এম এ হোসাইন
আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন পাহাড়ের কিনারায় থেমে যাওয়া একটি গাড়ির ইঞ্জিন। শব্দ করছে, অতিরিক্ত গরম হচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোনোর কোনো লক্ষণ নেই। আরও উদ্বেগজনক হলো-চালকের আসনে বসে থাকা কেউ যেন বুঝতেই পারছে না কোন লিভার টানতে হবে।
আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন পাহাড়ের কিনারায় থেমে যাওয়া একটি গাড়ির ইঞ্জিন। শব্দ করছে, অতিরিক্ত গরম হচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোনোর কোনো লক্ষণ নেই। আরও উদ্বেগজনক হলো-চালকের আসনে বসে থাকা কেউ যেন বুঝতেই পারছে না কোন লিভার টানতে হবে। এটি কোনো পক্ষপাতমূলক কটাক্ষ নয়, বরং একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদ, থিঙ্কট্যাঙ্ক বা চকচকে প্রতিবেদন পড়ার দরকার নেই। একটি রান্নাঘরে ঢুকলেই, কোনো কারখানার গেটে দাঁড়ালেই, কিংবা ভিড়ঠাসা বাসে উঠলেই এই বাস্তবতা টের পাওয়া যায়
এটি কোনো পক্ষপাতমূলক কটাক্ষ নয়, বরং একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদ, থিঙ্কট্যাঙ্ক বা চকচকে প্রতিবেদন পড়ার দরকার নেই। একটি রান্নাঘরে ঢুকলেই, কোনো কারখানার গেটে দাঁড়ালেই, কিংবা ভিড়ঠাসা বাসে উঠলেই এই বাস্তবতা টের পাওয়া যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে, যা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দীর্ঘ বছরগুলোতে লুণ্ঠন, পুঁজি পাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে-এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয়টি সমানভাবে অস্বস্তিকর এবং অনস্বীকারর্য, তা হলো-এই অর্থনীতি প্রায় সেখানেই পড়ে আছে, যেখানে ফেলে যাওয়া হয়েছিল: ভঙ্গুর, দিশাহীন এবং ক্রমশই অবনতিশীল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় রূপ নেবে বলে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ পায়নি। এমনকি তার ধারেকাছেও হয়নি।
হাসিনার পতনের পর আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। ১৯৮৯-এর পর পূর্ব ইউরোপ, সুহার্তোর পতনের পর ইন্দোনেশিয়া, বেন আলির পর তিউনিসিয়া-সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ভাঙন এমন এক বিভ্রম তৈরি করেছিল যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যেন আপনাআপনিই চলে আসবে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী শাসকরাও বোধহয় তাই ভেবেছিলেন। তারা ধরে নিয়েছিলেন, সদিচ্ছাই নীতির বিকল্প হতে পারে, আর নৈতিক বৈধতাই পুঁজি টানার জন্য যথেষ্ট। বাস্তবতা তা প্রমাণ করেনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ এবং ধনী দাতা রাষ্ট্রগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস দিয়েছিল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিপুল ব্যয় করে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে, ৫০টি দেশের বিনিয়োগকারী উড়িয়ে এনে জোরগলায় ঘোষণা দেয়-৩২০ মিলিয়ন ডলারের তাৎক্ষণিক অঙ্গীকার এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বড়োই হতাশাজনক। সেই অর্থ আর আসেনি। প্রতিশ্রুতি বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। পুঁজি প্রথমে সতর্ক থেকেছে, পরে একেবারেই অনুপস্থিত।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসও বিভিন্ন রাজধানী ও কর্পোরেট বোর্ডরুম ঘুরে বিনিয়োগকারীদের অনুরোধ করেছেন-“বাংলাদেশকে একটি সুযোগ দিন।” তিনি ফিরেছেন করতালির সৌজন্য নিয়ে, বাস্তব ফল নিয়ে নয়। বিনিয়োগকারীরা বক্তৃতায় নড়েন না; তারা নড়েন সংকেতে। আর বাংলাদেশ এখন ভুল সংকেতই পাঠাচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সম্প্রতি সরাসরি বলেছে-অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দেশটি মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়ার বাস্তব ঝুঁকিতেÑনিম্ন মজুরির অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য খুব ব্যয়বহুল, আবার উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ টানার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব দুর্বল। এটি কোনো মতাদর্শিক বক্তব্য নয়; এটি নিখাদ অঙ্ক।
তবে পরিসংখ্যান শুধু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকেই নিশ্চিত করে। দাম বাড়ছে, আয় কমছে, আর চাকরি উধাও হচ্ছে। শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে। বেকারত্ব বাড়ছে নিঃশব্দে কিন্তু নিরলসভাবে। আমদানি-রপ্তানি স্থবির। বিদেশি ঋণ ও সহায়তার প্রবাহ দিন দিন কমে আসছে। এমনকি সরকার নিজেই মৌলিক আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।
