শঙ্কর প্রসাদ দে
মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিগ ব্যাং, বিগ বাউন্স, বিগ ক্রাঞ্চ। মানুষ রাতের আকাশ দেখে অবাক বিষ্ময়ে হাজার হাজার বছর দেখে ভেবে চলেছে, এতো লক্ষ লক্ষ তারা অনিন্দ্য সুন্দর চাঁদ আর দিনের সূর্যের সৃষ্টিকর্তা কে? এগুলো সৃষ্টি হলো কিভাবে? ১৬১০ সালে গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পর মানুষের প্রশ্নের ধরণটাই পাল্টে গেল। গ্যালিলিও শহরের জ্ঞানী গুণিদের ডেকে এনে বললেন মহাকাশ দেখো। ইউরোপ জুড়ে হৈ চৈ পড়ে গেল। রাতের আকাশে মিটি মিটি তারাগুলোর বেশীর ভাগ নক্ষত্র এবং শুধু নক্ষত্রের সংখ্যাই লক্ষ কোটি। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই নক্ষত্রের সংখ্যা কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন।
ষোড়শ শতক থেকে মানুষ ভাবতে শুরু করল সম্ভবত; প্রাকৃতিক কোন কারনে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। ব্রহ্মা-ের সৃষ্টি বিকাশ
চলছে প্রাকৃতিক কিছু নিয়ম নীতির কার্যকারনে। এতো শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের তাত্বিক ভিত্তি কি? তত্ব নিয়ে আর্বিভূত হলেন বৃটিশ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। কোপার্নিকাস আগেই টলেমির পৃথিবী কেন্দ্রিক মডেল মিথ্যা প্রমাণ করে বলে গেছেন পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র কওে ঘুরছে। মানুষের প্রশ্ন ছিল ঘুরার সময় তাহলে মানুষ পড়ে যায় না কেন? আপেল এসে পড়ল তাঁর কোলে। হৈ চৈ করে চিৎকার কওে উঠে বললেন উত্তর পেয়েছি উত্তর পেয়েছি। ভূ-পৃষ্ঠ সবকিছুকে নিজের দিকে অবিরত টানছে। উনি বললেন, ভূ-পৃষ্ঠের এই টানের নাম গ্রাভিটি বা অভিকর্ষ। তাঁর এ সংক্রান্তে অপর বক্তব্য হলো মহাকাশে তারাগুলো পরষ্পর একে অন্যকে টানছে। এই টানের নাম মহাকর্ষ। নক্ষত্র বা তারার সাথে গ্রহ উপগ্রহের টানাটানিতে ভারসাম্য অবস্থায় গ্রহ উপগ্রহ মূল শক্তি তারার চতুর্দিকে ঘুরে। যেমন:- পৃথিবী, মঙ্গল বৃহষ্পতি সহ ৮টি গ্রহ সূর্যেও চারিদিকে ঘুরছে। পৃথিবীর একটি অংশ থেকে চাঁদের সৃষ্টি।
এজন্য পৃথিবীর উপগ্রহ হল চাঁদ। পৃথিবীর মহাকর্ষের সাথে চাঁদের মহাকর্ষের টানাটানিতে প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যতে উপগ্রহ চাঁদ তার গ্রহ পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে। একিভাবে শনির উপগ্রহ ২৭৪টি। সেগুলো শনির চারিদিকে ঘুরছে। বৃহষ্পতির উপগ্রহ ৪টি। সেগুলো বৃহষ্পতির চারিদিকে ঘুরছে। নিউটনের অভিমত ছিল, বাধাগ্রস্থ না করা পর্যন্ত চলন্ত বস্তু চিরকাল চলন্ত বা চলতে থাকবে। স্থির বস্তুতে বলপ্রয়োগ না করলে তা চিরকালই স্থির থাকবে। আইনস্টাইনও নিউটনের মতকে সমর্থন করে তাঁর সূত্রে খামোকা একটি ধ্রুবক (লেমডা) ব্যবহার করেছিলেন। যদিও নিউটনের অভিকর্ষ আর মহাকর্ষ তত্বেও সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললেন গ্রহ উপগ্রহ নিজ শক্তিতে অন্য কাউকে আকর্ষণ করে না। অভিকর্ষ বা মহাকর্ষ হল আসলে মহাকাশের বক্রতা থেকে সৃষ্ট শক্তি। মহাকাশকে চাদর গণ্য