আনোয়ারুল হক
আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেশবাসী নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই জেনে গিয়েছিল। ‘বিনা ভোটের’ নির্বাচন হিসেবে খ্যাত ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ‘সংস্কার আর বিচারের প্রয়োজনে’ ১৭ মাস যাবত দেশ পরিচালনা করে অবশেষে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করে নিশ্চিত করেছেন যে ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই দেশবাসী নির্বাচনের আংশিক ফলাফলও জেনে গেছে। আর স্বয়ং অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান যখন তা ঘোষণা করছেন, বিশ্বাস না করে উপায় কী?
এভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছিল, ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’।
২০১৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল জানতেও দেশবাসীকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ‘নিশি ভোট’ হিসেবে খ্যাত ওই নির্বাচনের দিন ঘুম থেকে উঠেই মানুষ জেনে যায় রাতেই ভোটের বাক্স ভরে ফেলা হয়েছে। সুতরাং ফলাফল জানার জন্য আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয়নি। ৭টি আসন বিএনপির জন্য রেখে দিয়ে বাকি সব আসনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের ‘বিজয়ী’ ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ সালের পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রথম বারের মতো বিরোধী দলসমূহ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতারণার শিকার হয়। ফলে ২০২৪ সনের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে ছাড়া বিরোধী দলসমূহ নির্বাচনে অংশ নিতে সম্মত হয়নি। বিরোধী দলবিহীন ওই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলসমূহের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। বেশ কিছু আসনে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণও হয়। তবে বিরোধী দলসমূহের অংশগ্রহণ ব্যতিত নির্বাচনের ফলাফলের জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়নি। মানুষ ‘বুঝে গিয়েছিল’ যে, ‘উন্নয়নের জন্য দরকার, শেখ হাসিনার সরকার’!
অন্তর্বর্তী সরকার ‘সংস্কার আর বিচারের প্রয়োজনে’ ১৭ মাস যাবত দেশ পরিচালনা করে অবশেষে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করে নিশ্চিত করেছেন যে ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই দেশবাসী নির্বাচনের আংশিক ফলাফলও জেনে গেছে। আর স্বয়ং অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান যখন তা ঘোষণা করছেন, বিশ্বাস না করে উপায় কী? গত ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘তরুণরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তারা আসন্ন নির্বাচনেও অংশ নেবে। আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন। ..... তাদের মধ্যে কেউ হয়তোবা শিক্ষামন্ত্রীও হবেন।” শুধু সংসদ সদস্য পদ নয়, মন্ত্রীত্বও আংশিক তিনি ঠিক করে ফেলেছেন। তবে মন্ত্রীত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা তার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের ভবিষ্যদ্বাণী রক্ষা করতে পারেননি। প্রেস সচিব তরুণ দলের প্রধান নেতাকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন! যাইহোক মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তো সরকার গঠন করতে হবে। তাহলে কি তরুণদের দল যে নির্বাচনী জোটে যোগ দিয়েছে সেই জোটের বিজয়ও বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো নির্ধারিত হয়ে আছে! নাকি ভিন্ন কোনো হিসাবনিকাশ ‘ডিজাইন’ করা আছে?
