জিয়াউদ্দীন আহমেদ
সরকারের প্রেস সচিব, আইন উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকেই নিজেদের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে একটা স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার অহঙ্কার করে থাকেন। কিন্তু তারা জানেন না যে, ব্যাংকিং সেক্টরকে বর্তমান সরকার বরং অস্থির করে তুলেছে।
বর্তমান গভর্নর ক্ষমতায় বসেই জনগণকে
শুধু দেউলিয়া ব্যাংকের সংবাদ দেননি, তিনি
অবলীলায় বলে দিলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কোন রকম আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে না, এই কথা
বলার সময় সম্ভবত তার খেয়াল ছিল না যে, তিনি তপশীলি ব্যাংকগুলোর অভিভাবক
মাত্রা ভিন্ন হলেও ঋণ প্রদানে অনিয়ম আগেও ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। অনিয়মের মাত্রা সমস্ত হিসাব-নিকাশের বাইরে চলে গেলে তখন সমগ্র জাতি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। ঋণ প্রদানে অনিয়ম থাকে বলেই ব্যাংকিং সেক্টরকে তদারকি করার জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।কেন্দ্রিয় ব্যাংকের মনিটরিং থাকা সত্ত্বেও একটি মন্ত্রণালয়ের মনিটরিংয়ের আবশ্যকতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে অতীতে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, এতদসত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচিতে এমন দ্বিমুখী মনিটরিং রদ করার কোন কথা শোনা যায়নি। অবশ্য সংস্কারের সামগ্রিক কর্মসূচিও নানাবিধ কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ের দুর্বলতা নিয়ে কথা উঠলেই বলা হয় ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা দরকার’। এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে অন্তর্বর্তী সরকার অফুরন্ত স্বাধীনতা দিয়ে ভুল করেছে, ব্যাংকিং সেক্টরের ধস ত্বরান্বিত হয়েছে।
গভর্নর নিযুক্ত হন অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে, সরাসরি প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে নিয়োগ হলে নাকি গভর্নরের স্বাধীনতা অনেক বেড়ে যাবে। এখন গভর্নরের স্বাধীনতা না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক নাকি তার নিজস্ব আইনগত স্বাধীনতাটুকুও ভোগ করতে পারে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দলের সাংসদদের ভোটে, প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ইস্তেফা দেয়ার কাহিনী সবার মনে থাকার কথা; আবদুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর কোন একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আগমন বার্তা পেয়েই স্বাগত জানাতে ছুটে গিয়েছিলেন। দলের নির্দেশে প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে হয়েছিলেন। তাই প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হলেই গভর্নর সরকারকে এড়িয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এই ধারণা সত্য না-ও হতে পারে। তবে কোন গভর্নরের বিদেশ যাওয়ার বাতিক বা গভর্নর পদে দ্বিতীয় মেয়াদে থাকার তীব্র আগ্রহ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা মন্ত্রণালয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিক্রি হয়ে যায়। সরকারের ভেতর সত্যিকার অর্থে প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত আর কোন পদের স্বাধীনতা নেই এবং স্বাধীনতা নেই বলেই সাংবিধানিক পোস্টগুলো নিয়েও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে, সাংবিধানিক পদধারীদের কর্মকা- সমালোচিত হয়েছে, তাদের নতজানু কর্মকা-ে জনগণ হতাশ হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের শুরুতেই বিএনপি তাদের নিজস্ব লোকের নিয়োগ দিয়ে তাদের একটি ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল। সব দলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত গঠিত হয়নি। সকল তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনে পরাজিত দলের নিকট পক্ষপাত দোষে অভিযুক্ত হয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠানের অবাধ স্বাধীনতা নয়, বরং সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে হলে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের লোকজনের জ্ঞান-গরিমার গভীরতা। আবার জ্ঞানও অনেক সময় বুমেরাং হয়।