করলে যে কোন তারার ভারে সন্নিহিত অঞ্চলে বক্রতার সৃষ্টি হয়। বক্রতা আশেপাশের গ্রহ উপগ্রহকে নিজের দিকে টানে এটিই আসলে মহাকর্ষ। যেমন ১টি চাদরকে ৪ কোণায় ধরে রেখে সেটিতে ১টি বল নিক্ষেপ করলে চাদরটি নীচের দিকে মাঝ বরাবর ডেবে যাবে। ঐ বাঁকা চাদরে যদি ১টি মার্বেল ছেড়ে দেয়া হয় তবে মার্বেলটি বক্রতা বরাবর ঘুরতে থাকবে। মহাকাশে সূর্য এরকম দেবে আছে। ফলে সূর্যের বক্রতা অনুযায়ী পৃথিবী সহ সব গ্রহ উপগ্রহ সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে। ১৯১৫ সালে জেনারেল রিয়েলেটিভিটির এই বক্রতার তথ্য মহাকাশ বিজ্ঞানের সর্বগ্রহণযোগ্য তত্ব। মহাকাশের সমস্ত গ্রহ উপগ্রহ ‘নিজ কক্ষপথে স্থির’ নিউটন ও আইনস্টাইনের এই বক্তব্য ভাংতে বেশী দিন লাগেনি।
আইনস্টাইনের জীবদ্দশাতেই পেশায় আইনজীবী এডুইন হাবল সখের বশে তাঁর নিজ নির্মিত টেলিস্কোপ বানিয়ে ছাদেও উপর থেকে মহাকাশে চোখ রাখলেন। এরপর তিনি যা উপস্থাপন করলেন তাতে নিউটন ও আইনস্টাইনের স্থির ব্রহ্মাণ্ডের ভাবনাই পাল্টে গেল। হাবল দেখালেন গ্যালাক্সীগুলো ক্রমশ একে অন্যের থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। এই সরে যাওয়া বা পালানো সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়মে ঘটছে। যে গ্যালাক্সী যতদূরে সেটির পলায়ন বা দৌড়ানোর হারও ততবেশী। আইনস্টাইন অকপটে ভুল স্বীকার করে স্থির মহাবিশ্ব তত্ব থেকে সরে এসে স্বীকার করে নিলেন হাবলের ‘সম্প্রসারণ মহাবিশ্ব তত্ব’ বা বিগ বাউন্স তত্ব।
বিংশ শতকের বিশের দশক ছিল মহাকাশ বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ। আইনস্টাইনের বন্ধু ধর্মযাজক ল্যামেত্রে নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছিলেন পদার্থ ও মহাকাশ বিজ্ঞানী। এক পড়ন্ত বিকেলে দু’জন বাগানে হাঁটছিলেন। ল্যামেত্রে গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, দেখ আইনস্টাইন হাবলের পর্যবেক্ষনে দেখা যাচ্ছে ব্রহ্মাণ্ড অনবরত দুরে থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। উল্টোভাবে চিন্তা করলে ব্রহ্মাণ্ডেরসমস্ত গ্যালাক্সী, তারা গ্রহ, উপগ্রহ নিশ্চয়ই এক সময় কাছাকাছি বা এক সাথে ছিল। বেলজিয়াম এই ধর্মযাজক বিজ্ঞানী আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললেন নিশ্চয়ই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড বহু অতীতে এক বিন্দুতে অকল্পনীয় ঘনত্ব, ভর ও উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীরা বিন্দুকে আখ্যায়িত করেছেন ‘সিঙ্গুলারিটি’ বলে।
ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং তত্ব অনুযায়ী সেকে-ের লক্ষ্যাংশে সিঙ্গুলারিটি বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মহাশূন্যে। এই বিস্ফোরণে নানারূপ গ্যাস, কনা, রাসায়নিক অনু পরমানু যত ছুটেছে ততই ধুলাবালি ঘনীভূত হয়ে কোটি কোটি বছওে সৃষ্টি হয়েছে উল্কাপিন্ড, ধুমকেতু, উপগ্রহ, গ্রহ, তারা, গ্যালাক্সী, লোকাল গ্যালাক্সী, গ্যালাক্সী ক্লাস্টার, সুপার গ্যালাক্সী ক্লাস্টার। হাবল অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাং সংঘঠিত হয়েছিল। ১৩.৮ কোটি বছর ধওে গ্যালাক্সীগুলো দৌড়াচ্ছে অনন্ত সীমানায়। এই অব্যাহত সম্প্রসারণকে বিজ্ঞানীরা অভিহিত করেছেন বিগ বাউন্স বলে।