যা-ই ডিজাইন করা থাকুক বা না-থাকুক অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কি আংশিকভাবে হলেও আগাম নির্বাচনী ফলাফল ও মন্ত্রীত্ব লাভের ঘোষণা করতে পারেন? একটি দলের পক্ষে এভাবে সমর্থন ব্যক্ত করতে পারেন? নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত যেহেতু কিছু বলছে না, তাহলে তো ধরে নিতে হয়- পারেন। বেহেশতের টিকেট লাভের জন্য সবই জায়েজ। আগে একটি দল একাত্তরকে, মুক্তিযুদ্ধকে যেমন নিজেদের মনে করেছে এখন একটি দল ধর্ম কে, ইসলাম কে শুধুই তাদের নিজেদের মনে করছে। আর নিজেদের দলে বিভক্তি এনেও সেই ধর্মাশ্রয়ী দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে তরুণদের দল। তাই শুধু মন্ত্রীত্ব কেনো মন্ত্রীত্বের ঘোষককে সহ বেহেশত লাভও নিশ্চিত হতে পারে।
বেহেশতে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে প্রথম টার্গেট পোস্টাল ব্যালট পেপার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, প্রবাসীদের কোনো কোনো বাসায় ২০০ থেকে ৩০০টি করে ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে। একজনের নামে পাঠানো ব্যালট অন্য কেউ গ্রহণ করছে এমন ঘটনাও জানা যাচ্ছে। জামায়াতের বাহরাইন শাখার নেতা পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন নামে একজন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কেবল বাহরাইন নয়, গাল্ফভুক্ত সব দেশেই ভোটারদের সহায়তা করছেন তারা। সৌদি আরব ও কুয়েতেও পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। আবার বিলির অযোগ্য আখ্যায়িত করে হাজারো পোস্টাল ব্যালট পেপার নাকি যুক্তরাষ্ট্রের গুদামে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত ৭৫টি দেশে অবস্থানরত পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ৬৮৯ জন প্রবাসী ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে। এখন ব্যালট পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা থাকলে ভোটের স্বচ্ছতা রইল কই? এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব আগের কমিশন সচিবদের মতো উত্তর দিয়েছেন, ‘আমার পাশে থাকে আমি ওরটা পৌঁছে দিচ্ছি- ব্যাপারটা এরকম।’ বিষয়টা কি এতই সাধারণ? একজনের ব্যালট পেপার আরেকজনের কাছে চলে যাচ্ছে- নির্বাচন কমিশনের কোনো হেলদোল নাই। এটা খুবই স্পষ্ট মধ্যপ্রাচ্যসহ যে সমস্ত দেশে স্বল্পশিক্ষিত জনশক্তি যাচ্ছে তাদের পোস্টাল ব্যালট পেপারের বড় একটা অংশ ধর্মাশ্রয়ী একটি রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর এভাবেই ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচনের আয়োজন পর্ব চলছে।
অন?্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের দিনে একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে যে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন তাতে করে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দুই আয়োজনেই সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণœ হচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ এরাই আবার থাকবেন নির্বাচনী কেন্দ্রে বিভিন্ন দায়িত্বে। গণভোটে সরকারের পক্ষ নেয়ার প্রভাব জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পড়তে পারে। ফলে অতীতের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মতো ‘ইতিহাসের সেরা’ এই নির্বাচনও অদূর ভবিষ্যতেই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
সাধারণ নির্বাচনই হোক আর গণভোটই হোক তা সম্পন্ন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশন গণভোটের বিষয়বস্তু ও ভোট দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে ভোটারকে স্বাধীনভাবে ‘হ্যা বা না’ ভোট দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে না দিলে এবং অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ও তার উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তারা পক্ষ নিয়ে ভোটের গাড়ি চালালে, গণভোট এবং সেই সঙ্গে সংসদ ভোটও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিন্তু যত ঘটনা ও অঘটন প্রায় সবক্ষেত্রেই ইস?্যু নির্বাচন। নির্বাচনী রায়কে অস্বীকার করার পরিণতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জনগণের ভোটাধিকার হরণের পরিণতিতে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, জনগণের ভোটকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধির কৌশল করার পরিনতিতে এক-এগারো, জনগণের ভোটাধিকার হরণের পরিণতি- স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের একযোগে অবমাননাকর দেশত্যাগ।
ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক প্রস্থানের একমাত্র পথই হলো দল নিরপেক্ষভাবে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। এমনিতেই অন্তর্বর্তী সরকার ও মবতন্ত্র সব দলের ও ব্যক্তির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না রাখায় নির্বাচন নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে। সবার জন্য নির্বাচনের মাঠ উন্মুক্ত না করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি স্থায়ী সমস্যা কিন্তু রয়ে গেল- পরবর্তী সরকারকে যা মোকাবিলা করতে হবে। উপরন্তু প্রধান উপদেষ্টা যদি নির্বাচনের আগেই প্রার্থীদের জয় পরাজয় বা সম্ভাব্য মন্ত্রীত্বের আগাম ঘোষণা দেন তবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার দোষে দুষ্ট হয়ে পড়বে ঘোষিত ‘সর্বকালের সর্বসেরা নির্বাচন’!
