নজরুল রাসেল
যেকোন রাষ্ট্রে কিছু নাগরিক থাকেন, যাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাস্তব ও প্রমাণিত। রাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বা স্তরে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। আবার অনেকে আছেন, যারা নিজ খরচে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলেন; বিশেষ করে সেলিব্রিটি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি আজকাল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই এ-কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাষ্ট্রে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে।
তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী যে কেবল সুরক্ষার জন্য নয়, তা আমাদের ঢাকাই সিনেমা আর আকাশ সংস্কৃতি বহু আগেই শিখিয়েছে। চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করলে মানুষকে দেখতে ‘অন্যরকম’ লাগে- এই ধারণা এখন আমাদের মন-মস্তিষ্কে অবচেতনে ঢুকে গেছে। আর যদি সেই নিরাপত্তা বাহিনীর গায়ে থাকে বিশেষ কোনো পোশাক- কালো কোট, সানগ্লাস- তাহলে তো কথাই নেই। নিরাপত্তা তখন আর নিরাপত্তা থাকে না, হয়ে ওঠে একধরনের সামাজিক স্ট্যাটাস প্রদর্শনের হাতিয়ার।
২০১৪ সালের একটি দৃশ্য এখনও অনেকের মনে থাকার কথা। তখন বাংলাদেশের আলোচিত ধনী মুসা বিন শমসের, যিনি ‘প্রিন্স মুসা’ নামেই বেশি পরিচিত, দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে গিয়েছিলেন কালো কোট ও সানগ্লাস পরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর বিশাল বহর নিয়ে। সেই দৃশ্য আমাদের মুঠোফোনের স্ক্রিনে বারবার ফিরে এসেছে। হয়তো সেখান থেকেই আমাদের সমাজে একধরনের মানসিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে-ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করা।
এই সংক্রমণ শুধু জনসাধারণের মধ্যেই নয়, সরকারি দপ্তরেও হানা দিয়েছে। আমাদের সামরিক বাহিনীর মতো পুলিশেরও নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম আছে। পুলিশের বড় কোনো কর্মকর্তা কোথাও গেলে তার অধস্তন কর্মকর্তা-কনস্টেবলরা ইউনিফর্মেই তার সঙ্গে থাকেন। ফলে বড় কর্তাকে ঘিরে পুলিশের পোশাক পরা সদস্যদের একটি বলয় তৈরি হয়। এই বলয় প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।
তবে এতে সবচেয়ে অস্বস্তিতে পড়েন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের মধ্যকার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা আমাদের অজানা নয়। কে বেশি দৃশ্যমান থাকবেন, কে বেশি প্রটোকল পাবেন- এই প্রশ্নটি নীরবে কিন্তু গভীরভাবে সেখানে কাজ করে। সম্ভবত এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন থেকেই ডিসিদের নতুন উদ্ভাবন (ঠিক নতুন নয়, অনেক দিন হয়ে গেছে)- ‘ডিবি জ্যাকেট’ বা ‘ডিবি ভেস্ট’ পরা নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। খাকি রঙের সেই জ্যাকেটের পেছনে বড় করে লেখা থাকে: ‘জেলা প্রশাসন’ এবং তার নিচে জেলার নাম।
আমি একবার একটি কলেজের অনুষ্ঠানে গুনে দেখেছিলাম, ডিবি জ্যাকেট পরা এমন ২২ জন ডিসির চারপাশে ঘোরাফেরা করছেন। আমার মনে পড়ল, ২০১৪ সালে মুসা বিন শমসের দুদকে গিয়েছিলেন (সম্ভবত) ২৫ জনের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে। পঁচিশ থেকে তিন কম, পার্থক্য খুব বেশি নয়। যেকোন অনুষ্ঠানে ডিসিকে কেন্দ্র করে তাদের এই ঘোরাফেরা সমাজে কী বার্তা দেয়- সেটাই এখন প্রশ্ন। একইভাবে প্রশ্ন: এই ২২ জনই কি ডিসি অফিসে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত?
