সাঈদ বারী
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প একসময় ছিল দেশের মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দর্পণ। বড় পর্দা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, মানুষের স্বপ্ন, আবেগ আর সংগ্রামের ভিজ্যুয়াল ব্যাখ্যা ছিল। গ্রাম থেকে শহর, শ্রমজীবী থেকে মধ্যবিত্তÑ সব শ্রেণির মানুষ সিনেমা হলে গিয়ে নিজেদের গল্প খুঁজে পেত। সিনেমা তখন কেবল বিনোদন নয়, মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবীÑ সবাই সিনেমা দেখার মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার সুযোগ পেত। কিন্তু গত দুই-তিন দশক ধরে এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকটে নিমজ্জিত। দর্শকের আস্থা কমে গেছে, প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমেছে, মানসম্মত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ও মান দুইই ক্ষীণ হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কি শুধু অতীতের গৌরবের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে, নাকি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনরুজ্জীবিত হবে?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, সামাজিক গল্প, গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম, প্রেম ও মানবিক সম্পর্কÑ সবকিছু মিলিয়ে সিনেমা মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছিল। প্রেক্ষাগৃহ ছিল সামাজিক মিলনকেন্দ্র। ঈদ উৎসব মানেই নতুন ছবি, নতুন গান, নতুন আলোচনার জন্ম। চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও গীতিকাররা সমাজে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতেন। সেই সময়ে চলচ্চিত্র ছিল শুধু ব্যবসা নয়, সাংস্কৃতিক দায়িত্বও বহন করত। ছবি দর্শককে সামাজিক ও নৈতিক বিষয় নিয়ে ভাবায়, একই সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যমে মুক্তি দিত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারায় ভাঙন আসে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গল্প ও সৃজনশীলতার ক্রমাবনতি। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কাহিনী, একই চরিত্র এবং অনুমেয় সমাপ্তি দর্শকের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। সমাজ ও মানুষের জীবন বদলেছে, সম্পর্কের ধরন ও সামাজিক প্রশ্ন নতুন রূপ নিয়েছে; কিন্তু চলচ্চিত্রে সেই পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে সিনেমা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দর্শক নিজেদের আর বড় পর্দায় খুঁজে পাচ্ছেন না। একই ধরনের গল্প ও অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি শিল্পের প্রগতি রোধ করছে।
অর্থনৈতিক দুর্বলতাও এই সংকটকে তীব্র করেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব ছিল। অনেক প্রযোজক দ্রুত লাভের আশায় স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় আটকে থাকেন। মানসম্মত নির্মাণের ঝুঁকি না নিয়ে পরীক্ষিত ফর্মুলার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এর ফলে দর্শকের আস্থা হারানো, প্রেক্ষাগৃহ ফাঁকা থাকা এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়া- এই দুষ্টচক্র চলচ্চিত্র শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিল্পে বিনিয়োগে অস্থিতিশীলতা এবং প্রযোজকদের স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। প্রতিভাবান নির্মাতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণে তাদের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
রাষ্ট্রীয় নীতির সীমাবদ্ধতাও শিল্পের উন্নয়নের পথে বাধা। চলচ্চিত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক শিল্প হিসেবে বিবেচনা না করে অনেক সময় কেবল বাণিজ্যিক পণ্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নীতি, কার্যকর প্রশিক্ষণ কাঠামো, গবেষণা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় শিল্পটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেন্সর ব্যবস্থার জটিলতা ও অস্পষ্টতা অনেক সময় নির্মাতাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা সীমিত করেছে। এতে নতুন বিষয়বস্তু ও সাহসী গল্প নির্মাণে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পের সৃজনশীলতা এবং দর্শকের চাহিদার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতাও একটি বড় সমস্যা। আধুনিক ক্যামেরা, উন্নত শব্দ, সম্পাদনা ও ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তি দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ছিল না। বিশ্ব যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, তখন আমাদের অনেক চলচ্চিত্র পুরনো কাঠামো ও কৌশলে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে গেছে, এবং দেশীয় সিনেমা বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রযুক্তির ঘাটতি শুধু চিত্রমানকে নয়, দর্শকপ্রিয়তাকেও প্রভাবিত করেছে।
চলচ্চিত্র হল সংকটও এই শিল্পের গভীর সমস্যা। একসময় দেশের প্রান্তপ্রান্তে প্রেক্ষাগৃহগুলো দর্শকে মুখর থাকত। এখন অনেক হল বন্ধ, অনেকগুলো বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। যারা টিকে আছে, তাদের অনেকের পরিবেশ দর্শকবান্ধব নয়। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং আধুনিক সুবিধার অভাবে পরিবার ও তরুণ দর্শক হলে যেতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ফলে সিনেমা দেখার সামাজিক অভ্যাস ভেঙে গেছে। দর্শকের অভ্যাস বদলানো ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের পুনর্জন্ম সম্ভব নয়।
