শেখর ভট্টাচার্য

নির্বাচন আসন্ন হলে আমাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত হন
আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, আবদুল বারী স্যার, সব সময় বলতেন, ‘কমনসেন্স ইজ দ্যাট সেন্স, হুইচ ইজ নট কমন’। তিনি কোন মনীষির কথা ধার করে এই কথাটি বলতেন জানি না; তবে কথাটি ভীষণ মূল্যবান বলে মনে হয়। কমনসেন্স বিষয়টিকে যতই সস্তা ভাবি না কেন, কমনন্সেন্স কিন্তু এত সস্তা না। কমনসেন্স অর্জনের জন্য নিজেকে ‘অনন্য’ হতে হয় কিছুটা ‘আনকমন’। ক্ষমা করবেন পাঠক, সাধারণ জ্ঞান নিয়ে ইংরেজি শব্দাবলি ব্যবহারের জন্য। আবদুল বারী স্যার, যাকে আমরা বারী স্যার বলে ডাকতাম, তিনি ছিলেন সিলেটের কিংবা বাংলাদেশের প্রবাদপ্রতীম ইংরেজির শিক্ষক। সিলেট এইডেড হাইস্কুলের ষাট-সত্তর দশকের দাপুটে, জ্ঞানী এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন বারী স্যার। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস স্যারের ঠোঁটের গোড়ায় ভেসে বেড়াত। বারী স্যার অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন বেশ কয়েক বছর হলো। রসিক, রাসভারী, জ্ঞানী এই মানুষটি অনন্তে হারিয়ে গেলেও আমার, আমাদের অন্তরে তিনি স্থায়ী হয়ে আছেন।
কাণ্ড, মাত্রা এবং সাধারণ- এই তিন রকমের জ্ঞানের কথা মনে হলো, রাজনীতির মাঠে বেলাগাম মন্তব্য প্রতিশ্রুতি শুনে। অনেকেই নির্বাচনী পাটিগণিত সঠিকভাবে সমাধানের জন্য, শত্রুর সঙ্গে এক কক্ষে বসত করছেন, মিত্রকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের দেশীয় কথায়, ‘তেল পানি কখনো একসাথে মিশে না’, নির্বাচনী হিসেবে তেল, পানিকে সুগন্ধী দিয়ে একসঙ্গে মেশানো হয় যাতে গন্ধে বিভোর হয়ে মানুষ খুঁজতে না যায়, ভেতরে তেল পানি সত্যি মিশেছে কিনা। এই যে বললাম শত্রু মিত্র, শত্রুর শত্রু, মিত্রের শত্রু, সব মিলে মিশে একাকার। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের অমর পঙ্ক্তির মতো: ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,/করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা/আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!’ কবি তার বিদ্রোহের সত্তাকে উন্মোচনে করতে গিয়ে এই মহৎ কথাগুলো বলে গেছেন। রাজনীতির মাঠের কুশীলবরা কেনো বেলাগাম, কাণ্ডজ্ঞানহীন এসব বয়ান দিচ্ছেন তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। জ্ঞানী মানুষদের কাছে কাণ্ডজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান এবং মাত্রা জ্ঞান হলো অত্যন্ত উপরিস্তরের মানে ভেসে থাকা জ্ঞান যে জ্ঞানের জন্য ধ্যান করে গভীরে প্রবেশ করতে হয় না। দার্শনিকরা মনে করে থাকেন এসব প্রাথমিক বিষয় সব মানুষই স্বাভাবিকভাবে অর্জন করতে সক্ষম। আবার অনেক ভিন্ন চিন্তার মানুষরা ভাবেন, এসব জ্ঞান মোটেই উপরিস্তরের জ্ঞান নয়, সক্রেটিসের নিজেকে জানো, ‘নো দাই সেলফের’ মতো অতি উচ্চ মার্গের জ্ঞান।
রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের পূর্বে হুশ রেখেই বেহুশ হয়ে যান বলে অনেকে মনে করে থাকেন। অনেকের ধারণা তারা সত্যি সত্যি বেহুশ হয়ে পড়েন জয় লাভের সুতীব্র ইচ্ছায়। আর এক ঘরানার বিশ্লেষকরা ভাবেন, এই অজ্ঞান হয়ে যাওয়াতে তাদের মোটেই দায় বা দোষ নেই। নিষ্পাস আবেগের প্রকাশ। বাংলা সিনেমায় প্রেমিক যখন হয়ে যায় ‘দরদি শত্রু’, অনেকটা দরদ থেকে আধুনিক ‘চৌধুরী সাহেব’ জনগণের প্রতি ভালোবাসা থেকে অ-জ্ঞান হয়ে যান। এক্ষেত্রে অজ্ঞান কিন্তু সার্জারির টেবিলের জ্ঞান হারানো নয়, জ্ঞান রেখেই নির্বাচনী অ-জ্ঞান। অজ্ঞান হয়ে গেলেও জ্ঞান থাকার মতো সবকিছু উপলব্ধি করা যায়। আর একটি ‘স্কুল অব থট’ আছে যাকে এড়িয়ে যাওয়া কোনভাবে সম্ভব নয়। সেটি হলো বাঙালির মনের ভেতরে থাকা বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো আবেগের স্রোত। সমুদ্রে মতো বাঙালির আবেগের জোয়ার ভাটা নাই, বাঙালির আবেগে বল্গাহীন, শুধু জোয়ারের মতো আসতে থাকে। আবেগের মাত্রার পরিবর্তন হয় মাঝে মধ্যে তবে নিস্তরঙ্গ হয় না কখনো। আবেগের জোয়ার যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় তখন আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখ দিয়ে বেশুমার কথা বেরোতে থাকে।
