alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

গৌতম রায়

: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

গোটা পশ্চিমবঙ্গ এখন এসআইআর এবং তার শুনানি ঘিরে প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বর্ণ- বয়স নির্বিশেষে এখানকার প্রতিটি মানুষের মনে এখন একটা ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ। সিএএ নিয়ে যে আতঙ্ক কয়েক বছর আগে তৈরি হয়েছিল, দ্বিগুণভাবে সেই আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে। এসআইআর-এর ফর্ম জমা দেয়া ঘিরে যে ধরনের মানসিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল নাগরিক সমাজে, সেই উদ্বেগ এখন একটা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে এই এসআইআর নিয়ে হেয়ারিংকে ঘিরে।

এসআইআর তো ২০০২ সালেও হয়েছে ভারতে। তার আগেও নিয়মিত হয়েছে। সেদিন তো আজকের মতো আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়নি। সেদিন তো এখনকার মতো শুনানি ঘিরে আতঙ্কের পরিবেশে এত মানুষের মৃত্যু হয়নি।

তাহলে এখন কেন?

পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজ ঘিরে বাংলাদেশ কে টার্গেট করে রাজ্য সরকারের অস্ত্র শানানো নতুন কোনও ঘটনা নয়। আজ এসআইআরের নামে নাগরিক হেনস্তা, যার মূল লক্ষ্য, ভারতের ভূমিপুত্রসহ নাগরিক মুসলিমদের বেনাগরিক করা, এই সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির রাজনৈতিক জিঘাংসা। আরএসএসের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম মূল উপাদান হলো, মুসলমান বিদ্বেষ। মুসলমানদের বেনাগরিক করবার নিদান, তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা এম এস গোলওয়ালকর ’৪৭-এর সময়কালেই দিয়েছিলেন। ‘শ্রীগুরুজী’র সেই তথাকথিত পথনির্দেশ মেনেই আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি আজ ও চলে। সেই নির্দেশিকা মোতাবেকই তারা সিএএর বিষয় টিকে দেখেছিল। এখন এসআইআরের বিষয়টাকে ও দেখছে।

বিজেপি এই এসআইআরের কাজে নির্বাচন কমিশনকে পর্যন্ত তাদের অঘোষিত দলীয় শাখাতে পরিণত করেছে। এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের খেয়ালখুশি মতো অবস্থান দেশের নাগরিক সমাজকে প্রচ- রকমের সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। হেয়ারিংয়ে যেসব নাগরিকদের ডাকা হচ্ছে, যাদের কী নথি আনতে হবেÑ এ সম্পর্কে একেক দিন, একেক রকম নিদান দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে সহনাগরিক, মুসলমানদের একদম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেনস্তা করাই যে নির্বাচন কমিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য, এসআইআরের শুনানির মধ্যে দিয়ে তা এখন ক্রমেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।

বহু ক্ষেত্রেই বিএলওরা যে আচরণ করছেন, তা কখনো একজন সরকারি আধিকরিকের আচরণ হতে পারে না। বিএলওদের আচরণ বহু ক্ষেত্রেই একজন বিজেপি কর্মীর মতো হয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তারা বিজেপি ছাড়া, তৃণমূল ছাড়া, বামপন্থিদের সমর্থক সাধারণ ভোটারদের হেনস্তা করছে। সেই সঙ্গে একেবারে অসম্মানজনকভাবে হেনস্তা করছে সহনাগরিক মুসলমানদের।

বিএলওদের প্রাথমিক প্রতিবেদনকেই সম্বল করে হেয়ারাংয়ে ডাকা হচ্ছে নাগরিকদের। তখন দেখা যাচ্ছে , অনেকক্ষেত্রেই স্থানীয় মানুষ বিএলও, তার যাদের ওপর ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা রাজনৈতিক বিদ্বেষ আছে, তাকে একদম পরিকল্পিতভাবে হেনস্তা করবার উদ্দেশেই, সেই নাগরিককে ঘিরে অসঙ্গতির রিপোর্ট বিএলও জমা দিচ্ছে। আর বিএলওর প্রাথমিক প্রতিবেদনকে শুনানির সময়ে নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত আধিকরিকরা স্বভাবতই গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে অসম্মান, অমর্যাদা, হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা।

