alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

এম এ হোসাইন

: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

রাষ্ট্র কীভাবে তার মৃতদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে এবং কীভাবে তার মন্ত্রীদের জন্য বাসস্থান বরাদ্দ দেয়-এতে রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় নগ্নভাবে প্রকাশ পায়। কবরস্থান আদতে সমতার চূড়ান্ত প্রতীক হওয়ার কথা। মৃত্যুতে সবাই সমান-ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন। আর মন্ত্রীদের সরকারি বাসভবন হওয়ার কথা জনসেবার কার্যকর প্রতীক, বিলাসিতার স্মারকস্তম্ভ নয়। কিন্তু যখন এই দুটোই ক্ষমতার তোষামোদে বিকৃত হয়, তখন সেটি আর শাসন থাকে না; তা হয়ে ওঠে নীরব নৈতিক ক্ষয়।

ঢাকার বনানী কবরস্থানের নীতিমালার কথাই ধরা যাক। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, এটি নাকি জমির সংকট মোকাবিলার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। সত্যিই, ঢাকায় জমি সীমিত, জনসংখ্যা অস্বাভাবিক ঘন, আর কবর ব্যবস্থাপনায় কিছু নিয়ম থাকা দরকার। কিন্তু রাজনীতি প্রায়ই বাস্তব প্রয়োজনকে আনুগত্যে পরিণত করে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম যখন বনানী কবরস্থানের দাফন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেন, সেটি নগর পরিকল্পনার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক পটভূমি। কারণ সেখানেই সমাহিত রয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যরা। নতুন নীতির ফলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্থায়ী কবর কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। একটি জনসাধারণের কবরস্থান ধীরে ধীরে পরিণত হয় ক্ষমতাবানদের জন্য আধা-পবিত্র সংরক্ষিত এলাকায়। এটি স্বদিচ্ছার কোন ব্যবস্থাপনা নয়, বরং তোষামোদের শাসন যা অতি উৎসাহী, অপ্রয়োজনীয় এবং নিষ্ঠুর।

বাংলাদেশের সামাজিক রীতি ও ইসলামী বিধান অনুযায়ী, কেউ যখন কবরের জন্য জমি ক্রয় করে, সেটিকে চিরস্থায়ী বিশ্রামের স্থান হিসেবেই ধরা হয়। কিন্তু বনানী কবরস্থানের নীতিতে যুক্ত করা হলো এক অদ্ভুত শর্তÑসময়সীমাবদ্ধ মালিকানা। এটি সরাসরি ইসলামী নীতির বিরুদ্ধে, সামাজিক রীতির পরিপন্থি এবং বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আরও বিস্ময়কর একটি বিধান হলো-একজন নাতি তার দাদার কবরে দাফন হতে পারবেন না। এমন নিয়ম শুধু ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য নয়, সামাজিকভাবেও গভীরভাবে অস্বস্তিকর।

এ বিষয়ে সকল তথ্য-উপাত্তই সব বলে দেয়। লিজের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে উঠে-১৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা, ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মেয়াদ শেষে পুনরায় কবর খুঁড়ে দাফন বাধ্যতামূলক। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হলো, নীতিমালা পরিশীলিত করা হলো-সবই দক্ষতার নামে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই দক্ষতা কার জন্য? যে নীতি সাধারণ মানুষের শোককে তাদের নাগালের বাইরে মূল্য নির্ধারণ করে, তা প্রশাসনিকভাবে স্বচ্ছ হতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে তা দুর্গন্ধ ছড়ায়। বার্তাটি পরিষ্কার-ক্ষমতার শুরুতেই সমতা শেষ।

সময় এগিয়ে চলে, ক্ষমতার চেহারা বদলায় কিন্তু অভ্যাস বদলায় না।

আজ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মুহাম্মদ ইউনূস আদালতে নয়, কিন্তু জনমনে এক গুরুতর অভিযোগের মুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি একই ধরনের ক্ষমতামুখী ভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। ক্ষেত্র ভিন্ন তবে যুক্তি একই। ঢাকার মানুষ যখন পানির জন্য লাইনে দাঁড়ায়, নিয়মিত বিদ্যুৎ-বিভ্রাট সহ্য করে, গ্যাসের দাম বাড়তে দেখে, তখন রাষ্ট্র অনুমোদন দেয় মন্ত্রীদের জন্য ৮,৫০০ থেকে ৯,০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট নয়-আকাশে ঝুলন্ত প্রাসাদ। সুইমিং পুল, জিম, বিলাসবহুল আসবাব, অফিস কক্ষ, পাঁচতারা হোটেলের সব সুবিধাসহ উঁচু ভবনের আবাসন।