অতি সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী বলছেন ব্রহ্মাণ্ডে গ্যালাক্সীগুলোর সম্প্রসারণ সম্ভবত; শেষ পর্যায়ে। এবার সংকুচিত হবার পালা। অদূর ভবিষ্যতে লক্ষ কোটি বছর পর হলেও গ্যালাক্সীগুলো উল্টো পথে হাঁটবে। অর্থাৎ গ্যালাক্সীগুলো পিছু হটতে হটতে একটার মধ্যে আরেকটা বিলীন হতে থাকবে। এভাবে গ্যালাক্সীগুলো একটার ভিতর আরেকটা মিলতে মিলতে ফিরে যাবে সেই সিঙ্গুলারিটি বা শুরু বিন্দুতে। বিশাল এই ব্রহ্মা- আবার একত্রিত হবে এক বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটিতে। বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীর মাঝে আশ্রয় নেবে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী। লক্ষ কোটি বছর পরের এই মিলন পর্বের নাম রাখা হয়েছে মিল্কিট্রোমিডা। গ্যালাক্সীগুলো সংকুচিত হওয়ায় এই প্রক্রিয়ার নাম দেয়া হয়েছে বিগ ক্রাঞ্চ। বিগ ক্রাঞ্চ মানে কেয়ামত। বিজ্ঞানের ভাষ্য অনুযায়ী বিগ ক্রাঞ্চ শুরু হতে এখনো লক্ষ কোটি বছর অবশিষ্ট আছে। ক্রাঞ্চ সমাপ্ত হতেও লাগবে লক্ষ কোটি বছর। অর্থাৎ কেয়ামত চলবে লক্ষ কোটি বছর ধরে। অত:পর বিশ্ব ব্রহ্মা- ফিরে যাবে সেই ছোট্ট বিন্দুতে। যার নাম সিঙ্গুলারিটি।
[লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শঙ্কর প্রসাদ দে
সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিগ ব্যাং, বিগ বাউন্স, বিগ ক্রাঞ্চ। মানুষ রাতের আকাশ দেখে অবাক বিষ্ময়ে হাজার হাজার বছর দেখে ভেবে চলেছে, এতো লক্ষ লক্ষ তারা অনিন্দ্য সুন্দর চাঁদ আর দিনের সূর্যের সৃষ্টিকর্তা কে? এগুলো সৃষ্টি হলো কিভাবে? ১৬১০ সালে গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পর মানুষের প্রশ্নের ধরণটাই পাল্টে গেল। গ্যালিলিও শহরের জ্ঞানী গুণিদের ডেকে এনে বললেন মহাকাশ দেখো। ইউরোপ জুড়ে হৈ চৈ পড়ে গেল। রাতের আকাশে মিটি মিটি তারাগুলোর বেশীর ভাগ নক্ষত্র এবং শুধু নক্ষত্রের সংখ্যাই লক্ষ কোটি। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই নক্ষত্রের সংখ্যা কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন।
ষোড়শ শতক থেকে মানুষ ভাবতে শুরু করল সম্ভবত; প্রাকৃতিক কোন কারনে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। ব্রহ্মা-ের সৃষ্টি বিকাশ
চলছে প্রাকৃতিক কিছু নিয়ম নীতির কার্যকারনে। এতো শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের তাত্বিক ভিত্তি কি? তত্ব নিয়ে আর্বিভূত হলেন বৃটিশ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। কোপার্নিকাস আগেই টলেমির পৃথিবী কেন্দ্রিক মডেল মিথ্যা প্রমাণ করে বলে গেছেন পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র কওে ঘুরছে। মানুষের প্রশ্ন ছিল ঘুরার সময় তাহলে মানুষ পড়ে যায় না কেন? আপেল এসে পড়ল তাঁর