alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

আনোয়ারুল হক

: বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগ তো শেষ হয়েও হইলো না শেষ। তার আগেই হঠাৎ করে মব সন্ত্রাসীরা গেল কই? গত কয়েকদিন যাবত মবের উৎপাতের খবর পাচ্ছি না। কেন? সহজ উত্তর। কোথায় নীতি, কোথায় জোট / সবার চাই আওয়ামী ভোট। হ্যাঁ, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল ও প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ অনুসারী ও সমর্থকদের ভোট পেতে মরীয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট দুপুর থেকেই যারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছেন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছেন, পিটিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের হত্যাও করেছেন, নির্বিচারে আওয়ামীলীগের সমর্থকদের খুনের মামলার আসামি বানিয়েছেন, স্বাধীনতার স্মৃতি ঘর ৩২নং-এর বাড়িটিকে ফ্যাসিবাদের আস্তানা হিসেবে আখ্যায়িত করে তা ভেঙে ফেলার যাবতীয় আয়োজন করেছেন, তাদের সবার কন্ঠেই আজ ভিন্ন সুর! সাধে কি আর ঐতিহাসিকরা বারবার সেই উক্তির উল্লেখ করেন, ‘সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ! দিনে প্রখর সূর্যের তাপ আর রাতে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, হৃদয় জুড়িয়ে যায়।’

রাজপথে কণ্ঠনালি কাঁপিয়ে ‘ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ’ আর ফ্যসিবাদের দোসরদের নির্মূল করার স্লোগান উচ্চারণ যারা করেছেন তারা এখন বলছেন, নিরপরাধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট চাই। আওয়ামী লীগের সমর্থক আবার নিরপরাধ হয় কীভাবে? যদি হয়ে থাকে তবে তারা নির্বিচারে খুনের আসামি কেমনে হলো? যদি নিরপরাধ হয়েই থাকে তবে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে যেয়ে যে বিপ্লবীরা নিজেরাই দগ্ধ হয়ে মারা গিয়ে জুলাই শহীদের খাতায় নাম লিখিয়ে অতঃপর বাড়ির মালিক ষড়যন্ত্রমূলক আমন্ত্রণ করে এনেছিল-এই অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে খুনের মামলা দেয়া হলো কেন? আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী সমর্থক যদি বিগত দীর্ঘ আওয়ামী শাসনামলে কোনো ধরনের অপরাধ না করে থাকেন বা ভিন্ন মত দমনে কোনো ধরনের ভূমিকা না রেখেও থাকেন-তারপরও তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে ‘পেয়ারা পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার অপরাধে দুষ্ট’ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করাটাইতো সবচেয়ে ‘বড় অপরাধ’। তারপরেও সেই অপরাধীদের ভোট চাই!

স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতাকারী ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সব দুষ্কর্মের সহযোগী জামায়াতে ইসলাম দলের নায়েবে আমীর সম্প্রতি এক নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত না করে ভাই সম্বোধন করে বলেন, ‘এবার তো মুজিব ভাই নেই তাহলে আপনাদের আগের অনুভূতিতে তো দুই নম্বরে আমি আছি তাহলে ইনশাআল্লাহ, এবার আপনারা আমাকে “ভাট দেবেন” চৌদ্দগ্রামের কালিকাপুরে এক নির্বাচনী সভায় তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে উপস্থিত করার ব্যবস্থা করেন। ২০১৫ সালে তৎকালীন জামায়াত কর্মীদের দ্বারা পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনায় ৫ আগস্টের পরে দ্বিতীয় দফা দায়ের করা এক মামলার জামিনে থাকা আসামি জামিন বহাল রাখতে চাইলে নায়েবে আমিরের নির্দেশমতো সভায় আসতে হবে এবং অন্তত মাহতারানের জন্য দোয়া চাইতে হবে। যাইহোক নায়েবে আমিরের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতির দোয়া-প্রার্থনার পর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আবার মাইকে এসে বলেন ‘সালাহউদ্দিন কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝছেন তো? কোথায় ভোট দেয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’ আহারে ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ভোট পাওয়ার জন্য কী আকুতি!

