শেখর ভট্টাচার্য

“আপনি যে ভাষায় আমাকে আক্রমণ করছেন, এটি বস্তির ভাষা।” টকশোতে এরকম কথা হরহামেশা শোনা যাচ্ছে। শ্রোতা, দর্শক, রাজনীতিবিদ সমাজ-বিজ্ঞানী, সুশীল সমাজের সদস্যরা এরকম বাক্য কিংবা শব্দাবলিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছেন বলে সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন। “বস্তির ভাষা” কিংবা “লোকটি কিছুদিন আগেও ফকির কিংবা ফকিরের সন্তান ছিল, এখন ফুলে ফেঁপে কলাগাছ।” ফকিরের সন্তানকে যে শব্দবন্ধ দিয়ে প্রকাশ করা হয় তা’ লিখতে আমার রুচিতে বাঁধে। যারা এসব বলছেন, তাদের কথা লক্ষ-কোটি মানুষ টিভিতে দর্শক হিসেবে উপভোগ(!) করছেন।
গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্ন মতের প্রকাশ নানাভাবে হতে পারে। সমালোচনার ভাষা যখন বহমান সংস্কৃতিকে নিম্নগামী করতে সহায়তা করে, সেই নিম্নমানের ভাষা রাজনীতি এবং সমাজের খুব যে উপকারে আসে না এ কথটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। টকশোতে যারা কথা বলেন কিংবা যারা মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক দলের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বেড়ান তাদের দেহভঙ্গি, বক্তব্য জনমত তৈরি করে নানাভাবে। তাদের বক্তব্যে সমাজ এবং রাজনীতির প্রতি দায় যদি না থাকে তাহলে আমাদের হতাশ হতে হয়। যারা মানুষের অর্থনৈতিক শ্রেণী কিংবা সামাজিক শ্রেণীর স্বাভাবিক ভাষাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে অশ্লীল বাক্যের ব্যবহার করেন তারা যত বড় পণ্ডিতই হন না কেন, তাদের পরামর্শে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কিংবা রাজনীতি যে এগিয়ে যাবে না এ কথা প্রথাগত পদ্ধতিতে গবেষণা না করেই বলা যায়।
আশ্চর্যের বিষয় এসব বিজ্ঞজনেরাই(!) ক্রমাগত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন। যে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কিংবা রাজনীতি নিয়ে তারা কথা বলে যাচ্ছেন, সে সমাজে কি বস্তির মানুষ অন্তর্ভুক্ত নয়, কিংবা ফকিরের সন্তানরা কি নাগরিক সমাজের সদস্যভুক্ত নন। জানি না। আসন্ন নির্বাচনে যারা ভোট দিতে যাবেন, তারা কি সবাই প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বাংলার মাটি, জল ধুলোবালি মাখা ভাষায় যারা কথা বলেন নাগরিক হিসেবে তাদের সম্মানজনকভাবে অন্তর্ভুক্তিকে কি আমার অন্তর থেকে মেনে নিতে কিংবা মনে নিতে পারি না। কোন রাজনীতিবিদের পিতা যদি আর্থিকভাবে দরিদ্র শ্রেণীতে অবস্থান করেন, তাকে বা তাদেরকে ফকিরের সন্তান বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কি শিক্ষিত, সমাজ সচেতন, সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ কিংবা সুশীল সমাজের সদস্যরা স্বাভাবিক বিবেচনা করতে পারেন। তাদের বক্তব্যে যে রুচি বোধের প্রকাশ ঘটে তা কি বহমান সামাজিক, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরণ ঘটাতে সহায়তা করে। এসব প্রশ্নের উত্তর আজকাল কেউ খুঁজে বেড়ান বলে মনে হয় না, মনে হয় সবাই স্বেচ্ছায় অহেতুক ঝামেলা এড়িয়ে গিয়ে নিরাপদে অবস্থান করতে চান।
মূল কথায় ফিরে আসি। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতি কীভাবে গড়ে ওঠে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গড়তে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ। সমাজে যদি পেশা, গোত্র , ধর্ম, বর্ণ, আর্থিক শ্রেণীনির্বিশেষে সবার সম্মানজনক অন্তর্ভুক্তি না ঘটে তাহলে রাজনীতি কোন অবস্থাতেই অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না। রাজনীতি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয় তাহলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অসম্ভব বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করে থাকেন। সমাজ, রাজনীতি/গণতন্ত্র, নির্বাচন প্রতিটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে অভিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। যে কোন একটি উপাদানে যদি অন্তর্ভুক্তির অসমতা, অসামঞ্জস্যতা থাকে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি অকার্যকর হতে বাধ্য।