গ্যাস সংকট এই ব্যর্থতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শিল্প উৎপাদন (বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদ-) গ্যাসের অভাবে বিপর্যস্ত। অথচ এই সংকট যুক্তিসংগত নয়। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ বর্তমানে অলস পড়ে আছে। চাহিদাই নেই এমন মাত্রায় যে এ ধরনের ঘাটতি যৌক্তিক হবে। এখানে আছে কেবল অপব্যবস্থাপনা-সরবরাহে, বিতরণে, অগ্রাধিকারে। এটি নিয়তি নয়; বরং ব্যর্থতা।
শেয়ারবাজারও একই গল্প বলে। আওয়ামী লীগ আমলের কুখ্যাত সুবিধাভোগীরা হয়তো নেই, কিন্তু বাজার এখনো মৃতপ্রায়। পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে ঘুরে যায়নি। তাহলে টাকা যাচ্ছে কোথায়? কেউই যেন বলতে পারছে না বা বলতে চাচ্ছে না। যে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তা কি এসেছে? যদি এসে থাকে তবে তা দৃশ্যমান নয়।
তারপর আছে পাচার হওয়া অর্থের প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার শুরুতেই নাটকীয় ঘোষণা দিয়েছিল-হাসিনা আমলে বিদেশে পাচার হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা উদ্ধার করা হবে। আজ পর্যন্ত একটি টাকাও ফেরত আসেনি। যদিও প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তা সরকারের দক্ষতায় নয়। বেড়েছে কারণ লাখো প্রবাসী শ্রমিক বাধ্যবাধকতা থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন, আশাবাদ থেকে নয়।
সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আঠারো মাস কোনো ছোট সময় নয়, বিশেষ করে একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যেখানে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য দরকার গতি-দৃঢ় পরিকল্পনা, বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। এর বদলে আমরা দেখেছি দোদুল্যমানতা। অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক সূচকগুলোও স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতের পথনকশা আঁকা তো দূরের কথা।
কিছু পর্যবেক্ষক এখন আরও অন্ধকার সন্দেহ প্রকাশ করছেন-সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা নাকি কৌশলগত। অর্থনীতি ভেঙে রেখে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা-যাতে অস্থিরতা, জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক দুর্বলতা অনিবার্য হয়। এটি সত্য হোক বা না হোক, এমন ধারণাই ক্ষতিকর। আর রাজনীতি, আমরা জানি, অনেক সময় ধারণার উপরই চলে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো কারিগরি বিলাসিতা নয়। এটি সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি। জীবিকা ভেঙে পড়লে ক্ষোভ জমে, অপরাধ বাড়ে, চরমপন্থা অক্সিজেন পায়। এই দৃশ্যপট আমরা আগেও দেখেছি। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পতনের আগে ছিল অর্থনৈতিক ধস। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার শিকড়ও অর্থনৈতিক শ্বাসরোধে, শুধু রাজনৈতিক দমন-পীড়নে নয়। দুই ক্ষেত্রেই সার্বভৌমত্ব শেষ পর্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল।
বাংলাদেশ এ থেকে মুক্ত নয়। বাস্তবিক অর্থে, তারা ইতোমধ্যে এই কাহিনীর একটি সংস্করণকে প্রত্যক্ষ করেছে। শেখ হাসিনার পতন শুধু গণতন্ত্রের দাবিতে হয়নি। এটি ঘটেছিল দুর্নীতিতে জর্জরিত এক অর্থনীতির কারণে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও বৈষম্য জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল। অর্থনীতি ব্যর্থ হলে রাজনীতিও ভেঙে পড়ে এবং তা ঘটে সহিংসভাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে এখন মাত্র এক মাস আছে। এই সময়ে অর্থনীতি উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি অর্থবহ কাজ এখনো করা যায়- পুনরুদ্ধারের জন্য রেখে যাওয়া যায় একটি সুসংহত ও দিকনির্দেশনামূলক কাঠামো, স্পষ্ট অগ্রাধিকার তালিকা এবং বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ। বিনিয়োগকারী, নাগরিক এবং পরবর্তী সরকারের প্রতি একটি আগাম সংকেত যা হলো বাংলাদেশ তার সংকটের গভীরতা বোঝে এবং সৎভাবে তা মোকাবিলা করতে চায়। এর চেয়ে কম কিছু হলে তা শুধু অদক্ষতা নয়, তা হবে অবহেলা। আর ইতিহাস সাধারণত এই দুইয়ের পার্থক্য খুব একটা করে না।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
এম এ হোসাইন
বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন পাহাড়ের কিনারায় থেমে যাওয়া একটি গাড়ির ইঞ্জিন। শব্দ করছে, অতিরিক্ত গরম হচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোনোর কোনো লক্ষণ নেই। আরও উদ্বেগজনক হলো-চালকের আসনে বসে থাকা কেউ যেন বুঝতেই পারছে না কোন লিভার টানতে হবে।
আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি যেন পাহাড়ের কিনারায় থেমে যাওয়া একটি গাড়ির ইঞ্জিন। শব্দ করছে, অতিরিক্ত গরম হচ্ছে, কিন্তু সামনে এগোনোর কোনো লক্ষণ নেই। আরও উদ্বেগজনক হলো-চালকের আসনে বসে থাকা কেউ যেন বুঝতেই পারছে না কোন লিভার টানতে হবে। এটি কোনো পক্ষপাতমূলক কটাক্ষ নয়, বরং একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদ, থিঙ্কট্যাঙ্ক বা চকচকে প্রতিবেদন পড়ার দরকার নেই। একটি রান্নাঘরে ঢুকলেই, কোনো কারখানার গেটে দাঁড়ালেই, কিংবা ভিড়ঠাসা বাসে উঠলেই এই বাস্তবতা টের পাওয়া যায়
এটি কোনো পক্ষপাতমূলক কটাক্ষ নয়, বরং একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। অর্থনীতিবিদ, থিঙ্কট্যাঙ্ক বা চকচকে প্রতিবেদন পড়ার দরকার নেই। একটি রান্নাঘরে ঢুকলেই, কোনো কারখানার গেটে দাঁড়ালেই, কিংবা ভিড়ঠাসা বাসে উঠলেই এই বাস্তবতা টের পাওয়া যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার এমন এক অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে, যা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দীর্ঘ বছরগুলোতে লুণ্ঠন, পুঁজি পাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে-এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয়টি সমানভাবে অস্বস্তিকর এবং অনস্বীকারর্য, তা হলো-এই অর্থনীতি প্রায় সেখানেই পড়ে আছে, যেখানে ফেলে যাওয়া হয়েছিল: ভঙ্গুর, দিশাহীন এবং ক্রমশই অবনতিশীল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় রূপ নেবে বলে যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ পায়নি। এমনকি তার ধারেকাছেও হয়নি।
হাসিনার পতনের পর আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। ১৯৮৯-এর পর পূর্ব ইউরোপ, সুহার্তোর পতনের পর ইন্দোনেশিয়া, বেন আলির পর তিউনিসিয়া-সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ভাঙন এমন এক বিভ্রম তৈরি করেছিল যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যেন আপনাআপনিই চলে আসবে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী শাসকরাও বোধহয় তাই ভেবেছিলেন। তারা ধরে নিয়েছিলেন, সদিচ্ছাই নীতির বিকল্প হতে পারে, আর নৈতিক বৈধতাই পুঁজি টানার জন্য যথেষ্ট। বাস্তবতা তা প্রমাণ করেনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ এবং ধনী দাতা রাষ্ট্রগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস দিয়েছিল। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিপুল ব্যয় করে ২০২৫ সালের বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে, ৫০টি দেশের বিনিয়োগকারী উড়িয়ে এনে জোরগলায় ঘোষণা দেয়-৩২০ মিলিয়ন ডলারের তাৎক্ষণিক অঙ্গীকার এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বড়োই হতাশাজনক। সেই অর্থ আর আসেনি। প্রতিশ্রুতি বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। পুঁজি প্রথমে সতর্ক থেকেছে, পরে একেবারেই অনুপস্থিত।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসও বিভিন্ন রাজধানী ও কর্পোরেট বোর্ডরুম ঘুরে বিনিয়োগকারীদের অনুরোধ করেছেন-“বাংলাদেশকে একটি সুযোগ দিন।” তিনি ফিরেছেন করতালির সৌজন্য নিয়ে, বাস্তব ফল নিয়ে নয়। বিনিয়োগকারীরা বক্তৃতায় নড়েন না; তারা নড়েন সংকেতে। আর বাংলাদেশ এখন ভুল সংকেতই পাঠাচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সম্প্রতি সরাসরি বলেছে-অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দেশটি মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়ার বাস্তব ঝুঁকিতেÑনিম্ন মজুরির অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য খুব ব্যয়বহুল, আবার উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ টানার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব দুর্বল। এটি কোনো মতাদর্শিক বক্তব্য নয়; এটি নিখাদ অঙ্ক।
তবে পরিসংখ্যান শুধু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকেই নিশ্চিত করে। দাম বাড়ছে, আয় কমছে, আর চাকরি উধাও হচ্ছে। শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে। বেকারত্ব বাড়ছে নিঃশব্দে কিন্তু নিরলসভাবে। আমদানি-রপ্তানি স্থবির। বিদেশি ঋণ ও সহায়তার প্রবাহ দিন দিন কমে আসছে। এমনকি সরকার নিজেই মৌলিক আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।