তবে আশার আলো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ নির্মাতারা নতুন ভাষা ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেছেন। তাদের ছবিতে সমাজের বাস্তবতা, ব্যক্তিগত সংকট, রাজনৈতিক টানাপড়েন ও মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। এসব চলচ্চিত্র দেশীয় দর্শকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে প্রতিভা ও সৃজনশীলতার ঘাটতি নেই, বরং সাহসী নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি দৃঢ়ভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন তুলনামূলক কম বাজেটে মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও স্ট্রিমিং সেবার প্রসারে সিনেমার নতুন দর্শক তৈরি হচ্ছে। যারা হলে যেতে পারতেন না বা আগ্রহ হারিয়েছিলেন, তারা ঘরে বসে দেশীয় চলচ্চিত্র উপভোগ করতে পারছেন। এতে দর্শক ও চলচ্চিত্রের সংযোগ নতুনভাবে গড়ে উঠেছে।
দর্শকের রুচি পরিবর্তনও একটি ইতিবাচক দিক। আজকের দর্শক সহজ বিনোদনে সন্তুষ্ট নন; তারা শক্তিশালী গল্প, বাস্তব চরিত্র, নির্ভুল অভিনয় এবং সুসংগঠিত নির্মাণ প্রত্যাশা করেন। এই পরিবর্তিত রুচি নির্মাতাদের জন্য চাপ, আবার এক সুযোগও। সাম্প্রতিক কিছু চলচ্চিত্র প্রমাণ করেছে যে মানসম্মত ছবি হলে দর্শক এখনও হলে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। নির্মাতা, প্রযোজক, অভিনেতা, সমালোচক এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রসার, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহপ্রযোজনার সুযোগ বৃদ্ধি শিল্পকে টেকসই ভিত্তি দেবে। একই সঙ্গে আধুনিক ও দর্শকবান্ধব প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সংকট, অন্যদিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও নতুন প্রজন্মের উদ্যোগ। শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য সাহসী ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি জাতির স্মৃতি, চেতনা ও স্বপ্নের ধারক। সেই শিল্পকে প্রাণবন্ত করে তোলা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব এবং সময়ের দাবি।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র আবারও মানুষকে চিন্তা করতে, ভাবতে এবং সমাজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, সৃজনশীল সাহস, প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ, অর্থনৈতিক সমর্থন এবং দর্শকের আস্থা ফিরে আনা গেলে এই শিল্প নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে পারে। অতীতের গৌরব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের চাহিদা মেলাতে পারলে, চলচ্চিত্র আবারও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মর্যাদা ফিরে পাবে।
[লেখক: প্রকাশক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
সাঈদ বারী
শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প একসময় ছিল দেশের মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দর্পণ। বড় পর্দা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, মানুষের স্বপ্ন, আবেগ আর সংগ্রামের ভিজ্যুয়াল ব্যাখ্যা ছিল। গ্রাম থেকে শহর, শ্রমজীবী থেকে মধ্যবিত্তÑ সব শ্রেণির মানুষ সিনেমা হলে গিয়ে নিজেদের গল্প খুঁজে পেত। সিনেমা তখন কেবল বিনোদন নয়, মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবীÑ সবাই সিনেমা দেখার মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার সুযোগ পেত। কিন্তু গত দুই-তিন দশক ধরে এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকটে নিমজ্জিত। দর্শকের আস্থা কমে গেছে, প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমেছে, মানসম্মত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ও মান দুইই ক্ষীণ হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কি শুধু অতীতের গৌরবের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে, নাকি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনরুজ্জীবিত হবে?
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, সামাজিক গল্প, গ্রামীণ জীবনের সংগ্রাম, প্রেম ও মানবিক সম্পর্কÑ সবকিছু মিলিয়ে সিনেমা মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছিল। প্রেক্ষাগৃহ ছিল সামাজিক মিলনকেন্দ্র। ঈদ উৎসব মানেই নতুন ছবি, নতুন গান, নতুন আলোচনার জন্ম। চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও গীতিকাররা সমাজে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতেন। সেই সময়ে চলচ্চিত্র ছিল শুধু ব্যবসা নয়, সাংস্কৃতিক দায়িত্বও বহন করত। ছবি দর্শককে সামাজিক ও নৈতিক বিষয় নিয়ে ভাবায়, একই সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যমে মুক্তি দিত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারায় ভাঙন আসে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গল্প ও সৃজনশীলতার ক্রমাবনতি। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কাহিনী, একই চরিত্র এবং অনুমেয় সমাপ্তি দর্শকের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। সমাজ ও মানুষের জীবন বদলেছে, সম্পর্কের ধরন ও সামাজিক প্রশ্ন নতুন রূপ নিয়েছে; কিন্তু চলচ্চিত্রে সেই পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে সিনেমা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দর্শক নিজেদের আর বড় পর্দায় খুঁজে পাচ্ছেন না। একই ধরনের গল্প ও অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি শিল্পের প্রগতি রোধ করছে।