কোলে। হৈ চৈ করে চিৎকার কওে উঠে বললেন উত্তর পেয়েছি উত্তর পেয়েছি। ভূ-পৃষ্ঠ সবকিছুকে নিজের দিকে অবিরত টানছে। উনি বললেন, ভূ-পৃষ্ঠের এই টানের নাম গ্রাভিটি বা অভিকর্ষ। তাঁর এ সংক্রান্তে অপর বক্তব্য হলো মহাকাশে তারাগুলো পরষ্পর একে অন্যকে টানছে। এই টানের নাম মহাকর্ষ। নক্ষত্র বা তারার সাথে গ্রহ উপগ্রহের টানাটানিতে ভারসাম্য অবস্থায় গ্রহ উপগ্রহ মূল শক্তি তারার চতুর্দিকে ঘুরে। যেমন:- পৃথিবী, মঙ্গল বৃহষ্পতি সহ ৮টি গ্রহ সূর্যেও চারিদিকে ঘুরছে। পৃথিবীর একটি অংশ থেকে চাঁদের সৃষ্টি।
এজন্য পৃথিবীর উপগ্রহ হল চাঁদ। পৃথিবীর মহাকর্ষের সাথে চাঁদের মহাকর্ষের টানাটানিতে প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যতে উপগ্রহ চাঁদ তার গ্রহ পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে। একিভাবে শনির উপগ্রহ ২৭৪টি। সেগুলো শনির চারিদিকে ঘুরছে। বৃহষ্পতির উপগ্রহ ৪টি। সেগুলো বৃহষ্পতির চারিদিকে ঘুরছে। নিউটনের অভিমত ছিল, বাধাগ্রস্থ না করা পর্যন্ত চলন্ত বস্তু চিরকাল চলন্ত বা চলতে থাকবে। স্থির বস্তুতে বলপ্রয়োগ না করলে তা চিরকালই স্থির থাকবে। আইনস্টাইনও নিউটনের মতকে সমর্থন করে তাঁর সূত্রে খামোকা একটি ধ্রুবক (লেমডা) ব্যবহার করেছিলেন। যদিও নিউটনের অভিকর্ষ আর মহাকর্ষ তত্বেও সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললেন গ্রহ উপগ্রহ নিজ শক্তিতে অন্য কাউকে আকর্ষণ করে না। অভিকর্ষ বা মহাকর্ষ হল আসলে মহাকাশের বক্রতা থেকে সৃষ্ট শক্তি। মহাকাশকে চাদর গণ্য করলে যে কোন তারার ভারে সন্নিহিত অঞ্চলে বক্রতার সৃষ্টি হয়। বক্রতা আশেপাশের গ্রহ উপগ্রহকে নিজের দিকে টানে এটিই আসলে মহাকর্ষ। যেমন ১টি চাদরকে ৪ কোণায় ধরে রেখে সেটিতে ১টি বল নিক্ষেপ করলে চাদরটি নীচের দিকে মাঝ বরাবর ডেবে যাবে। ঐ বাঁকা চাদরে যদি ১টি মার্বেল ছেড়ে দেয়া হয় তবে মার্বেলটি বক্রতা বরাবর ঘুরতে থাকবে। মহাকাশে সূর্য এরকম দেবে আছে। ফলে সূর্যের বক্রতা অনুযায়ী পৃথিবী সহ সব গ্রহ উপগ্রহ সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে। ১৯১৫ সালে জেনারেল রিয়েলেটিভিটির এই বক্রতার তথ্য মহাকাশ বিজ্ঞানের সর্বগ্রহণযোগ্য তত্ব। মহাকাশের সমস্ত গ্রহ উপগ্রহ ‘নিজ কক্ষপথে স্থির’ নিউটন ও আইনস্টাইনের এই বক্তব্য ভাংতে বেশী দিন লাগেনি।
আইনস্টাইনের জীবদ্দশাতেই পেশায় আইনজীবী এডুইন হাবল সখের বশে তাঁর নিজ নির্মিত টেলিস্কোপ বানিয়ে ছাদেও উপর থেকে মহাকাশে চোখ রাখলেন। এরপর তিনি যা উপস্থাপন করলেন তাতে নিউটন ও আইনস্টাইনের স্থির ব্রহ্মাণ্ডের ভাবনাই পাল্টে গেল। হাবল দেখালেন গ্যালাক্সীগুলো ক্রমশ একে অন্যের থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। এই সরে যাওয়া বা পালানো সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়মে ঘটছে। যে গ্যালাক্সী যতদূরে সেটির পলায়ন বা দৌড়ানোর হারও ততবেশী। আইনস্টাইন অকপটে ভুল স্বীকার করে স্থির মহাবিশ্ব তত্ব থেকে সরে এসে স্বীকার করে নিলেন হাবলের ‘সম্প্রসারণ মহাবিশ্ব তত্ব’ বা বিগ বাউন্স তত্ব।
