মাহরুফ চৌধুরী
(শেষাংশ)
একজন প্রকৃত শিক্ষক তার উপস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল পাঠদানের মাধ্যম নয়, বরং একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তোলেন। এই আশ্রয় নিছক শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একধরনের মানসিক, মানবিক ও নৈতিক নিরাপত্তাবোধ, যা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং স্বপ্নের ভিত্তি নির্মাণ করে। শিক্ষার্থীরা যখন তার চোখের দিকে তাকায়, তখন তারা খুঁজে পায় এক ধরনের নিশ্চিন্ত ভরসা; তার কণ্ঠে শুনতে পায় ন্যায়বোধের এক স্থির, অবিচল উচ্চারণ; আর তার অবস্থানে তারা দেখতে পায় এক দৃঢ় নৈতিক অবস্থান, যা কোনো চাপে, কোনো সুবিধার মোহে বিচলিত হয় না। এই বিশ্বাস, এই নির্ভরতা একদিনে জন্মায় না, এবং পাঠদানের নিপুণতা দিয়ে একে অর্জনও করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় হৃদয়ের প্রশস্ততা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার পরিচয়, প্রেক্ষাপট, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সমান মর্যাদায় স্থান পায়। প্রয়োজন হয় নৈতিক বোধের দৃঢ়তা, যা শিক্ষককে ন্যায়ের পক্ষে অবিচল রাখে, এমনকি যখন তা অসুবিধাজনক বা জনপ্রিয় নয়। এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মানবিক সহানুভূতির গভীর চর্চা যার মাধ্যমে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর অদৃশ্য যন্ত্রণা, নিঃশব্দ সংকট এবং নিগূঢ় আকাক্সক্ষাকে অনুভব করতে পারেন। এই প্রসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন. ‘শিক্ষা হল সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা ব্যবহার করে তুমি পৃথিবী পরিবর্তন করতে পারো;। কিন্তু এই ‘অস্ত্র’ যদি একজন শিক্ষকের হাতেই থাকে, তবে তার হৃদয় না থাকলে, তার নৈতিকতা না থাকলে, তা আর পরিবর্তনের অস্ত্র নয় বরং তা হয়ে ওঠে নিছক তথ্য সঞ্চালনের যন্ত্র। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাই শুধু জ্ঞানের বাহক নন, তিনি হয়ে ওঠেন করুণা, ন্যায় ও স্বপ্নের ধারক।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে যখন কেবল পাঠদাতা হিসেবে নয়, বরং এক মানবিক সত্তা হিসেবে দেখতে শেখে যিনি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাদের মতামতকে মূল্য দেন, এবং তাদের সত্যিকার সম্ভাবনার খোঁজ করেন, তখনই গড়ে ওঠে শিক্ষা নামক সম্পর্কের গভীরতম বন্ধন। এই সম্পর্কের বুননেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল, নৈতিক ও মননশীল নাগরিক। প্রকৃতপক্ষে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিক্ষকদের হাত ধরে। সে কারণেই বলা হয়ে থাকে,‘শিক্ষকেরাই জাতির কারিগর’। তারা কেবল ছাত্র নয়, গড়ে তোলেন ভবিষ্যতের নাগরিক, চিন্তক, নেতা, শিল্পী, নীতিনির্ধারক ও সমাজ-পরিবর্তক। তাই একজন শিক্ষক যখন সত্যিকার অর্থে দায়িত্বশীল হন, তখন তার কর্মক্ষেত্র কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার স্নেহ, ন্যায়বোধ এবং নৈতিক অবস্থান দিয়েই তিনি সমাজের ভিত গড়ে তোলেন। একটি শিক্ষার্থী যদি তার শিক্ষকের মধ্যে সাহস দেখে সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার, ন্যায় ও মানবিকতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার সাহস তাহলে সেই শিক্ষার্থীও সাহসী হয়ে ওঠে। সাহস তখন সংক্রামিত হয়; শিক্ষা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের, প্রতিবিম্বনের এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাবানের বিপরীতে দাঁড়ানোর ভাষা। শিক্ষক যদি ভালোবাসা দেন, যেটা নির্বাচনহীন, নিঃস্বার্থ ও আত্মিক ভালোবাসা, তাহলে শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ওঠে এক প্রকার বিশ্বাস, যা তাকে মানুষ হতে শেখায়। সেই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, পরোপকার এবং দায়িত্ববোধ। যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা সেই, যা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষ করে’। এই ‘মানুষ করে তোলা’র পেছনে সবচেয়ে বড় হাত একজন শিক্ষকেরই যিনি নিজে মানুষ হয়ে ওঠেন, এবং তার ছাত্রদের মানুষ করে তোলেন। আর যখন একজন শিক্ষক ন্যায়বোধ শেখান তা শুধু কথায় নয়, তার নিজের অবস্থানে, ব্যবহারে এবং নীরব প্রতিরোধে। তখন শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করে সমাজ কেবল নিয়ম বা আইন দিয়ে চলে না; এর প্রাণশক্তি আসে ন্যায়, বিবেক ও সহানুভূতির মতো নৈতিক গুণাবলি থেকে। তখন শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে শুধু পেশাজীবী নয়, ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক হয়ে ওঠে, যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবে।