প্রান্তিক বাঙালির এই আবেগকে উসকে দিতে জানেন, আমাদের বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদরা। তারা মাঝে মাঝে কৌশলে আবেগের বাঁধ ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করেন, যেমন করে হাজার কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ ভেঙে দেয় লোভি, দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদার রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিয়ে; ব্যাপারটা ঠিক সেরকম। আবেগের বাঁধ ভেঙে গেলে বাঙালি কাণ্ডজ্ঞান, মাত্রাজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সন্মোহিত হয়ে রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির পিছু নিতে থাকে। আবেগের তোড়ে আমরা অনেক মহৎ পরিবর্তনের দেখা পেয়েছি আবার এই আবেগের প্লাবনে অনন্ত আশা নিয়ে জেগে ওঠা বাঙালিকে বিমর্ষ হয়ে আশাহত হতেও দেখেছি। এতোবার আশাহত হওয়ার পরও ফিনিক্স পাখির স্বভাব করায়ত্ত করা বাঙালি আবার জেগে ওঠে। নতুন শুরুর প্রত্যাশা নিয়ে বুক বাঁধে।
নির্বাচন আসন্ন হলে আমাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত হন। এসময় রাজনীতিবিদরা সচেতন, অসচেতনভাবে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কাণ্ডজ্ঞানকে বলা হয় সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কাণ্ডজ্ঞানকে কিছুটা বিকশিত করে তবে কান্ডজ্ঞান অর্জন করতে হয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে, নির্বাচনী বক্তৃতায় বিশেষ করে মেঠো বক্তৃতায় সব চেয়ে বেশি ব্যবহার হয় চারটি বিষয়। ধর্ম, নারী, কর্মসংস্থান এবং সার্বিক অর্থনীতি। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় বা হচ্ছে, সাধারণ বিশ্লেষকের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়।
নির্বাচনে সাধারণত অংশগ্রহণকারী দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি, পরিকল্পনার কথা শোনা যায় নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে। ইশতেহার থেকে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ দলটির নির্বাচনোত্তর কার্যক্রমের প্রতিশ্রুতি পেয়ে যায়। ইশতেহার মূলত প্রকাশ্য ঘোষণা। যেখানে কর্ম পরিকল্পনা এবং দলের ভিশন নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথরেখা সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
নির্বাচনে সবাই নারী স্বাধীনতা, নারীর দক্ষতাকে শতভাগ কাজে লাগানোর কথা বলছেন। কিন্তু কীভাবে কাজে লাগানো হবে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে আড়াইশ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে যেখানে অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। এসব কারখানা চালু করার কথা না বলে নতুন কর্মসংস্থান কী করে হবে, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়।
১৮ মাসে এক কোটি তরুণের কর্ম সংস্থান হবে, এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিএনপি। এই প্রতিশ্রুতি দেয়ার পূর্বে মনে রাখতে হবে এই সময়ের মধ্যে ১৮ থেকে ২০ লাখ তরুণ নতুন করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, অর্থসংস্থানের বিষয়টি সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে যে সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক বিদ্যমান আছে (বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা)-এর সঙ্গে বিএনপি চার কোটি পরিবারকে পারিবারিক কার্ড প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২৫০০ টাকা প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, রাজস্ব আহোরণ কী করে হবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া না গেলে এরকম আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি জনমনে স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারবে না।