নিরাপত্তার আশ্বাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষকতা- এমনকি চাষাবাদ করার অনুমতির নিশ্চয়তা দেয়ার নামে প্রকৃত পক্ষে কৌশলে হুমকি দেয়া হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগের সমর্থকদের। জামায়াত ইসলাম নেতা গোলাম পরওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন হিন্দু মানে নৌকা নয়, এবার হিন্দু মানে দাঁড়িপাল্লা। আর এ কাজে আবার তার প্রধান সহযোগী আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রী নারায়ণ চন্দের বিশ্বস্ত কর্মী বিষ্ণু নন্দী।

রাজপথে কণ্ঠনালি কাঁপিয়ে ‘ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ’ আর ফ্যসিবাদের দোসরদের নির্মূল করার স্লোগান উচ্চারণ যারা করেছেন তারা এখন বলছেন, নিরপরাধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট চাই। আওয়ামী লীগের সমর্থক আবার নিরপরাধ হয় কীভাবে? যদি হয়ে থাকে তবে তারা নির্বিচারে খুনের আসামি কেমনে হলো?

জামায়াত ইসলামের সহযোগী দল এনসিপি বলার চেষ্টা করছে ছাত্রলীগের অনেকেই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সরাসরি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। তেমনি আওয়ামী ভোটারদের একটা অংশও নির্বাচনে তাদের ভোট দিবে। এনসিপির উগ্রপন্থীদের নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ তো ইঙ্গিতে বলেছেন একটি দলের লোকজন তাকে গোপনে ভোট দেবেন। সবার ভোটই তো গোপনে হওয়ার কথা। একটি দলের লোক ব্যতিত সবাই কি তাকে প্রকাশ্যে ভোট দেবেন? যাইহোক, এনসিপির লক্ষ্য শাপলা কলির আসনগুলোতে যাতে করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা কম আসেন এবং আসলেও ভয় ভীতি দেখিয়ে তাদের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা। যতই মুখে নতুন ব্যবস্থার কথা বলুক, যতই মুখে সংস্কারের ফেনা উঠুক-জামাতকে যেমন তারা বুকে জড়িয়ে ধরেছে তেমনি সব কার্যক্রমে ও আচরণে তারা পুরোনো ব্যবস্থাকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে।

এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনী সমাবেশে বলছেন, দেশে শুধু দুটোই মার্কা। নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। দাঁড়িপাল্লা মার্কার দল স্বাধীনতাবিরোধীদের দল। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন ভালো করেছেন। এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি, আপনাদের পাশে। আওয়ামী লীগের বিনা অপরাধীদের সঙ্গে তিনি ও তার দল থাকবে।’

বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ৫ আগস্ট পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও দখলবাজি চালালেও এবং ‘চাঁদা আনতে পারলে পুরস্কার, ধরা পড়লে বহিষ্কার’ নীতি অবলম্বন করলেও, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম নিষিদ্ধের পক্ষপাতি বিএনপি ছিল না। নিষিদ্ধ করার কৌশল হিসেবে সরকারি প্রশ্রয়ে যে মব জমায়েত করা হয়েছিল, সে জমায়েতে তারা শামিল হননি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই মব সন্ত্রাস, নির্বিচার হামলা মামলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে, উগ্র দক্ষিণ পন্থা ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উত্থানের বিপরীতে বিএনপি শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেনি। ফলে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ বিএনপির হাতে যতটা থাকার কথা ছিল ততটা থাকেনি।

এ পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী জোট, দল বা ব্যক্তি সবার নজর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটের দিকে। আর আওয়ামী লীগ ভোটে না থেকেও ভোটের মাঠে আছে। এক চরম সংকটপূর্ণ সময়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি থেকে যেমন তারা রেহাই পেল তেমনি আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন যে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি এ প্রশ্ন আরো জোরালোভাবে উত্থাপনের সুযোগ থাকল। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজন না করায় এবং নির্বাচন ও গণভোটে সরকারের পক্ষপাত দুষ্ট ভূমিকা দৃশ্যমান হয়ে পড়ায় ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাই নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তোর পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মাঝে এক গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজমান। আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এতটুকু আত্মসমালোচনা না করেও বহাল তবিয়তে বিরোধীদের মাধ্যমেই ভোটের মাঠে আছে; বিনাশ্রমে শক্তি সন্চয় করছে। আর যারা এতদিন সংস্কার সংস্কার করে কণ্ঠনালি ফুলিয়েছেন তারা নিজ দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।