স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়; আইন দ্বারা স্বাধীনতার রক্ষাকবচ তৈরি করা হলেও সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার অহংবোধ নিয়ে চলতে পারে না। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকার বহির্ভূত আলাদা কোন সত্ত্বা নেই, সরকারের পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে সহায়তা করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখ্য কাজ। তবে সরকারের কর্মসূচি নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সমন্বয়মূলক মতামত দিতে পারে। সরকার প্রতি বছর বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে এবং তা সংসদ বা পরোক্ষভাবে জনগণ কর্তৃক অনুমোদিত। এই বাজেট বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করাই সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মুখ্য দায়িত্ব। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কী পরিমাণ ঋণ নেবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি দিয়ে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় বলেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কখনো কোন সরকারকে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘আর ঋণ দেব না’ এই কথাটি বলতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। ঋণ খেলাপি শুধু এস আলম আর বেক্সিমকো নয়, ঋণের ভিন্ন ব্যবহার কেবল এই দুটি প্রতিষ্ঠান করেনি, করেছে আরও বহু প্রতিষ্ঠান। সব ঋণ খেলাপি আওয়ামী লীগের নয়, অন্যান্য দলেরও আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখ্য কাজ তপশীলি ব্যাংকগুলোকে ঠিক রাখা। ঠিক রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পরিদর্শন বিভাগকে যেভাবে সম্প্রসারণ করেছে, সেভাবে পরিদর্শন কর্মকা- সংহত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। প্রতিটি তপশীলি ব্যাংকের বেশির ভাগ ঋণ প্রতি বছর পরিদর্শন করা হয়, পর্যালোচিত হয়, শ্রেণীবিণ্যাসিত হয়। তারপরও কেন ঋণে এত অনিয়ম তার খোঁজ নেয়া জরুরি, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা বা অপূর্ণতার অনুসন্ধান করা জরুরি। মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনে ডকুমেন্ট যাচাই করার চেয়ে ঋণ-সংশ্লিষ্ট কারখানা পরিদর্শনের আগ্রহ বেশি, এজন্যই সম্ভবত কারখানা পরিদর্শন একসময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কারখানা পরিদর্শন অপরিহার্য। অন্যদিকে নির্ধারিত তারিখের পূর্বে পরিদর্শন শেষ করে বাসায় অবস্থান করার কারণেও পরিদর্শকদের নৈতিক শক্তি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপনার কাছে বিক্রি হয়ে যায়। মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনের বড় দুর্বলতা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পরিদর্শন রিপোর্ট যথাযথ গুরুত্ব পায় না, গুরুত্ব পায় তখনই যখন ঋণগ্রহীতা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিদর্শনের আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে ঘুষ আর দুর্নীতি; সরাসরি ঘুষ না নিলেও বড় বড় কর্মকর্তারা অবসর গ্রহণের পর মোটা বেতনের চাকুরির নিশ্চয়তা পেয়ে যান। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, অবসর গ্রহণের পর কোন সরকারি কর্মকর্তারও কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি, যে নামেই হোক না কেন, করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা ফরজ।
মাঠ পর্যায়ের অনসাইট পরিদর্শন ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক বিবরণী সংগ্রহের মাধ্যমে অফসাইট তদারকি করে থাকে, এই অফসাইট তদারকি দ্বারা প্রতিটি তপশীলি ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা করা হয়। নিয়মিত এই পর্যালোচনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা-সবলতা সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক হালনাগাদ তথ্য পেয়ে থাকে। দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দিলেই দুর্বল ব্যাংকগুলোর বোর্ড বা পরিচালক পর্ষদের কার্যক্রম মনিটরিং করার নিমিত্তে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘পর্যবেক্ষক’ বহাল করা হয়। এছাড়া গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর প্রতিটি তপশীলি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ ব্যাংকে ডেকে এনে নিয়মিত সবক দিয়ে থাকেন। তারপরও ব্যাংক দেউলিয়া হয় কেন? কেন লক্ষ লক্ষ আমানতকারীকে নিজের টাকা পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে, কেন তাদের টাকা ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত আরোপ করা হচ্ছে, কেন তাদের আমানতের ওপর মুনাফা দেয়া হবে না, কেন একীভূত ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য জিরো হয়ে গেল? শেয়ারের মূল্য জিরো হয়ে যাওয়ার কথাটি গর্ব করে ঘোষণা করার কী কোন দরকার ছিল? বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমত হচ্ছে, লাভ না হলে মুনাফা দেবে না, কিন্তু ঋণগ্রহীতার বিনিয়োগে লোকসান হলে কি কোন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তার দায় নিয়েছে? এছাড়া যেসব আমনাতের ওপর মুনাফা দেয়া হবে না, সেই সব আমানতের ওপর বছরভিত্তিক মুনাফার হিসাব কষে সরকার কি তাদের ট্যাক্স কর্তন করে নিয়ে গেছে? যদি নিয়ে থাকে তা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা কি বাংলাদেশ ব্যাংক করবে?
বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের এক দিন আগেও ব্যাংকগুলোর অবস্থা এত খারাপ ছিল না, শেয়ারের মূল্য জিরো ছিল না, ব্যাংকগুলোর ওপর জনগণের আস্থায় কোন ছেদ ছিল না, ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তোলার হিড়িক ছিল না। যেদিন গভর্নর বললেন, দশটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে, ব্যাংকগুলোকে তাদের দুর্বলতাভিত্তিক লাল বা হলুদ করা হলো সেদিন থেকেই জনগণের আস্থায় ধস নেমেছে। তারপরও গভর্নর থেমে যাননি, দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের মতো এলোমেলো সিদ্ধান্ত নিতেই থাকলেন, ব্যাংকের মালিক ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তাকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি তার অবিমৃষ্যকারী কথাবার্তা বন্ধ করলেন না। আওয়ামী লীগের আমলে দেশের ভেতর ও বাইরে ইসলামিক ব্যাংক নিয়ে অবিরত অপপ্রচার করার পরও ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা অটুট ছিল, এই আস্থা অটুট রাখার জন্য তখন বাংলাদেশ ব্যাংকও দৃঢ় ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তৎকালীন গভর্নর আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে এই মর্মে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সাময়িক তারল্য সংকট থাকলেও আমানতকারীদের ভয়ের কোন কারণ নেই, কারণ ইসলামিক ব্যাংকের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী, তারপরও প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামিক ব্যাংককে টাকার জোগান দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন দৃঢ় অবস্থানের কারণে কোন ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়নি।
বর্তমান গভর্নর ক্ষমতায় বসেই জনগণকে শুধু দেউলিয়া ব্যাংকের সংবাদ দেননি, তিনি অবলীলায় বলে দিলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কোন রকম আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে না, এই কথা বলার সময় সম্ভবত তার খেয়াল ছিল না যে, তিনি তপশীলি ব্যাংকগুলোর অভিভাবক। স্কুলেও শেখানো হয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হচ্ছে তপশীলি ব্যাংকগুলোর ঋণপ্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে আমানত কেন রাখা হলো তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন, তিনি বললেন এই সকল আমানতের দায় তিনি নেবেন না, ছেলেমি কাকে বলে! বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত কোন ব্যাংকে টাকা কেন জনগণ রাখল এমন প্রশ্ন কোন বিচক্ষণ গভর্নর তুলতে পারেন বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। এই কথা বলার পর ঠেস দিয়ে বা প্রচুর অর্থের জোগান দিয়েও ব্যাংকগুলোর ধস আর থামানো যায়নি। এখনও অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকে সরকারের টাকা আমানত হিসেবে রাখতে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ তাদের অধীনস্থ সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে থাকে। সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন বৈমাত্রীয়সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধতকা তৈরি করবে। অর্থ উপদেষ্টার পরামর্শে বা অন্য যে কোন কারণেই হোক, গভর্নর যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন সময়ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, পরবর্তীকালে ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েও জনগণের নষ্ট আস্থা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর অন্য কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এই জাতীয় কথাবার্তা বলে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন বলে জানা নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় ব্যাংকের সংখ্যা অবশ্যই বেশি, আগের আমলে শুধু রাজনৈতিক কারণে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে বিভিন্ন পেশার লোকদের তুষ্ট করতেও। অতিরিক্ত ব্যাংকের অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায় ঋণগ্রহীতার কদর বেড়ে গেলে নির্বিচারে ঋণ দেয়া শুরু হয় এবং খেলাপি ঋণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আগের সরকারের আমলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংক একীভূতকরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, এবং তারই সূত্রে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে। কিন্তু এখন একীভূত করা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করে।এই একীভূতকরণেও রাজনীতি রয়েছে বলে মনে হয়। রাজনীতি ছিল বলেই সম্ভবত যে দুটি ব্যাংক নিজস্ব প্রচেষ্টায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল তাদের সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়া হয়নি। সাড়া দিলে ব্যাংকিং জগতে হ য ব র ল একটু কম হতো।রাজনৈতিক বিবেচনা না থাকলে এই একীভূতকরণে অধিকতর দুর্বল আরও কয়েকটি ব্যাংকের থাকার কথা ছিল। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌন সম্মতিতে ইসলামিক ব্যাংক শত শত কর্মচারীকে ছাঁটাই করতে পেরেছে। তাই স্বাধীনতা নয়, প্রয়োজন বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে যতটুকু সম্ভব নিরপেক্ষ ও নির্মোহ নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