একটু তুলনা করা যাক। ঢাকায় একজন স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট গড়ে সাধারণত ১২০০ বর্গফুট। নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীরা গড়ে ৬৫০ বর্গফুটেই জীবন কাটান। সেখানে নতুন মন্ত্রীদের ফ্ল্যাট সাধারণ নাগরিকের স্বপ্নের চেয়ে ছয় গুণ বড়, আর বহু সরকারি কর্মচারীর স্বাভাবিক জীবনের চেয়ে প্রায় চৌদ্দ গুণ বড়। ব্যয় প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা-যখন রাষ্ট্র কর বাড়ানো ও ভর্তুকি কমানোর পক্ষে কৃচ্ছ্রতার দোহাই দিচ্ছে।

অনেকে হয়তবা বলবেন, মন্ত্রীদের কাজ, নিরাপত্তা ও প্রটোকলের জন্য বড় জায়গা দরকার। যুক্তি একেবারে অমূলক নয়, কিন্তু তার এক সীমা আছে। শাসন শুধু বাস্তবতা নয়, দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ও। আর আকাশচুম্বী প্রাসাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি অশালীন। যখন মন্ত্রীরা ছাদে সাঁতার কাটেন, আর নাগরিকরা গ্যাস ও পানির অভাবে ভাত রান্না করতে পারেন না, তখন সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ে।

এই মুহূর্তটিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে একটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধারণা-যা খুব কমই খণ্ডিত হয়েছে-এই বিলাসিতা কেবল দেশীয় আত্মতুষ্টি নয়, বরং আন্তর্জাতিক বার্তা দেয়ার চেষ্টা। সমালোচকদের মতে, প্রফেসর ইউনূস দেশের মানুষের কষ্টের চেয়ে বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের রুচির প্রতিই বেশি মনোযোগী। ‘ফরাসি ওয়াইন’-এর গল্প হয়তো গুজব, কিংবা অতিরঞ্জন, কিন্তু এটি একটি গভীর উদ্বেগকে সামনে নিয়ে এসেছে-নীতিনির্ধারণ কি নাগরিকদের সেবা করতে, নাকি বিদেশি মহলকে মুগ্ধ করতে এসকল করছেন? তার উপদেষ্টা মহলে বিদেশি প্রভাবের আধিক্য সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করে।

২০২৪ সালে রাষ্ট্রের বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইউনূস ক্ষমতায় আসেন। আপামর জনগণ তখন আশা করেছিল-তিনি এই বৈষম্যের চক্র ভাঙবেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি উচ্ছেদ করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি নিজেই সেই একই বৈষম্য ও দুর্নীতির বৃত্তে জড়িয়ে পড়েছেন। আর এমন অভিযোগ এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের আত্মত্যাগের পর এমন আচরণ গভীর হতাশার জন্ম দেয়। এটি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।

ইতিহাস এখানে অস্বস্তিকর তুলনা হাজির করে। ঔপনিবেশিক শাসকরা শাসিত জনগণের দারিদ্র?্য থেকে নিজেদের আলাদা করে বিলাসবহুল এলাকায় বাস করত। স্বাধীনতার পর অনেক দেশের এলিট সেই একই দূরত্বের স্থাপত্য পুনর্গঠন করেছে-বড় বাড়ি, প্রশস্ত সড়ক, সীমাবদ্ধ এলাকা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ এই চক্র ভাঙার কথা ছিল। অথচ আজও আমরা তর্ক করছি-মন্ত্রীদের ভালোভাবে থাকা উচিত কি না তা নয়, বরং তারা কি জনগণের কষ্টের মাঝেও রাজকীয়ভাবে বাস করবেন?