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে “দৃষ্টিভঙ্গিকে” খুব জরুরি বিষয় বলে মনে করা হয়। নিরবচ্ছিন্ন উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার চর্চা এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় পরস্পরের প্রতি সম্মান বোধ, ভালোবাসা, মর্যাদাবোধের অনুভূতি থেকে। এক্ষেত্রে দুটি প্রশ্নের উত্তর জানা খুব প্রয়োজন। প্রথম প্রশ্নটি হলো, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সমদৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ কী একটি সমাজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, নাগরিক সমাজে কি মূল্যবোধের বিষয় কিংবা উপাদান কৃত্রিমভাবে আরোপ করা যায়। দুটি প্রশ্নের উত্তর হলো, অন্তর্ভুক্তির সামগ্রিক বিষয় হলো একটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন কার্যকর থাকলে মূল্যবোধের অন্তর্গত বিষয় নাগরিক সমাজ ধীরে ধীরে তাদের আচরণের সংস্কৃতিতে ধারণ করতে পারে। নাগরিক সমাজের ভেতর পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন আচরণের সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে সমাজের আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা উচ্চ রুচি এবং মানসম্পন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে সহায়তা করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতি গড়ে ওঠার জন্য সমাজের সুস্পষ্ট প্রত্যয় প্রয়োজন। যে প্রত্যয়ে সামাজিক এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমতার এবং সমদৃষ্টির সমাজ গড়ার নিবেদন দৃঢ়ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমদৃষ্টির সমাজ গড়তে হলে আচরণের সংস্কৃতিতে অন্য মানুষের প্রতি বিশেষ করে প্রান্তিক, এবং সমাজে অন্তর্ভুক্ত নয় তাদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা , নিবেদন প্রকাশিত হতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধ্যান, ধারণায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সব সময়ই কার্যকর ছিল। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে সরাসরি কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ না করলেও রাজনৈতিক দল গুলোর গঠণতন্ত্র, ইস্তেহারে অন্তর্ভুক্তিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা করা হয়েছে সকল সময়। ধরণাটিকে বাস্তবে দৃশ্যমান করার জন্য ভব্যতা, সভ্যতা, সৌজন্যের অভাব দেখা যায়নি কোন কালে। আমরা যারা ষাটের দশকে জন্ম নিয়েছি তারা অনেকেই মওলানা ভাসানী, শেখমুজিবুর রহমান, কমরেড মণিসিং, মোজাফফর আহম্মদ, অলি আহাদসহ অনেক কালজয়ী, জননেতার বক্তব্য সরাসরি শোনার সৌভাগ্য লাভ করেছি। এছাড়া সংবাদপত্র, রেডিও টেলিভিশনের পর্দায় তাদের বক্তব্য, বিবৃতি পড়ার এবং শোনার সুযোগ হয়েছে। রাজনীতির মাঠে আমাদের প্রবাদপ্রতিম নেতাদের মুখে কখনো অশ্লীল, অভব্য কথা কেউ শোনেনি। তাদের কণ্ঠে সমাজ ও রাজনীতিতে প্রান্তিক মানুষের অন্তর্ভুক্তির কথা শুনেছি নানাভাবে। মওলানা ভাসানীকে তো বলাই হতো মজলুম জননেতা। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের দুঃখ, দুর্দশায় আমাদের প্রবাদপ্রতিম জাতীয় নেতারা সবার আগে এগিয়ে আসতেন। অকৃত্রিম ভাষা, অতিসাধারণ পোশাক, মানুষের প্রতি নিবেদন ছিল তাদের রাজনৈতিক চরিত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