সরকারের প্রেস সচিব, আইন উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকেই নিজেদের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে একটা স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনার অহঙ্কার করে থাকেন। কিন্তু তারা জানেন না যে, ব্যাংকিং সেক্টরকে বর্তমান সরকার বরং অস্থির করে তুলেছে।
বর্তমান গভর্নর ক্ষমতায় বসেই জনগণকে
শুধু দেউলিয়া ব্যাংকের সংবাদ দেননি, তিনি
অবলীলায় বলে দিলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কোন রকম আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে না, এই কথা
বলার সময় সম্ভবত তার খেয়াল ছিল না যে, তিনি তপশীলি ব্যাংকগুলোর অভিভাবক
মাত্রা ভিন্ন হলেও ঋণ প্রদানে অনিয়ম আগেও ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। অনিয়মের মাত্রা সমস্ত হিসাব-নিকাশের বাইরে চলে গেলে তখন সমগ্র জাতি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। ঋণ প্রদানে অনিয়ম থাকে বলেই ব্যাংকিং সেক্টরকে তদারকি করার জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।কেন্দ্রিয় ব্যাংকের মনিটরিং থাকা সত্ত্বেও একটি মন্ত্রণালয়ের মনিটরিংয়ের আবশ্যকতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে অতীতে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, এতদসত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচিতে এমন দ্বিমুখী মনিটরিং রদ করার কোন কথা শোনা যায়নি। অবশ্য সংস্কারের সামগ্রিক কর্মসূচিও নানাবিধ কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ের দুর্বলতা নিয়ে কথা উঠলেই বলা হয় ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা দরকার’। এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে অন্তর্বর্তী সরকার অফুরন্ত স্বাধীনতা দিয়ে ভুল করেছে, ব্যাংকিং সেক্টরের ধস ত্বরান্বিত হয়েছে।
গভর্নর নিযুক্ত হন অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে, সরাসরি প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে নিয়োগ হলে নাকি গভর্নরের স্বাধীনতা অনেক বেড়ে যাবে। এখন গভর্নরের স্বাধীনতা না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক নাকি তার নিজস্ব আইনগত স্বাধীনতাটুকুও ভোগ করতে পারে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দলের সাংসদদের ভোটে, প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ইস্তেফা দেয়ার কাহিনী সবার মনে থাকার কথা; আবদুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর কোন একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আগমন বার্তা পেয়েই স্বাগত জানাতে ছুটে গিয়েছিলেন। দলের নির্দেশে প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে হয়েছিলেন। তাই প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হলেই গভর্নর সরকারকে এড়িয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এই ধারণা সত্য না-ও হতে পারে। তবে কোন গভর্নরের বিদেশ যাওয়ার বাতিক বা গভর্নর পদে দ্বিতীয় মেয়াদে থাকার তীব্র আগ্রহ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা মন্ত্রণালয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিক্রি হয়ে যায়। সরকারের ভেতর সত্যিকার অর্থে প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত আর কোন পদের স্বাধীনতা নেই এবং স্বাধীনতা নেই বলেই সাংবিধানিক পোস্টগুলো নিয়েও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে, সাংবিধানিক পদধারীদের কর্মকা- সমালোচিত হয়েছে, তাদের নতজানু কর্মকা-ে জনগণ হতাশ হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের শুরুতেই বিএনপি তাদের নিজস্ব লোকের নিয়োগ দিয়ে তাদের একটি ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল। সব দলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত গঠিত হয়নি। সকল তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনে পরাজিত দলের নিকট পক্ষপাত দোষে অভিযুক্ত হয়েছে। তাই প্রতিষ্ঠানের অবাধ স্বাধীনতা নয়, বরং সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে হলে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের লোকজনের জ্ঞান-গরিমার গভীরতা। আবার জ্ঞানও অনেক সময় বুমেরাং হয়।
