, সম্মান ও গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করছে। এরা তৃণমূলে সাহিত্য বিকাশে নানাভাবে পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি করে। সমাজে সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে কুকথা ছড়ায়। এরা আত্মকেন্দ্রিক; নিজেদের জ্ঞানী মনে করে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের লেখক-কবি হিসেবে গ্রহণ করে না। এদের কর্মকাণ্ড ও মূলত ফেসবুককেন্দ্রিক- লাইক ও কমেন্ট দিয়েই জনপ্রিয়তা মাপা হয়।

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

back to top