পারস্যের দার্শনিক সুফি কবি ও গণিতজ্ঞ রুমি এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘তুমি কি এখনও জানো না? তোমার আলোই পৃথিবীকে আলোকিত করে’। এই আলো, এই অন্তর্জাগতিক দীপ্তিই একজন শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে প্রবাহিত হয়। আর সেখান থেকেই আলোকিত হয় একটি সমাজ, একদিন আলোকিত হয় একটি জাতি। এই কারণেই শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি ত্যাগ, একটি নৈতিক অভিযাত্রা। সেই অভিযাত্রায় একজন শিক্ষক যখন তার পথটিকে সত্য, সাহস ও ভালোবাসার আলোয় আলোকিত করেন, তখন তার ছাত্রেরা শুধু পাস করে না, উত্তীর্ণ হয় মানুষ হয়ে ওঠার পরীক্ষায়। এই সময় যখন সমাজ নানা প্রতিকূলতা, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পথ খুঁজছে, যখন মূল্যবোধের সংকট, বিভাজনের রাজনীতি ও নিঃসংগত অন্যায় ঘনীভূত হয়ে উঠছে ঠিক তখনই একজন শিক্ষকের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এই অস্থির সময়ে শিক্ষকই হতে পারেন স্থিরতার প্রতীক, নৈতিক পথপ্রদর্শক এবং মানবিক সংলাপের সূচনাকারী।
বর্তমান সময় আমাদের শিক্ষকতাকে কেবল পেশাগত দক্ষতা দিয়ে বিচার করতে দিচ্ছে না। এখন প্রয়োজন প্রতিটি শিক্ষকের নিজের ভূমিকা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। তার অবস্থান, নীরবতা, কিংবা অবস্থানহীনতাকে নৈতিক আত্মসমালোচনার চোখে নতুন করে দেখা। আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনার এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই, কারণ শিক্ষার্থীরা আর শুধু পাঠ শিখতে চায় না। তারা শিক্ষককে দেখে, বুঝতে চায় তার অবস্থান, অনুধাবন করতে চায় তিনি সত্যের পক্ষে আছেন কিনা।
শিক্ষকতার মূল হৃদয়ে রয়েছে এক ধরনের নৈতিক সাহস যা প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের চাপকে অগ্রাহ্য করে, সামাজিক প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ায়, এবং প্রতিটি অসহায় শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। এই সাহসই শিক্ষককে শিক্ষক করে তোলে, নাহলে তিনি হয়ে ওঠেন কেবল একজন পাঠদাতা, যিনি পঠিত পাঠদানের বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন না। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় ভারতীয় শিক্ষাবিদ জে. কৃষ্ণমূর্তির একটি গভীর উপলব্ধির কথা। তার মতে, ‘প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বন্ধ হয়ে গেলেই প্রকৃত শিক্ষা লাভ হয়’। যেখানে প্রতিযোগিতা থেমে যায়, সেখানে শুরু হয় প্রকৃত শিক্ষা। এই শিক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন একজন শিক্ষক নিজেকেই প্রশ্ন করতে শেখেন, নিজেকে বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়ান: আমি যা বলছি, তা কি আমি নিজেই পালন করছি? আমি কি শিক্ষার্থীদের সামনে এমন এক মানবিক প্রতিমূর্তি তুলে ধরছি যা তারা অনুসরণ করতে পারবে? শিক্ষকতা তাই শুধুই শেখানো নয়, এটি প্রতিনিয়ত এই প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হওয়া যে, আপনি কি সত্যিই শিক্ষকের মতো আচরণ করছেন? আপনি কি কেবল একজন প্রতিষ্ঠান-নির্ভর পেশাজীবী, নাকি একজন আদর্শ-বাহক মানুষ? আপনি কি নীরব দর্শক, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতন্ত্রপ্রহরী ও অটল কণ্ঠস্বর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা কষ্টদায়ক হতে পারে, কিন্তু এগুলোর মুখোমুখি হওয়া ছাড়া শিক্ষকতা পূর্ণতা পায় না। বরং এখান থেকেই শিক্ষকতার পুনর্জাগরণ শুরু হয় যেখানে সাহস, সহানুভূতি এবং ন্যায়বোধ মিলিয়ে গড়ে ওঠে এমন এক ভূমিকা, যা বদলে দিতে পারে শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, পুরো সমাজকেও।