বয়স্ক নাগরিকদের শুনানির নামে হেনস্তা পশ্চিমবঙ্গে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যার জেরে বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া এসআইআর-এর শুনানি ঘিরে লাইনে হেনস্তা হতে হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের। শুনানির নামে এমন সব প্রশ্ন করা হচ্ছে নাগরিকদের, যেসব প্রশ্নের এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে সম্পর্ক, পিতা-মাতার বয়স এবং সন্তানের বয়স ইত্যাদি বিষয় ঘিরে এমন ধরনের প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে প্রায় সব বয়সের নাগরিকদের, যে প্রশ্নগুলো একজন মানুষের কাছে প্রবল অমর্যাদার, অসম্মানের।

সহনাগরিক মুসলমানদের যেভাবে হেনস্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেটা দেখে খুব পরিষ্কারভাবেই বলতে পারা যায়, এই শুনানির গোটা পদ্ধতির মধ্যেই হিন্দুত্ববাদী শক্তির যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি তা ফুটে উঠছে। একদম পরিকল্পিত ভাবে ভারতের সহনাগরিক মুসলমানদের বেনাগরিক করবার উদ্দেশে এসআইআর-এর নাম করে এই হেনস্তা করা হচ্ছে। এই হেনস্তার গেম প্ল্যানটা করা আরএসএসের। নয়ের দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলে এই গেম প্ল্যান হিন্দুত্ববাদীরা করে চলেছে। এসব অঞ্চলে সেদিন বামপন্থিদের যে রাজনৈতিক বিস্তার ছিল, জ্যোতি বসুর ব্যক্তি উপস্থিতির যে প্রভাব ছিল, সেসবের দরুণ এই কাজে সেদিন নিজেরা সফল হতে পারবে না এটা হিন্দুত্ববাদীরা জানত।

এসআইআরের গোটা গেম প্ল্যানটা বিজেপির মস্তিষ্ক আরএসএসের তৈরি করা। আজ যখন এসআইআর নিয়ে গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, বিশেষ করে এই রাজ্যের সব ধরণের প্রান্তিক মানুষ চরম অসহায়তা, সঙ্কটের মধ্যে আছে , তখন এই রাজ্যে বিজেপিকে প্রথম পায়ের তলায় মাটি জোগাতে বামপন্থি- প্রগতিশীলদের মধ্যেও যে ক্ষমতলোভী প্রতারকরা ছিল, যারা নয়ের দশকে বামপন্থীদের সুদিনেও , বামপন্থীদের পেছন থেকে ছুরি মারতে দ্বিধা করেনি, সেইসব গণশত্রুদের ভূমিকাও বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।

হিন্দুত্ববাদীরা, প্রতিক্রিয়াশীলরা সেদিন আমেরিকার তামাক খেয়ে নিজের দেশের মানুষের যে ক্ষতি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, সেকাজে নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করা কিছু সাম্রাজ্যবাদের দালালেরাও জোরদার ভাবে ছিল।এই দালালেরা চেষ্টা করেছিল সিপিআই (এম)কে ভেঙে, একটা বামপন্থী লেবাস দিয়ে চরম দক্ষিণপন্থী দল তৈরি করতে, যারা বামেদের ক্ষমতাচ্যুত করবে। ক্ষমতায় বসাবে মমতাকে। এই কাজে এসইউসি, কিছু স্বঘোষিত নকশাল, পিডিএস ইত্যাদি দলের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বামফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে আরএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লকের ও গোপন অবস্থানটা ওই সব প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গেই ছিল।

এসআইআর, তার শুনানি ঘিরে নাগরিকদের হেনস্তা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভারতীয় মুসলমানদের হেনস্তা- এই কাজের জন্যে হিন্দুত্ববাদীদের উপযুক্ত জমি তৈরি করে দিয়েছেন মমতা। তাকে এই জমি তৈরিতে সাহায্য করেছেন পিডিএসের সমীর পুততুন্ডুর মতো লোকরা। নিজেদের স্বঘোষিত নকশাল বলে দাবি করা অসীম চট্টোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু বসুর মতো লোকরা। আরএসপি নেতা ক্ষিতি গোস্বামীর মতো লোকরা।

তাদের সেদিন উদ্দেশ্য ছিল সিপিআই (এম)কে বেকায়দায় ফেলা। নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে গিয়ে ওইসব লোকরা আসলে বেকায়দায় ফেলেছেন সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে ভারতীয় মুসলমানদের। আর এই অরাজকতার তামাক এখনো খাওয়ার চেষ্টা করে চলেছে রাজ্য সরকার।

[লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

শীতকালীন অসুখ-বিসুখ

দিশাহীন অর্থনীতি, নিষ্ক্রিয় অন্তর্বর্তী সরকার

নরসুন্দরের পোয়াবারো

জামায়াতের ‘অক্টোপাস পলিসি’ কৌশল নাকি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি?

ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও গোলক ধাঁধা

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

ছবি

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

গৌতম রায়

শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

গোটা পশ্চিমবঙ্গ এখন এসআইআর এবং তার শুনানি ঘিরে প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বর্ণ- বয়স নির্বিশেষে এখানকার প্রতিটি মানুষের মনে এখন একটা ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ। সিএএ নিয়ে যে আতঙ্ক কয়েক বছর আগে তৈরি হয়েছিল, দ্বিগুণভাবে সেই আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে। এসআইআর-এর ফর্ম জমা দেয়া ঘিরে যে ধরনের মানসিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল নাগরিক সমাজে, সেই উদ্বেগ এখন একটা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে এই এসআইআর নিয়ে হেয়ারিংকে ঘিরে।

এসআইআর তো ২০০২ সালেও হয়েছে ভারতে। তার আগেও নিয়মিত হয়েছে। সেদিন তো আজকের মতো আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়নি। সেদিন তো এখনকার মতো শুনানি ঘিরে আতঙ্কের পরিবেশে এত মানুষের মৃত্যু হয়নি।

তাহলে এখন কেন?

পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক সমাজ ঘিরে বাংলাদেশ কে টার্গেট করে রাজ্য সরকারের অস্ত্র শানানো নতুন কোনও ঘটনা নয়। আজ এসআইআরের নামে নাগরিক হেনস্তা, যার মূল লক্ষ্য, ভারতের ভূমিপুত্রসহ নাগরিক মুসলিমদের বেনাগরিক করা, এই সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির রাজনৈতিক জিঘাংসা। আরএসএসের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম মূল উপাদান হলো, মুসলমান বিদ্বেষ। মুসলমানদের বেনাগরিক করবার নিদান, তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা এম এস গোলওয়ালকর ’৪৭-এর সময়কালেই দিয়েছিলেন। ‘শ্রীগুরুজী’র সেই তথাকথিত পথনির্দেশ মেনেই আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি আজ ও চলে। সেই নির্দেশিকা মোতাবেকই তারা সিএএর বিষয় টিকে দেখেছিল। এখন এসআইআরের বিষয়টাকে ও দেখছে।

বিজেপি এই এসআইআরের কাজে নির্বাচন কমিশনকে পর্যন্ত তাদের অঘোষিত দলীয় শাখাতে পরিণত করেছে। এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের খেয়ালখুশি মতো অবস্থান দেশের নাগরিক সমাজকে প্রচ- রকমের সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। হেয়ারিংয়ে যেসব নাগরিকদের ডাকা হচ্ছে, যাদের কী নথি আনতে হবেÑ এ সম্পর্কে একেক দিন, একেক রকম নিদান দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে সহনাগরিক, মুসলমানদের একদম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেনস্তা করাই যে নির্বাচন কমিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য, এসআইআরের শুনানির মধ্যে দিয়ে তা এখন ক্রমেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।

বহু ক্ষেত্রেই বিএলওরা যে আচরণ করছেন, তা কখনো একজন সরকারি আধিকরিকের আচরণ হতে পারে না। বিএলওদের আচরণ বহু ক্ষেত্রেই একজন বিজেপি কর্মীর মতো হয়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তারা বিজেপি ছাড়া, তৃণমূল ছাড়া, বামপন্থিদের সমর্থক সাধারণ ভোটারদের হেনস্তা করছে। সেই সঙ্গে একেবারে অসম্মানজনকভাবে হেনস্তা করছে সহনাগরিক মুসলমানদের।

বিএলওদের প্রাথমিক প্রতিবেদনকেই সম্বল করে হেয়ারাংয়ে ডাকা হচ্ছে নাগরিকদের। তখন দেখা যাচ্ছে , অনেকক্ষেত্রেই স্থানীয় মানুষ বিএলও, তার যাদের ওপর ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা রাজনৈতিক বিদ্বেষ আছে, তাকে একদম পরিকল্পিতভাবে হেনস্তা করবার উদ্দেশেই, সেই নাগরিককে ঘিরে অসঙ্গতির রিপোর্ট বিএলও জমা দিচ্ছে। আর বিএলওর প্রাথমিক প্রতিবেদনকে শুনানির সময়ে নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত আধিকরিকরা স্বভাবতই গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে অসম্মান, অমর্যাদা, হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা।