সরকার অবশ্য ইতোমধ্যে ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একধরনের বৈষম্যবিরোধী সংস্কার আয়োজন করছেন। সরকারি কর্মচারীদের ফ্ল্যাটের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ আয়তনের অর্থাৎ প্রায় দশ হাজার স্কয়ার ফিটের ৭২টি বিলাসবহুল বৈষম্যবিরোধী ফ্ল্যাট নির্মাণের একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার, যেখানে সুইমিংপুল, জিম ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধা থাকবে। এর পরে হয়তো সংসদ সদস্যদের জন্য সাত হাজার বা সাড়ে সাত হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এই সব বৈষম্যবিরোধী আবাসস্থলে থাকার যোগ্যতা অর্জনের অধীর আগ্রহ থেকেই জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতারা সংসদে আসনের জন্য বিএনপি ও জামাতের সঙ্গে দর-কষাকষি করে আসছিলেন। বিএনপির সঙ্গে ব্যাটে-বলে না মেলায় তারা বেছে নিয়েছেন অর্থবিত্তে ও সংগঠনগতভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশের জন্ম যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতকে।

অন্যদিকে জামায়াত-বিএনপি দুই দলের প্রার্থীরাই বলছেন তারা নাকি সব সময় ভোটারদের কাছে সেকেন্ড চয়েস ছিলেন এবং ফার্স্ট চয়েস যেহেতু ভোটে নাই তাই সেকেন্ড চয়েসকে বেছে নিতে হবে। আর এভাবেই ভোটে না থাকলেও ভোটের মাঠে থাকছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের জন্য জুলাই’২৪-ছিল প্রখর সূর্যের তাপ আর জানুয়ারি’২৫-এ ভোটের মাঠে যেন স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, হৃদয় জুড়িয়ে যায়!

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

শীতকালীন অসুখ-বিসুখ

দিশাহীন অর্থনীতি, নিষ্ক্রিয় অন্তর্বর্তী সরকার

নরসুন্দরের পোয়াবারো

জামায়াতের ‘অক্টোপাস পলিসি’ কৌশল নাকি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি?

ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও গোলক ধাঁধা

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

ছবি

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

আনোয়ারুল হক

বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগ তো শেষ হয়েও হইলো না শেষ। তার আগেই হঠাৎ করে মব সন্ত্রাসীরা গেল কই? গত কয়েকদিন যাবত মবের উৎপাতের খবর পাচ্ছি না। কেন? সহজ উত্তর। কোথায় নীতি, কোথায় জোট / সবার চাই আওয়ামী ভোট। হ্যাঁ, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল ও প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ অনুসারী ও সমর্থকদের ভোট পেতে মরীয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট দুপুর থেকেই যারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছেন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছেন, পিটিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের হত্যাও করেছেন, নির্বিচারে আওয়ামীলীগের সমর্থকদের খুনের মামলার আসামি বানিয়েছেন, স্বাধীনতার স্মৃতি ঘর ৩২নং-এর বাড়িটিকে ফ্যাসিবাদের আস্তানা হিসেবে আখ্যায়িত করে তা ভেঙে ফেলার যাবতীয় আয়োজন করেছেন, তাদের সবার কন্ঠেই আজ ভিন্ন সুর! সাধে কি আর ঐতিহাসিকরা বারবার সেই উক্তির উল্লেখ করেন, ‘সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ! দিনে প্রখর সূর্যের তাপ আর রাতে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, হৃদয় জুড়িয়ে যায়।’

রাজপথে কণ্ঠনালি কাঁপিয়ে ‘ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ’ আর ফ্যসিবাদের দোসরদের নির্মূল করার স্লোগান উচ্চারণ যারা করেছেন তারা এখন বলছেন, নিরপরাধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট চাই। আওয়ামী লীগের সমর্থক আবার নিরপরাধ হয় কীভাবে? যদি হয়ে থাকে তবে তারা নির্বিচারে খুনের আসামি কেমনে হলো? যদি নিরপরাধ হয়েই থাকে তবে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে যেয়ে যে বিপ্লবীরা নিজেরাই দগ্ধ হয়ে মারা গিয়ে জুলাই শহীদের খাতায় নাম লিখিয়ে অতঃপর বাড়ির মালিক ষড়যন্ত্রমূলক আমন্ত্রণ করে এনেছিল-এই অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে খুনের মামলা দেয়া হলো কেন? আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী সমর্থক যদি বিগত দীর্ঘ আওয়ামী শাসনামলে কোনো ধরনের অপরাধ না করে থাকেন বা ভিন্ন মত দমনে কোনো ধরনের ভূমিকা না রেখেও থাকেন-তারপরও তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে ‘পেয়ারা পাকিস্তানকে ভেঙে ফেলার অপরাধে দুষ্ট’ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করাটাইতো সবচেয়ে ‘বড় অপরাধ’। তারপরেও সেই অপরাধীদের ভোট চাই!