মওলানা ভাসানী মাঝে মাঝে নদীতে নৌকায় অবস্থান করতেন। অনেক নেতাই তার সঙ্গে দেখা করতে ভাসানীর যে ঘাটে নৌকা ভেড়াতেন, সে ঘাটে গিয়ে তার সঙ্গে মতবিনিময় করতেন। এসব মহান জাতীয় নেতারা সব মানুষের কাছে অনুসরণীয়। এই যে সৌজন্য, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মানুষের প্রতি গভীর নিবেদন আমাদের মহান নেতারা তৈরি করে গেছেন। জাতীয় নেতারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে গেছেন যেখানে সমাজের সব সদস্য, তাদের যোগ্যতা, পটভূমি, ক্ষমতা, অক্ষমতা নির্বিশেষে, নিজেকে মূল্যবান, সম্মানিত বোধ করে এবং মূলধারার সুযোগ-সুবিধা ও প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। জাতীয় তাদের সূচিত পথে আমরা কেনো এগিয়ে যেতে পারলাম না সে আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ তবে তা ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন সময় করা যেতে পারে।
তবে এ কথা সত্য যে আমরা সমতা, সমদৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে উল্লেখ করার মতো সফলতা পাইনি। প্রান্তিক, চরম দারিদ্র পীড়িত, সমাজের ছোট-বড় পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে বৈচিত্র?্যপূর্ণ সমাজ গঠনে এগিয়ে না গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। সমাজে সব মানুষের অন্তর্ভুক্তির পূর্বে আমরা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং নির্বাচনের প্রত্যাশা করি সেটি সেই পুরনো কথা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার মতো বিষয় হবে। নাগরিক সমাজের সব সদস্যদের নিয়ে আমরা যদি একটি সমদৃষ্টির মানবিক সমাজ গড়তে চাই তাহলে সামজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য নিবেদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ কাজে ব্যর্থ হলে এর দায় নিতে হবে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজসহ নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত সব মানুষকে। মনে রাখতে হবে, আমরা একটি গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছি। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলসমূহের নিবেদিত উদ্যোগই পারে, এই গোলক ধাঁধা থেকে বের করে সমদৃষ্টির সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শেখর ভট্টাচার্য

বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
“আপনি যে ভাষায় আমাকে আক্রমণ করছেন, এটি বস্তির ভাষা।” টকশোতে এরকম কথা হরহামেশা শোনা যাচ্ছে। শ্রোতা, দর্শক, রাজনীতিবিদ সমাজ-বিজ্ঞানী, সুশীল সমাজের সদস্যরা এরকম বাক্য কিংবা শব্দাবলিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছেন বলে সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন। “বস্তির ভাষা” কিংবা “লোকটি কিছুদিন আগেও ফকির কিংবা ফকিরের সন্তান ছিল, এখন ফুলে ফেঁপে কলাগাছ।” ফকিরের সন্তানকে যে শব্দবন্ধ দিয়ে প্রকাশ করা হয় তা’ লিখতে আমার রুচিতে বাঁধে। যারা এসব বলছেন, তাদের কথা লক্ষ-কোটি মানুষ টিভিতে দর্শক হিসেবে উপভোগ(!) করছেন।
গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্ন মতের প্রকাশ নানাভাবে হতে পারে। সমালোচনার ভাষা যখন বহমান সংস্কৃতিকে নিম্নগামী করতে সহায়তা করে, সেই নিম্নমানের ভাষা রাজনীতি এবং সমাজের খুব যে উপকারে আসে না এ কথটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। টকশোতে যারা কথা বলেন কিংবা যারা মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক দলের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বেড়ান তাদের দেহভঙ্গি, বক্তব্য জনমত তৈরি করে নানাভাবে। তাদের বক্তব্যে সমাজ এবং রাজনীতির প্রতি দায় যদি না থাকে তাহলে আমাদের হতাশ হতে হয়। যারা মানুষের অর্থনৈতিক শ্রেণী কিংবা সামাজিক শ্রেণীর স্বাভাবিক ভাষাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতে অশ্লীল বাক্যের ব্যবহার করেন তারা যত বড় পণ্ডিতই হন না কেন, তাদের পরামর্শে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কিংবা রাজনীতি যে এগিয়ে যাবে না এ কথা প্রথাগত পদ্ধতিতে গবেষণা না করেই বলা যায়।