বনানী কবরস্থানের নীতি ও মন্ত্রীদের আবাসন প্রকল্প আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এগুলো একটি গভীর শাসনপ্রবণতার লক্ষণ-যেখানে আনুগত্য মানে বিলাসিতা, আর কর্তৃত্ব মানে বিচ্ছিন্নতা। জীবিত বা মৃত্যুর পরÑদুক্ষেত্রেই ক্ষমতা নিজেকে রক্ষা করতে চায়, বহু মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করে।

এর রাজনৈতিক মূল্যও আছে। মানুষ যখন দেখে, শাসকেরা তাদের কষ্ট শুনছে না, তখন বৈধতা ক্ষয়ে যায়। কষ্ট মানুষ মেনে নেয়, যদি মনে হয় সেটি সবার জন্য সমান। কিন্তু যখন দেখে শাসকেরা নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে, তখন নীরব বা প্রকাশ্য বিদ্রোহ জন্ম নেয়। ফরাসি বিপ্লব শুধু রুটির অভাবে শুরু হয়নি; ভার্সাইয়ের দৃশ্যও তার কারণ ছিল। ইতিহাস কখনোই ক্ষমাশীল নয় তাদের প্রতি, যারা এটি ভুলে যায়।

আজ বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত সংকটের অভাব নেই-মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, নগরে যানজট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। ৯০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বা বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত কবরস্থান এসব সমস্যার সমাধান করবে না। বরং এগুলো সংস্কার থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয় এবং নাগরিকদের মধ্যে সংশয় বাড়ায়। যে বার্তাটি এতে স্পষ্ট তাহলো রাষ্ট্রের প্রথম প্রবৃত্তি সেবা নয়, কতিপয়ের আত্মতুষ্টি। জনগণের কাছে কৃচ্ছ্রতা চাইলে, সেটি আগে শীর্ষে দেখাতে হয়। ক্ষমতায় সংযম জনতুষ্টি নয় বরং এটি দূরদর্শিতা। দুর্দশার সময় বিলাসিতায় জেদ ধরা শক্তির লক্ষণ নয়-এটি ভয়ের চিহ্ন। মর্যাদা, প্রাসঙ্গিকতা বা অনুগ্রহ হারানোর ভয়।

সবচেয়ে বড় ট্র?্যাজেডি হলো-বাংলাদেশ এই দৃশ্যপট আগেও দেখেছে। প্রতিবার শেষটা একই-জনরোষ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়, আর ‘মৌসুমি পাখি’দের আগমন, যারা যা পাওয়া যায় তুলে নিয়ে দেশকে আরও দরিদ্র করে রেখে যায়-বস্তুগত ও নৈতিকভাবে। এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু নতুন মুখ নয়, নতুন নীতি দরকার-ক্ষমতা দূরত্ব বাড়ানোর জন্য নয়, কমানোর জন্য।

কবরস্থান নেতাদের সমতার কথা মনে করিয়ে দেবে। সরকারি বাসভবন মনে করিয়ে দেবে দায়িত্বের কথা। যখন দুটোই তোষামোদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র আর শাসন করে না। সে নিজেকেই নিজে অভিনন্দন জানায় আর খড়্গের নিচে বলি হয় জনগণ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

অধিকারহীনতার বৃত্তে আদিবাসী জীবন

স্লোগানে ফ্যাসিবাদ, ভোটের মাঠে আশির্বাদ!

ভাঙা-গড়া সমাজের আমূল পরিবর্তন আনে

শান্তির বৃত্তে বাঁধা বাঘ

শিক্ষকতা: নৈতিক অবস্থান ও মানবিক প্রতিশ্রুতি

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রিনল্যান্ড: নতুন ভূ-রাজনীতির ইঙ্গিত

ব্যাংকিং খাত: সংকট, সংস্কার ও আস্থার সন্ধান

চলচ্চিত্র শিল্প : সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা

কুষ্ঠ-সম্পর্কিত কুসংস্কার ও বৈষম্য

ব্যাংক ধসের দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে অহেতুক হয়রানির মূল টার্গেট মুসলমানেরাই

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান

নির্বাচনের আগেই জানা গেল আংশিক ফল!