মেট্রোপলিটন এলাকায় বসবাসকারী অনেকেই হয়তো জানেন না, এই প্রবণতা জেলা প্রশাসনেই থেমে থাকেনি; জেলা থেকে নেমে এসেছে উপজেলায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও এখন এই ডিবি জ্যাকেট পরা নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলেছেন। জ্যাকেটের পেছনে একইভাবে লেখা থাকে: ‘উপজেলা প্রশাসন’ এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার নাম। আগামীতে এটা যে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার ও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পর্যন্ত গড়াবে না, তা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীতে কালো কোটের পরিবর্তে ডিবি জ্যাকেট-এর জনপ্রিয়তায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেরও ভূমিকা আছে। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা নাগরিক। কারওয়ান বাজারে তার ওপর হামলার ঘটনা আমরা আজও ভুলে যাইনি। অথচ দীর্ঘ সময় তাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেয়া হয়নি। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকার এই সময়টাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ‘চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইতোমধ্যে আমাদের জানা হয়ে গেছে যে, সিএসএফ-এর জ্যাকেটের পেছনে ইংরেজিতে ‘সিএসএফ’ লেখা থাকে। অনুমান করি, বিএনপির চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্সের কল্যাণে এই ডিবি জ্যাকেটের সামাজিক জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়।
পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দেশে শিগগিরই এমন সময় আসবে, ডিবি জ্যাকেট পরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়া কেউ কোন পাবলিক প্লেসে যাবে না। হতে পারে একজন লেখক বইমেলায় যাবেন, তার সঙ্গে কয়েকজন পাঠক ডিবি জ্যাকেট পরে থাকবেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে। কারণ লেখকেরও নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে পারে। কোনো লেখা কারও পছন্দ না হলে লেখকের ওপর ক্ষোভ জন্মাতেই পারে।
একই যুক্তিতে একজন শিক্ষক বাসা থেকে তার নিজ প্রতিষ্ঠানে যাবেন, সঙ্গে কয়েকজন ছাত্র ডিবি জ্যাকেট পরে থাকবেন। জ্যাকেটের পেছনে লেখা থাকবে তার কোচিংয়ের নাম। কারণ কোনো ছাত্র বা অভিভাবক যেকোন কারণে শিক্ষকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতেই পারেন। উপরের কথাগুলো শুনতে হাস্যকর লাগলেও আমরা ঠিক সে পথেই এগোচ্ছি।
একবার ঢাকার এক ওয়ার্ড কমিশনার নিহত হওয়ার পর সরকার সব ওয়ার্ড কমিশনারকে পুলিশ স্কট দিয়েছিল। কিছুদিন পর জানা গেল, অনেক কমিশনার এই নিরাপত্তা আর নিতে চান না। কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর থাকা-খাওয়ার খরচ, গাড়ি, বাসস্থানের ব্যবস্থা-সব তাদেরই করতে হচ্ছে। পরে কেউ কেউ সরকারকে লিখিতভাবে অনুরোধও করেছিলেন, যেন এই নিরাপত্তা তুলে নেয়া হয়।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকেও একবার সরকার গানম্যান দিয়েছিল (তিনি সেই গানম্যানের নাম দিয়েছিলেন ‘বন্দুক-মানব’)। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক জীবনে এর প্রভাব তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই পুলিশের কাছে গিয়ে গানম্যান তুলে নেয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই।
গত ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন। তার নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে দেশ-বিদেশে কারোরই কোনো দ্বিমত ছিল না। অবশেষে সরকার এবং সিএসএফ-এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তিনি দেশে আসেন। তার নিরাপত্তায় একাধিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সিএসএফ-এর ভূমিকাও আমরা স্পষ্টভাবে দেখছি (তার নিরাপত্তায় সবচেয়ে কাছের বলয়টি এই সিএসএফ-এরই)।