অর্থনৈতিক দুর্বলতাও এই সংকটকে তীব্র করেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব ছিল। অনেক প্রযোজক দ্রুত লাভের আশায় স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় আটকে থাকেন। মানসম্মত নির্মাণের ঝুঁকি না নিয়ে পরীক্ষিত ফর্মুলার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এর ফলে দর্শকের আস্থা হারানো, প্রেক্ষাগৃহ ফাঁকা থাকা এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়া- এই দুষ্টচক্র চলচ্চিত্র শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিল্পে বিনিয়োগে অস্থিতিশীলতা এবং প্রযোজকদের স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। প্রতিভাবান নির্মাতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণে তাদের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
রাষ্ট্রীয় নীতির সীমাবদ্ধতাও শিল্পের উন্নয়নের পথে বাধা। চলচ্চিত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক শিল্প হিসেবে বিবেচনা না করে অনেক সময় কেবল বাণিজ্যিক পণ্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নীতি, কার্যকর প্রশিক্ষণ কাঠামো, গবেষণা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় শিল্পটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেন্সর ব্যবস্থার জটিলতা ও অস্পষ্টতা অনেক সময় নির্মাতাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা সীমিত করেছে। এতে নতুন বিষয়বস্তু ও সাহসী গল্প নির্মাণে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পের সৃজনশীলতা এবং দর্শকের চাহিদার মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতাও একটি বড় সমস্যা। আধুনিক ক্যামেরা, উন্নত শব্দ, সম্পাদনা ও ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তি দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ছিল না। বিশ্ব যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, তখন আমাদের অনেক চলচ্চিত্র পুরনো কাঠামো ও কৌশলে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে গেছে, এবং দেশীয় সিনেমা বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রযুক্তির ঘাটতি শুধু চিত্রমানকে নয়, দর্শকপ্রিয়তাকেও প্রভাবিত করেছে।
চলচ্চিত্র হল সংকটও এই শিল্পের গভীর সমস্যা। একসময় দেশের প্রান্তপ্রান্তে প্রেক্ষাগৃহগুলো দর্শকে মুখর থাকত। এখন অনেক হল বন্ধ, অনেকগুলো বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। যারা টিকে আছে, তাদের অনেকের পরিবেশ দর্শকবান্ধব নয়। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং আধুনিক সুবিধার অভাবে পরিবার ও তরুণ দর্শক হলে যেতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ফলে সিনেমা দেখার সামাজিক অভ্যাস ভেঙে গেছে। দর্শকের অভ্যাস বদলানো ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের পুনর্জন্ম সম্ভব নয়।
তবে আশার আলো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ নির্মাতারা নতুন ভাষা ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেছেন। তাদের ছবিতে সমাজের বাস্তবতা, ব্যক্তিগত সংকট, রাজনৈতিক টানাপড়েন ও মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। এসব চলচ্চিত্র দেশীয় দর্শকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে প্রতিভা ও সৃজনশীলতার ঘাটতি নেই, বরং সাহসী নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি দৃঢ়ভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন তুলনামূলক কম বাজেটে মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও স্ট্রিমিং সেবার প্রসারে সিনেমার নতুন দর্শক তৈরি হচ্ছে। যারা হলে যেতে পারতেন না বা আগ্রহ হারিয়েছিলেন, তারা ঘরে বসে দেশীয় চলচ্চিত্র উপভোগ করতে পারছেন। এতে দর্শক ও চলচ্চিত্রের সংযোগ নতুনভাবে গড়ে উঠেছে।
দর্শকের রুচি পরিবর্তনও একটি ইতিবাচক দিক। আজকের দর্শক সহজ বিনোদনে সন্তুষ্ট নন; তারা শক্তিশালী গল্প, বাস্তব চরিত্র, নির্ভুল অভিনয় এবং সুসংগঠিত নির্মাণ প্রত্যাশা করেন। এই পরিবর্তিত রুচি নির্মাতাদের জন্য চাপ, আবার এক সুযোগও। সাম্প্রতিক কিছু চলচ্চিত্র প্রমাণ করেছে যে মানসম্মত ছবি হলে দর্শক এখনও হলে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। নির্মাতা, প্রযোজক, অভিনেতা, সমালোচক এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রসার, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সহপ্রযোজনার সুযোগ বৃদ্ধি শিল্পকে টেকসই ভিত্তি দেবে। একই সঙ্গে আধুনিক ও দর্শকবান্ধব প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সংকট, অন্যদিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও নতুন প্রজন্মের উদ্যোগ। শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য সাহসী ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি জাতির স্মৃতি, চেতনা ও স্বপ্নের ধারক। সেই শিল্পকে প্রাণবন্ত করে তোলা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব এবং সময়ের দাবি।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র আবারও মানুষকে চিন্তা করতে, ভাবতে এবং সমাজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, সৃজনশীল সাহস, প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ, অর্থনৈতিক সমর্থন এবং দর্শকের আস্থা ফিরে আনা গেলে এই শিল্প নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে পারে। অতীতের গৌরব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের চাহিদা মেলাতে পারলে, চলচ্চিত্র আবারও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মর্যাদা ফিরে পাবে।
[লেখক: প্রকাশক]