শীতকালীন অসুখ-বিসুখ

দিশাহীন অর্থনীতি, নিষ্ক্রিয় অন্তর্বর্তী সরকার

নরসুন্দরের পোয়াবারো

জামায়াতের ‘অক্টোপাস পলিসি’ কৌশল নাকি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি?

ছবি

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও গোলক ধাঁধা

আগুনের ছাইয়ে কলমের আলো

বিগ বাউন্স শেষে বিগ ক্রাঞ্চের পথে ব্রহ্মাণ্ড

সংস্কৃতি চর্চা: শিকড়, সংকট ও আগ্রাসন

শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত কারাব্যবস্থার প্রত্যাশা

ছবি

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

এম এ হোসাইন

বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

রাষ্ট্র কীভাবে তার মৃতদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে এবং কীভাবে তার মন্ত্রীদের জন্য বাসস্থান বরাদ্দ দেয়-এতে রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় নগ্নভাবে প্রকাশ পায়। কবরস্থান আদতে সমতার চূড়ান্ত প্রতীক হওয়ার কথা। মৃত্যুতে সবাই সমান-ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন। আর মন্ত্রীদের সরকারি বাসভবন হওয়ার কথা জনসেবার কার্যকর প্রতীক, বিলাসিতার স্মারকস্তম্ভ নয়। কিন্তু যখন এই দুটোই ক্ষমতার তোষামোদে বিকৃত হয়, তখন সেটি আর শাসন থাকে না; তা হয়ে ওঠে নীরব নৈতিক ক্ষয়।

ঢাকার বনানী কবরস্থানের নীতিমালার কথাই ধরা যাক। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, এটি নাকি জমির সংকট মোকাবিলার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। সত্যিই, ঢাকায় জমি সীমিত, জনসংখ্যা অস্বাভাবিক ঘন, আর কবর ব্যবস্থাপনায় কিছু নিয়ম থাকা দরকার। কিন্তু রাজনীতি প্রায়ই বাস্তব প্রয়োজনকে আনুগত্যে পরিণত করে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম যখন বনানী কবরস্থানের দাফন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করেন, সেটি নগর পরিকল্পনার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক পটভূমি। কারণ সেখানেই সমাহিত রয়েছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যরা। নতুন নীতির ফলে সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্থায়ী কবর কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। একটি জনসাধারণের কবরস্থান ধীরে ধীরে পরিণত হয় ক্ষমতাবানদের জন্য আধা-পবিত্র সংরক্ষিত এলাকায়। এটি স্বদিচ্ছার কোন ব্যবস্থাপনা নয়, বরং তোষামোদের শাসন যা অতি উৎসাহী, অপ্রয়োজনীয় এবং নিষ্ঠুর।

বাংলাদেশের সামাজিক রীতি ও ইসলামী বিধান অনুযায়ী, কেউ যখন কবরের জন্য জমি ক্রয় করে, সেটিকে চিরস্থায়ী বিশ্রামের স্থান হিসেবেই ধরা হয়। কিন্তু বনানী কবরস্থানের নীতিতে যুক্ত করা হলো এক অদ্ভুত শর্তÑসময়সীমাবদ্ধ মালিকানা। এটি সরাসরি ইসলামী নীতির বিরুদ্ধে, সামাজিক রীতির পরিপন্থি এবং বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আরও বিস্ময়কর একটি বিধান হলো-একজন নাতি তার দাদার কবরে দাফন হতে পারবেন না। এমন নিয়ম শুধু ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য নয়, সামাজিকভাবেও গভীরভাবে অস্বস্তিকর।

এ বিষয়ে সকল তথ্য-উপাত্তই সব বলে দেয়। লিজের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে উঠে-১৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা, ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মেয়াদ শেষে পুনরায় কবর খুঁড়ে দাফন বাধ্যতামূলক। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হলো, নীতিমালা পরিশীলিত করা হলো-সবই দক্ষতার নামে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই দক্ষতা কার জন্য? যে নীতি সাধারণ মানুষের শোককে তাদের নাগালের বাইরে মূল্য নির্ধারণ করে, তা প্রশাসনিকভাবে স্বচ্ছ হতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে তা দুর্গন্ধ ছড়ায়। বার্তাটি পরিষ্কার-ক্ষমতার শুরুতেই সমতা শেষ।