আশ্চর্যের বিষয় এসব বিজ্ঞজনেরাই(!) ক্রমাগত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন। যে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ কিংবা রাজনীতি নিয়ে তারা কথা বলে যাচ্ছেন, সে সমাজে কি বস্তির মানুষ অন্তর্ভুক্ত নয়, কিংবা ফকিরের সন্তানরা কি নাগরিক সমাজের সদস্যভুক্ত নন। জানি না। আসন্ন নির্বাচনে যারা ভোট দিতে যাবেন, তারা কি সবাই প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বাংলার মাটি, জল ধুলোবালি মাখা ভাষায় যারা কথা বলেন নাগরিক হিসেবে তাদের সম্মানজনকভাবে অন্তর্ভুক্তিকে কি আমার অন্তর থেকে মেনে নিতে কিংবা মনে নিতে পারি না। কোন রাজনীতিবিদের পিতা যদি আর্থিকভাবে দরিদ্র শ্রেণীতে অবস্থান করেন, তাকে বা তাদেরকে ফকিরের সন্তান বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কি শিক্ষিত, সমাজ সচেতন, সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ কিংবা সুশীল সমাজের সদস্যরা স্বাভাবিক বিবেচনা করতে পারেন। তাদের বক্তব্যে যে রুচি বোধের প্রকাশ ঘটে তা কি বহমান সামাজিক, রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরণ ঘটাতে সহায়তা করে। এসব প্রশ্নের উত্তর আজকাল কেউ খুঁজে বেড়ান বলে মনে হয় না, মনে হয় সবাই স্বেচ্ছায় অহেতুক ঝামেলা এড়িয়ে গিয়ে নিরাপদে অবস্থান করতে চান।
মূল কথায় ফিরে আসি। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতি কীভাবে গড়ে ওঠে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গড়তে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ। সমাজে যদি পেশা, গোত্র , ধর্ম, বর্ণ, আর্থিক শ্রেণীনির্বিশেষে সবার সম্মানজনক অন্তর্ভুক্তি না ঘটে তাহলে রাজনীতি কোন অবস্থাতেই অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না। রাজনীতি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয় তাহলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অসম্ভব বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করে থাকেন। সমাজ, রাজনীতি/গণতন্ত্র, নির্বাচন প্রতিটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে অভিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। যে কোন একটি উপাদানে যদি অন্তর্ভুক্তির অসমতা, অসামঞ্জস্যতা থাকে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি অকার্যকর হতে বাধ্য।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে “দৃষ্টিভঙ্গিকে” খুব জরুরি বিষয় বলে মনে করা হয়। নিরবচ্ছিন্ন উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার চর্চা এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় পরস্পরের প্রতি সম্মান বোধ, ভালোবাসা, মর্যাদাবোধের অনুভূতি থেকে। এক্ষেত্রে দুটি প্রশ্নের উত্তর জানা খুব প্রয়োজন। প্রথম প্রশ্নটি হলো, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সমদৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ কী একটি সমাজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, নাগরিক সমাজে কি মূল্যবোধের বিষয় কিংবা উপাদান কৃত্রিমভাবে আরোপ করা যায়। দুটি প্রশ্নের উত্তর হলো, অন্তর্ভুক্তির সামগ্রিক বিষয় হলো একটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন কার্যকর থাকলে মূল্যবোধের অন্তর্গত বিষয় নাগরিক সমাজ ধীরে ধীরে তাদের আচরণের সংস্কৃতিতে ধারণ করতে পারে। নাগরিক সমাজের ভেতর পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন আচরণের সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে সমাজের আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা উচ্চ রুচি এবং মানসম্পন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে সহায়তা করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতি গড়ে ওঠার জন্য সমাজের সুস্পষ্ট প্রত্যয় প্রয়োজন। যে প্রত্যয়ে সামাজিক এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সমতার এবং সমদৃষ্টির সমাজ গড়ার নিবেদন দৃঢ়ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমদৃষ্টির সমাজ গড়তে হলে আচরণের সংস্কৃতিতে অন্য মানুষের প্রতি বিশেষ করে প্রান্তিক, এবং সমাজে অন্তর্ভুক্ত নয় তাদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা , নিবেদন প্রকাশিত হতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধ্যান, ধারণায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সব সময়ই কার্যকর ছিল। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে সরাসরি কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ না করলেও রাজনৈতিক দল গুলোর গঠণতন্ত্র, ইস্তেহারে অন্তর্ভুক্তিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা করা হয়েছে সকল সময়। ধরণাটিকে বাস্তবে দৃশ্যমান করার জন্য ভব্যতা, সভ্যতা, সৌজন্যের অভাব দেখা যায়নি কোন কালে। আমরা যারা ষাটের দশকে জন্ম নিয়েছি তারা অনেকেই মওলানা ভাসানী, শেখমুজিবুর রহমান, কমরেড মণিসিং, মোজাফফর আহম্মদ, অলি আহাদসহ অনেক কালজয়ী, জননেতার বক্তব্য সরাসরি শোনার সৌভাগ্য লাভ করেছি। এছাড়া সংবাদপত্র, রেডিও টেলিভিশনের পর্দায় তাদের বক্তব্য, বিবৃতি পড়ার এবং শোনার সুযোগ হয়েছে। রাজনীতির মাঠে আমাদের প্রবাদপ্রতিম নেতাদের মুখে কখনো অশ্লীল, অভব্য কথা কেউ শোনেনি। তাদের কণ্ঠে সমাজ ও রাজনীতিতে প্রান্তিক মানুষের অন্তর্ভুক্তির কথা শুনেছি নানাভাবে। মওলানা ভাসানীকে তো বলাই হতো মজলুম জননেতা। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের দুঃখ, দুর্দশায় আমাদের প্রবাদপ্রতিম জাতীয় নেতারা সবার আগে এগিয়ে আসতেন। অকৃত্রিম ভাষা, অতিসাধারণ পোশাক, মানুষের প্রতি নিবেদন ছিল তাদের রাজনৈতিক চরিত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
মওলানা ভাসানী মাঝে মাঝে নদীতে নৌকায় অবস্থান করতেন। অনেক নেতাই তার সঙ্গে দেখা করতে ভাসানীর যে ঘাটে নৌকা ভেড়াতেন, সে ঘাটে গিয়ে তার সঙ্গে মতবিনিময় করতেন। এসব মহান জাতীয় নেতারা সব মানুষের কাছে অনুসরণীয়। এই যে সৌজন্য, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মানুষের প্রতি গভীর নিবেদন আমাদের মহান নেতারা তৈরি করে গেছেন। জাতীয় নেতারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে গেছেন যেখানে সমাজের সব সদস্য, তাদের যোগ্যতা, পটভূমি, ক্ষমতা, অক্ষমতা নির্বিশেষে, নিজেকে মূল্যবান, সম্মানিত বোধ করে এবং মূলধারার সুযোগ-সুবিধা ও প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। জাতীয় তাদের সূচিত পথে আমরা কেনো এগিয়ে যেতে পারলাম না সে আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ তবে তা ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন সময় করা যেতে পারে।
তবে এ কথা সত্য যে আমরা সমতা, সমদৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে উল্লেখ করার মতো সফলতা পাইনি। প্রান্তিক, চরম দারিদ্র পীড়িত, সমাজের ছোট-বড় পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে বৈচিত্র?্যপূর্ণ সমাজ গঠনে এগিয়ে না গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। সমাজে সব মানুষের অন্তর্ভুক্তির পূর্বে আমরা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি এবং নির্বাচনের প্রত্যাশা করি সেটি সেই পুরনো কথা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার মতো বিষয় হবে। নাগরিক সমাজের সব সদস্যদের নিয়ে আমরা যদি একটি সমদৃষ্টির মানবিক সমাজ গড়তে চাই তাহলে সামজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য নিবেদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ কাজে ব্যর্থ হলে এর দায় নিতে হবে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজসহ নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত সব মানুষকে। মনে রাখতে হবে, আমরা একটি গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছি। নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলসমূহের নিবেদিত উদ্যোগই পারে, এই গোলক ধাঁধা থেকে বের করে সমদৃষ্টির সমাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]