শিক্ষকতা কখনোই কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনের আরামদায়ক ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া নয়; এটি একটি সচেতন নৈতিক অবস্থান, একটি জীবন্ত মানবিক প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেকে যাচাই করে। শিক্ষক কেবল সেই মানুষটি নন, যিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠ দেন; তিনি সেই মানুষ, যার উপস্থিতি একজন শিক্ষার্থীর জীবনবোধ, ন্যায়ের অনুভব এবং মানবিক আত্মসচেতনতার ভিত গড়ে তোলে। আজকের বাস্তবতায়, যখন সমাজ জর্জরিত বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবিক বিচ্যুতিতে, তখন একজন শিক্ষকই পারেন সেই আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে, যিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পেশার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ জানানো, এবং নিপীড়িতের পাশে থাকার মতো এই প্রতিটি মানবিক গুণ একজন শিক্ষকের নিকট শুধু বিকল্প নয়, বরং অনিবার্য। কারণ শিক্ষকতা মানেই ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ এবং সেই ভবিষ্যৎ শুধু সনদের সংখ্যা বা পাসের হার দিয়ে নয়, পরিমাপ হয় বিবেকবান, ন্যায়পরায়ণ এবং মানবিক নাগরিক তৈরির ক্ষমতা দিয়ে। তাই বর্তমান সময়ের একজন শিক্ষককে নতুন করে ভাবতে হবে নিজেকে নিয়ে; নিজের নীরবতা, নিজের অবস্থান এবং নিজের সাহসিকতা নিয়ে। কারণ একমাত্র তিনিই পারেন সেই অদৃশ্য কারিগরের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সমাজের ভিত্তি নতুন করে নির্মাণ করতে। তাই শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছে প্রশ্ন রইল, আপনি কি সত্যিই শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করছেন? যদি না করে থাকেন, আপনি কি এখন নিজেকে তৈরি করতে ইচ্ছুক? তাহলে আজই আপনার নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যাত্রা শুরু করুন।
[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মাহরুফ চৌধুরী
বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
(শেষাংশ)
একজন প্রকৃত শিক্ষক তার উপস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল পাঠদানের মাধ্যম নয়, বরং একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তোলেন। এই আশ্রয় নিছক শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একধরনের মানসিক, মানবিক ও নৈতিক নিরাপত্তাবোধ, যা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং স্বপ্নের ভিত্তি নির্মাণ করে। শিক্ষার্থীরা যখন তার চোখের দিকে তাকায়, তখন তারা খুঁজে পায় এক ধরনের নিশ্চিন্ত ভরসা; তার কণ্ঠে শুনতে পায় ন্যায়বোধের এক স্থির, অবিচল উচ্চারণ; আর তার অবস্থানে তারা দেখতে পায় এক দৃঢ় নৈতিক অবস্থান, যা কোনো চাপে, কোনো সুবিধার মোহে বিচলিত হয় না। এই বিশ্বাস, এই নির্ভরতা একদিনে জন্মায় না, এবং পাঠদানের নিপুণতা দিয়ে একে অর্জনও করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন হয় হৃদয়ের প্রশস্ততা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার পরিচয়, প্রেক্ষাপট, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সমান মর্যাদায় স্থান পায়। প্রয়োজন হয় নৈতিক বোধের দৃঢ়তা, যা শিক্ষককে ন্যায়ের পক্ষে অবিচল রাখে, এমনকি যখন তা অসুবিধাজনক বা জনপ্রিয় নয়। এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মানবিক সহানুভূতির গভীর চর্চা যার মাধ্যমে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর অদৃশ্য যন্ত্রণা, নিঃশব্দ সংকট এবং নিগূঢ় আকাক্সক্ষাকে অনুভব করতে পারেন। এই প্রসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন. ‘শিক্ষা হল সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা ব্যবহার করে তুমি পৃথিবী পরিবর্তন করতে পারো;। কিন্তু এই ‘অস্ত্র’ যদি একজন শিক্ষকের হাতেই থাকে, তবে তার হৃদয় না থাকলে, তার নৈতিকতা না থাকলে, তা আর পরিবর্তনের অস্ত্র নয় বরং তা হয়ে ওঠে নিছক তথ্য সঞ্চালনের যন্ত্র। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাই শুধু জ্ঞানের বাহক নন, তিনি হয়ে ওঠেন করুণা, ন্যায় ও স্বপ্নের ধারক।
শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে যখন কেবল পাঠদাতা হিসেবে নয়, বরং এক মানবিক সত্তা হিসেবে দেখতে শেখে যিনি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাদের মতামতকে মূল্য দেন, এবং তাদের সত্যিকার সম্ভাবনার খোঁজ করেন, তখনই গড়ে ওঠে শিক্ষা নামক সম্পর্কের গভীরতম বন্ধন। এই সম্পর্কের বুননেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল, নৈতিক ও মননশীল নাগরিক। প্রকৃতপক্ষে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিক্ষকদের হাত ধরে। সে কারণেই বলা হয়ে থাকে,‘শিক্ষকেরাই জাতির কারিগর’। তারা কেবল ছাত্র নয়, গড়ে তোলেন ভবিষ্যতের নাগরিক, চিন্তক, নেতা, শিল্পী, নীতিনির্ধারক ও সমাজ-পরিবর্তক। তাই একজন শিক্ষক যখন সত্যিকার অর্থে দায়িত্বশীল হন, তখন তার কর্মক্ষেত্র কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার স্নেহ, ন্যায়বোধ এবং নৈতিক অবস্থান দিয়েই তিনি সমাজের ভিত গড়ে তোলেন। একটি শিক্ষার্থী যদি তার শিক্ষকের মধ্যে সাহস দেখে সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার, ন্যায় ও মানবিকতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার সাহস তাহলে সেই শিক্ষার্থীও সাহসী হয়ে ওঠে। সাহস তখন সংক্রামিত হয়; শিক্ষা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের, প্রতিবিম্বনের এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাবানের বিপরীতে দাঁড়ানোর ভাষা। শিক্ষক যদি ভালোবাসা দেন, যেটা নির্বাচনহীন, নিঃস্বার্থ ও আত্মিক ভালোবাসা, তাহলে শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ওঠে এক প্রকার বিশ্বাস, যা তাকে মানুষ হতে শেখায়। সেই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, পরোপকার এবং দায়িত্ববোধ। যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা সেই, যা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষ করে’। এই ‘মানুষ করে তোলা’র পেছনে সবচেয়ে বড় হাত একজন শিক্ষকেরই যিনি নিজে মানুষ হয়ে ওঠেন, এবং তার ছাত্রদের মানুষ করে তোলেন। আর যখন একজন শিক্ষক ন্যায়বোধ শেখান তা শুধু কথায় নয়, তার নিজের অবস্থানে, ব্যবহারে এবং নীরব প্রতিরোধে। তখন শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করে সমাজ কেবল নিয়ম বা আইন দিয়ে চলে না; এর প্রাণশক্তি আসে ন্যায়, বিবেক ও সহানুভূতির মতো নৈতিক গুণাবলি থেকে। তখন শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে শুধু পেশাজীবী নয়, ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক হয়ে ওঠে, যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবে।
পারস্যের দার্শনিক সুফি কবি ও গণিতজ্ঞ রুমি এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘তুমি কি এখনও জানো না? তোমার আলোই পৃথিবীকে আলোকিত করে’। এই আলো, এই অন্তর্জাগতিক দীপ্তিই একজন শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে প্রবাহিত হয়। আর সেখান থেকেই আলোকিত হয় একটি সমাজ, একদিন আলোকিত হয় একটি জাতি। এই কারণেই শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি ত্যাগ, একটি নৈতিক অভিযাত্রা। সেই অভিযাত্রায় একজন শিক্ষক যখন তার পথটিকে সত্য, সাহস ও ভালোবাসার আলোয় আলোকিত করেন, তখন তার ছাত্রেরা শুধু পাস করে না, উত্তীর্ণ হয় মানুষ হয়ে ওঠার পরীক্ষায়। এই সময় যখন সমাজ নানা প্রতিকূলতা, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পথ খুঁজছে, যখন মূল্যবোধের সংকট, বিভাজনের রাজনীতি ও নিঃসংগত অন্যায় ঘনীভূত হয়ে উঠছে ঠিক তখনই একজন শিক্ষকের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এই অস্থির সময়ে শিক্ষকই হতে পারেন স্থিরতার প্রতীক, নৈতিক পথপ্রদর্শক এবং মানবিক সংলাপের সূচনাকারী।
বর্তমান সময় আমাদের শিক্ষকতাকে কেবল পেশাগত দক্ষতা দিয়ে বিচার করতে দিচ্ছে না। এখন প্রয়োজন প্রতিটি শিক্ষকের নিজের ভূমিকা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। তার অবস্থান, নীরবতা, কিংবা অবস্থানহীনতাকে নৈতিক আত্মসমালোচনার চোখে নতুন করে দেখা। আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনার এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই, কারণ শিক্ষার্থীরা আর শুধু পাঠ শিখতে চায় না। তারা শিক্ষককে দেখে, বুঝতে চায় তার অবস্থান, অনুধাবন করতে চায় তিনি সত্যের পক্ষে আছেন কিনা।