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
আনোয়ারুল হক
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেশবাসী নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই জেনে গিয়েছিল। ‘বিনা ভোটের’ নির্বাচন হিসেবে খ্যাত ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ‘সংস্কার আর বিচারের প্রয়োজনে’ ১৭ মাস যাবত দেশ পরিচালনা করে অবশেষে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করে নিশ্চিত করেছেন যে ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই দেশবাসী নির্বাচনের আংশিক ফলাফলও জেনে গেছে। আর স্বয়ং অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান যখন তা ঘোষণা করছেন, বিশ্বাস না করে উপায় কী?
এভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছিল, ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’।
২০১৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল জানতেও দেশবাসীকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ‘নিশি ভোট’ হিসেবে খ্যাত ওই নির্বাচনের দিন ঘুম থেকে উঠেই মানুষ জেনে যায় রাতেই ভোটের বাক্স ভরে ফেলা হয়েছে। সুতরাং ফলাফল জানার জন্য আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয়নি। ৭টি আসন বিএনপির জন্য রেখে দিয়ে বাকি সব আসনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের ‘বিজয়ী’ ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ সালের পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রথম বারের মতো বিরোধী দলসমূহ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতারণার শিকার হয়। ফলে ২০২৪ সনের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে ছাড়া বিরোধী দলসমূহ নির্বাচনে অংশ নিতে সম্মত হয়নি। বিরোধী দলবিহীন ওই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলসমূহের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। বেশ কিছু আসনে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণও হয়। তবে বিরোধী দলসমূহের অংশগ্রহণ ব্যতিত নির্বাচনের ফলাফলের জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়নি। মানুষ ‘বুঝে গিয়েছিল’ যে, ‘উন্নয়নের জন্য দরকার, শেখ হাসিনার সরকার’!
অন্তর্বর্তী সরকার ‘সংস্কার আর বিচারের প্রয়োজনে’ ১৭ মাস যাবত দেশ পরিচালনা করে অবশেষে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করে নিশ্চিত করেছেন যে ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগেই দেশবাসী নির্বাচনের আংশিক ফলাফলও জেনে গেছে। আর স্বয়ং অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান যখন তা ঘোষণা করছেন, বিশ্বাস না করে উপায় কী? গত ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘তরুণরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তারা আসন্ন নির্বাচনেও অংশ নেবে। আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন। ..... তাদের মধ্যে কেউ হয়তোবা শিক্ষামন্ত্রীও হবেন।” শুধু সংসদ সদস্য পদ নয়, মন্ত্রীত্বও আংশিক তিনি ঠিক করে ফেলেছেন। তবে মন্ত্রীত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা তার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের ভবিষ্যদ্বাণী রক্ষা করতে পারেননি। প্রেস সচিব তরুণ দলের প্রধান নেতাকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন! যাইহোক মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হতে হলে তো সরকার গঠন করতে হবে। তাহলে কি তরুণদের দল যে নির্বাচনী জোটে যোগ দিয়েছে সেই জোটের বিজয়ও বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো নির্ধারিত হয়ে আছে! নাকি ভিন্ন কোনো হিসাবনিকাশ ‘ডিজাইন’ করা আছে?