এখন এই সিএসএফ যেন নির্বাচনের মাঠে নতুন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় এক প্রার্থীকে দেখা গেল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডিবি জ্যাকেট পরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে যেতে। তারা পেশাদার নিরাপত্তা বাহিনী নাকি ভাই-ব্রাদার, সেটি জানা না গেলেও দৃশ্যটি পরিচিত। হয়তো যুক্তি দেয়া যায়- ওই প্রার্থীর নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে শিশুর জামা দেখে নিজের ছেলে শিশুকেও সেই একই জামা পরানো হাস্যকর প্রচেষ্টা।
আর ওই প্রার্থীর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা যদি মেনেও নেই, তাহলে মানতে হয়-নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে যাওয়া প্রতিটি ভোটারেরও নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। সেক্ষেত্রে সবাই ডিবি জ্যাকেট পরা লোকজন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন-এমন দৃশ্য কল্পনা করলেই বোঝা যায় আমরা কতটা অযৌক্তিক পথে হাঁটছি। আমাদের মনে রাখা উচিত, ডিবি জ্যাকেট পরে কিছু মানুষ চারপাশে দৌড়ালেই বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান হওয়া যাবে না।
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা, কোনো একটি বিষয় পেলে সেটিকে আমরা অধঃপতনের শেষ সীমা পর্যন্ত না নিয়ে গিয়ে থামি না। অনুকরণপ্রিয়তা আমাদের জাতীয় চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়- এ কথা সত্য। কিন্তু নিরাপত্তাকে যদি আমরা ক্ষমতার প্রদর্শনী ও সামাজিক নাটকের অংশ বানিয়ে ফেলি, তাহলে শেষ পর্যন্ত এই নিরাপত্তাই আমাদের জন্য নতুন ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক; অ্যামাজন-তালিকাভুক্ত ‘হোয়াট ডু সিটিজেন্স থিঙ্ক’ বইয়ের লেখক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
নজরুল রাসেল
শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
যেকোন রাষ্ট্রে কিছু নাগরিক থাকেন, যাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাস্তব ও প্রমাণিত। রাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বা স্তরে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। আবার অনেকে আছেন, যারা নিজ খরচে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলেন; বিশেষ করে সেলিব্রিটি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি আজকাল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই এ-কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাষ্ট্রে কিছু মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে।
তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী যে কেবল সুরক্ষার জন্য নয়, তা আমাদের ঢাকাই সিনেমা আর আকাশ সংস্কৃতি বহু আগেই শিখিয়েছে। চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করলে মানুষকে দেখতে ‘অন্যরকম’ লাগে- এই ধারণা এখন আমাদের মন-মস্তিষ্কে অবচেতনে ঢুকে গেছে। আর যদি সেই নিরাপত্তা বাহিনীর গায়ে থাকে বিশেষ কোনো পোশাক- কালো কোট, সানগ্লাস- তাহলে তো কথাই নেই। নিরাপত্তা তখন আর নিরাপত্তা থাকে না, হয়ে ওঠে একধরনের সামাজিক স্ট্যাটাস প্রদর্শনের হাতিয়ার।
২০১৪ সালের একটি দৃশ্য এখনও অনেকের মনে থাকার কথা। তখন বাংলাদেশের আলোচিত ধনী মুসা বিন শমসের, যিনি ‘প্রিন্স মুসা’ নামেই বেশি পরিচিত, দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে গিয়েছিলেন কালো কোট ও সানগ্লাস পরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর বিশাল বহর নিয়ে। সেই দৃশ্য আমাদের মুঠোফোনের স্ক্রিনে বারবার ফিরে এসেছে। হয়তো সেখান থেকেই আমাদের সমাজে একধরনের মানসিক সংক্রমণ শুরু হয়েছে-ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে চলাফেরা করা।