বিংশ শতকের বিশের দশক ছিল মহাকাশ বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ। আইনস্টাইনের বন্ধু ধর্মযাজক ল্যামেত্রে নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছিলেন পদার্থ ও মহাকাশ বিজ্ঞানী। এক পড়ন্ত বিকেলে দু’জন বাগানে হাঁটছিলেন। ল্যামেত্রে গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, দেখ আইনস্টাইন হাবলের পর্যবেক্ষনে দেখা যাচ্ছে ব্রহ্মাণ্ড অনবরত দুরে থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। উল্টোভাবে চিন্তা করলে ব্রহ্মাণ্ডেরসমস্ত গ্যালাক্সী, তারা গ্রহ, উপগ্রহ নিশ্চয়ই এক সময় কাছাকাছি বা এক সাথে ছিল। বেলজিয়াম এই ধর্মযাজক বিজ্ঞানী আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললেন নিশ্চয়ই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড বহু অতীতে এক বিন্দুতে অকল্পনীয় ঘনত্ব, ভর ও উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীরা বিন্দুকে আখ্যায়িত করেছেন ‘সিঙ্গুলারিটি’ বলে।
ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং তত্ব অনুযায়ী সেকে-ের লক্ষ্যাংশে সিঙ্গুলারিটি বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মহাশূন্যে। এই বিস্ফোরণে নানারূপ গ্যাস, কনা, রাসায়নিক অনু পরমানু যত ছুটেছে ততই ধুলাবালি ঘনীভূত হয়ে কোটি কোটি বছওে সৃষ্টি হয়েছে উল্কাপিন্ড, ধুমকেতু, উপগ্রহ, গ্রহ, তারা, গ্যালাক্সী, লোকাল গ্যালাক্সী, গ্যালাক্সী ক্লাস্টার, সুপার গ্যালাক্সী ক্লাস্টার। হাবল অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাং সংঘঠিত হয়েছিল। ১৩.৮ কোটি বছর ধওে গ্যালাক্সীগুলো দৌড়াচ্ছে অনন্ত সীমানায়। এই অব্যাহত সম্প্রসারণকে বিজ্ঞানীরা অভিহিত করেছেন বিগ বাউন্স বলে।
অতি সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী বলছেন ব্রহ্মাণ্ডে গ্যালাক্সীগুলোর সম্প্রসারণ সম্ভবত; শেষ পর্যায়ে। এবার সংকুচিত হবার পালা। অদূর ভবিষ্যতে লক্ষ কোটি বছর পর হলেও গ্যালাক্সীগুলো উল্টো পথে হাঁটবে। অর্থাৎ গ্যালাক্সীগুলো পিছু হটতে হটতে একটার মধ্যে আরেকটা বিলীন হতে থাকবে। এভাবে গ্যালাক্সীগুলো একটার ভিতর আরেকটা মিলতে মিলতে ফিরে যাবে সেই সিঙ্গুলারিটি বা শুরু বিন্দুতে। বিশাল এই ব্রহ্মা- আবার একত্রিত হবে এক বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটিতে। বহুদিন ধরে বলা হচ্ছে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীর মাঝে আশ্রয় নেবে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী। লক্ষ কোটি বছর পরের এই মিলন পর্বের নাম রাখা হয়েছে মিল্কিট্রোমিডা। গ্যালাক্সীগুলো সংকুচিত হওয়ায় এই প্রক্রিয়ার নাম দেয়া হয়েছে বিগ ক্রাঞ্চ। বিগ ক্রাঞ্চ মানে কেয়ামত। বিজ্ঞানের ভাষ্য অনুযায়ী বিগ ক্রাঞ্চ শুরু হতে এখনো লক্ষ কোটি বছর অবশিষ্ট আছে। ক্রাঞ্চ সমাপ্ত হতেও লাগবে লক্ষ কোটি বছর। অর্থাৎ কেয়ামত চলবে লক্ষ কোটি বছর ধরে। অত:পর বিশ্ব ব্রহ্মা- ফিরে যাবে সেই ছোট্ট বিন্দুতে। যার নাম সিঙ্গুলারিটি।
[লেখক: আইনজীবী, আপিল বিভাগ]