যা-ই ডিজাইন করা থাকুক বা না-থাকুক অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কি আংশিকভাবে হলেও আগাম নির্বাচনী ফলাফল ও মন্ত্রীত্ব লাভের ঘোষণা করতে পারেন? একটি দলের পক্ষে এভাবে সমর্থন ব্যক্ত করতে পারেন? নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত যেহেতু কিছু বলছে না, তাহলে তো ধরে নিতে হয়- পারেন। বেহেশতের টিকেট লাভের জন্য সবই জায়েজ। আগে একটি দল একাত্তরকে, মুক্তিযুদ্ধকে যেমন নিজেদের মনে করেছে এখন একটি দল ধর্ম কে, ইসলাম কে শুধুই তাদের নিজেদের মনে করছে। আর নিজেদের দলে বিভক্তি এনেও সেই ধর্মাশ্রয়ী দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে তরুণদের দল। তাই শুধু মন্ত্রীত্ব কেনো মন্ত্রীত্বের ঘোষককে সহ বেহেশত লাভও নিশ্চিত হতে পারে।
বেহেশতে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে প্রথম টার্গেট পোস্টাল ব্যালট পেপার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, প্রবাসীদের কোনো কোনো বাসায় ২০০ থেকে ৩০০টি করে ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে। একজনের নামে পাঠানো ব্যালট অন্য কেউ গ্রহণ করছে এমন ঘটনাও জানা যাচ্ছে। জামায়াতের বাহরাইন শাখার নেতা পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন নামে একজন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কেবল বাহরাইন নয়, গাল্ফভুক্ত সব দেশেই ভোটারদের সহায়তা করছেন তারা। সৌদি আরব ও কুয়েতেও পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। আবার বিলির অযোগ্য আখ্যায়িত করে হাজারো পোস্টাল ব্যালট পেপার নাকি যুক্তরাষ্ট্রের গুদামে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত ৭৫টি দেশে অবস্থানরত পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ৬৮৯ জন প্রবাসী ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠিয়েছে। এখন ব্যালট পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা থাকলে ভোটের স্বচ্ছতা রইল কই? এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব আগের কমিশন সচিবদের মতো উত্তর দিয়েছেন, ‘আমার পাশে থাকে আমি ওরটা পৌঁছে দিচ্ছি- ব্যাপারটা এরকম।’ বিষয়টা কি এতই সাধারণ? একজনের ব্যালট পেপার আরেকজনের কাছে চলে যাচ্ছে- নির্বাচন কমিশনের কোনো হেলদোল নাই। এটা খুবই স্পষ্ট মধ্যপ্রাচ্যসহ যে সমস্ত দেশে স্বল্পশিক্ষিত জনশক্তি যাচ্ছে তাদের পোস্টাল ব্যালট পেপারের বড় একটা অংশ ধর্মাশ্রয়ী একটি রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর এভাবেই ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচনের আয়োজন পর্ব চলছে।
অন?্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের দিনে একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে যে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন তাতে করে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দুই আয়োজনেই সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণœ হচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ এরাই আবার থাকবেন নির্বাচনী কেন্দ্রে বিভিন্ন দায়িত্বে। গণভোটে সরকারের পক্ষ নেয়ার প্রভাব জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পড়তে পারে। ফলে অতীতের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মতো ‘ইতিহাসের সেরা’ এই নির্বাচনও অদূর ভবিষ্যতেই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
সাধারণ নির্বাচনই হোক আর গণভোটই হোক তা সম্পন্ন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশন গণভোটের বিষয়বস্তু ও ভোট দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে ভোটারকে স্বাধীনভাবে ‘হ্যা বা না’ ভোট দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে না দিলে এবং অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ও তার উপদেষ্টা ও সরকারি কর্মকর্তারা পক্ষ নিয়ে ভোটের গাড়ি চালালে, গণভোট এবং সেই সঙ্গে সংসদ ভোটও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিন্তু যত ঘটনা ও অঘটন প্রায় সবক্ষেত্রেই ইস?্যু নির্বাচন। নির্বাচনী রায়কে অস্বীকার করার পরিণতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জনগণের ভোটাধিকার হরণের পরিণতিতে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, জনগণের ভোটকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধির কৌশল করার পরিনতিতে এক-এগারো, জনগণের ভোটাধিকার হরণের পরিণতি- স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের একযোগে অবমাননাকর দেশত্যাগ।
ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক প্রস্থানের একমাত্র পথই হলো দল নিরপেক্ষভাবে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। এমনিতেই অন্তর্বর্তী সরকার ও মবতন্ত্র সব দলের ও ব্যক্তির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না রাখায় নির্বাচন নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে। সবার জন্য নির্বাচনের মাঠ উন্মুক্ত না করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি স্থায়ী সমস্যা কিন্তু রয়ে গেল- পরবর্তী সরকারকে যা মোকাবিলা করতে হবে। উপরন্তু প্রধান উপদেষ্টা যদি নির্বাচনের আগেই প্রার্থীদের জয় পরাজয় বা সম্ভাব্য মন্ত্রীত্বের আগাম ঘোষণা দেন তবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার দোষে দুষ্ট হয়ে পড়বে ঘোষিত ‘সর্বকালের সর্বসেরা নির্বাচন’!
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]