এই সংক্রমণ শুধু জনসাধারণের মধ্যেই নয়, সরকারি দপ্তরেও হানা দিয়েছে। আমাদের সামরিক বাহিনীর মতো পুলিশেরও নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম আছে। পুলিশের বড় কোনো কর্মকর্তা কোথাও গেলে তার অধস্তন কর্মকর্তা-কনস্টেবলরা ইউনিফর্মেই তার সঙ্গে থাকেন। ফলে বড় কর্তাকে ঘিরে পুলিশের পোশাক পরা সদস্যদের একটি বলয় তৈরি হয়। এই বলয় প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।
তবে এতে সবচেয়ে অস্বস্তিতে পড়েন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের মধ্যকার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা আমাদের অজানা নয়। কে বেশি দৃশ্যমান থাকবেন, কে বেশি প্রটোকল পাবেন- এই প্রশ্নটি নীরবে কিন্তু গভীরভাবে সেখানে কাজ করে। সম্ভবত এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন থেকেই ডিসিদের নতুন উদ্ভাবন (ঠিক নতুন নয়, অনেক দিন হয়ে গেছে)- ‘ডিবি জ্যাকেট’ বা ‘ডিবি ভেস্ট’ পরা নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। খাকি রঙের সেই জ্যাকেটের পেছনে বড় করে লেখা থাকে: ‘জেলা প্রশাসন’ এবং তার নিচে জেলার নাম।
আমি একবার একটি কলেজের অনুষ্ঠানে গুনে দেখেছিলাম, ডিবি জ্যাকেট পরা এমন ২২ জন ডিসির চারপাশে ঘোরাফেরা করছেন। আমার মনে পড়ল, ২০১৪ সালে মুসা বিন শমসের দুদকে গিয়েছিলেন (সম্ভবত) ২৫ জনের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে। পঁচিশ থেকে তিন কম, পার্থক্য খুব বেশি নয়। যেকোন অনুষ্ঠানে ডিসিকে কেন্দ্র করে তাদের এই ঘোরাফেরা সমাজে কী বার্তা দেয়- সেটাই এখন প্রশ্ন। একইভাবে প্রশ্ন: এই ২২ জনই কি ডিসি অফিসে নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত?
মেট্রোপলিটন এলাকায় বসবাসকারী অনেকেই হয়তো জানেন না, এই প্রবণতা জেলা প্রশাসনেই থেমে থাকেনি; জেলা থেকে নেমে এসেছে উপজেলায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও এখন এই ডিবি জ্যাকেট পরা নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলেছেন। জ্যাকেটের পেছনে একইভাবে লেখা থাকে: ‘উপজেলা প্রশাসন’ এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার নাম। আগামীতে এটা যে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার ও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পর্যন্ত গড়াবে না, তা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীতে কালো কোটের পরিবর্তে ডিবি জ্যাকেট-এর জনপ্রিয়তায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেরও ভূমিকা আছে। বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা নাগরিক। কারওয়ান বাজারে তার ওপর হামলার ঘটনা আমরা আজও ভুলে যাইনি। অথচ দীর্ঘ সময় তাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেয়া হয়নি। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকার এই সময়টাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ‘চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইতোমধ্যে আমাদের জানা হয়ে গেছে যে, সিএসএফ-এর জ্যাকেটের পেছনে ইংরেজিতে ‘সিএসএফ’ লেখা থাকে। অনুমান করি, বিএনপির চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্সের কল্যাণে এই ডিবি জ্যাকেটের সামাজিক জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়।
পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দেশে শিগগিরই এমন সময় আসবে, ডিবি জ্যাকেট পরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়া কেউ কোন পাবলিক প্লেসে যাবে না। হতে পারে একজন লেখক বইমেলায় যাবেন, তার সঙ্গে কয়েকজন পাঠক ডিবি জ্যাকেট পরে থাকবেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে। কারণ লেখকেরও নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে পারে। কোনো লেখা কারও পছন্দ না হলে লেখকের ওপর ক্ষোভ জন্মাতেই পারে।