বয়স্ক নাগরিকদের শুনানির নামে হেনস্তা পশ্চিমবঙ্গে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যার জেরে বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া এসআইআর-এর শুনানি ঘিরে লাইনে হেনস্তা হতে হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের। শুনানির নামে এমন সব প্রশ্ন করা হচ্ছে নাগরিকদের, যেসব প্রশ্নের এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে সম্পর্ক, পিতা-মাতার বয়স এবং সন্তানের বয়স ইত্যাদি বিষয় ঘিরে এমন ধরনের প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে প্রায় সব বয়সের নাগরিকদের, যে প্রশ্নগুলো একজন মানুষের কাছে প্রবল অমর্যাদার, অসম্মানের।

সহনাগরিক মুসলমানদের যেভাবে হেনস্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেটা দেখে খুব পরিষ্কারভাবেই বলতে পারা যায়, এই শুনানির গোটা পদ্ধতির মধ্যেই হিন্দুত্ববাদী শক্তির যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি তা ফুটে উঠছে। একদম পরিকল্পিত ভাবে ভারতের সহনাগরিক মুসলমানদের বেনাগরিক করবার উদ্দেশে এসআইআর-এর নাম করে এই হেনস্তা করা হচ্ছে। এই হেনস্তার গেম প্ল্যানটা করা আরএসএসের। নয়ের দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলে এই গেম প্ল্যান হিন্দুত্ববাদীরা করে চলেছে। এসব অঞ্চলে সেদিন বামপন্থিদের যে রাজনৈতিক বিস্তার ছিল, জ্যোতি বসুর ব্যক্তি উপস্থিতির যে প্রভাব ছিল, সেসবের দরুণ এই কাজে সেদিন নিজেরা সফল হতে পারবে না এটা হিন্দুত্ববাদীরা জানত।

এসআইআরের গোটা গেম প্ল্যানটা বিজেপির মস্তিষ্ক আরএসএসের তৈরি করা। আজ যখন এসআইআর নিয়ে গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, বিশেষ করে এই রাজ্যের সব ধরণের প্রান্তিক মানুষ চরম অসহায়তা, সঙ্কটের মধ্যে আছে , তখন এই রাজ্যে বিজেপিকে প্রথম পায়ের তলায় মাটি জোগাতে বামপন্থি- প্রগতিশীলদের মধ্যেও যে ক্ষমতলোভী প্রতারকরা ছিল, যারা নয়ের দশকে বামপন্থীদের সুদিনেও , বামপন্থীদের পেছন থেকে ছুরি মারতে দ্বিধা করেনি, সেইসব গণশত্রুদের ভূমিকাও বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।

হিন্দুত্ববাদীরা, প্রতিক্রিয়াশীলরা সেদিন আমেরিকার তামাক খেয়ে নিজের দেশের মানুষের যে ক্ষতি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, সেকাজে নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করা কিছু সাম্রাজ্যবাদের দালালেরাও জোরদার ভাবে ছিল।এই দালালেরা চেষ্টা করেছিল সিপিআই (এম)কে ভেঙে, একটা বামপন্থী লেবাস দিয়ে চরম দক্ষিণপন্থী দল তৈরি করতে, যারা বামেদের ক্ষমতাচ্যুত করবে। ক্ষমতায় বসাবে মমতাকে। এই কাজে এসইউসি, কিছু স্বঘোষিত নকশাল, পিডিএস ইত্যাদি দলের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বামফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে আরএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লকের ও গোপন অবস্থানটা ওই সব প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গেই ছিল।

এসআইআর, তার শুনানি ঘিরে নাগরিকদের হেনস্তা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভারতীয় মুসলমানদের হেনস্তা- এই কাজের জন্যে হিন্দুত্ববাদীদের উপযুক্ত জমি তৈরি করে দিয়েছেন মমতা। তাকে এই জমি তৈরিতে সাহায্য করেছেন পিডিএসের সমীর পুততুন্ডুর মতো লোকরা। নিজেদের স্বঘোষিত নকশাল বলে দাবি করা অসীম চট্টোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু বসুর মতো লোকরা। আরএসপি নেতা ক্ষিতি গোস্বামীর মতো লোকরা।

তাদের সেদিন উদ্দেশ্য ছিল সিপিআই (এম)কে বেকায়দায় ফেলা। নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করতে গিয়ে ওইসব লোকরা আসলে বেকায়দায় ফেলেছেন সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে ভারতীয় মুসলমানদের। আর এই অরাজকতার তামাক এখনো খাওয়ার চেষ্টা করে চলেছে রাজ্য সরকার।

[লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

back to top