সময় এগিয়ে চলে, ক্ষমতার চেহারা বদলায় কিন্তু অভ্যাস বদলায় না।

আজ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মুহাম্মদ ইউনূস আদালতে নয়, কিন্তু জনমনে এক গুরুতর অভিযোগের মুখে দাঁড়িয়েছেন। তিনি একই ধরনের ক্ষমতামুখী ভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। ক্ষেত্র ভিন্ন তবে যুক্তি একই। ঢাকার মানুষ যখন পানির জন্য লাইনে দাঁড়ায়, নিয়মিত বিদ্যুৎ-বিভ্রাট সহ্য করে, গ্যাসের দাম বাড়তে দেখে, তখন রাষ্ট্র অনুমোদন দেয় মন্ত্রীদের জন্য ৮,৫০০ থেকে ৯,০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাট নয়-আকাশে ঝুলন্ত প্রাসাদ। সুইমিং পুল, জিম, বিলাসবহুল আসবাব, অফিস কক্ষ, পাঁচতারা হোটেলের সব সুবিধাসহ উঁচু ভবনের আবাসন।

একটু তুলনা করা যাক। ঢাকায় একজন স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট গড়ে সাধারণত ১২০০ বর্গফুট। নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীরা গড়ে ৬৫০ বর্গফুটেই জীবন কাটান। সেখানে নতুন মন্ত্রীদের ফ্ল্যাট সাধারণ নাগরিকের স্বপ্নের চেয়ে ছয় গুণ বড়, আর বহু সরকারি কর্মচারীর স্বাভাবিক জীবনের চেয়ে প্রায় চৌদ্দ গুণ বড়। ব্যয় প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা-যখন রাষ্ট্র কর বাড়ানো ও ভর্তুকি কমানোর পক্ষে কৃচ্ছ্রতার দোহাই দিচ্ছে।

অনেকে হয়তবা বলবেন, মন্ত্রীদের কাজ, নিরাপত্তা ও প্রটোকলের জন্য বড় জায়গা দরকার। যুক্তি একেবারে অমূলক নয়, কিন্তু তার এক সীমা আছে। শাসন শুধু বাস্তবতা নয়, দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ও। আর আকাশচুম্বী প্রাসাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি অশালীন। যখন মন্ত্রীরা ছাদে সাঁতার কাটেন, আর নাগরিকরা গ্যাস ও পানির অভাবে ভাত রান্না করতে পারেন না, তখন সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ে।

এই মুহূর্তটিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে একটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধারণা-যা খুব কমই খণ্ডিত হয়েছে-এই বিলাসিতা কেবল দেশীয় আত্মতুষ্টি নয়, বরং আন্তর্জাতিক বার্তা দেয়ার চেষ্টা। সমালোচকদের মতে, প্রফেসর ইউনূস দেশের মানুষের কষ্টের চেয়ে বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের রুচির প্রতিই বেশি মনোযোগী। ‘ফরাসি ওয়াইন’-এর গল্প হয়তো গুজব, কিংবা অতিরঞ্জন, কিন্তু এটি একটি গভীর উদ্বেগকে সামনে নিয়ে এসেছে-নীতিনির্ধারণ কি নাগরিকদের সেবা করতে, নাকি বিদেশি মহলকে মুগ্ধ করতে এসকল করছেন? তার উপদেষ্টা মহলে বিদেশি প্রভাবের আধিক্য সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করে।

২০২৪ সালে রাষ্ট্রের বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইউনূস ক্ষমতায় আসেন। আপামর জনগণ তখন আশা করেছিল-তিনি এই বৈষম্যের চক্র ভাঙবেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি উচ্ছেদ করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি নিজেই সেই একই বৈষম্য ও দুর্নীতির বৃত্তে জড়িয়ে পড়েছেন। আর এমন অভিযোগ এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের আত্মত্যাগের পর এমন আচরণ গভীর হতাশার জন্ম দেয়। এটি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।