স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়; আইন দ্বারা স্বাধীনতার রক্ষাকবচ তৈরি করা হলেও সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার অহংবোধ নিয়ে চলতে পারে না। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকার বহির্ভূত আলাদা কোন সত্ত্বা নেই, সরকারের পরিকল্পনা ও কর্মসূচিকে সহায়তা করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখ্য কাজ। তবে সরকারের কর্মসূচি নির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সমন্বয়মূলক মতামত দিতে পারে। সরকার প্রতি বছর বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে এবং তা সংসদ বা পরোক্ষভাবে জনগণ কর্তৃক অনুমোদিত। এই বাজেট বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা করাই সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মুখ্য দায়িত্ব। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সরকার কী পরিমাণ ঋণ নেবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসি দিয়ে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় বলেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কখনো কোন সরকারকে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘আর ঋণ দেব না’ এই কথাটি বলতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। ঋণ খেলাপি শুধু এস আলম আর বেক্সিমকো নয়, ঋণের ভিন্ন ব্যবহার কেবল এই দুটি প্রতিষ্ঠান করেনি, করেছে আরও বহু প্রতিষ্ঠান। সব ঋণ খেলাপি আওয়ামী লীগের নয়, অন্যান্য দলেরও আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখ্য কাজ তপশীলি ব্যাংকগুলোকে ঠিক রাখা। ঠিক রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পরিদর্শন বিভাগকে যেভাবে সম্প্রসারণ করেছে, সেভাবে পরিদর্শন কর্মকা- সংহত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। প্রতিটি তপশীলি ব্যাংকের বেশির ভাগ ঋণ প্রতি বছর পরিদর্শন করা হয়, পর্যালোচিত হয়, শ্রেণীবিণ্যাসিত হয়। তারপরও কেন ঋণে এত অনিয়ম তার খোঁজ নেয়া জরুরি, বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা বা অপূর্ণতার অনুসন্ধান করা জরুরি। মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনে ডকুমেন্ট যাচাই করার চেয়ে ঋণ-সংশ্লিষ্ট কারখানা পরিদর্শনের আগ্রহ বেশি, এজন্যই সম্ভবত কারখানা পরিদর্শন একসময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কারখানা পরিদর্শন অপরিহার্য। অন্যদিকে নির্ধারিত তারিখের পূর্বে পরিদর্শন শেষ করে বাসায় অবস্থান করার কারণেও পরিদর্শকদের নৈতিক শক্তি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপনার কাছে বিক্রি হয়ে যায়। মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনের বড় দুর্বলতা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পরিদর্শন রিপোর্ট যথাযথ গুরুত্ব পায় না, গুরুত্ব পায় তখনই যখন ঋণগ্রহীতা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিদর্শনের আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে ঘুষ আর দুর্নীতি; সরাসরি ঘুষ না নিলেও বড় বড় কর্মকর্তারা অবসর গ্রহণের পর মোটা বেতনের চাকুরির নিশ্চয়তা পেয়ে যান। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, অবসর গ্রহণের পর কোন সরকারি কর্মকর্তারও কোন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি, যে নামেই হোক না কেন, করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা ফরজ।
মাঠ পর্যায়ের অনসাইট পরিদর্শন ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক বিবরণী সংগ্রহের মাধ্যমে অফসাইট তদারকি করে থাকে, এই অফসাইট তদারকি দ্বারা প্রতিটি তপশীলি ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা করা হয়। নিয়মিত এই পর্যালোচনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা-সবলতা সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক হালনাগাদ তথ্য পেয়ে থাকে। দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দিলেই দুর্বল ব্যাংকগুলোর বোর্ড বা পরিচালক পর্ষদের কার্যক্রম মনিটরিং করার নিমিত্তে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘পর্যবেক্ষক’ বহাল করা হয়। এছাড়া গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর প্রতিটি তপশীলি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ ব্যাংকে ডেকে এনে নিয়মিত সবক দিয়ে থাকেন। তারপরও ব্যাংক দেউলিয়া হয় কেন? কেন লক্ষ লক্ষ আমানতকারীকে নিজের টাকা পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে, কেন তাদের টাকা ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত আরোপ করা হচ্ছে, কেন তাদের আমানতের ওপর মুনাফা দেয়া হবে না, কেন একীভূত ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য জিরো হয়ে গেল? শেয়ারের মূল্য জিরো হয়ে যাওয়ার কথাটি গর্ব করে ঘোষণা করার কী কোন দরকার ছিল? বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমত হচ্ছে, লাভ না হলে মুনাফা দেবে না, কিন্তু ঋণগ্রহীতার বিনিয়োগে লোকসান হলে কি কোন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তার দায় নিয়েছে? এছাড়া যেসব আমনাতের ওপর মুনাফা দেয়া হবে না, সেই সব আমানতের ওপর বছরভিত্তিক মুনাফার হিসাব কষে সরকার কি তাদের ট্যাক্স কর্তন করে নিয়ে গেছে? যদি নিয়ে থাকে তা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা কি বাংলাদেশ ব্যাংক করবে?
বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের এক দিন আগেও ব্যাংকগুলোর অবস্থা এত খারাপ ছিল না, শেয়ারের মূল্য জিরো ছিল না, ব্যাংকগুলোর ওপর জনগণের আস্থায় কোন ছেদ ছিল না, ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তোলার হিড়িক ছিল না। যেদিন গভর্নর বললেন, দশটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে, ব্যাংকগুলোকে তাদের দুর্বলতাভিত্তিক লাল বা হলুদ করা হলো সেদিন থেকেই জনগণের আস্থায় ধস নেমেছে। তারপরও গভর্নর থেমে যাননি, দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলকের মতো এলোমেলো সিদ্ধান্ত নিতেই থাকলেন, ব্যাংকের মালিক ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তাকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি তার অবিমৃষ্যকারী কথাবার্তা বন্ধ করলেন না। আওয়ামী লীগের আমলে দেশের ভেতর ও বাইরে ইসলামিক ব্যাংক নিয়ে অবিরত অপপ্রচার করার পরও ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা অটুট ছিল, এই আস্থা অটুট রাখার জন্য তখন বাংলাদেশ ব্যাংকও দৃঢ় ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তৎকালীন গভর্নর আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে এই মর্মে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সাময়িক তারল্য সংকট থাকলেও আমানতকারীদের ভয়ের কোন কারণ নেই, কারণ ইসলামিক ব্যাংকের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী, তারপরও প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামিক ব্যাংককে টাকার জোগান দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন দৃঢ় অবস্থানের কারণে কোন ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়নি।
বর্তমান গভর্নর ক্ষমতায় বসেই জনগণকে শুধু দেউলিয়া ব্যাংকের সংবাদ দেননি, তিনি অবলীলায় বলে দিলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কোন রকম আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে না, এই কথা বলার সময় সম্ভবত তার খেয়াল ছিল না যে, তিনি তপশীলি ব্যাংকগুলোর অভিভাবক। স্কুলেও শেখানো হয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হচ্ছে তপশীলি ব্যাংকগুলোর ঋণপ্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে আমানত কেন রাখা হলো তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন, তিনি বললেন এই সকল আমানতের দায় তিনি নেবেন না, ছেলেমি কাকে বলে! বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত কোন ব্যাংকে টাকা কেন জনগণ রাখল এমন প্রশ্ন কোন বিচক্ষণ গভর্নর তুলতে পারেন বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। এই কথা বলার পর ঠেস দিয়ে বা প্রচুর অর্থের জোগান দিয়েও ব্যাংকগুলোর ধস আর থামানো যায়নি। এখনও অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকে সরকারের টাকা আমানত হিসেবে রাখতে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ তাদের অধীনস্থ সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে থাকে। সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন বৈমাত্রীয়সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল হওয়ার পথে প্রতিবন্ধতকা তৈরি করবে। অর্থ উপদেষ্টার পরামর্শে বা অন্য যে কোন কারণেই হোক, গভর্নর যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন সময়ও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, পরবর্তীকালে ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েও জনগণের নষ্ট আস্থা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর অন্য কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এই জাতীয় কথাবার্তা বলে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন বলে জানা নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় ব্যাংকের সংখ্যা অবশ্যই বেশি, আগের আমলে শুধু রাজনৈতিক কারণে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে বিভিন্ন পেশার লোকদের তুষ্ট করতেও। অতিরিক্ত ব্যাংকের অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতায় ঋণগ্রহীতার কদর বেড়ে গেলে নির্বিচারে ঋণ দেয়া শুরু হয় এবং খেলাপি ঋণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আগের সরকারের আমলেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংক একীভূতকরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, এবং তারই সূত্রে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে। কিন্তু এখন একীভূত করা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করে।এই একীভূতকরণেও রাজনীতি রয়েছে বলে মনে হয়। রাজনীতি ছিল বলেই সম্ভবত যে দুটি ব্যাংক নিজস্ব প্রচেষ্টায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল তাদের সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়া হয়নি। সাড়া দিলে ব্যাংকিং জগতে হ য ব র ল একটু কম হতো।রাজনৈতিক বিবেচনা না থাকলে এই একীভূতকরণে অধিকতর দুর্বল আরও কয়েকটি ব্যাংকের থাকার কথা ছিল। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌন সম্মতিতে ইসলামিক ব্যাংক শত শত কর্মচারীকে ছাঁটাই করতে পেরেছে। তাই স্বাধীনতা নয়, প্রয়োজন বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে যতটুকু সম্ভব নিরপেক্ষ ও নির্মোহ নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]