প্রতিশ্রুতি দেয়ার ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ হয়ে মাত্রাজ্ঞান হারানো উচিত হবে না বলে মনে হয়। ভোটারের মনোরঞ্জনের জন্য কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে পরবর্তীতে বুমেরাং হয়ে প্রতিশ্রুতিগুলো আবার রাজনৈতিক দলের কাছে ‘প্রশ্ন’ আকারে ফিরে আসবে, কথাটি মনে রাখতে হবে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারবার এর বরখেলাপের ফলে রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়। মানুষের আস্থা যখন রাজনৈতিক দলের প্রতি হারিয়ে যায় তখন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
স্বাধীন সার্বভৌম দেশে ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা বহাল থাকতে পারে না। দেশপ্রেম মানে দেশের সব শ্রেণির মানুষের প্রতি সমাদৃত নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়নি। শাসক বদল হয়েছে, শাসনের চরিত্রের বদল এখনও দৃশ্যমান নয়। গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ও সময়ের অপচয় করলে একদিন আবার জেগে ওঠা মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হলে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত কবিতার পঙ্?ক্তির মতো আমাদের হয়তো উচ্চারণ করতে হবে -‘আমরা বুঝতে পারিনি/আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ এরকম কথা যাতে উচ্চারণ করতে না হয়, তাই এবারের সুবর্ণ সুযোগকে হারানো উচিত হবে না কোনভাবেই।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শেখর ভট্টাচার্য

নির্বাচন আসন্ন হলে আমাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত হন
শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, আবদুল বারী স্যার, সব সময় বলতেন, ‘কমনসেন্স ইজ দ্যাট সেন্স, হুইচ ইজ নট কমন’। তিনি কোন মনীষির কথা ধার করে এই কথাটি বলতেন জানি না; তবে কথাটি ভীষণ মূল্যবান বলে মনে হয়। কমনসেন্স বিষয়টিকে যতই সস্তা ভাবি না কেন, কমনন্সেন্স কিন্তু এত সস্তা না। কমনসেন্স অর্জনের জন্য নিজেকে ‘অনন্য’ হতে হয় কিছুটা ‘আনকমন’। ক্ষমা করবেন পাঠক, সাধারণ জ্ঞান নিয়ে ইংরেজি শব্দাবলি ব্যবহারের জন্য। আবদুল বারী স্যার, যাকে আমরা বারী স্যার বলে ডাকতাম, তিনি ছিলেন সিলেটের কিংবা বাংলাদেশের প্রবাদপ্রতীম ইংরেজির শিক্ষক। সিলেট এইডেড হাইস্কুলের ষাট-সত্তর দশকের দাপুটে, জ্ঞানী এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন বারী স্যার। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস স্যারের ঠোঁটের গোড়ায় ভেসে বেড়াত। বারী স্যার অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন বেশ কয়েক বছর হলো। রসিক, রাসভারী, জ্ঞানী এই মানুষটি অনন্তে হারিয়ে গেলেও আমার, আমাদের অন্তরে তিনি স্থায়ী হয়ে আছেন।
কাণ্ড, মাত্রা এবং সাধারণ- এই তিন রকমের জ্ঞানের কথা মনে হলো, রাজনীতির মাঠে বেলাগাম মন্তব্য প্রতিশ্রুতি শুনে। অনেকেই নির্বাচনী পাটিগণিত সঠিকভাবে সমাধানের জন্য, শত্রুর সঙ্গে এক কক্ষে বসত করছেন, মিত্রকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের দেশীয় কথায়, ‘তেল পানি কখনো একসাথে মিশে না’, নির্বাচনী হিসেবে তেল, পানিকে সুগন্ধী দিয়ে একসঙ্গে মেশানো হয় যাতে গন্ধে বিভোর হয়ে মানুষ খুঁজতে না যায়, ভেতরে তেল পানি সত্যি মিশেছে কিনা। এই যে বললাম শত্রু মিত্র, শত্রুর শত্রু, মিত্রের শত্রু, সব মিলে মিশে একাকার। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের অমর পঙ্ক্তির মতো: ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,/করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা/আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!’ কবি তার বিদ্রোহের সত্তাকে উন্মোচনে করতে গিয়ে এই মহৎ কথাগুলো বলে গেছেন। রাজনীতির মাঠের কুশীলবরা কেনো বেলাগাম, কাণ্ডজ্ঞানহীন এসব বয়ান দিচ্ছেন তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। জ্ঞানী মানুষদের কাছে কাণ্ডজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান এবং মাত্রা জ্ঞান হলো অত্যন্ত উপরিস্তরের মানে ভেসে থাকা জ্ঞান যে জ্ঞানের জন্য ধ্যান করে গভীরে প্রবেশ করতে হয় না। দার্শনিকরা মনে করে থাকেন এসব প্রাথমিক বিষয় সব মানুষই স্বাভাবিকভাবে অর্জন করতে সক্ষম। আবার অনেক ভিন্ন চিন্তার মানুষরা ভাবেন, এসব জ্ঞান মোটেই উপরিস্তরের জ্ঞান নয়, সক্রেটিসের নিজেকে জানো, ‘নো দাই সেলফের’ মতো অতি উচ্চ মার্গের জ্ঞান।
রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের পূর্বে হুশ রেখেই বেহুশ হয়ে যান বলে অনেকে মনে করে থাকেন। অনেকের ধারণা তারা সত্যি সত্যি বেহুশ হয়ে পড়েন জয় লাভের সুতীব্র ইচ্ছায়। আর এক ঘরানার বিশ্লেষকরা ভাবেন, এই অজ্ঞান হয়ে যাওয়াতে তাদের মোটেই দায় বা দোষ নেই। নিষ্পাস আবেগের প্রকাশ। বাংলা সিনেমায় প্রেমিক যখন হয়ে যায় ‘দরদি শত্রু’, অনেকটা দরদ থেকে আধুনিক ‘চৌধুরী সাহেব’ জনগণের প্রতি ভালোবাসা থেকে অ-জ্ঞান হয়ে যান। এক্ষেত্রে অজ্ঞান কিন্তু সার্জারির টেবিলের জ্ঞান হারানো নয়, জ্ঞান রেখেই নির্বাচনী অ-জ্ঞান। অজ্ঞান হয়ে গেলেও জ্ঞান থাকার মতো সবকিছু উপলব্ধি করা যায়। আর একটি ‘স্কুল অব থট’ আছে যাকে এড়িয়ে যাওয়া কোনভাবে সম্ভব নয়। সেটি হলো বাঙালির মনের ভেতরে থাকা বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো আবেগের স্রোত। সমুদ্রে মতো বাঙালির আবেগের জোয়ার ভাটা নাই, বাঙালির আবেগে বল্গাহীন, শুধু জোয়ারের মতো আসতে থাকে। আবেগের মাত্রার পরিবর্তন হয় মাঝে মধ্যে তবে নিস্তরঙ্গ হয় না কখনো। আবেগের জোয়ার যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় তখন আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখ দিয়ে বেশুমার কথা বেরোতে থাকে।
প্রান্তিক বাঙালির এই আবেগকে উসকে দিতে জানেন, আমাদের বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদরা। তারা মাঝে মাঝে কৌশলে আবেগের বাঁধ ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করেন, যেমন করে হাজার কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ ভেঙে দেয় লোভি, দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদার রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিয়ে; ব্যাপারটা ঠিক সেরকম। আবেগের বাঁধ ভেঙে গেলে বাঙালি কাণ্ডজ্ঞান, মাত্রাজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সন্মোহিত হয়ে রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির পিছু নিতে থাকে। আবেগের তোড়ে আমরা অনেক মহৎ পরিবর্তনের দেখা পেয়েছি আবার এই আবেগের প্লাবনে অনন্ত আশা নিয়ে জেগে ওঠা বাঙালিকে বিমর্ষ হয়ে আশাহত হতেও দেখেছি। এতোবার আশাহত হওয়ার পরও ফিনিক্স পাখির স্বভাব করায়ত্ত করা বাঙালি আবার জেগে ওঠে। নতুন শুরুর প্রত্যাশা নিয়ে বুক বাঁধে।
নির্বাচন আসন্ন হলে আমাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিশ্রুতির ডালা সাজিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত হন। এসময় রাজনীতিবিদরা সচেতন, অসচেতনভাবে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কাণ্ডজ্ঞানকে বলা হয় সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কাণ্ডজ্ঞানকে কিছুটা বিকশিত করে তবে কান্ডজ্ঞান অর্জন করতে হয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে, নির্বাচনী বক্তৃতায় বিশেষ করে মেঠো বক্তৃতায় সব চেয়ে বেশি ব্যবহার হয় চারটি বিষয়। ধর্ম, নারী, কর্মসংস্থান এবং সার্বিক অর্থনীতি। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় বা হচ্ছে, সাধারণ বিশ্লেষকের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়।