একই যুক্তিতে একজন শিক্ষক বাসা থেকে তার নিজ প্রতিষ্ঠানে যাবেন, সঙ্গে কয়েকজন ছাত্র ডিবি জ্যাকেট পরে থাকবেন। জ্যাকেটের পেছনে লেখা থাকবে তার কোচিংয়ের নাম। কারণ কোনো ছাত্র বা অভিভাবক যেকোন কারণে শিক্ষকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতেই পারেন। উপরের কথাগুলো শুনতে হাস্যকর লাগলেও আমরা ঠিক সে পথেই এগোচ্ছি।
একবার ঢাকার এক ওয়ার্ড কমিশনার নিহত হওয়ার পর সরকার সব ওয়ার্ড কমিশনারকে পুলিশ স্কট দিয়েছিল। কিছুদিন পর জানা গেল, অনেক কমিশনার এই নিরাপত্তা আর নিতে চান না। কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর থাকা-খাওয়ার খরচ, গাড়ি, বাসস্থানের ব্যবস্থা-সব তাদেরই করতে হচ্ছে। পরে কেউ কেউ সরকারকে লিখিতভাবে অনুরোধও করেছিলেন, যেন এই নিরাপত্তা তুলে নেয়া হয়।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকেও একবার সরকার গানম্যান দিয়েছিল (তিনি সেই গানম্যানের নাম দিয়েছিলেন ‘বন্দুক-মানব’)। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বিরক্ত হয়ে পড়েন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক জীবনে এর প্রভাব তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই পুলিশের কাছে গিয়ে গানম্যান তুলে নেয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই।
গত ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন। তার নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে দেশ-বিদেশে কারোরই কোনো দ্বিমত ছিল না। অবশেষে সরকার এবং সিএসএফ-এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তিনি দেশে আসেন। তার নিরাপত্তায় একাধিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সিএসএফ-এর ভূমিকাও আমরা স্পষ্টভাবে দেখছি (তার নিরাপত্তায় সবচেয়ে কাছের বলয়টি এই সিএসএফ-এরই)।
এখন এই সিএসএফ যেন নির্বাচনের মাঠে নতুন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় এক প্রার্থীকে দেখা গেল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডিবি জ্যাকেট পরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে যেতে। তারা পেশাদার নিরাপত্তা বাহিনী নাকি ভাই-ব্রাদার, সেটি জানা না গেলেও দৃশ্যটি পরিচিত। হয়তো যুক্তি দেয়া যায়- ওই প্রার্থীর নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে শিশুর জামা দেখে নিজের ছেলে শিশুকেও সেই একই জামা পরানো হাস্যকর প্রচেষ্টা।
আর ওই প্রার্থীর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা যদি মেনেও নেই, তাহলে মানতে হয়-নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে যাওয়া প্রতিটি ভোটারেরও নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। সেক্ষেত্রে সবাই ডিবি জ্যাকেট পরা লোকজন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন-এমন দৃশ্য কল্পনা করলেই বোঝা যায় আমরা কতটা অযৌক্তিক পথে হাঁটছি। আমাদের মনে রাখা উচিত, ডিবি জ্যাকেট পরে কিছু মানুষ চারপাশে দৌড়ালেই বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান হওয়া যাবে না।
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা, কোনো একটি বিষয় পেলে সেটিকে আমরা অধঃপতনের শেষ সীমা পর্যন্ত না নিয়ে গিয়ে থামি না। অনুকরণপ্রিয়তা আমাদের জাতীয় চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়- এ কথা সত্য। কিন্তু নিরাপত্তাকে যদি আমরা ক্ষমতার প্রদর্শনী ও সামাজিক নাটকের অংশ বানিয়ে ফেলি, তাহলে শেষ পর্যন্ত এই নিরাপত্তাই আমাদের জন্য নতুন ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক; অ্যামাজন-তালিকাভুক্ত ‘হোয়াট ডু সিটিজেন্স থিঙ্ক’ বইয়ের লেখক]