স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতাকারী ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সব দুষ্কর্মের সহযোগী জামায়াতে ইসলাম দলের নায়েবে আমীর সম্প্রতি এক নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগের সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত না করে ভাই সম্বোধন করে বলেন, ‘এবার তো মুজিব ভাই নেই তাহলে আপনাদের আগের অনুভূতিতে তো দুই নম্বরে আমি আছি তাহলে ইনশাআল্লাহ, এবার আপনারা আমাকে “ভাট দেবেন” চৌদ্দগ্রামের কালিকাপুরে এক নির্বাচনী সভায় তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে উপস্থিত করার ব্যবস্থা করেন। ২০১৫ সালে তৎকালীন জামায়াত কর্মীদের দ্বারা পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনায় ৫ আগস্টের পরে দ্বিতীয় দফা দায়ের করা এক মামলার জামিনে থাকা আসামি জামিন বহাল রাখতে চাইলে নায়েবে আমিরের নির্দেশমতো সভায় আসতে হবে এবং অন্তত মাহতারানের জন্য দোয়া চাইতে হবে। যাইহোক নায়েবে আমিরের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতির দোয়া-প্রার্থনার পর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আবার মাইকে এসে বলেন ‘সালাহউদ্দিন কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝছেন তো? কোথায় ভোট দেয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’ আহারে ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ভোট পাওয়ার জন্য কী আকুতি!

নিরাপত্তার আশ্বাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষকতা- এমনকি চাষাবাদ করার অনুমতির নিশ্চয়তা দেয়ার নামে প্রকৃত পক্ষে কৌশলে হুমকি দেয়া হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগের সমর্থকদের। জামায়াত ইসলাম নেতা গোলাম পরওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন হিন্দু মানে নৌকা নয়, এবার হিন্দু মানে দাঁড়িপাল্লা। আর এ কাজে আবার তার প্রধান সহযোগী আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রী নারায়ণ চন্দের বিশ্বস্ত কর্মী বিষ্ণু নন্দী।

রাজপথে কণ্ঠনালি কাঁপিয়ে ‘ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ’ আর ফ্যসিবাদের দোসরদের নির্মূল করার স্লোগান উচ্চারণ যারা করেছেন তারা এখন বলছেন, নিরপরাধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট চাই। আওয়ামী লীগের সমর্থক আবার নিরপরাধ হয় কীভাবে? যদি হয়ে থাকে তবে তারা নির্বিচারে খুনের আসামি কেমনে হলো?

জামায়াত ইসলামের সহযোগী দল এনসিপি বলার চেষ্টা করছে ছাত্রলীগের অনেকেই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সরাসরি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। তেমনি আওয়ামী ভোটারদের একটা অংশও নির্বাচনে তাদের ভোট দিবে। এনসিপির উগ্রপন্থীদের নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ তো ইঙ্গিতে বলেছেন একটি দলের লোকজন তাকে গোপনে ভোট দেবেন। সবার ভোটই তো গোপনে হওয়ার কথা। একটি দলের লোক ব্যতিত সবাই কি তাকে প্রকাশ্যে ভোট দেবেন? যাইহোক, এনসিপির লক্ষ্য শাপলা কলির আসনগুলোতে যাতে করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা কম আসেন এবং আসলেও ভয় ভীতি দেখিয়ে তাদের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা। যতই মুখে নতুন ব্যবস্থার কথা বলুক, যতই মুখে সংস্কারের ফেনা উঠুক-জামাতকে যেমন তারা বুকে জড়িয়ে ধরেছে তেমনি সব কার্যক্রমে ও আচরণে তারা পুরোনো ব্যবস্থাকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে।

এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচনী সমাবেশে বলছেন, দেশে শুধু দুটোই মার্কা। নৌকা আর ধানের শীষ। নৌকা এখন নেই, তাহলে ভোট দেবেন ধানের শীষে। দাঁড়িপাল্লা মার্কার দল স্বাধীনতাবিরোধীদের দল। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। তিনি ভারতে গেছেন ভালো করেছেন। এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আপনারা বিপদে পড়বেন না। আমরা আছি, আপনাদের পাশে। আওয়ামী লীগের বিনা অপরাধীদের সঙ্গে তিনি ও তার দল থাকবে।’

বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ৫ আগস্ট পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও দখলবাজি চালালেও এবং ‘চাঁদা আনতে পারলে পুরস্কার, ধরা পড়লে বহিষ্কার’ নীতি অবলম্বন করলেও, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম নিষিদ্ধের পক্ষপাতি বিএনপি ছিল না। নিষিদ্ধ করার কৌশল হিসেবে সরকারি প্রশ্রয়ে যে মব জমায়েত করা হয়েছিল, সে জমায়েতে তারা শামিল হননি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই মব সন্ত্রাস, নির্বিচার হামলা মামলা নির্যাতনের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে, উগ্র দক্ষিণ পন্থা ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উত্থানের বিপরীতে বিএনপি শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেনি। ফলে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ বিএনপির হাতে যতটা থাকার কথা ছিল ততটা থাকেনি।

এ পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী জোট, দল বা ব্যক্তি সবার নজর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটের দিকে। আর আওয়ামী লীগ ভোটে না থেকেও ভোটের মাঠে আছে। এক চরম সংকটপূর্ণ সময়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি থেকে যেমন তারা রেহাই পেল তেমনি আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন যে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি এ প্রশ্ন আরো জোরালোভাবে উত্থাপনের সুযোগ থাকল। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজন না করায় এবং নির্বাচন ও গণভোটে সরকারের পক্ষপাত দুষ্ট ভূমিকা দৃশ্যমান হয়ে পড়ায় ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাই নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তোর পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মাঝে এক গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজমান। আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এতটুকু আত্মসমালোচনা না করেও বহাল তবিয়তে বিরোধীদের মাধ্যমেই ভোটের মাঠে আছে; বিনাশ্রমে শক্তি সন্চয় করছে। আর যারা এতদিন সংস্কার সংস্কার করে কণ্ঠনালি ফুলিয়েছেন তারা নিজ দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।

সরকার অবশ্য ইতোমধ্যে ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একধরনের বৈষম্যবিরোধী সংস্কার আয়োজন করছেন। সরকারি কর্মচারীদের ফ্ল্যাটের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ আয়তনের অর্থাৎ প্রায় দশ হাজার স্কয়ার ফিটের ৭২টি বিলাসবহুল বৈষম্যবিরোধী ফ্ল্যাট নির্মাণের একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার, যেখানে সুইমিংপুল, জিম ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধা থাকবে। এর পরে হয়তো সংসদ সদস্যদের জন্য সাত হাজার বা সাড়ে সাত হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এই সব বৈষম্যবিরোধী আবাসস্থলে থাকার যোগ্যতা অর্জনের অধীর আগ্রহ থেকেই জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতারা সংসদে আসনের জন্য বিএনপি ও জামাতের সঙ্গে দর-কষাকষি করে আসছিলেন। বিএনপির সঙ্গে ব্যাটে-বলে না মেলায় তারা বেছে নিয়েছেন অর্থবিত্তে ও সংগঠনগতভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশের জন্ম যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতকে।

অন্যদিকে জামায়াত-বিএনপি দুই দলের প্রার্থীরাই বলছেন তারা নাকি সব সময় ভোটারদের কাছে সেকেন্ড চয়েস ছিলেন এবং ফার্স্ট চয়েস যেহেতু ভোটে নাই তাই সেকেন্ড চয়েসকে বেছে নিতে হবে। আর এভাবেই ভোটে না থাকলেও ভোটের মাঠে থাকছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের জন্য জুলাই’২৪-ছিল প্রখর সূর্যের তাপ আর জানুয়ারি’২৫-এ ভোটের মাঠে যেন স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, হৃদয় জুড়িয়ে যায়!

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

back to top