গ্যাস সংকট এই ব্যর্থতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শিল্প উৎপাদন (বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদ-) গ্যাসের অভাবে বিপর্যস্ত। অথচ এই সংকট যুক্তিসংগত নয়। গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ বর্তমানে অলস পড়ে আছে। চাহিদাই নেই এমন মাত্রায় যে এ ধরনের ঘাটতি যৌক্তিক হবে। এখানে আছে কেবল অপব্যবস্থাপনা-সরবরাহে, বিতরণে, অগ্রাধিকারে। এটি নিয়তি নয়; বরং ব্যর্থতা।
শেয়ারবাজারও একই গল্প বলে। আওয়ামী লীগ আমলের কুখ্যাত সুবিধাভোগীরা হয়তো নেই, কিন্তু বাজার এখনো মৃতপ্রায়। পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে ঘুরে যায়নি। তাহলে টাকা যাচ্ছে কোথায়? কেউই যেন বলতে পারছে না বা বলতে চাচ্ছে না। যে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তা কি এসেছে? যদি এসে থাকে তবে তা দৃশ্যমান নয়।
তারপর আছে পাচার হওয়া অর্থের প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার শুরুতেই নাটকীয় ঘোষণা দিয়েছিল-হাসিনা আমলে বিদেশে পাচার হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা উদ্ধার করা হবে। আজ পর্যন্ত একটি টাকাও ফেরত আসেনি। যদিও প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তা সরকারের দক্ষতায় নয়। বেড়েছে কারণ লাখো প্রবাসী শ্রমিক বাধ্যবাধকতা থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন, আশাবাদ থেকে নয়।
সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আঠারো মাস কোনো ছোট সময় নয়, বিশেষ করে একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যেখানে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য দরকার গতি-দৃঢ় পরিকল্পনা, বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়ন। এর বদলে আমরা দেখেছি দোদুল্যমানতা। অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক সূচকগুলোও স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতের পথনকশা আঁকা তো দূরের কথা।
কিছু পর্যবেক্ষক এখন আরও অন্ধকার সন্দেহ প্রকাশ করছেন-সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা নাকি কৌশলগত। অর্থনীতি ভেঙে রেখে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা-যাতে অস্থিরতা, জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক দুর্বলতা অনিবার্য হয়। এটি সত্য হোক বা না হোক, এমন ধারণাই ক্ষতিকর। আর রাজনীতি, আমরা জানি, অনেক সময় ধারণার উপরই চলে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো কারিগরি বিলাসিতা নয়। এটি সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি। জীবিকা ভেঙে পড়লে ক্ষোভ জমে, অপরাধ বাড়ে, চরমপন্থা অক্সিজেন পায়। এই দৃশ্যপট আমরা আগেও দেখেছি। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পতনের আগে ছিল অর্থনৈতিক ধস। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার শিকড়ও অর্থনৈতিক শ্বাসরোধে, শুধু রাজনৈতিক দমন-পীড়নে নয়। দুই ক্ষেত্রেই সার্বভৌমত্ব শেষ পর্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল।
বাংলাদেশ এ থেকে মুক্ত নয়। বাস্তবিক অর্থে, তারা ইতোমধ্যে এই কাহিনীর একটি সংস্করণকে প্রত্যক্ষ করেছে। শেখ হাসিনার পতন শুধু গণতন্ত্রের দাবিতে হয়নি। এটি ঘটেছিল দুর্নীতিতে জর্জরিত এক অর্থনীতির কারণে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও বৈষম্য জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল। অর্থনীতি ব্যর্থ হলে রাজনীতিও ভেঙে পড়ে এবং তা ঘটে সহিংসভাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে এখন মাত্র এক মাস আছে। এই সময়ে অর্থনীতি উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি অর্থবহ কাজ এখনো করা যায়- পুনরুদ্ধারের জন্য রেখে যাওয়া যায় একটি সুসংহত ও দিকনির্দেশনামূলক কাঠামো, স্পষ্ট অগ্রাধিকার তালিকা এবং বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ। বিনিয়োগকারী, নাগরিক এবং পরবর্তী সরকারের প্রতি একটি আগাম সংকেত যা হলো বাংলাদেশ তার সংকটের গভীরতা বোঝে এবং সৎভাবে তা মোকাবিলা করতে চায়। এর চেয়ে কম কিছু হলে তা শুধু অদক্ষতা নয়, তা হবে অবহেলা। আর ইতিহাস সাধারণত এই দুইয়ের পার্থক্য খুব একটা করে না।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]