নির্বাচনে সাধারণত অংশগ্রহণকারী দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি, পরিকল্পনার কথা শোনা যায় নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে। ইশতেহার থেকে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ দলটির নির্বাচনোত্তর কার্যক্রমের প্রতিশ্রুতি পেয়ে যায়। ইশতেহার মূলত প্রকাশ্য ঘোষণা। যেখানে কর্ম পরিকল্পনা এবং দলের ভিশন নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথরেখা সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
নির্বাচনে সবাই নারী স্বাধীনতা, নারীর দক্ষতাকে শতভাগ কাজে লাগানোর কথা বলছেন। কিন্তু কীভাবে কাজে লাগানো হবে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে আড়াইশ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে যেখানে অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। এসব কারখানা চালু করার কথা না বলে নতুন কর্মসংস্থান কী করে হবে, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়।
১৮ মাসে এক কোটি তরুণের কর্ম সংস্থান হবে, এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিএনপি। এই প্রতিশ্রুতি দেয়ার পূর্বে মনে রাখতে হবে এই সময়ের মধ্যে ১৮ থেকে ২০ লাখ তরুণ নতুন করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, অর্থসংস্থানের বিষয়টি সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে যে সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক বিদ্যমান আছে (বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা)-এর সঙ্গে বিএনপি চার কোটি পরিবারকে পারিবারিক কার্ড প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২৫০০ টাকা প্রদানের কথা বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, রাজস্ব আহোরণ কী করে হবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া না গেলে এরকম আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি জনমনে স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারবে না।
প্রতিশ্রুতি দেয়ার ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ হয়ে মাত্রাজ্ঞান হারানো উচিত হবে না বলে মনে হয়। ভোটারের মনোরঞ্জনের জন্য কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রতিশ্রুতি প্রদান করলে পরবর্তীতে বুমেরাং হয়ে প্রতিশ্রুতিগুলো আবার রাজনৈতিক দলের কাছে ‘প্রশ্ন’ আকারে ফিরে আসবে, কথাটি মনে রাখতে হবে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারবার এর বরখেলাপের ফলে রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়। মানুষের আস্থা যখন রাজনৈতিক দলের প্রতি হারিয়ে যায় তখন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
স্বাধীন সার্বভৌম দেশে ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা বহাল থাকতে পারে না। দেশপ্রেম মানে দেশের সব শ্রেণির মানুষের প্রতি সমাদৃত নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়নি। শাসক বদল হয়েছে, শাসনের চরিত্রের বদল এখনও দৃশ্যমান নয়। গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ও সময়ের অপচয় করলে একদিন আবার জেগে ওঠা মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হলে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত কবিতার পঙ্?ক্তির মতো আমাদের হয়তো উচ্চারণ করতে হবে -‘আমরা বুঝতে পারিনি/আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ এরকম কথা যাতে উচ্চারণ করতে না হয়, তাই এবারের সুবর্ণ সুযোগকে হারানো উচিত হবে না কোনভাবেই।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]