ইতিহাস এখানে অস্বস্তিকর তুলনা হাজির করে। ঔপনিবেশিক শাসকরা শাসিত জনগণের দারিদ্র?্য থেকে নিজেদের আলাদা করে বিলাসবহুল এলাকায় বাস করত। স্বাধীনতার পর অনেক দেশের এলিট সেই একই দূরত্বের স্থাপত্য পুনর্গঠন করেছে-বড় বাড়ি, প্রশস্ত সড়ক, সীমাবদ্ধ এলাকা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ এই চক্র ভাঙার কথা ছিল। অথচ আজও আমরা তর্ক করছি-মন্ত্রীদের ভালোভাবে থাকা উচিত কি না তা নয়, বরং তারা কি জনগণের কষ্টের মাঝেও রাজকীয়ভাবে বাস করবেন?

বনানী কবরস্থানের নীতি ও মন্ত্রীদের আবাসন প্রকল্প আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এগুলো একটি গভীর শাসনপ্রবণতার লক্ষণ-যেখানে আনুগত্য মানে বিলাসিতা, আর কর্তৃত্ব মানে বিচ্ছিন্নতা। জীবিত বা মৃত্যুর পরÑদুক্ষেত্রেই ক্ষমতা নিজেকে রক্ষা করতে চায়, বহু মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করে।

এর রাজনৈতিক মূল্যও আছে। মানুষ যখন দেখে, শাসকেরা তাদের কষ্ট শুনছে না, তখন বৈধতা ক্ষয়ে যায়। কষ্ট মানুষ মেনে নেয়, যদি মনে হয় সেটি সবার জন্য সমান। কিন্তু যখন দেখে শাসকেরা নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে, তখন নীরব বা প্রকাশ্য বিদ্রোহ জন্ম নেয়। ফরাসি বিপ্লব শুধু রুটির অভাবে শুরু হয়নি; ভার্সাইয়ের দৃশ্যও তার কারণ ছিল। ইতিহাস কখনোই ক্ষমাশীল নয় তাদের প্রতি, যারা এটি ভুলে যায়।

আজ বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত সংকটের অভাব নেই-মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, নগরে যানজট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। ৯০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বা বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত কবরস্থান এসব সমস্যার সমাধান করবে না। বরং এগুলো সংস্কার থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয় এবং নাগরিকদের মধ্যে সংশয় বাড়ায়। যে বার্তাটি এতে স্পষ্ট তাহলো রাষ্ট্রের প্রথম প্রবৃত্তি সেবা নয়, কতিপয়ের আত্মতুষ্টি। জনগণের কাছে কৃচ্ছ্রতা চাইলে, সেটি আগে শীর্ষে দেখাতে হয়। ক্ষমতায় সংযম জনতুষ্টি নয় বরং এটি দূরদর্শিতা। দুর্দশার সময় বিলাসিতায় জেদ ধরা শক্তির লক্ষণ নয়-এটি ভয়ের চিহ্ন। মর্যাদা, প্রাসঙ্গিকতা বা অনুগ্রহ হারানোর ভয়।

সবচেয়ে বড় ট্র?্যাজেডি হলো-বাংলাদেশ এই দৃশ্যপট আগেও দেখেছে। প্রতিবার শেষটা একই-জনরোষ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়, আর ‘মৌসুমি পাখি’দের আগমন, যারা যা পাওয়া যায় তুলে নিয়ে দেশকে আরও দরিদ্র করে রেখে যায়-বস্তুগত ও নৈতিকভাবে। এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু নতুন মুখ নয়, নতুন নীতি দরকার-ক্ষমতা দূরত্ব বাড়ানোর জন্য নয়, কমানোর জন্য।

কবরস্থান নেতাদের সমতার কথা মনে করিয়ে দেবে। সরকারি বাসভবন মনে করিয়ে দেবে দায়িত্বের কথা। যখন দুটোই তোষামোদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র আর শাসন করে না। সে নিজেকেই নিজে অভিনন্দন জানায় আর খড়্গের নিচে বলি হয় জনগণ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

back to top