শিক্ষকতার মূল হৃদয়ে রয়েছে এক ধরনের নৈতিক সাহস যা প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের চাপকে অগ্রাহ্য করে, সামাজিক প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ায়, এবং প্রতিটি অসহায় শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। এই সাহসই শিক্ষককে শিক্ষক করে তোলে, নাহলে তিনি হয়ে ওঠেন কেবল একজন পাঠদাতা, যিনি পঠিত পাঠদানের বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে পারেন না। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় ভারতীয় শিক্ষাবিদ জে. কৃষ্ণমূর্তির একটি গভীর উপলব্ধির কথা। তার মতে, ‘প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বন্ধ হয়ে গেলেই প্রকৃত শিক্ষা লাভ হয়’। যেখানে প্রতিযোগিতা থেমে যায়, সেখানে শুরু হয় প্রকৃত শিক্ষা। এই শিক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন একজন শিক্ষক নিজেকেই প্রশ্ন করতে শেখেন, নিজেকে বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়ান: আমি যা বলছি, তা কি আমি নিজেই পালন করছি? আমি কি শিক্ষার্থীদের সামনে এমন এক মানবিক প্রতিমূর্তি তুলে ধরছি যা তারা অনুসরণ করতে পারবে? শিক্ষকতা তাই শুধুই শেখানো নয়, এটি প্রতিনিয়ত এই প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হওয়া যে, আপনি কি সত্যিই শিক্ষকের মতো আচরণ করছেন? আপনি কি কেবল একজন প্রতিষ্ঠান-নির্ভর পেশাজীবী, নাকি একজন আদর্শ-বাহক মানুষ? আপনি কি নীরব দর্শক, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতন্ত্রপ্রহরী ও অটল কণ্ঠস্বর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা কষ্টদায়ক হতে পারে, কিন্তু এগুলোর মুখোমুখি হওয়া ছাড়া শিক্ষকতা পূর্ণতা পায় না। বরং এখান থেকেই শিক্ষকতার পুনর্জাগরণ শুরু হয় যেখানে সাহস, সহানুভূতি এবং ন্যায়বোধ মিলিয়ে গড়ে ওঠে এমন এক ভূমিকা, যা বদলে দিতে পারে শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, পুরো সমাজকেও।
শিক্ষকতা কখনোই কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনের আরামদায়ক ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া নয়; এটি একটি সচেতন নৈতিক অবস্থান, একটি জীবন্ত মানবিক প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেকে যাচাই করে। শিক্ষক কেবল সেই মানুষটি নন, যিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠ দেন; তিনি সেই মানুষ, যার উপস্থিতি একজন শিক্ষার্থীর জীবনবোধ, ন্যায়ের অনুভব এবং মানবিক আত্মসচেতনতার ভিত গড়ে তোলে। আজকের বাস্তবতায়, যখন সমাজ জর্জরিত বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবিক বিচ্যুতিতে, তখন একজন শিক্ষকই পারেন সেই আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে, যিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পেশার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ জানানো, এবং নিপীড়িতের পাশে থাকার মতো এই প্রতিটি মানবিক গুণ একজন শিক্ষকের নিকট শুধু বিকল্প নয়, বরং অনিবার্য। কারণ শিক্ষকতা মানেই ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ এবং সেই ভবিষ্যৎ শুধু সনদের সংখ্যা বা পাসের হার দিয়ে নয়, পরিমাপ হয় বিবেকবান, ন্যায়পরায়ণ এবং মানবিক নাগরিক তৈরির ক্ষমতা দিয়ে। তাই বর্তমান সময়ের একজন শিক্ষককে নতুন করে ভাবতে হবে নিজেকে নিয়ে; নিজের নীরবতা, নিজের অবস্থান এবং নিজের সাহসিকতা নিয়ে। কারণ একমাত্র তিনিই পারেন সেই অদৃশ্য কারিগরের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সমাজের ভিত্তি নতুন করে নির্মাণ করতে। তাই শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছে প্রশ্ন রইল, আপনি কি সত্যিই শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করছেন? যদি না করে থাকেন, আপনি কি এখন নিজেকে তৈরি করতে ইচ্ছুক? তাহলে আজই আপনার নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যাত্রা শুরু করুন।
[লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য]